শহরের মানুষ বইমেলায় যায় বই কিনতে, কিন্তু সেদিন কেউ জানত না—একটা বই তাদের নিজেদেরই গল্প ফিরিয়ে দেবে।
শীতের শেষ বিকেল। আকাশে রোদের রঙটা ধীরে ধীরে কমলা হয়ে আসছিল। শহরের পুরোনো টাউন হলের সামনে প্রতি বছরের মতো এবারও বসেছে ছোট্ট একটা বইমেলা।
মেলার ভিড় খুব বড় ছিল না, তবে অদ্ভুত এক শান্তি ছিল সেখানে। পুরোনো বইয়ের গন্ধ, চায়ের কাপ থেকে উড়তে থাকা ধোঁয়া, দূরে ভাজা বাদামের গন্ধ আর মানুষের নরম কণ্ঠের কথাবার্তা—সব মিলিয়ে যেন অন্য এক পৃথিবী।
মেলার একেবারে শেষ মাথায় ছিল ছোট্ট একটা স্টল।
স্টল নম্বর ২৭।
স্টলটার উপরে কোনো প্রকাশনীর নাম লেখা ছিল না।
শুধু একটা সাদা বোর্ডে কালো কালি দিয়ে লেখা ছিল—
"যে গল্প খুঁজছ, হয়তো সেই গল্পই তোমাকে খুঁজছে।"
এই কথাটাই থামিয়ে দিয়েছিল নীলয়কে।
নীলয় পেশায় সাংবাদিক। মানুষের গল্প খুঁজে বের করাই তার কাজ। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে সে একটা কথাও লিখতে পারছিল না।
স্টলের ভেতরে বসেছিলেন সাদা দাড়িওয়ালা একজন বৃদ্ধ।
নীলয় বইগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
— "এই বইগুলো কোন প্রকাশনীর?"
বৃদ্ধ হালকা হেসে বললেন,
— "সব গল্পের প্রকাশক থাকে না। কিছু গল্প শুধু পাঠক খুঁজে বেড়ায়।"
নীলয় একটু অবাক হলো।
— "বই কিনতে হলে কত টাকা দিতে হবে?"
বৃদ্ধ বললেন,
— "দাম বই ঠিক করে না, পাঠক ঠিক করে।"
কথাটা শুনে নীলয় হেসে ফেলল।
বইয়ের স্তূপের মধ্যে একটা নীল মলাটের বই তার চোখে পড়ল।
বইটার কোনো নাম নেই।
কোনো লেখকের নামও নেই।
শুধু প্রথম পাতায় লেখা—
"যে মানুষগুলোকে আমরা ভুলে যাই, তারা কি সত্যিই হারিয়ে যায়?"
নীলয় বইটা কিনে বাড়ি ফিরে গেল।
রাতে বইটা খুলে সে থমকে গেল।
প্রথম অধ্যায়ের নাম—
"রেলস্টেশনের বেঞ্চে বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটি।"
নীলয়ের বুক ধক করে উঠল।
দুই বছর আগে সে এক বৃদ্ধের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল।
বৃদ্ধ বলেছিলেন,
— "আমার ছেলেরা আমাকে ভুলে গেছে।"
নীলয় সেই সাক্ষাৎকার কখনো প্রকাশ করেনি।
পরদিন খবর এসেছিল, বৃদ্ধ মানুষটা মারা গেছেন।
বইয়ের পাতায় ঠিক সেই কথোপকথন লেখা।
একটা শব্দও এদিক-ওদিক হয়নি।
নীলয়ের হাত কাঁপতে লাগল।
সে ভাবল, এটা কি কাকতালীয়?
পরের অধ্যায় খুলল।
সেখানে লেখা—
"লাল ছাতাওয়ালা মেয়েটি।"
পাঁচ বছর আগে এক বর্ষার দিনে নীলয় একটা মেয়েকে দেখেছিল বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে।
মেয়েটি হেসে বলেছিল,
— "কখনো কখনো অপরিচিত মানুষরাই সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকে।"
সেদিনের পর আর কখনো তার সঙ্গে দেখা হয়নি।
কিন্তু সেই কথাটাও বইয়ের পাতায় লেখা ছিল।
একদম হুবহু।
সারা রাত নীলয় ঘুমাতে পারল না।
পরদিন সে আবার বইমেলায় গেল।
কিন্তু স্টল নম্বর ২৭ নেই।
পাশের স্টলের বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করল,
— "এখানে কাল একটা স্টল ছিল না?"
লোকটা অবাক হয়ে বলল,
— "না ভাই, এখানে তো কোনো স্টল ছিল না।"
— "একজন বৃদ্ধ ছিলেন..."
— "আপনি হয়তো ভুল করছেন।"
নীলয় চুপ করে গেল।
সেই রাতে বইয়ের শেষ অংশ খুলতেই সে আরেকটা নাম দেখল।
তার নিজের নাম।
অধ্যায়ের শিরোনাম—
"যে মানুষ অন্যের গল্প লিখতে লিখতে নিজের গল্প হারিয়ে ফেলেছিল।"
সেখানে লেখা ছিল—
"নীলয় মানুষের দুঃখ লিখেছে, মানুষের স্বপ্ন লিখেছে, মানুষের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো লিখেছে। কিন্তু নিজের বাবাকে শেষবার ফোন করার সময় খুঁজে পায়নি।"
নীলয়ের চোখ ভিজে উঠল।
বাবার সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল আট মাস আগে।
অভিমান, ব্যস্ততা, কাজ—সবকিছুর ভিড়ে সম্পর্কটা দূরে সরে গিয়েছিল।
পাতার নিচে আরও একটা লাইন লেখা ছিল—
"যে গল্পগুলো আমরা কাল লিখব ভাবি, সেগুলোর অনেকগুলোই আজ লিখে ফেলা উচিত।"
সেই রাতেই নীলয় বাবাকে ফোন করল।
ওপাশ থেকে কাঁপা গলায় উত্তর এল,
— "হ্যালো?"
নীলয় অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— "আব্বু, কেমন আছো?"
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর খুব আস্তে একটা উত্তর—
— "তুই ফোন করেছিস, এখন ভালো আছি।"
মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো কোনো ভাষায় পুরো বলা যায় না।
এটাও ছিল তেমন একটা মুহূর্ত।
কয়েকদিন পর নীলয় আবার বইমেলায় গেল।
স্টল নম্বর ২৭ এখনও নেই।
কিন্তু যেখানে স্টলটা ছিল, সেখানে মাটিতে একটা কাগজ পড়ে ছিল।
সেখানে লেখা—
"প্রতিটি মানুষ একটা অসমাপ্ত বই।
কেউ পুরোটা পড়তে পারে না।
তবে কেউ যদি মন দিয়ে পড়ে, তাহলে একটা জীবন বদলে যেতে পারে।"
নীলয় কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিল।
তারপর সে বাড়ি ফিরে একটা নতুন লেখা শুরু করল।
লেখার প্রথম লাইন ছিল—
"পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্য হয়তো ভূতের গল্প নয়, হারিয়ে যাওয়া শহরও নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—আমরা কত সহজে গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলোকে সাধারণ ভেবে ফেলি।"
বইটা পরে প্রকাশিত হয়েছিল।
নাম ছিল—
"শেষ বিকেলের বইমেলা"
আর বইয়ের উৎসর্গপত্রে শুধু একটি লাইন লেখা ছিল—
"সেই অজানা বই বিক্রেতার জন্য, যিনি আমাকে আমার নিজের গল্পটা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।"
15
View