কালো ঘোড়াটি প্রাণপণে ছুটছে ট্রেনটার দিকে। কার্ল বড় করে একটা নিশ্বাস নিলো, তারপর সাবধানে দাঁড়িয়ে পরল ঘোড়ার পিঠে, এক হাতে ধরে আছে লাগাম। ট্রেনের খুব কাছে পৌছে গেছে ঘোড়াটা, কার্ল শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে একটা ঝাপ দিলো ট্রেনের শেষ বগির ছোট্ট বারান্দায়। ধুপ করে আছাড় খেলো সে বারান্দার লোহার মেঝেতে। সফলভাবে ট্রেন ধরে ফেলেছে। বারান্দায় আওয়াজ শুনে একজন মজুর জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো, দেখল একটা ঘোড়া ধীরে ধীরে নিজের গতি কমিয়ে নিচ্ছে। ঘোড়াটা এক সময় থেমে গেলো, তার দৃষ্টি ট্রেনের টিমটিমে আলোর দিকে। কার্ল এরই মধ্যে ট্রেনের ছাদে চলে এসেছে। ওভারকোটটা শক্ত করে জড়িয়ে নিলো শরীরের সঙ্গে, শো শো শব্দে বাতাস বইছে তার দিকে, মনে হচ্ছে যেনো উড়িয়ে নিয়ে যাবে। সে হামাগুড়ি দিয়ে সামনের বগির দিকে গেলো। পেছনের তিনটে বগিতে কথাবার্তার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। এদের মধ্যে ওদের পাওয়ার সম্ভবনা কম। সে বাতাসের সাথে যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে গেলো সামনে বগি গুলোর দিকে। মাঝামাঝি একটা বগিতে সে কোনো আলো জ্বলতে দেখলনা। কাপা কাপা হাতে সে ছাঁদ থেকে মই বেয়ে নামল নিচে, তারপর এক লাফে কেবিনের মধ্যে ঢুকে পরল। মেঝেতে শুয়ে হাপাতে লাগল, বড্ড পরিশ্রম গেলো। শুয়ে শুয়ে একটা সিগারেট ধরাল, লম্বা করে টান দিলো একের পর এক। তারপর উঠে দাড়ালো, “আমার পা কাপছে!” নিজের মনেই বলল কার্ল। জানালা দিয়ে ঝুকে দেখল, একদম সামনের পাচটা বগিতে আলো জ্বলছে। তারপরের দুই বগি অন্ধকার। সে দ্বিতীয়টাতে আছে। “এবার কি করব!” কার্ল একটা সিটে বসল। শুনেছি ট্রেনটা নাকি কয়েক জায়গায় থামে। ওরা কোন বগিতে আছে তা জানা তেমন কঠিন হবেনা। এরপর কোথাও থামলে তখন ওদের ধরে ফেলব। সে সিটে লম্বা হয়ে শুয়ে পরল, “আছে তো এই ট্রেনেই তাইনা! গায়েব তো আর হয়ে যাবেনা।” আধারের মাঝে জ্বলছে শুধু একটা লাল বিন্দু, সিগারেটের ক্ষিণ আলো। সেই সিগারেটের আলোও নিভে গেলো। মেঘ কেটে সামান্য চাদের আলো এসে পরল কেবিনের জানালা গলে, সেই আলোতে দেখা গেলো কার্ল বাম কনুই চোখের উপর এবং ডান হাত ওভারকোটের পকেটে রেখে ঘুমিয়ে পরেছে, আর সেই ওভারকোটের পকেটে আছে তার শখের রিভল*ভার।
ঠান্ডা বাতাস থেকে বাচতে লিলি জানালা টেনে দিলো। লেটো অস্থিরভাবে পায়চারা করতে শুরু করেছে। লিলি সিটে শুয়ে পরল, যদিও সারাদিন শুয়ে বসেই কাটাতে হয়েছে তবুও কেমন ঘুমঘুম পাচ্ছে। লেটো কেবিনের এ মাথা থেকে ও মাথা হেটে বেরাচ্ছে। তার মন কোনো এক অজানা কারণে অস্থির হয়ে উঠেছে। হারিকেনের টিমটিমে আলোতে সে তাকালো, গোটা কেবিনে শুধু তারা দুজন। এই হলুদ আলো আর অন্ধকার মিলেমিশে কেমন অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। নিজের অজান্তেই শিরদাড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। পকেট থেকে রিভল*ভার বের করল, তারপর রিং ঘুরিয়ে দেখল বুলে*ট সবগুলো ভরা আছে কিনা। তারপর আবার রিভল*ভার চলে গেলো পকেটে। পায়চারী থামিয়ে স্থির হয়ে সে বসল একটা সিটে, জানালা দিয়ে তীব্র হাওয়া ঢুকছে, বাইরে কখনো খোলা মাঠ, কখনো জঙ্গল, আবার কখনো সেতু দিয়ে নদী পার হচ্ছে ট্রেন। এসব দেখতে দেখতে সেও ঘুমিয়ে পরল। ট্রেনের পিছনের কামরাগুলোতেও সিটের উপর, মেঝেতে গাদাগাদি করে শুয়ে আছে লোকজন। ঘুমের ঘোরে কেউ পাশের জনের গায়ের উপর পা তুলে দিচ্ছে; আবার কেউ সিট থেকে ধুপ করে মেঝেতে কারো গায়ের উপর পরে যাচ্ছে। ঘুমের ঘোরে অশ্রাব্য গালি দিলেও আবার পর মুহূর্তে পাশ ফিরে ফিরে যাচ্ছে ঘুমের দেশে।
ভোরের আলো ফুটে উঠেছে, ট্রেনের জানালা দিয়ে আলো ভেতরে ঢুকে হারিকেনের আলোকে স্তিমিত করে দিচ্ছে। ট্রেন সিটি বাজিয়ে থেমে গেলো একটা গ্রাম্য এলাকায়। সেই আগের মতোই ব্যবস্থা, একটা পাথরের প্ল্যাটফর্ম বানানো, তার উপর কাঠের ছাউনি। একটা টেবিলে এক লোক বসে টোকেন দিচ্ছে, আর আরেকজন টাকা তুলছে। মানুষজন জটলা বেধে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন থামতেই পেছনের কামরার দিকে ছুটে গেলো তারা, কামরাগুলো থেকেও কিছু লোক নেমে যাচ্ছে। রেল কর্মচারীরা চেচিয়ে চেচিয়ে বলল, ট্রেন এখানে কিছু সময় দাঁড়াবে। বাইরের হইচই শুনে কার্ল বেশ কিছুক্ষণ হলো জেগেছে। সে ওভারকোটের টুপি টেনে মুখ যতটুকু ঢাকা সম্ভব ঢাকল। তারপর বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে, মানুষজনের জটলার মধ্যে দিয়ে সে এগোলো সামনে কেবিনে ঢু মারতে। তবে ঢু মারতে হলোনা। তার থেকে দুই কেবিন সামনেই দরজায় দাঁড়িয়ে আছে লেটো। আর জানালায় দেখা যাচ্ছে লিলিকে। কার্ল ভাবছে ওই কেবিনে ঢুকতে হবে, কিন্তু কিভাবে? সে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ওদের লক্ষ্য করতে লাগল, লেটো কেবিন থেকে বেরিয়ে একজন রেল কর্মচারীর সাথে কথা বলছে, এদিকে লিলিও আনমনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে। এই সুযোগ কি হাতে নেয়া যায়? সে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে দ্রুত চলে গেলো কেবিনের দরজার সামনে। তারপর একবার লক্ষ্য করল লেটোর দিকে, লেটো এখনো লোকটার সাথে কথা বলেই যাচ্ছে, এদিকে লিলিও অন্যমনস্ক। তারপর পেছনের দরজা দিয়ে চুপিসারে ঢুকে পরল, লিলি বসে আছে মাঝের সারিতে। সে একপাশে নিজেকে আড়াল করে বসে পরল, লেটো সম্ভবত সামনের দরজা দিয়ে ঢুকবে, তাই ধরা পরার সম্ভাবনা কম, আর ধরা পরলেই বা কি! গুলি করে উড়িয়ে দেবো!
লেটো কেবিনে ঢুকল, হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট। প্যাকেটটা লিলির দিকে বাড়িয়ে দিলো, "খেয়ে নে" "তুমি খাবেনা বাবা?" লেটো পকেট থেকে আরেকটা প্যাকেট বের করে দেখালো। দুজন নিঃশব্দে খেতে লাগল, এদিকে সিটি বাজিয়ে ট্রেনও ছুটতে শুরু করল। বাবা-মেয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাইরের দৃশ্য দেখছে। বরফে ঢাকা মাঠ, বন-জঙ্গল, মাঝে মধ্যে বরফে ঢাকা নদী। সূর্যের আলোয় বরফ চিকচিক করছে। এমন সুন্দর দৃশ্যের মাঝে হারাতে মন চাইলেও, লেটোর মনের মধ্যে একটা খচখচানি কাজ করছে। কেনো? কেউ জানেনা। ক্লিক! আচমকা শব্দে দুজনেই লাফিয়ে উঠল। দেখল কার্ল রিভল*ভার তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। "আমাদের আবার দেখা হয়েই গেলো, মি. ফ্রস্ট।" লেটোর মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দই বের হলো, "টেমার!" লেটো উঠে দাড়াতে চেষ্টা করল, কিন্তু কার্ল ইশারা করল বসার জন্য, "মি. ফ্রস্ট, আপনার মেয়ের অতিলৌকিক ক্ষমতা থাকলেও সে কিন্তু বুলে*ট-প্রুফ নয়। কথাটা মনে রাখবেন।" লিলি শান্ত হয়ে বসে রয়েছে, একবার সে কার্লের দিকে তাকালো। তারপর তাকালো তার বাবার দিকে। তার চোখে একটা অদ্ভুত ঝিলিক খেলা করল এবং সেই মুহুর্তে কার্ল এক লাফে দুপা পেছালো। তার হাত ও রিভল*ভার বরফে ঢেকে গেছে। কার্লের মুহুর্তের অসচেতনতাকে কাজে লাগালো লেটো। প্রথমেই সে লাথি মারল কার্লের হাতে। বরফ ভাঙার শব্দ ছাপিয়ে আরেকটা শব্দ কানে এলো, তা হলো কার্লের কব্জির হাড় ভাঙ্গার। রিভলভার ছিটকে চলে গেলো দূরে। কার্ল পেছানোর চেষ্টা করতে লাগল, লেটোও ছাড়ার পাত্র নয়। সেও তেড়ে গেলো কার্লের দিকে, কার্ল পা দিয়ে একটা লাথি বসিয়ে দিলো লেটোর পেটে৷ লেটো পেটে হাত দিয়ে বসে পরল। কার্ল এবার লাথি চালালো মুখ বরাবর, কিন্তু লেটো সরে গিয়ে আঘাত থেকে বাচল। তারপর ঝাপিয়ে পরল কার্লের উপর। দুজন কেবিনের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ধস্তাধস্তি করছে। লিলি বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সে কি করবে বুঝতে পারছেনা। লেটোর ঘুষি খেয়ে কার্ল চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল। কিন্তু সেও কম কিসে! হাটু দিয়ে লেটোর তলপেটে আঘাত করল। লেটো কার্লকে ঠেলে কেবিনের দরজার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট, হারাম*জাদাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেবে। কার্লও সেটা বুঝতে পেরে প্রতিরোধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কার্ল টের পেলো লেটো প্রচন্ড শক্তিশালী। কার্লকে ঠেলতে ঠেলতে দরজার কাছে এনে ফেলেছে। কার্ল পালটা ধাক্কা দিয়েও কিছুই করতে পারছেনা। উপায় না দেখে সে তার গোপন অস্ত্র ব্যবহার করল। বুটের তলায় থাকা ছোট্ট ছুরি আলগা করে নিলো চাপ দিয়ে। তারপর লেটোর হাটুতে ঢুকিয়ে দিলো, ভারসাম্য হারিয়ে কার্লের গায়ের উপরেই হুমড়ি খেলো সে। এবং কার্ল সরে গিয়ে তাকে জোরে ধাক্কা মারল। পরমুহূর্তেই লিলির চিৎকার শোনা গেলো, বাবাআআআআআ...