হলোপাইন নগর, অন্ধকার রাতকে আলোকিত করেছে থালার মতো পূর্ণচাদ। বাতাসে মৃদু তুষার ভেসে বেরাচ্ছে। চাদের হলদে আলোয় ছুটতে দেখা যাচ্ছে একটা ঘোড়াগাড়িকে। গাড়ির চালকের আসনে বসে আছেন মি. লেটো। খুব ব্যস্ত হাতে গাড়ি সামলাচ্ছেন, তার সিটের পেছনে একটা কার*বাইন রাখা। আর ভেতরে যাত্রীর আসনে বসে আছে তার মেয়ে লিলি। গাড়ির আওয়াজে রাস্তার কুকুরগুলো মুখ তুলে তাকিয়ে আছে। ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগছে লেটোর মুখে। কিছুদূর থেকে ভেসে আসছে কয়েকটা ঘোড়ার খুড়ের আওয়াজ। টগবগ টগবগ করে তারা ছুটে আসছে গাড়িটার দিকে। লেটো চাবুক হাকিয়ে ঘোড়াগুলোকে আরো জোরে ছোটালো। এদের হাত থেকে পালাতেই হবে। ধাম! সামনে কিছু একটা লাফিয়ে পরতে দেখে আচমকা গাড়ি থামালো লেটো। সে দেখল তাদের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রকান্ড একটা জীব, পুরো শরীর সাদা লোমে ঢাকা, একটা তুষারমানব। তুষারমানব স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে লেটোর দিকে। আপনাআপনি কার*বাইনটা চলে এলো লেটোর হাতে। সে কার*বাইনটা তাক করল তুষারমানবের দিকে, “বন্দু*ক দিয়ে ওকে কিছুই করতে পারবেনা বাবা।” লিলি গাড়ি থেকে নেমে পরল। তাকে নামতে দেখে লেটো বলে উঠল, “কি করছ মা, গাড়িতে উঠে পরো!” লিলি তুষারমানবটার দিকে এগিয়ে গেলো, “কিছু হবেনা বাবা।” মেয়েটাকে এগিয়ে আসতে দেখে গর্জে উঠল তুষারমানব। তুষারমানবের ভয়াবহ গর্জনে ঘোড়া গুলো ভয়ে পেয়ে গেলো, ওরাও ছটফট করতে শুরু করল, রাস্তার পাশের কুকুর গুলোও ভয়ে দৌড় দিয়েছে। লিলি তার ডান হাত সামনে বাড়িয়ে দিলো। চাদের ক্ষিণ আলোতে দেখা গেলো মেয়েটার হাতের আশেপাশে ঘন কুয়াশার মতো জড়ো হতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে চারপাশটা ঠান্ডা হতে শুরু করল। পেছনের ঘোড়াগুলো আরো কাছে চলে এসেছে। এখন লোকজনদের কথা শোনা যাচ্ছে। লেটো নর্থপাস কার*বাইন হাতে নেমে পরল। “হয় ম*রব নয়তো মা*রব।” লিলির ডান হাতে বরফ জমতে শুরু করেছে এবং তুষারমানবটাও মেয়েটার দিকে ছুটে আসছে। লিলি স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে তুষারমানবের দিকে। তুষারমানব আসছে, আরো কাছে আসছে। এদিকে লেটো ঘোড়াগুলো মোড় ঘুরে দৃশ্যমান হওয়ামাত্র গু*লি চালাতে শুরু করেছে। নিস্তব্ধ নগরী হঠাৎ যেনো আলোড়িত হয়ে গেলো। কার*বাইনের ঠা ঠা ঠা ঠা শব্দ আর সেই সাথে কিছু মানুষ আর ঘোড়ার মিলিত চিৎকার। তুষারমানব ঘুষি পাকিয়ে লিলির দিকে তেড়ে আসতেই হঠাৎ সে থমকে গেলো। সে নড়তে পারছেনা। অবিশ্বাস নিয়ে সে তাকালো তার পায়ের দিকে। তার পা বরফে আটকে গেছে, আর সেই বরফ তার পুরো শরীরকে জড়িয়ে নিচ্ছে। সে হাত ছোরাছুরি করতে লাগল, কিন্তু বরফ তাকে ক্রমেই আচ্ছাদিত করছে। ধীরে ধীরে বরফ তার কাধ পর্যন্ত চলে এলো। সে নিরুপায় হয়ে গর্জে উঠল। এদিকে লিলি গাড়িতে উঠে বসেছে এবং লেটো চালকের আসনে। লেটো আবার গাড়ি ছোটালো। এক মূহুর্তও নষ্ট করা যাবেনা। দেখতে দেখতে গাড়িটা চোখের আড়ালে চলে গেলো। কিন্তু তুষারমানব বরফের শক্ত আচ্ছাদনে আটকে রইল। সে নিরুপায় হয়ে গর্জন করতে লাগল, তারপর স্থির চোখে তাকিয়ে রইল একটা অন্ধকার গলির দিকে। নীরব রাস্তায় বুটের ঠক ঠক আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তুষারমানবটার দিকে এগিয়ে আসছে একজন লোক। এখন তুষারমানব আর গর্জন করছেনা, সে কাতর চোখে তাকিয়ে আছে লোকটার দিকে। লোকটা তুষারমানবের সামনে এসে দাড়াল, হাত দিলো স্বচ্ছ বরফের আচ্ছাদনে, “ব্যাপার না ফ্র্যাঙ্ক, এবারে ধরতে পারিনি তো কি হয়েছে। আমরা পরের বার ঠিক ধরব।” লোকটা শার্টের হাতা গোটাতে লাগল, “তার আগে তোমাকে বের করি।” লোকটা সজোরে ঘুষি মারল বরফের আবরণে। ক্রিক! ক্র্যাআআআক! বরফের আবরণ গুড়োগুড়ো হয়ে গেলো এক ঘুষিতে। তুষারমানব মুক্তি পেয়ে হাত-পা নাড়াচাড়া করতে লাগল, আর মুক্তির আনন্দে জোরে গর্জে উঠল। লোকটা তুষারমানবের বুকে হাত দিয়ে বলল, “ফ্র্যাঙ্ক চলো, আমাদের অনেক কাজ বাকী।” লোকটা উল্টো ঘুরে অন্ধকার গলির দিকে হাটা শুরু করল, আর তুষারমানব এক লাফে একটা দালানের ছাদে উঠে গেলো।
অবিরাম ছুটে চলেছে ক্রোপাইন এক্সপ্রেস, ক্রোপাইন পৌছাতে দুদিন লাগবে। ট্রেনের একটা ফাকা কামরায় বসে আছে মি. লেটো ও লিলি। দুজনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে, রাতের আধারে কালো গাছগুলো ছুটে যাচ্ছে পেছনের দিকে। ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে খোলা জানালা দিয়ে। মি. লেটো পর্দা টেনে দিলো। “মা তুই ঘুমিয়ে পর।” লিলি সিটে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পরল, “আমরা কোথায় যাচ্ছি বাবা?” “উইন্ডক্রফটে।” “ওখানে গেলে কি আমাদের খুজে পাবেনা?” “আমরা ওখানে বেশিদিন থাকবনা, আমরা তোর নক্স চাচার সাথে মিলে এই দেশ থেকে বের হওয়ার ব্যবস্থা করব।” “কিভাবে?” “ওসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবেনা। তুই এখন বিশ্রাম নে।” লিলি তার ছোট্ট ব্যাগটাকে মাথার নিচে দিলো। ট্রেনের ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক আওয়াজে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। তার সামনে সিটে লেটো বসে রইল হাতে রিভল*ভার নিয়ে।
লোকটা হাজির হলো ট্রেন স্টেশনের সামনে। সে পকেটে হাত দিয়ে একটা পরিচয়পত্র বের করল, পরিচয়পত্র দেখে নিজের মনেই মাথা নাড়ল। এটা দিয়েই কাজ হবে। তারপর সোজা চলে গেলো স্টেশনমাস্টারের অফিসের দিকে। “আসতে পারি।” এই মাঝরাতে স্টেশনমাস্টার কাউকে আশা করেননি, লোকটা বিরক্তি নিয়ে বলল, “কি চাই?” “আপনি থমাস গ্রেসন?” “হ্যা, আমিই থমাস গ্রেসন, স্টেশনমাস্টার।” লোকটা তার পরিচয়পত্র স্টেশনমাস্টারের হাতে দিলো। থমাস গ্রেসন পরিচয়পত্র দেখে ভয়ে ভয়ে তাকালো লোকটার দিকে, “স্যার… কি করতে পারি… আপনার জন্য?” লোকটা একটা চেয়ারে বসল, “এক কাপ কফি দিতে বলুন।” “অবশ্যই স্যার।” “আর হ্যা, আপনার টিকেট অফিসারকে ডাকুন” “জি স্যার, এই বিলি!” এক ছোকড়া ঘরে ঢুকল, “স্যারের জন্য এক কাপ কফি আর রেজিস্টার নিয়ে এসো। আর মি. ফ্লেভারকেও একটু ডেকে দিও।” ছোকড়া সালাম ঠুকে বেরিয়ে গেলো। “তা আজকাল কেমন বেতন পান?” মি. গ্রসনের ঢোক গিলল, সিক্রেট সার্ভিসের লোক যদি এসব জিজ্ঞেস করে তবে বুঝতে হবে কপালে অনেক দুঃখ আছে। “স্যার চলে আরকি কোনো রকমে…” “কত?” “ইয়ে স্যার, ওই হাজার-দেড় হাজার শেল।” লোকটা কিছুক্ষন ভাবল, “বেতন হিসেবে কাপড়-চোপড় আরেকটু পরিপাটি হওয়া উচিত ছিলো।” “জি স্যার?” “তোমার কাপড়-চোপড়!” “ইয়ে মানে স্যার … মানে …” এমন সময় বিলি ঘরে ঢুকল, “স্যার আপনার কফি” আর রেজিস্টার টেবিলে রাখল। “মি. ফ্লেভার আসছেন।” লোকটা রেজিস্টার নিয়ে লিস্ট দেখতে লাগল। “এখান থেকে সবচেয়ে দূরের স্টেশন কোনটা?” “স্যার, ক্রোপাইন হল্ট।” লোকটা মাথা নাড়ল। টিকেট অফিসার দরজায় টোকা দিলো, “স্যার ডেকেছেন?” “মি. ফ্লেভার আসুন।” টিকেট অফিসার ভেতরে ঢুকল, মি. গ্রসন বলল, “ইনি সিক্রেট সার্ভিস থেকে মি. কার্ল ইজেনবার্গ। উনি কিছু জানতে চান।” “স্যার, কি জানতে চান?” “একজন লোক তার মেয়েকে নিয়ে ক্রোপাইনের টিকেট কেটেছে?” লোকটা নিমেষে মাথা নাড়ল, “জি স্যার, ট্রেন ছাড়ার আগমুহুর্তে। ক্রোপাইনেরই টিকেট কেটেছে।” “তোমাকে ধন্যবাদ।” লোকটা মি. গ্রেসনের দিকে তাকালো, “ক্রোপাইনের পরের ট্রেন কখন।” “আসলে পরের ট্রেন চারদিন পর।” কার্ল ইজেনবার্গ স্টেশনমাস্টারের দিকে তাকিয়ে রইল, “চার দিন?” মি. গ্রসন মাথা ঝাকাল, “জি স্যার, এসব অজপাড়াগায়ে খুব কম মানুষ যাতায়াত করে, তাছাড়া ওদিকে নদীপথটা বেশি ব্যবহার হয়, তাই…” কার্ল উঠে পরল, “আমার জন্য পুরো একটা বগি বুক করবেন।” “অবশ্যই স্যার অবশ্যই।” কার্ল ইজেনবার্গ বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। টিকেট অফিসার স্টেশনমাস্টারের দিকে তাকালো, “স্যার ব্যাপারটা কি বলুন তো?” “আমিও বুঝলাম নাহ মি.ফ্লেভার।” কার্ল ফাকা রাস্তায় একা একা হেটে যাচ্ছে, দমকা বাতাস তার পুরো শরীর কেপে কেপে উঠছে। “পুরো চারদিন! ধুর!”