Posts

গল্প

ভূতের বাড়ি ডাব চুরি করতে গিয়ে ভূতের কাছে ধরা খেলাম।

July 1, 2026

Shafin pro

2
View

১১ বন্ধুর ডাব চুরি ও ভূতের বাড়ির রহস্যপর্ব ১: লোডশেডিং এবং ঘাটলার আড্ডামেট্রিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরের সেই তিন মাস যেন ছিল অনন্তকালের মতো দীর্ঘ। পড়ার কোনো তাড়া নেই, সকালে দেরিতে ঘুম থেকে উঠলেও কেউ বকার নেই। এক অদ্ভুত মুক্তির আনন্দ তখন আমাদের সবার মনে। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও একঘেয়েমি কাটাতে আমাদের প্রধান আশ্রয় ছিল গ্রামের বাশঁঝাড়ের কোল ঘেঁষে থাকা সেই পুরোনো পুকুরপাড়ের সানবাঁধানো ঘাটলাটি।সেদিন রাতে মারাত্মক ভ্যাপসা গরম পড়েছিল। বাতাসে কোনো কম্পন ছিল না, গাছের পাতাও নড়ছিল না। তার ওপর সন্ধ্যার পর থেকেই পুরো এলাকায় শুরু হলো ভয়াবহ লোডশেডিং। ঘরে টেকা দায়। একে একে আমরা সবাই এসে হাজির হলাম সেই চেনা ঘাটলায়।আঁধার রাতে পুকুরের স্থির জলে আকাশের তারাদের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছিল। আমরা মোট এগারো জন বন্ধু—আমি (শান্ত), আনোয়ার, রহিম, ফারুক, করিম, মোস্তফা, মানিক, রতন এবং বাকিরা। গরমে সবাই তখন হাঁসফাঁস করছি আর গেঞ্জি দিয়ে বাতাস করছি।হঠাৎ আনোয়ার নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠল, "বন্ধু, এই মরণ গরমে এভাবে বসে থাকা যায়? কারেন্ট আসতে তো মনে হয় আরও এক-দেড় ঘণ্টা বাকি। কিছু একটা কর।"রহিম এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "এই, তোদের কারো কাছে ম্যাচ আছে রে?"আমি কিছুটা অবাক হয়ে বললাম, "কেন? ম্যাচ দিয়ে কী করবি? তোর কাছে সিগারেট আছে নাকি?"ফারুক পকেট হাতড়ে একটা দেশলাই বের করে গর্বের সুরে বলল, "ম্যাচ আমার কাছে আছে। আর এই দেখ, একটা চারমিনার সিগারেটও আছে!"আমি হেসে বললাম, "আরে বোকা, আমরা এখানে এগারো জন! একটা সিগারেট এগারো জনে কীভাবে খাব?"করিম তখন আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলল, "শান্ত, তুই-ই আগে ধরা। টান শুরু কর, তারপর দেখা যাবে।"আমি দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে সিগারেটটা ধরালাম। আগুনের লাল আলোয় আমাদের সবার উৎসুক মুখগুলো একবার ঝলকানি দিয়ে উঠল। বুক ভরে মাত্র দুটো টান দিয়েছি, অমনি পাশ থেকে রহিম সেটা কেড়ে নিল। তারপর শুরু হলো এক অদ্ভুত মহোৎসব। এক এক করে সবাই মাত্র এক টান বা দুই টান দিতে দিতে এগারো জনের হাত ঘুরে সেই একটা সিগারেট নিমেষেই শেষ হয়ে গেল।আমরা তখন ছাত্র মানুষ, পকেটে একটা ফুটো পয়সাও নেই যে দোকান থেকে আরেকটা কিনে আনব। সিগারেটের ধোঁয়া মিলিয়ে যেতেই আবার সেই চেনা একঘেয়েমি আর গরম আমাদের গ্রাস করল।পর্ব ২: ভূতের বাড়ির পরিকল্পনাঠিক তখনই মোস্তফা সোজা হয়ে বসল। তার চোখে এক চোর চোর চতুর চাউনি। সে ফিসফিস করে বলল, "এই, চল না সবাই মিলে ভূতের বাড়ি যাই!"আমাদের শহরের সেই নির্জন, অন্ধকার রাস্তাটার নামই ছিল 'ভূতের বাড়ি গলি'। সেখানে একটা মস্ত বড় পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি ছিল, যা নিয়ে এলাকায় নানা রকমের ভৌতিক গল্প প্রচলিত ছিল। কেউ বলত রাতে সেখানে আলো জ্বলতে দেখা যায়, কেউ বলত নূপুরের আওয়াজ শোনা যায়।আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম, "এত রাতে ভূতের বাড়ি গিয়ে কী করব শুনি?"মোস্তফা উত্তেজিত হয়ে বলল, "আরে ধুর, ভূত-টুত কিছু না! আমি কাল দুপুরে ওই দিক দিয়ে আসার সময় দেখেছি, ভূতের বাড়ির পেছনের গাছগুলোয় একদম থোকায় থোকায় ডাব ধরে আছে। এই গরমে এক একটা ডাব যেন অমৃত! চল, ডাব পেড়ে খাই।"ডাবের কথা শুনতেই সবার জিভে জল চলে এল। গরমের চোটে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়েছিল সবার। আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই বাকি দশজন একসঙ্গে সায় দিয়ে উঠল, "চল চল! আর দেরি নয়। আজ রাতেই ডাব অভিযান হবে।"আমরা ঘাটলা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। এগারো জোড়া জুতো কোনো শব্দ না করে অন্ধকার গলিটার দিকে পা বাড়াল।পর্ব ৩: নিশুত রাতে ডাব চুরিভূতের বাড়ি গলিটায় কোনো ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছিল না। দুপাশে বড় বড় জঙ্গল আর পুরোনো দেয়াল। মেঘে ঢাকা চাঁদের আলোয় চারপাশটা আবছা দেখা যাচ্ছিল। দূরে কোথাও একটা শিয়াল ডেকে উঠল, যা পরিবেশটাকে আরও গা ছমছমে করে তুলল। কিন্তু আমরা এগারো জন একসাথে থাকায় মনের ভেতর একটা বাড়তি সাহস কাজ করছিল।অবশেষে আমরা সেই পরিত্যক্ত বাড়ির ভাঙা পাঁচিলের সামনে এসে পৌঁছালাম। ভেতরের চত্বরটা বড় বড় গাছে ঢাকা। ঠিক মাঝখানে দুটো বিশাল ডাব গাছ আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সত্যিই, অন্ধকারের মধ্যেও দেখা যাচ্ছিল গাছ দুটো ডাবে ছেয়ে আছে।আমাদের মধ্যে মানিক আর রতন ছিল গাছে ওঠায় ওস্তাদ। মানিক তো একদম কাঠবেড়ালির মতো তরতর করে গাছে উঠে যেতে পারত।পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমরা নয়জন গাছের নিচে চারপাশ পাহারা দেওয়ার জন্য দাঁড়ালাম। আর রতন একটা গাছে এবং মানিক তার পাশের অন্য গাছটায় উঠতে শুরু করল। কোনো শব্দ না করে তারা দুজন কুশলী চোরের মতো ওপরে উঠে গেল।কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপর থেকে ডাব পড়ার পালা শুরু হলো। রতন আর মানিক ডাবের ছড়া থেকে একটা একটা করে ডাব ছিঁড়ে নিচে ফেলছিল। আমরা নিচে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে বা লুঙ্গি পেতে ডাবগুলো লুফে নিচ্ছিলাম, যাতে মাটিতে পড়ে বড় কোনো শব্দ না হয়। বেশ অনেকগুলো ডাব নিচে পড়ে গেল, অথচ কোনো অঘটন ঘটল না। আমাদের মনে তখন চুরির সফলতার আনন্দ।পর্ব ৪: সেই ভয়ংকর চিৎকার ও অলৌকিক কাণ্ডকিন্তু আমাদের সেই আনন্দ বেশি সময় স্থায়ী হলো না। হঠাৎ করেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। ওপর থেকে একটা ডাব নিচে পড়ার সাথে সাথেই মানিকের গাছের একদম গোড়া থেকে এক অল্পবয়সী মহিলার তীক্ষ্ণ, কলিজা কাঁপানো চিৎকার ভেসে এল—"উফ রে! মরে গেলাম রে!"সেই নিস্তব্ধ নিশুত রাতে, জনমানবহীন একটা ভূতের বাড়িতে অমন কর্কশ আর বুক ফাটানো চিৎকার শুনে আমাদের এগারো জনেরই রক্তের গতি যেন থমকে গেল। আমরা সবাই একদম হতভম্ব হয়ে গেলাম। ওই গাছের তলায় তো আমরাই দাঁড়িয়ে ছিলাম, কোনো মহিলা তো সেখানে ছিল না! তবে এই চিৎকার কার?আমরা টর্চের আলো ফেলার সাহসও পাচ্ছিলাম না। ঠিক সেই মুহূর্তেই ওপর থেকে রতন আর মানিক মরণ চিৎকার দিয়ে উঠল, "ওরে বাবারে! আমাদের বাঁচা! কে যেন আমাদের মারতেছে! কে যেন পা টেনে ধরছে!"আমরা নিচে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে যা দেখলাম, তা বিশ্বাস করার মতো ছিল না। আবছা চাঁদের আলোয় দেখা গেল, গাছের ওপর রতন আর মানিক অদৃশ্য কোনো শক্তির সাথে লড়াই করছে। তারা ডাল আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে আর ওপরে কোনো এক কালো ছায়ামূর্তি তাদের ওপর চড়-থাপ্পড় মারছে। তাদের পিঠে আর গালে সপাটে চড়ের শব্দ নিচে থেকেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল—ঠাস! ঠাস!রতন কাঁদতে কাঁদতে বলল, "শান্ত, আনোয়ার! তোরা পালা! এটা মানুষ না, এটা ভূত!"পর্ব ৫: প্রাণভয়ে পলায়নগাছের ওপর বন্ধুদের ওপর ভূতের আক্রমণ আর নিচে সেই অদৃশ্য মহিলার গোঙানির শব্দ শুনে আমাদের আর বুঝতে বাকি রইল না যে আমরা মস্ত বড় বিপদে পড়েছি। আমাদের শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল।আমরা চিৎকার দিয়ে উঠলাম, "ভূত! সত্যিই ভূত! পালাও!"মুহূর্তের মধ্যে কে কার আগে দৌড়াবে, সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। ছেঁড়া ডাবগুলো ওখানেই পড়ে রইল। মানিক আর রতন কীভাবে যেন গাছ থেকে স্লাইড করে নিচে আছড়ে পড়ল। মাটিতে পড়েই তারা ব্যথায় না ককিয়ে জান কবুল করে আমাদের সাথে দৌড় দিল।পেছন থেকে মনে হচ্ছিল এক ঝাঁক অদৃশ্য ডানা আমাদের তাড়া করে আসছে। আমরা কান্নারত অবস্থায় অন্ধকারের বুক চিরে ভূতের বাড়ির গলি দিয়ে মেইন রোডের দিকে দৌড়াতে লাগলাম। জুতো কোথায় পড়ে গেছে, কার লুঙ্গি খুলে গেছে—সেদিকে কারো কোনো খেয়াল ছিল না। একমাত্র লক্ষ্য ছিল ওই অভিশপ্ত জায়গা থেকে প্রাণ নিয়ে পালানো।উপসংহার: চিরদিনের স্মৃতিদৌড়াতে দৌড়াতে যখন আমরা সেই চেনা পুকুরপাড়ে এসে পৌঁছালাম, তখন আমাদের সবার বুক কামারের হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে। সবার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, চোখে চরম আতঙ্ক।টর্চের আলো জ্বেলে দেখলাম, মানিকের গালে আর রতনের পিঠে সত্যি সত্যিই লাল চড়ের দাগ বসে গেছে! তারা দুজনেই ভয়ে কাঁপছিল আর বলছিল, গাছের ওপর কোনো মানুষের পক্ষে অমন শক্তি নিয়ে চড় মারা অসম্ভব।কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎ করে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে এল। চারপাশটা আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। কিন্তু আমাদের মনের ভেতরের সেই অন্ধকার আর আতঙ্ক যেন কাটছিল না। সেই রাতে আর কেউ বাড়ি ফিরতে চাচ্ছিলাম না, সবাই পুকুরপাড়েই গুটিসুটি মেরে বসে রইলাম সকাল হওয়া পর্যন্ত।মেট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট কী হয়েছিল, তা আজ আর অতটা মনে নেই। কিন্তু গরমের সেই রাতে এগারো বন্ধুর ডাব চুরি করতে গিয়ে ভূতের হাতে মার খাওয়ার সেই রোমাঞ্চকর ঘটনাটি আজও আমাদের আড্ডার প্রধান খোরাক। বড় হয়ে আমরা যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, কিন্তু 'ভূতের বাড়ি গলি'র সেই রাতটি আমাদের স্মৃতির পাতায় চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো গল্পটি সম্পূর্ণ পড়লে খুব ভালো লিখে জানাতে পারেন ধন্যবাদ।

Comments

    Please login to post comment. Login