Posts

উপন্যাস

উইন্টার সোলজার (পর্ব-০৩)

July 1, 2026

Sabit Hasan

60
View

পুরোদমে সকাল হয়ে গেছে, সুর্যের আলো জানালা দিয়ে ভেতরে পরছে, লেটো সিটে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। লিলি ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখল দূরে একটা ছোট্ট একটা ইটের বাড়ি, বাড়িটার সামনে বিশাল বারান্দা, সেখানে কিছু লোককে দেখা যাচ্ছে। আর একজন লাইনের উপর দাঁড়িয়ে লাল পতাকা ওড়াচ্ছে। ট্রেনের গতি কমতে শুরু করল, লিলি জানালায় মুখ ঠেকিয়ে লোকদের দেখতে লাগল, অধিকাংশ দিন-মজুর গোছের লোকজন। তারা শেষের বগিতে গাদাগাদি করে উঠল। লিলির কামরার পাশ দিয়ে যাবার সময় তারা লিলির দিকে অবাক চোখে তাকালো। এই লাইনে ভদ্রগোছের লোকজনের চলাচল নেই বললেই চলে। তাই লিলিকে দেখে তাদের মনে বিস্ময় জাগে। লোকজনের আওয়াজে লেটো উঠে বসে। চোখ পিটপিট করে বাইরে তাকায়, “কয়েক জায়গায় এভাবে ট্রেন থামিয়ে লোকজন ওঠে।” “এখানে কোনো স্টেশন বা হল্ট নেই?” “নাহ, এ জন্যই লোকজন এই ব্যবস্থা করেছে। আর রেল কোম্পানিও ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে।” লিলি দেখল বারান্দায় একটা টেবিলের পেছনে এক লোক খাতা কলম নিয়ে বসে আছে। রেল কর্মচারী নেমে তার সাথে কিছু একটা আলোচনা করল। তারপর লোকটা রেল কর্মচারীর হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিলো। লেটো বলল, “ব্যবসা!” “কিন্তু লাভ তো সবারই হচ্ছে। রেল কোম্পানীরও, আবার এই লোকগুলোরও।” লেটো মাথা নাড়ল, “তা ঠিক।” ট্রেন আবারো চলতে শুরু করল। ট্রেনের শুরুর দিকের একটা কামরাতে বসে আছে তারা, এইটা অপেক্ষাকৃত ভালো মানের। সাধারণ লোকজন পেছনের কামরাগুলোতে বসে। বরফে ঢাকা সাদা মাঠ, তার মাঝে রেললাইন। সেই লাইনের উপর দিয়ে ট্রেন ছূটে চলছে। মাঠ পেরিয়ে জঙ্গলের মাঝে ঢুকল ট্রেনটা, দুপাশে স্প্রুস, পাইন আর ওক গাছের ছড়াছড়ি। লেটো আবারো শুয়ে পরেছে তার সিটে, ওভারকোট গায়ের উপর ফেলেছে। লিলি সিটে বসে ঝিমুচ্ছে, হঠাৎ একটা ঝাকি খেয়ে তার তন্দ্রা ছুটে গেলো। ট্রেনটা থেমে গেছে, ঘন জঙ্গলের মাঝে। লেটো কাত ঘুরে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে রে? ট্রেনটা আবার থামল কেনো?”

টগবগ টগবগ আওয়াজ তুলে ছুটে চলেছে বাদামী রঙের একটা ঘোড়া রেললাইন ধরে। ঘোড়ার পিঠে বসে কার্ল ভাবছে, এক রাতে ট্রেনটা যতদূর গিয়েছে ঘোড়ায় চেপে ততদূর যেতে কত সময় লাগবে? কার্লের মাথায় হাজারো হিসাব ঘুরছে। এই ট্রেনগুলো তেমন দ্রুতগামী না, তবু হিসাব করলে একটা ঘোড়ার চেয়ে প্রায় তিনগুন দ্রুত। কার্ল হতাশ ভাবে মাথা নাড়ায়, ট্রেন লম্বা সময়ে জন্য না থামলে ধরার কোনো উপায় নেই। রোদের তেজ বাড়তে শুরু করেছে, সে একটানে তার ওভারকোট খুলে ফেলল। তারপর তাকালো সুদূরপ্রসারী মাঠের দিকে। দেখে মনে হচ্ছে এই মাঠের কোনো শেষ নেই।

“অফিসার, ট্রেন থামল কেনো?” “স্যার ইঞ্জিনে কিছু সমস্যা হয়েছে, সময় লাগবে।” “সময় লাগবে মানে!” “স্যার এখন ট্রেনে সমস্যা হলে আমাদের কি করার আছে?” “বাবা!” লিলির ডাক শুনে লেটো থামল, তারপর রাগে গজগজ করতে করতে কেবিনে ঢুকল। “কি বলল বাবা?” “ইঞ্জিনে সমস্যা হয়েছে, সময় লাগবে।” লিলি ব্যাগ থেকে বোতল বের করে দিলো, লেটো এক ঢোক পানি খেয়ে বোতল ফেরত দিলো। “এভাবে দেরি করলে ওরা তোকে ধরে ফেলবে।” লেটো বাইরে তাকিয়ে আছে, “কতক্ষণ দাঁড়াবে কে জানে।” “কিচ্ছু হবেনা বাবা, হাজার হোক আমরা ট্রেনে যাচ্ছি। ট্রেনকে টক্কর দেওয়ার মতো কোনো যানবাহন আছে নাকি!” লেটো মাথা ঝাকাল, “তুই ওদের হালকা ভাবে নিচ্ছিস।” “ঠিক আছে, ঠিক আছে!” লিলি হাত বাড়িয়ে সিট থেকে রিভল*ভার তুলে নিলো। “আমি একটু হাটাহাটি করব। ট্রেন চলতে তো সময় লাগবে, তাই না?” লেটোও উঠে দাড়াল। “আমিও যাবো তোর সাথে।” দুজনে ট্রেন ছেড়ে নামল। ইঞ্জিন রুমের সামনে লোকজন চেচামেচি শুরু করেছে। কেউ কেউ চেচিয়ে টাকা ফেরত চাইছে। তাদের সামলাতে সামনের কেবিন থেকে রেলপুলিশ বন্দু*ক নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। পুলিশদের এগিয়ে আসতে দেখে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। বোঝা গেলো বন্দু*কের নলের সামনে মুখ খোলার সাহস এদের নেই। মুখ গোমড়া করে লোকজন সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখানে ওখানে বসে পরল। অপেক্ষা করতে হবে, কিছু করার নেই। কেউ কেউ সস্তার সিগারেট টানছে। আবার কেউ কেউ কেবিনে গেলো একটু ঝিমিয়ে নিতে। লিলি আর লেটো রেললাইন ধরে হাটছে, তাদের দুপাশে ঘন জঙ্গল, একজন রেলপুলিশ তাদের কাছে এলো, “স্যার, ম্যাম, আপনারা ট্রেনের কাছাকাছি থাকুন, এই জঙ্গলে অনেক রকম বিপদ থাকতে পারে।” পুলিশের কথায় তারা আবার ট্রেনের কাছে চলে এলো। লিলি লেটোর কানে কানে বলল, “আমাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় বিপদ তো পুলিশগুলো নিজেরাই!” লেটো নিজের অজান্তেই রিভল*ভারটা একবার ছুয়ে দেখল জায়গা মতো আছে কিনা।

বিকাল নাগাদ কার্ল পৌছালো সেই জায়গায় যেখানে সকালে ট্রেন থেমেছিলো লোক তুলতে। বারান্দায় বসে থাকা লোকটা উঠে এলো, “জনাব, আপনি কোথা থেকে?” কার্ল ঘোড়া থেকে নামল, তার ঘোড়াটাকে অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে। “ক্রোপাইন এক্সপ্রেস এই জায়গা পার করেছে কখন?” “আজ্ঞে আজ সকালে।” “আচ্ছা একটা সাহায্য করতে পারবেন?” “জি বলুন” “আমার একটা শক্ত পোক্ত ঘোড়া লাগবে।” কার্ল লোকটার হাতে কিছু টাকা গুজে দিলো। নগদ টাকা পেয়ে লোকটার চেহারায় খুশির ঝিলিক উঠল। “জনাব আপনি একটু বসুন, আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি।” লোকটা বারান্দা ছেড়ে ছুট লাগালো পেছনের দিকে, দূরে কিছু ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। কার্ল চেয়ার বসে একটা সিগারেট জালালো। ট্রেন ধরা তার কাছে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। সিগারেট শেষ হতে হতে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পাওয়া গেলো। লোকটা একটা কালো রঙের ঘোড়া নিয়ে হাজির। কার্ল উঠে দাড়ালো, “ঘোড়া দেখেই মনে হচ্ছে খুব শক্তিশালী।” “জি জনাব, গ্রামের সবচেয়ে ভালো ঘোড়া এনেছি।” কার্ল যে ঘোড়ায় এসেছিল সেটার দিকে ইশারা করে বলল, “এটাকে রেখে দিন, খুব ভালো ঘোড়া।” তারপর আরো কিছু টাকা দিলো লোকটাকে। কার্ল ঘোড়ায় চড়ে বসল, লোকটা জিজ্ঞেস করল, “জনাব আপনার পরিচয় জানা হলোনা?” “কার্ল ইজেনবার্গ, সরকারী অফিসার।” বলেই কার্ল ঘোড়া ছোটালো, লোকটা পেছন থেকে চেচালো, “জনাব আমি উইলসন, যেকোনো প্রয়োজনে এই গরীবকে স্মরণ করবেন।” কার্ল মুচকি হাসল, লোকটা সত্যি ভালো ঘোড়া দিয়েছে।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেলো, লেটো অধৈর্য হয়ে পরল। এদিকে রেল কর্মচারীরা ‘আরেকটু অপেক্ষা করুন স্যার’ বলে বারবার আশ্বাস দিচ্ছে। কিন্তু লেটো জানে দেরি করলে কি ধরণের বিপদ হতে পারে। সিক্রেট সার্ভিসের কার্ল ইজেনবার্গ লেগেছে তাদের পেছনে, একে থামাতে হলে এর হৃতপিন্ডকে থামাতে হবে। “বাবা!” লেটোর চিন্তায় ছেদ পরে। “আবার দুশ্চিন্তা করছ?” লেটো হতাশ হয়ে মাথা নাড়ে, এ অবস্থায় যেকোনো বাবার দুশ্চিন্তা হবে। তার মেয়ের পেছনে যদি কেউ জোকের মতো লেগে থাকে তো দুশ্চিন্তা হওয়ারই কথা। তার উপর সেই জোক যদি হয় স্বয়ং সরকারে বসে থাকা শয়তানগুলো। একজন রেলকর্মচারী এসে তাদের কিছু শুকনো খাবার দিয়ে গেলো। “স্যার আপনারা বোধ হয় এধরণের অবস্থায় কখনো পরেননি, তবে এই লাইনে এমন হয়, অহরহ। আসলে সরকার এইদিকে খুব একটা নজর দেয়না। তাই প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমরা অনেক দুর্বল।” যাওয়ার আগে কর্মচারী এই কথাগুলো বলে গেলো। লেটো প্রতি উত্তরে বলে, “সরকারের যেদিকে নজর দেয়ার কথা সেদিকে নজর দেয়না,” তারপর লিলির দিকে তাকিয়ে বলে, “আবার যেদিকে নজর দেয়ার কিছু নেই সেখানে ঝাপিয়ে পরে।” কর্মচারী সায় দিয়ে চলে গেলো। লিলি জানালা দিয়ে আঙ্গুল দিয়ে কিছু একটার দিকে ইশারা করল, “বাবা মনে হচ্ছে একটা ঘোড়া ছুটে আসছে!”

সন্ধ্যার অন্ধকার চারিদিক দিয়ে ঝেপে ধরেছে। কার্ল প্রাণপণে ঘোড়া ছোটাচ্ছে, রাত গভীর হওয়ার আগেই কোনো গ্রামে আশ্রয় নিতে হবে। এই জঙ্গলের ভেতর রাত কাটানোর কোনো ইচ্ছে নেই তার। সে হঠাৎ খেয়াল করল দূরে ট্রেনের সিটির আওয়াজ, তার মনে একটা আনন্দের ঢেউ খেলে গেলো, কোনো একটা কারণে ট্রেন থেমেছিলো, শুধু থামেইনি, অনেকক্ষণের জন্য থেমেছিলো। সে প্রাণপণে ঘোড়া ছোটালো, ট্রেনে চড়তেই হবে, যে করেই হোক! 

Comments

    Please login to post comment. Login