যেদিন থেকে শুনেছি বরপক্ষ আমাকে দেখতে আসছে, সেদিন থেকেই মনের ভেতরে চাপা আনন্দ আকুলি-বিকুলি করছিল। এই রকম আনন্দ সবারই হয়, নাকি কেবল আমারই হচ্ছে—তা জানার প্রবল আগ্রহ দমন করতে হলো; পাছে কারও কাছে আমার এই নির্লজ্জ অবস্থা প্রকাশ পায়, সেই ভয়ে।
বরপক্ষ আমাকে দেখতে আসবে, তাই নানা রকম সম্ভব-অসম্ভব কল্পনা মনের দুয়ারে এসে ঠুকাঠুকি করছিল। যার অধিকাংশই যে বরকে নিয়ে, তা না বললেও চলে। বর দেখতে কেমন হবে, তার মন-মানসিকতাই বা কেমন হবে—আরও কত কিছু! তা অভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রই বুঝবেন।
শুনেছি, হিন্দু মেয়েরা নাকি ভালো বর পাওয়ার জন্য শিবপূজা করে। সে রকম পূজা তো আর আমি করতে পারি না। তাই বলে খোদার নিকটে আমার মনের আরাধনা তুলে ধরতে আমি কোনো দিনই কার্পণ্য করিনি। তারই ফল বুঝি খোদা আমাকে হাতে-নাতে দিলেন।
বরপক্ষের সামনে গিয়ে প্রথমেই নির্লজ্জের মতো বরকে এক পলক দেখে নিয়েছিলাম। বাস্তবতার সঙ্গে যদি কারও চাওয়া-পাওয়ার মিল থাকে, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। বরকে দেখার পর আমারও অবস্থা সেই রকম। মনে মনে চাচ্ছিলাম, উভয় পক্ষের গুরুজনেরা যেন বিয়েটার ব্যাপারে আগ্রহ দেখান।
আমার কথা শুনে হয়তো আমাকে একটা নির্লজ্জ মেয়ে ভাবছেন। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এতটা নির্লজ্জ আমি নই।
যাই হোক, আমার হবু বরের কথায় আসি। তার স্বভাব কেমন, তা তো আর এক দিনের কথায় বলতে পারব না। তবে তার চেহারা আমার কল্পনার চেয়েও সুন্দর। তাকে দেখে আসার পর মনে মনে তার সঙ্গে সম্পর্কটা প্রায় স্থির করেই ফেলেছিলাম। ভাগ্যবিধাতাও সে ব্যাপারে সায় দিলেন।
পাত্রপক্ষ আমাকে পছন্দ করে আংটি পরিয়ে যাওয়ার পর সবাই আমাকে নিয়ে খুনসুটিতে মেতে উঠল। এবার একটু লজ্জাও পেলাম, সঙ্গে অবাকও হলাম—আমিও লজ্জা পাই!
দাদি-নানি সম্পর্কিতরা এই বিষয়ে যেন রসের হাঁড়ি নিয়ে বসেন, আর নিজেদের জীবনের প্রথম দিকের সুখ খুঁজে ফেরেন।
সেদিন রাত দশটার সময় আরেকজন হঠাৎ করে এসে আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে গেলেন। সঙ্গে আমাকে দেখতে কেমন লাগছে, তারও একটা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে হঠাৎ করেই চলে গেলেন।
নিজের বিয়ের আনন্দে এই লোকটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। সে কি, লোক বলছি কেন! হ্যাঁ, লোকই বলি; কারণ তিনি আমার আপন কেউ ছিলেন না (দূরসম্পর্কের মামাতো ভাই)।
আমার আপন ছিলেন না, এই কারণেই যে তিনি আমার সকল কাজের মস্ত বড় সমালোচক। মাঝে মাঝে আমার চঞ্চলতার প্রশংসা করতেন, তবে তা ছিল খুবই ক্ষীণ। কেন জানি না, তার সেই ক্ষীণ প্রশংসাটুকু আমাকে সীমাহীন আনন্দ দিত। কৃপণের দান যতটুকুই হোক, তা তার কাছে পাহাড়সম। তার সমালোচনার ভিড়ে এই প্রশংসাটুকুও ছিল তেমনি।তার সঙ্গে আমার সব সময় দ্বন্দ্ব বেঁধেই থাকত। তাকে আমি কোনো দিনই সহ্য করতে পারতাম না। একদিন আমার এক চাচাতো বোন আমাকে প্রশ্ন করেছিল, "তামিম ভাইয়া আমাকে পছন্দ করে কিনা?"
আমি বেশ গর্ব করে বলেছিলাম, "করলে করতে পারে, তাতে আমার যায়-আসে না।"
করতেও পারে, কিন্তু কোনো দিন আমাকে মুখ ফুটে কিছু বলেননি। তিনি তেমন চাপা স্বভাবের ছিলেন না। তারপরও আমার প্রতি কোনো দুর্বলতা থাকলেও থাকতে পারে।
মাঝে-মধ্যে আমারও মনে হতো, তিনি আমাকে পছন্দ করেন; হয়তো আমাকে বলতে পারেন না। আহা, বেচারা!
তাকে কেন জানি সহ্য করতে পারতাম না। আবার দু-এক দিন তাকে দেখতে না পেলে কেন জানি না, মনে মনে খুঁজতাম। খুঁজে পেলে আবার যা-তা।
মন বড়ই আজব! না থাকলে খুঁজি, আর থাকলে অবহেলা করি।
একটা সময় ছিল, যখন তিনি আমাদের নিয়ে খুব মজা করতেন। আমরাও মজা পেতাম। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে তিনি আমাদের সেরকম সময় দিতেন না। তার এ রূপ পরিবর্তনে আমরা অবাক হয়েছিলাম বটে। কিন্তু এই বয়সে এসে তাকে নিয়ে ভাবার কোনো রসদ আমাদের, বিশেষ করে আমার, কাছে ছিল না।
অথচ তিনি যখন আমার বিয়ে নিয়ে কথা বলতে আসলেন, তাকে কিছুটা বিমর্ষ, আবার কিছুটা আনন্দিত দেখলাম। বড় আজব চরিত্র!
আমার বিয়ে নিয়ে তার এরকম রহস্যময় ব্যবহার আমাকে নতুন করে ভাবাতে শুরু করল। তিনি কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসেন? ভালোই যদি বাসবেন, তবে বলবেন না কেন? আমাকে বললে কি আমি না করতাম? না-ই করতাম বোধ হয়। কী জানি, কী করতাম!
আমিই বা তাকে নিয়ে ভাবছি কেন?
ভাবনা হলো বড় বৃক্ষের মতো—শুরু করলেই শাখা-প্রশাখা গজিয়ে যায়।
এই ভাবনা শেষ করার জন্য যখন তাকে ফোন দিলাম, ভাবনা আরও বেড়ে গেল। তার ফোন বন্ধ পেলাম। তার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিলাম, কিন্তু কোথায় গেছে, কেউ বলতে পারল না।
তবে কি আমার বিয়ের কথা শুনেই তিনি চলে গেছেন? কোথায় গেছেন? কবে আসবেন? যদি আমার বিয়ের পর আসেন?
নাহ, মাথাটা একেবারে গেছে। যাকে নিয়ে কোনো দিন এসব কল্পনাও করিনি, তাকে নিয়ে এ দুই সপ্তাহ ধরে এসব কী ভাবছি!
তাহলে তাকে কি আমি ভালোবেসে ফেলেছি?
হ্যাঁ, তাকে বোধ হয় ভালোইবাসি। বোধ হয় কী! তাকে আমি ভালোইবাসি। আমার ভেতরটা তার জন্য গুমরে কেঁদে যাচ্ছে।
কিন্তু এত দিন কোথায় ছিল আমার এই ভালোবাসা?
জীবনে কত ছেলেই তো আমাকে ভালোবাসল। তাদের কাউকেই তো ভালোবাসতে পারলাম না। কিন্তু অবশেষে এসে আমার এ কী হলো!
নিজেকে নিঃস্ব মনে হচ্ছে। এত দিন যা কিছু করেছি, সব মিথ্যা মনে হচ্ছে। আমার এমন লাগছে কেন? তাকে কি আমি পেয়েও হারিয়ে ফেললাম?
নাহ, তা তো নয়। তিনিও কি আমাকে ভালোবাসেন, কিনা—আমারও তো জানা নেই। সবই তো লোকমুখে শোনা কথা।
তিনি যদি আমাকে ভালোবেসেই থাকেন, তাহলেই বা কী? কালকেই তো আমার বিয়ে হয়ে যাবে। কালকেই আমি অন্য কারও হয়ে যাব।
উফ! কোন কারণে যদি বিয়েটা ভেঙে যেত!
এই সব কী ভাবছি? আমিই তো আমার বিয়ে নিয়ে সপ্তাহ দুয়েক আগে আনন্দে ঢোল পিটিয়েছি। বরকে দেখেই তো দুই সপ্তাহ আগে আমার স্বপ্নরাজ্যের দুয়ার খুলে গিয়েছিল। অথচ তাকেই আর একটুও ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে, ওই লোকটার কাছে ছুটে যাই।
বাইরে চেনা, ভেতরে ভেতরে অচেনা লোকটার জন্য যে এতখানি ভালোবাসা ছিল, তা এত দিনে বুঝতে পারিনি। সারা জীবন যাকে সহ্য করতে পারিনি, আজ তার জন্য নিজেকে বড় অতৃপ্ত মনে হচ্ছে।
কেন বুঝতে পারিনি? ক্রমে ক্রমে জমে ওঠা ভালোবাসা কাউকে দিয়ে মানবজীবনে তৃপ্তি আসে।
যদি ও কালকের মধ্যে না আসে, তাহলে সারাটা জীবন আমাকে এ অসহ্য জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। তার রেখে যাওয়া স্মৃতির খণ্ডাংশ আমার হৃদয়ে ভেঙে যাওয়া কাচের মতো খচখচ করে বিধবে। আর একটি পরিবারকেও রক্তাক্ত করবে।
ব্যর্থ প্রেমের মতো ভয়ংকর ছোঁয়াচে রোগ আর দ্বিতীয়টি নেই।
আর তিনি যদি ফিরে আসেন, তাহলেই বা কী করব? তিনি আমাকে আদৌ ভালোবাসেন কি না, তাও তো জানি না।
আমাকে ভালোবাসার অনেক কারণ হয়তো অনেকের কাছে থাকতে পারে। কিন্তু তিনি আমার মতো মেয়েকে ভালোবাসবেন—তার কোনো কারণ আমি তো রাখতে পারিনি।
সব ভালোবাসার কারণ থাকতে হয় না। কারণহীন ভালোবাসাই প্রকৃত ভালোবাসা।
তার মতো মানুষ আমাকে কারণ ছাড়া ভালোবাসবেন—এটাই স্বাভাবিক। আমি ভালোবাসার মতোই একটা মেয়ে।
ভালোবাসা পেয়েই শুধু মন ভরে না, ভালোবাসা দিয়েও মন ভরে। কিন্তু ভালোবাসা জীবনে ঠিকই এলো, ভালোবাসা দিতে পারলাম না। সারা জীবন ভালোবাসা পেয়ে এসেছি; সেই সব তৃপ্তি, ভালোবাসা দিতে না পারার অতৃপ্তির কাছে হার মেনেছে।
সেদিন অনেক ভেবেছি, কিন্তু কোনোভাবেই বিয়েটা আর বন্ধ করতে পারিনি। পরের দিন বিয়েটা হয়েই গেল।
যে বরকে নিয়ে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ভালো লাগছিল, তাকে আমার আর কোনো দিনই ভালো লাগেনি।
আমার এ ক্ষুদ্র জীবনে নিজের মনকে কোনো দিন বুঝলাম না। নিজের স্বামীকে আর ভালোবাসতে পারলাম না। তাকে নিজের জীবনের অপূর্ণতার কথাও জানাতে পারলাম না।
জীবনটা গল্প হলে হয়তো এই স্বামীকেই ভালোবেসে জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পেতাম।
আমি সেই সব অভাগা নারীদের দলে, যারা স্বামীকে ভালোবাসতে পারেনি। তাকে ভালোবাসার প্রবৃত্তি কখনোই হয়নি। কারণ, যে আক্ষেপ আমার চিরসঙ্গী হয়েছিল, সে আক্ষেপই আমাকে বিরহের নেশায় পুড়িয়ে ভিন্ন জীবনের স্বাদ দিচ্ছিল।
বেদনার নেশা সাপের বিষের নেশার মতোই।
তাকে না পাওয়ার ব্যথা আমার হৃদয়ে যে তান তুলে দিয়ে গেল, তা যে আমৃত্যু আমাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করবে, আমি ভাবতেও পারিনি।
বিয়ের পরও তাকে বিবাহিত জীবনের বন্ধনের মাঝেই খুঁজে ফিরেছি। তার এতটুকু খোঁজ পাওয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থেকেছি। এই এতটুকুর নেশায় যারা পড়েছে, তাদের জীবনের সবটুকু আলো কখন যে বিশাল অন্ধকারে হারিয়ে গেছে, তার খোঁজ কেউ রাখেনি।
তাকে নিয়ে যতই স্মৃতি হাতড়ে খুঁজি, ততই তাকে এক পলক দেখার নেশায় বাবার বাড়িতে ছুটে আসি। তাকে নিয়ে মনের গহিন বনে এত যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা কাউকে বলতে পারিনি। কিন্তু এখন আর তাকে পাওয়ার আশা যত না করি, তার চেয়ে তাকে ভুলে থাকার মিথ্যা চেষ্টাই বেশি করি। ভুলতে গিয়ে তাকে মনের গহিন থেকে ততই টেনে বের করি।
বয়স অনেক হলো। নিজের নাতি-নাতনির নামটাও ভুলে যাই। কিন্তু সে আমাকে ভালোবাসত কি না, এই প্রশ্নটাকে কোনো দিন ভুলতে পারলাম না। তিনি কোথায় চলে গেলেন, কেনই বা গেলেন, তাও জানতে পারলাম না।
তিনি যদি আজও এসে আমাকে বলতেন...
তবুও চির-আক্ষেপ আমার ঘুচত।
আমার ননদের মেয়ের বিয়ে হয়েছে আমাদের গ্রামে। ও নাকি শুনে এসেছে, আমাদের গ্রামের হারিয়ে যাওয়া ছেলেটা ফিরে এসেছে।
খবরটা শুনে আমি স্বাভাবিক থাকার যতই চেষ্টা করছি, ততই মনে হচ্ছে, এই বুঝি মেয়েটা আমাকে ধরে ফেলবে, বুঝে যাবে মনের অবস্থা। তবুও বলে ফেললাম,
—উনি দেখতে কেমন আছেন রে?
প্রশ্নটা শোনার আগেই মেয়েটা চলে গেল।
আমিও কালক্ষেপণ না করে গ্রামের বাড়িতে যাব বলে বের হলাম। মনের ভেতর কত কল্পনা! নিজেকে বুড়ো মহিলা বলে মনেই হচ্ছে না। সত্যিই মানুষের মনের বসন্তের অন্ত নেই।
মনের ভেতর কত শত চিন্তা উঁকি দিচ্ছে। উনি দেখতে কেমন হয়েছেন? আমাকে মনে আছে কি না? আমাকে ভালোবাসতেন কি না?
নিজেই নিজেই হেসে ফেলি এ বুড়ো বয়সের ভীমরতি দেখে। যদি ভালোবাসেন, তাহলেই বা কী?
না, থাক। গিয়ে আর কাজ নেই।
কিন্তু পা দুটো পেছনের দিকে না গিয়ে সামনের দিকেই আপন খেয়ালে চলে যাচ্ছিল। যেখানে মন গিয়ে থাকে, সেখানে পা দুটো দু-ধাপ এগিয়ে থাকে। মনের ডাককে উপেক্ষা করতে পারলাম না।
যতই সামনে এগিয়ে যেতে থাকি, ততই বুকের ভেতর চাপা আকাঙ্ক্ষা ধড়ফড়িয়ে জেগে ওঠে। দেখা হলে কী বলব? না গেলেই ভালো হয়। এ এমন এক কথা, যা কাউকে জানানো সম্ভব নয়।
সম্ভব-অসম্ভব সকল ভাবনা কাটিয়ে লোকটার বাড়ির সামনে গিয়ে অনেক মানুষের ভিড় দেখতে পেলাম। মনের ভেতর ভয়-শঙ্কা আরও চেপে বসল।
—মারা-টারা যায়নি তো?
ছি, ছি! এসব কী ভাবছি? বয়স ষাট, তা হতে যাবে কেন!
দু-একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,
—কী হয়েছে রে? সবাই এত ভিড় জমিয়ে কী দেখছিস?
তখনই আমার ভাইয়ের নাতনিটা বলে উঠল,
—পাগল দেখছি।
আমি বললাম,
—কোন পাগল?
নাতনি বলল,
—ওই যে, অনেক আগে নাকি হারিয়ে গিয়েছিল, সেই পাগল।
কথাটা শুনেই ভিড় ঠেলে তাকে ্ক নজর দেখলাম, দেখেই
আমার ভেতরটা ঠেলে বুকফাটা কান্না উঠে এল। এত বছর পরও একটি কথাই বারবার ফিরে আসে—
"অবশেষে তুমি আসলে... কিন্তু বলতে পারলে না। আর আমিও কোনো দিন জানতে পারলাম না—তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসতে?"