যারা স্বজন হারিয়ে এখনো ব্যথাতুর জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের পক্ষে কখনোই হোলি আর্টিজান ট্রাজেডি ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের কেউ কেউ এবং তাদের নিষ্ঠ অনুসারীরা হোলি আর্টিজান ট্রাজেডিকে নিতান্তই নাটক বলে উড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস পাচ্ছে। দেশের ধর্মগুরুরা অনেকেই ওই হামলাকে তাদের বিজয় বলে উল্লেখ করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের পর খোদ কোনো কোনো পুলিশ সদস্যও বলবার চেষ্টা করেছে হোলি আর্টিজানে কোনো হামলা হয়নি। এবং তারই ধারাবাহিকতায় ওই হামলায় দেশের পক্ষে অসম সাহসিকতা দেখাতে গিয়ে পুলিশের দুই বীর সদস্যকেও মুছে ফেলবার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কোনো সভ্য রাষ্ট্র তো তার দেশপ্রেমিক নাগরিককে কখনোই ভুলে যায় না।
২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিদের হামলায় মোট ২৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন সাত বাংলাদেশি, নয় ইতালীয়, সাত জাপানি ও এক ভারতীয় নাগরিক। হামলাকারীদের সবার পরিচয় নিশ্চিত করেছিল তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। হামলাকারীদের প্রায় সবাই বিশ্ববিশ্রুত এক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের দ্বারা উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ ছিল বলে প্রমাণ মিলেছিল।
গেল দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক্সট্রিমিজম নিয়ে কীসব ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে তা সবারই জানা। তবে বর্তমানে গণতান্ত্রিক সরকার রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার দশম বছরে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের ‘জিরো টলারেন্স’ বা ‘শূন্য সহনশীল’ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
দ্য ডেইলি স্টার জানাচ্ছে, আজ বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গুলশানে ইতালির রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, হামলা থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তি ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘এ ধরনের শক্তির কোনো স্থান বাংলাদেশে নেই। দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার সুযোগ কখনোই তাদের দেওয়া হবে না।’
হোলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত সেই মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলা এখনো আমাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি,’ বলেন তিনি।
হামলাটিকে বাংলাদেশের প্রাণবন্ত, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজে ভয়, ঘৃণা ও বিভাজন সৃষ্টির একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
শামা ওবায়েদ জানান, এরপর থেকে বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলায় হোল-অব-গভর্নমেন্ট ও হোল-অব-সোসাইটি পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, নাগরিক সমাজ, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
ওই হামলায় সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে গিয়ে শহীদ হন তৎকালীন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের এসি রবিউল করিম (কামরুল)। সেসময় আমরা 'রবি কামরুল: এক মানবহিতৈষী ব্রতচারীর অকাল প্রয়াণ' -শীর্ষক কলামে লিখেছিলাম, মহাপ্রকৃতির এ এক নিদারুণ বিচার এই যে, যখন একা থাকার অভ্যাস হয়ে যায় ঠিক তখনি সৃষ্টিকর্তা কিছু মানুষের সন্ধান দেন। যখন তাদেরকে নিয়ে ভালো থাকার অভ্যাস হয়ে যায়, ঠিক তখনি আবার একা হয়ে যেতে হয়। দার্শনিক বার্নার্ড শ'র এই খাঁটি কথাটি মনে-প্রাণে বেশ নাড়া দিয়ে যায়, যখন নিজের জীবনে এই অনুভব স্বতঃসিদ্ধ হয় যে, এক বিশেষ মানুষকে অকালে হারিয়ে আসলেই আমরা বেশ একা হয়ে গেলাম। আর সেই বিয়োগ ব্যথাটা সত্যিকার অর্থেই করুণ কাব্য হয়ে ওঠে যখন দেখি, স্বামী বিবেকানন্দের আপ্তবাক্য 'মানুষের সেবা করাই হচ্ছে ঈশ্বরের সেবা করা'- একে আদর্শ মেনে যে মানুষটি নিজের জীবনে সেবাকে ব্রত করে ছিল। বলছিলাম, অকালপ্রয়াত এক স্বপ্নবাজ তরুণ পুলিশ অফিসার রবিউল ইসলামের কথা। যিনি পহেলা জুলাই হোলি আর্টিজান ট্রাজেডিতে বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করে দেশের জন্য নিঃশেষে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে গেছেন। সেই একনিষ্ঠ মানবহিতৈষী ব্রতচারীর অকাল প্রয়াণ কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। তবে মনে মনে সান্ত্বনা খুঁজে ফিরি ঠিকই, নাহ, রবিতো যায়নি, আদর্শের কচি সবুজ ঘাসে শিশির বিন্দু হয়ে, বর্ণিল পুষ্পের মধুরিমায়, বোধ প্রকোষ্ঠের উপলব্ধিতে, কর্মের নিপুণ কুশলতায়, সেবার পরম ব্রতে রবি কামরুল আমাদের মাঝে চিরঞ্জীব হয়ে আছেন। আমরা সেই মানুষ রবি'র জয়গানই গাই।
ঈশ্বরের এক অপার কৃপা এই যে, ছাত্রজীবনের বেশ কয়েকটি বছর এই আলোকোজ্জ্বল রবি'র সাথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ অরণ্যের উন্মুক্ত পথে একসাথে হেঁটেছি। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সমস্বরে স্লোগান তুলেছি। জহির রায়হান মিলনায়তনে ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের রস আস্বাদনের সাথে সাথে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেকাল ও একালের চিত্রধারা নিয়ে তুমুল বিতর্কে মেতেছি। মহুয়া তলে কবিতা সন্ধ্যায় একসাথে বিমুগ্ধ স্রোতা হয়েছি কতদিন। কবিতাপত্র প্রকাশ করবার এক ধরণের বন্য নেশা ছিল রবি'র। আর সেই কাব্যপত্রে কতবার ভালোবাসার পঙক্তিমালা সাজিয়েছি। মানুষ হিসেবে অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনা কিংবা বোধেরা একই খেয়াতে পাল তুলত বলে প্রগতির স্রোতস্বিনীতে আমাদের যৌথ চলন ছিল নিয়ত বেগবান। আমাদের বন্ধুবর, সতীর্থ, সুখ আর দুঃখেরও ভাগীদার গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার সেই রবিউলকে ১লা জুলাইয়ে গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে এক অস্পৃশ্য ঝড় এসে বড় অকালে কেড়ে নিয়ে গেল। তবে রেখে গেল রবি'র অকৃত্রিম দেশপ্রেম, বিরল সাহসিকতা আর উদাহরণযোগ্য কর্মনিষ্ঠার অবিচল দৃষ্টান্ত। আমরা এই রবি'রই বন্দনা করব। আমাদের এই রবি'র জন্যইতো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেকালে গলা সেধেছিলেন:
আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও।
আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও।
যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে
আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে
এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও।
স্নাকতোত্তর পাস করে কিছুদিন ইতালি ছিলেন রবিউল। কিন্তু বিদেশ বিভূঁইয়ে ভালো লাগছিল না তাঁর। রক্তে যাঁর দেশসেবার বীজ পোতা, তিনি কেন পরদেশে থাকতে যাবেন? ২০১১ সালে ইতালি থেকে গ্রামে ফিরেন তিনি। আর ঐ বছরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের দিনে নিজের নাড়িপোতা ভূমি মানিকগঞ্জের কাটিগ্রামে সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য 'বিকনিং লাইট অর্গানাইজেশন অব ম্যানকাইন্ড এন্ড সোসাইটি (ব্লুমস)' নামে বিদ্যায়তন গড়ে তোলেন। আর এই শুভযাত্রার উদ্বোধক করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের শিক্ষক কবি খালেদ হোসাইনকে। সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য একটি আশ্রম, খেলাঘর এবং বিদ্যানিকেতনের স্বপ্ন আজন্মই বয়ে বেড়াতেন রবিউল। প্রকৃতিপ্রদত্ত সামান্য অক্ষমতার জন্য শিশুরা অবহেলার পাত্র হবে, অন্যের বোঝা হয়ে থাকবে কিংবা কারো গলগ্রহ হয়ে জীবন কাটাবে -একথা ভাবতেই পারতেন না তিনি। আর জেগে জেগে যে স্বপ্ন রবিউল দেখতে ভালোবাসতেন তা বাস্তবায়ন করবার আত্মপ্রত্যয়টাও তাঁর ছিল। এমন রবিউলের তারিফ করে শেষ করা যায়?
কিন্তু মাত্র ১০ বছরের মাথায় শহীদ কামরুল যেন রাষ্ট্রের নিউরণ থেকে বিস্মৃত হতে চলেছে। এটা যুগপৎভাবে দুঃখজনক ও অভাবনীয়।
'হোলি আর্টিজানে প্রাণ দেওয়া পুলিশ সদস্যদের কি আমরা ভুলে যাচ্ছি'-শীর্ষক মতামত কলামে শহীদ এসি রবিউল করিমের ভাই সাংবাদিক শামসুজ্জামান প্রথম আলোর মতামত কলামে আজ লিখেছেন, ঢাকার গুলশান থানার সামনে ২০১৮ সালে নির্মিত হয়েছিল ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্য। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জিম্মিদের উদ্ধারে সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের ছোড়া গু'লি ও গ্রেনেডের আঘাতে নিহত হন তৎকালীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন। জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে জীবন উৎসর্গকারী এই দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে গুলশান থানার সামনে ভাস্কর্যটি তৈরি করেছিলেন ভাস্কর মৃণাল হক।
এর পর থেকে প্রতিবছর এখানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দেশের হাইকমিশনাররা এই দুই বীর পুলিশ কর্মকর্তাকে শ্রদ্ধা জানাতেন। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলার পর এখন আর সেখানে কেউ যান না। এমনকি সেখানে কোনো ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগও নেয়নি কেউ।
২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের পর থেকে সব সময় আমাকে সগর্বে বলতে হয়েছে রবিউল আমাদের ভাই। আমাদের ভাইকে নানাভাবে সম্মান জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসেবে যেমন ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছিল, তেমনি ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটকটিও রবিউলের নামে উৎসর্গ করা হয়েছিল। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভাস্কর্যটি যেমন ভেঙে ফেলা হয়েছে, ঠিক তেমনি ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবির প্রধান ফটক থেকে রবিউলের নামটিও মুছে ফেলা হয়েছে।
হোলি আর্টিজানে জঙ্গিরা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৭ জন নাগরিককে। এই ঘটনার পর পুলিশ সদস্যদের বীরোচিত আত্মোৎসর্গ ও গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে ক্ষতবিক্ষত শরীরের মধ্য দিয়ে শুধু পুলিশ বাহিনীই নয়, দেশ-বিদেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান ও পদক্ষেপের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি জোরালো হয়েছিল।
আমরা রবি কামরুলে পরিবারের স্বজনদের ব্যথাটা কি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারছি? কেন একজন বীরকে নিয়ে তার বাহিনী গর্ব করবার চেতনা হারিয়ে ফেলবে? কেন একশ্রেণীর মানুষ নির্বিচারে মানুষ হত্যাকে জাস্টিফিকেশন দিতে তাচ্ছিল্যভরে বলবে, হোলি আর্টিজান বলে কিছু ছিল না! এ যে আমাদের বোধ ও বিবেকের বিস্ময়কর অবনমন।
বর্তমান সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হলি আর্টিজান হামলাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজে বিভাজন সৃষ্টির পরিকল্পিত প্রচেষ্টা বলে উল্লেখ করেছেন। এখন এই কথার রেশ ধরে রাষ্ট্রীয় আধিকারিক, পুলিশ বাহিনীর সদস্য, ধর্মগুরু ও তাদের মুরিদেরা এবং আপামর জনসাধারণের মধ্যে এই প্রতীতি জাগরুক থাকুক যে, উগ্রবাদ সবসময় নিন্দনীয়। এবং উগ্রবাদ প্রতিরোধে শহীদ হওয়া বীরেরা অতি অবশ্যই সদা সর্বদা স্মরণীয় এবং বরণীয়।
লেখক: সাংবাদিক
১ জুলাই ২০২৬
22
View