চলতি বছরে কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারের সামগ্রিক বিজয়ী হয়েছেন ত্রিনিদাদের লেখক জামির নাজির। মঙ্গলবার (৩০ জুন) যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন কমনওয়েলথভুক্ত ৫টি অঞ্চলের আঞ্চলিক বিজয়ীদের মধ্যে সামগ্রিক বিজয়ী হিসেবে জামিরের নাম ঘোষণা করেছে। তার লেখা গল্পটির বিরুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। আর এই বিতর্ককে কেন্দ্র করে বিশ্বখ্যাত সাহিত্য সাময়িকী 'গ্রান্টা' কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারের বিজয়ী গল্প প্রকাশের দীর্ঘদিনের প্রথা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক বিজয়ী হিসেবে নাম ঘোষণার পর জামির নাজিরের গল্প ‘দ্য সার্পেন্ট ইন দ্য গ্রোভ’ (The Serpent in the Grove) নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স ও ব্লুস্কাই এ সমালোচকরা দাবি করেছেন, এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সুস্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে।
এছাড়া এআই শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম প্যানগ্রাম, ‘দ্য সার্পেন্ট ইন দ্য গ্রোভ’ গল্পটিতে শতভাগ এআই এর উপস্থিতি শনাক্ত করেছে। লেখায় সন্দেহজনক কাঠামো এবং বার বার একই ধরনের রূপক ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া গেছে। এরপর সাহিত্যপত্রিকা ‘গ্রান্টা’ কমনওয়েলথ বিজয়ীদের লেখা প্রকাশের দীর্ঘদিনের চুক্তি থেকে সরে আসে। তবে এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যারের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই বিতর্কের জেরে কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন আঞ্চলিক বিজয়ীদের ছোটগল্পগুলো পর্যালোচনা করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, এই প্রক্রিয়ায় খসড়া, সময়-চিহ্নিত নথিপত্র ও বিভিন্ন নোট যাচাই করা হয়েছে। ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক রাজমি ফারুক জানিয়েছেন, লেখকদের দেওয়া বক্তব্য এবং তাদের লেখার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার না করার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তারা সন্তুষ্ট হয়েছেন।
‘দ্য গার্ডিয়ান’ কে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে আমরা বিজয়ীদের কাছে তাদের কাজের খসড়া, রূপরেখা এবং সৃজনশীল যাত্রার প্রমাণাদি দেখতে চেয়েছিলাম। উল্লেখ্য, ওই সফটওয়্যারটি কিন্তু নির্ভুল নয়; এটি প্রায়শই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল দেয়। এর ফলে পুরস্কারের মূল ভিত্তি যে ‘আস্থা’, তা ক্ষুণ্ণ হয়।’ এদিকে জামির নাজিরের গল্পটিকে ‘একটি মৌলিক, কাব্যিক এবং অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী গল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছেন কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারের বিচারক প্যানেলের প্রধান লুইস ডটি।
মঙ্গলবার কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে নাজির জানিয়েছেন, নোবেলজয়ী লেখক ভি. এস. নাইপল ও ডেরেক ওয়ালকট তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘দ্য সার্পেন্ট ইন দ্য গ্রোভ' গল্পটির জন্য তাকে ছয়-সাতটি খসড়া লিখতে হয়েছিল। সে সময় তিনি ‘স্পিচ-টু-টেক্সট’ সফটওয়্যার ব্যবহার করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ফোনের পর্দায় একবারে মাত্র তিন-চার লাইন লেখা দেখা যেত বলে প্রতিটি লাইন নিখুঁত করার পরই তিনি পরের লাইনে যেতেন। আর এভাবেই তার গল্পটি পরিশীলিত ও মার্জিত রূপ পায়।
তিনি বলেছেন, ‘এই গল্পের শুরুটা হয়েছিল ত্রিনিদাদের এক গ্রামীণ এলাকায় আমার শৈশবে। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে আমাকে রাম বিক্রির দোকানগুলোর পাশ দিয়ে যেতে হতো, যেখানে আখের ক্ষেতের শ্রমিক ও অন্যান্য কর্মীরা জড়ো হতেন। আমার এখনো মনে পড়ে সেই সব কণ্ঠস্বর, হাসি-ঠাট্টা, তর্ক-বিতর্ক আর কথাবার্তার স্মৃতি, যা গ্রামীণ জীবনকে গড়ে তুলেছিল।’
কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন নাজিরকে বিজয়ী ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল নেতিবাচক। একজন ব্যবহারকারী এক্সে লিখেছেন, ‘অত্যন্ত হতাশাজনক ও নিরুৎসাহব্যঞ্জক। মনে হচ্ছে, এআই নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের পরেও তারা তাদের অবস্থানেই অনড় থাকতে চেয়েছে। এখন এখানে লেখা জমা দেওয়ার আগে আমাকে দুবার ভাবতে হবে।’
উল্লেখ্য, কমনওয়েলথভুক্ত ৫টি অঞ্চলের দেশগুলোর লেখকদের অপ্রকাশিত ছোটগল্পের জন্য বার্ষিক এই পুরস্কারটি দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের পুরস্কারের জন্য লেখাগুলো গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১ নভেম্বর অনলাইনে জমা নেওয়া হয়েছিল। এরপর মে মাসে কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন চলতি বছরের পাঁচজন আঞ্চলিক বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে। এদের মধ্যে একজনকে সামগ্রিক বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং পুরস্কার হিসেবে তিনি পান ৫ হাজার পাউন্ড। বাকি চারজনের প্রত্যেককে আড়াই হাজার পাউন্ড দেওয়া হয়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান