একটা ছোট্ট ঘরে বসে আছে কার্ল ইজেনবার্গ, ঘরের জানালা খোলা, সে তাকিয়ে আছে বাইরে, ভোরের লালচে আলো ফুটে উঠছে। কাল সারারাত ধকল গেছে এবং সে এক ফোটা ঘুমাতে পারেনি। আর ঘুমানোর সময়ও নেই, সে হাতের সিগারেট জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলল, তারপর ব্যাগ থেকে একটা শিশি বের করল। শিশির মধ্যে নীল রঙের তরল। এক গ্লাস পানিতে তা মিশিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল, “এবার দেখি ঘুম কোন দিক দিয়ে আসে!” তারপর বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। এতো ভোরে ঘোড়াগাড়ি পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু কপাল ভালো, রাস্তায় একটা ঘোড়াগাড়ি আসতে দেখা গেলো। সে গাড়ি থামিয়ে মিলিটারী আউটপোস্টের দিকে যেতে বলল। গাড়োয়ানও ‘উড়ে যাবো স্যার’ বলে চাবুক হাকিয়ে ছুটে চলল মিলিটারী আউটপোস্টের দিকে।
ভোরের আলো চোখে পরতেই উঠে পরল লিলি। দেখল তার বাবা সিটের সাথে হেলান দিয়ে ঝিমোচ্ছে, হাতে রিভল*ভারটা তখনো শক্ত হাতে ধরা। “বাবা!” লেটো ধরমর করে উঠে পরল, “কী? কী হয়েছে?” “কিছু হয়নি।” “ওহ, উঠে পরেছিস?” “হ্যা, এবার তুমি একটূ ঘুমাও, শুয়ে পরো। আর রিভল*ভারটা আমাকে দাও।” লিলি লেটো হাত থেকে রিভল*ভারটা কেড়ে নিলো, তারপর জোর করে লেটোকে শুয়ে দিলো সিটের উপর। “এই ব্যাগটা মাথার নিচে দাও, আরাম লাগবে।” শুয়ে পরার সাথে সাথে লেটোর অবসন্ন দেহ ঘুমিয়ে পরল। আর লিলি জেগে রইল, তার কোলের পাশে রিভল*ভার, তার ছোট্ট ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে সে পড়তে শুরু করল, লম্বা যাত্রা, সময় কাটাতে হবে তো।
কার্ল আউটপোস্টে পৌছে গেছে। সে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে প্রবেশপথের দিকে এগোলো। এতো ভোরে একজন অপরিচিতকে আসতে দেখে সেন্ট্রি তাকে আটকালো, “স্যার আপনার পরিচয়?” কার্ল তার পরিচয়পত্র এগিয়ে দিলো। সেন্ট্রির চক্ষু চড়কগাছ। “স্যার আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” “এই আউটপোস্টের চিফ কে?” “লেফটেন্যান্ট রজার।” “নিয়ে চলো তার কাছে।” সেন্ট্রি আমতা আমতা করে বলল, “স্যার এতো সকাল সকাল তো লেফটেন্যান্ট আসেনা।” “ডেকে নিয়ে আসুন, জরুরি প্রয়োজন।” সেন্ট্রি কার্লকে নিয়ে গেলো লেফটেন্যান্টের ঘরে। তারপর আরেকজন সিপাহীকে ডেকে ঘর খুলে নিলো, “স্যার আপনি বসুন। আমি লেফটেন্যান্টকে নিয়ে আসছি।” সেন্ট্রি চলে গেলো, ঘরে কার্ল একা বসে রইল। দেওয়ালে রেভেনশিল্ডের পতাকা ঝুলছে, এদিকে ওদিকে নানা রকম চার্ট, তালিকা, সনদপত্র। “স্যার আমি লেফটেন্যান্ট রজার।” কার্ল ফিরে তাকালো, দেখল সামরিক পোষাকে এক লোক দাঁড়িয়ে। লোকটা চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু, পোষাক পর্যন্ত বদল করেনি, পায়জামা-শার্ট পরেই চলে এসেছে। কার্ল উঠে হাত মেলালো লেফটেন্যান্টের সাথে, “আমি কার্ল ইজেনবার্গ, সিক্রেট সার্ভিস থেকে।” লেফটেন্যান্ট কার্লকে ইশারা করল বসতে, দুজনে মুখোমুখি বসল। “তো আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” “একটা সংবাদ হয়ত পেয়েছেন যে নগরের একটা জায়গায় রাতে গোলাগুলি হয়েছে?” “হ্যা হ্যা অবশ্যই! তবে সেখানে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যদিও স্থানীয়রা জোর দাবি করছে কিছু একটা হয়েছিল।” “ওখানে সত্যি গোলাগুলি হয়েছিল এবং আমার লোকেরাই করেছিল, তবে সবাই মারা যায়।” “সেকী? কেনো?” “বিষয়টা গোপনীয়, শুধু এটুকু জেনে রাখুন যে আমি কাউকে খুজছি এবং কাল রাতে সে আমার হাত থেকে পালিয়ে গেছে।” “আচ্ছা!” “এখন তারা ক্রোপাইন এক্সপ্রেসে চড়ে ক্রোপাইনের দিকে গেছে এবং আমার ধারণা তারা উইন্ডক্রফটে যাবে।” লেফটেন্যান্ট গালে হাত দিয়ে ভাবতে লাগল, “সেক্ষেত্রে আপনি যদি ট্রেনের জন্য বসে থাকেন তাহলে অনেক দেরী হয়ে যাবে।” “ঠিক! এজন্যই আমি আপনার সাহায্য চাইছি। কিভাবে দ্রুত সময়ে ক্রোপাইন হল্টে পৌছানো যাবে?” লেফটেন্যান্ট ড্রয়ার থেকে একটা ম্যাপ বের করল, “আসলে ক্রোপাইন যেতে দুদিন লাগলেও, রাস্তা মূলত একদিনের। কিন্তু রাস্তাটা অনেক প্রতিকূল, পথে নানা রকম ঝামেলা হয়।” “যেমন?” “যেমন ধরুন, রেললাইনের উপর গাছ, পাথর অনেক সময় পুরু বরফের স্তর জমে যায়। তাছাড়া কিছু পয়েন্টে স্থানীয়রা ট্রেন থামিয়ে যাতায়াত করে, যেহেতু সরকারী ভাবে সেখানে কোনো স্টেশন বা হল্ট নেই।” “তার মানে আমি যদি এখনই রওনা হই তাহলে তাদের ধরতে পারার সম্ভবনা আছে?” “হ্যা, সম্ভাবনা আছে কিছুটা। আর যদি ট্রেন ধরতে নাও পারেন, তবুও দ্রুত পৌছোতে পারবেন। শুধু রাস্তায় কোনো গ্রাম পেলে ঘোড়াকে বিশ্রাম করাবেন কিংবা ঘোড়া বদলও করতে পারেন।” “ভালো বুদ্ধি। তাহলে একটা ঘোড়ার ব্যবস্থা করুন।” “অবশ্যই। আপনি কি এখনি বের হবেন?” “আগে আমি যেখানে ছিলাম, সেখানে ফিরতে হবে, একটা ছোট্ট কাজ সেরে তারপর রওনা হবো… আচ্ছা কাগজ কলম দিন তো।” লেফটেন্যান্ট এক টুকরো কাগজ ও একটা কলম এগিয়ে দিলো, “এই নিন।” কার্ল কাগজে তার ঠিকানা লিখল, “এক ঘন্টা পর এই ঠিকানায় যাবেন। একটা বিশাল বাক্স পাবেন। কয়েকজনকে নিয়ে যাবেন কিন্তু। সেই বাক্স ক্রোপাইনের পরের ট্রেনে পাঠিয়ে দেবেন উইন্ডক্রফটের সামরিক ঘাটিতে।” “ঠিক আছে স্যার।” কার্ল উঠে দাড়াল, “সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ” লেফটেন্যান্ট মাথা নাড়ল।
আউটপোস্ট থেকে ঘোড়া নিয়ে কার্ল তার ঘরে ফিরল। ঘরের পাশেই এক পরিত্যক্ত গুদাম, তার মধ্যে ঢুকল সে। গুদামের এক কোনায় বসে আছে ফ্র্যাঙ্ক, তার বিশাল সাদা দেহ একদম স্তদ্ধ, কোনো নড়াচড়া নেই। “ফ্র্যাঙ্ক!” কার্লের আওয়াজ শুনে ফ্র্যাঙ্ক নড়েচড়ে বসল। কার্ল তার কাছে এলো, “ফ্র্যাঙ্ক আমি জানি তুমি এটা পছন্দ করোনা, কিন্তু এটা ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই। এসো এই বাক্সে বসো।” কার্ল ইশারা করল একটা বিশাল বাক্সের দিকে, ফ্র্যাঙ্ক বাক্স দেখেই মাথা জোরে ঘোরাতে লাগল, সে কিছুতেই ওই বাক্সে ঢুকবেনা। “ওহ ফ্র্যাঙ্ক!” কার্ল একটা শিশি খুলে ফ্র্যাঙ্কের সামনে ধরল, শিশি থেকে বেগুনি ধোয়া ছড়াতে লাগল, ফ্র্যাঙ্ক মুখ সরিয়ে ধোয়া থেকে বাচার চেষ্টা করল কিন্তু খুব দ্রুতই ধোয়া তার নিশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করল এবং সে নেতিয়ে পরে গেলো। “ইশ আবার সেই একই ঝামেলা।” কার্ল ওকে টেনে বাক্সের দিকে নিয়ে গেলো, “এত ভারী একটা দেহ টানা কি এতই সোজা!” ফ্র্যাঙ্ককে টেনে হিচড়ে কোনোমতে বাক্সে ঢোকালে কার্ল, “এক সপ্তাহে আর ওর ঘুম ভাঙ্গবে না।” কার্ল গুদাম থেকে বেরিয়ে এলো, “এবার রওনা হওয়া যাক!”