Posts

নন ফিকশন

এক দরিদ্র মা

July 1, 2026

Md Josam

Original Author Md Shamim Skder

Translated by Md Shamim Skder

5
View

রহিমা বেগমের জীবন শুরু হয়েছিল গ্রামের একটা ছোট্ট ঘরে কিন্তু শেষ হয়েছিল ঢাকার মিরপুরের ঘিঞ্জি বস্তিতে যেখানে ড্রেনের নোংরা পানি সারাবছর রাস্তায় জমে থাকত আর বৃষ্টি হলেই ঘরের মেঝে কাদায় ভরে যেত তিনি তার স্বামী আব্দুল করিমের সাথে শহরে এসেছিল স্বপ্ন নিয়ে যে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করবে কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্নগুলো একে একে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল আব্দুল করিম রিকশা চালিয়ে যা আয় করত তাতে কোনোমতে দিন চলে যেত সকালে উঠে রহিমা চুলা জ্বালিয়ে ভাত বসাতো এক মুঠো চাল আর ডাল দিয়ে আর ছেলেমেয়েরা ঘুম থেকে উঠে খেয়ে বেরিয়ে যেত বড় ছেলে রাকিব তখন মাত্র দশ বছরের ছিল সে প্রায়ই চায়ের দোকানে কাপ ধুয়ে দিত আর বিকেলে ফিরে এসে মাকে বলত মা আজ দোকানদার আমাকে ধমক দিয়েছে কারণ একটা কাপ ভেঙে গেছে তার চোখে জল চলে আসত কিন্তু রহিমা তাকে জড়িয়ে ধরে বলত চুপ করে খেয়ে নে বাবা কাল থেকে সাবধানে কাজ করিস মেয়ে রুপা ছিল নয় বছরের সে মায়ের সাথে পানি তুলতে যেত বস্তির কল থেকে লাইন দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত আর অনেক সময় পানি না পেয়ে খালি বালতি নিয়ে ফিরত তখন রান্না করতে গিয়ে রহিমা চোখের জল ফেলত ছোট সোহেল ছিল মাত্র ছয় বছরের সে রাস্তায় অন্য ছেলেদের সাথে খেলত কিন্তু খেলার মাঝে অনেক সময় খিদেয় কান্না করত কারণ বাড়িতে খাবার থাকত না সবাই মিলে একসাথে কষ্ট করত বাবা আব্দুল করিম সন্ধ্যায় ফিরে এসে ক্লান্ত শরীরে ছেলেমেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিত আর বলত একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু সেই একদিন আর আসেনি।
এক বর্ষার সন্ধ্যায় আব্দুল করিম রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল কিন্তু আর ফিরে আসেনি মিরপুরের রাস্তায় ট্রাকের ধাক্কায় তার রিকশা চুরমার হয়ে গিয়েছিল আর তিনি রাস্তায় পড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন খবর পেয়ে রহিমা ছুটে গিয়েছিল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হাসপাতালে পৌঁছে দেখেছিল শুধু লাশ পুলিশ বলেছিল ড্রাইভার পালিয়েছে কোনো ক্ষতিপূরণ নেই কোনো সাহায্য নেই সেই রাতে বস্তির ঘরে তিন সন্তানকে নিয়ে রহিমা চুপ করে বসে ছিল ছেলেমেয়েরা কাঁদছিল রাকিব বলছিল আব্বা কই গেল মা রুপা মায়ের কোলে মাথা গুঁজে কাঁদছিল আর সোহেল ঘুমের মধ্যে বাবার নাম নিয়ে ডাকছিল পরদিন থেকে রহিমার একা লড়াই শুরু হয়েছিল সে প্রথমে গার্মেন্টসের কাজ খুঁজতে গিয়েছিল কিন্তু বয়স আর সন্তান দেখে কেউ নেয়নি শেষে বস্তির পাশের বড় বাড়িগুলোতে ঝি এর কাজ নিয়েছিল সকাল ছয়টায় বেরিয়ে তিন চারটি বাড়িতে ঘর মোছা বাসন মাজা কাপড় ধোয়া করে রাত নয়টায় ফিরত শরীর ভেঙে যেত কিন্তু থামার উপায় ছিল না বাড়ি ফিরে রান্না করত আর ছেলেমেয়েদের খাওয়াত রাকিব তখন পুরোপুরি চায়ের দোকানে চলে গিয়েছিল সেখানে সারাদিন কাজ করে হাত পুড়ে যেত পায়ে ব্যথা করত অনেক রাতে ফিরে এসে মাকে বলত মা আমার শরীর খারাপ লাগে কিন্তু রহিমা তাকে কিছু বলতে পারত না শুধু চুপ করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত রুপা মায়ের সাথে সব কাজ করত কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে বস্তির ছেলেরা তাকে উত্যক্ত করতে শুরু করেছিল একদিন সন্ধ্যায় একটা ছেলে তাকে ধরে টানাটানি করছিল রুপা চিৎকার করে উঠেছিল রহিমা ঝাঁটা নিয়ে ছুটে গিয়ে তাড়া করেছিল কিন্তু তারপর থেকে রুপা আর বাইরে বের হতো না ঘরের ভেতরেই থাকত আর কাঁদত সোহেল রাস্তায় ঘুরে বেড়াত অনেক সময় খিদের জন্য দোকান থেকে বিস্কুট চুরি করত ধরা পড়লে মার খেত বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে কাঁদত মা খিদে পেয়েছিল আমি আর পারি না।
বছরগুলো কেটে যাচ্ছিল কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছিল না গ্রীষ্মকালে ঘরের ভেতর তাপমাত্রা এত বেড়ে যেত যে শোয়া যেত না রহিমা আর ছেলেমেয়েরা বাইরে খোলা জায়গায় চাটাই বিছিয়ে ঘুমাত কিন্তু মশার কামড়ে সারারাত জেগে থাকত বর্ষায় ঘরে পানি ঢুকে সব ভিজে যেত তারা প্লাস্টিকের চাদর মুড়ি দিয়ে বসে থাকত রান্না করতে গিয়ে উনুন নিভে যেত অনেক দিন শুধু শুকনো রুটি আর লবণ দিয়ে দিন কাটাত রাকিবের শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল সে গ্যারেজে কাজ নিয়েছিল সেখানে তেল কালি মেখে সারাদিন গাড়ি সারাত হাত কেটে যেত পায়ে ব্যথা করত অনেক সময় বন্ধুরা তাকে মদ খাওয়াত সে ফিরে এসে মাকে বলত মা এই জীবন আর ভালো লাগে না কিন্তু টাকা ছাড়া কী করব রুপা বড় হয়ে উঠছিল তার শরীরে অসুখ লেগেই থাকত একবার জ্বর হয়েছিল তিন দিন সে শুয়ে ছিল রহিমা কাজ থেকে এসে তার কপালে হাত দিয়ে বসে থাকত ওষুধ কিনতে মাসের খাবারের টাকা চলে যেত সোহেল আরও খারাপ পথে যাচ্ছিল সে অন্য ছেলেদের সাথে মিলে ছিনতাই করতে শুরু করেছিল একদিন ধরা পড়ে পুলিশের হাতে মার খেয়েছিল রহিমা গিয়ে টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছিল কিন্তু সোহেলের চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না সে বলত মা না খেয়ে মরার চেয়ে এটা ভালো।
রহিমা নিজের শরীরের দিকে তাকাত না তার হাঁটুতে ব্যথা পিঠে ব্যথা চোখে ঝাপসা দেখা যেত কিন্তু কাজ বন্ধ করেনি একদিন বাসায় ফেরার পথে রাস্তায় একটা ট্রাকের সাথে ধাক্কা লেগে সে পড়ে গিয়েছিল পা ভেঙে গিয়েছিল মাথায় আঘাত লেগেছিল প্রতিবেশীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু টাকার অভাবে ভালো চিকিৎসা হয়নি কয়েকদিন পর হাসপাতালের বিছানায় রহিমা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল তার চোখে শেষ দেখা ছিল ছেলেমেয়েদের মুখ রাকিব রুপা আর সোহেল সবাই এসেছিল কিন্তু কেউ কিছু করতে পারেনি কবর দেওয়া হয়েছিল সস্তা কাফনে বস্তির পাশের একটা খোলা জায়গায় সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল আর সবাই ভিজতে ভিজতে ফিরে এসেছিল।
রাকিব পরে একটা ছোট ঘর নিয়ে বিয়ে করেছিল কিন্তু তার সংসারও একই কষ্টে ভরা ছিল তার বউয়ের সাথে ঝগড়া লেগেই থাকত টাকার অভাবে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পারত না তারা রাস্তায় ঘুরে বেড়াত খিদেয় কাঁদত রাকিব অনেক রাতে ফিরে এসে চুপ করে বসে থাকত তার চোখে মায়ের স্মৃতি ঘুরত রুপা তার শ্বশুরবাড়িতে মারধর খেয়ে কষ্ট করত অনেক সময় তার স্বামী মদ খেয়ে তাকে মারত সে মাঝে মাঝে বস্তিতে এসে কাঁদত কিন্তু কেউ তার কষ্ট কমাতে পারত না সোহেল জেলে গিয়েছিল বেরিয়ে এসে আবার রাস্তায় ঘুরত কোনো স্থিরতা ছিল না তার জীবনে একদিন সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল কিন্তু কেউ দেখেনি সে একা একা শেষ হয়ে গিয়েছিল এভাবেই রহিমার তিন সন্তানের শৈশব থেকে যৌবন সবটাই কষ্টে ভরা ছিল কোনো সুখের মুহূর্ত ছিল না শুধু অভাব অসুখ মারধর আর একদিন চলে যাওয়া বস্তির জীবন চলতেই থাকত একইভাবে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই

Comments

    Please login to post comment. Login