Posts

গল্প

টাইম মেশিনের নীল ডায়েরি

July 3, 2026

belal uddin

16
View

নীলয় পেশায় একজন তরুণ বিজ্ঞানী। দিন-রাত ল্যাবরেটরির চার দেয়ালে কাচ, তার আর অদ্ভুত সব রাসায়নিক তরল নিয়ে পড়ে থাকাই তার কাজ। তবে সাধারণ বিজ্ঞানীদের মতো সে কেবল নতুন কোনো গ্যাজেট বানাচ্ছিল না; সে কাজ করছিল মানুষের চিরকালের এক অসম্ভব স্বপ্ন নিয়ে—টাইম মেশিন

দীর্ঘ পাঁচ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর, আজ রাতে নীলয় সফল হলো। তার সামনে টেবিলের ওপর জ্বলজ্বল করছে একটি ছোট, নীল রঙের ডায়েরির মতো দেখতে ডিভাইস। এটি সাধারণ কোনো ডায়েরি নয়, এটি অতীতের যেকোনো সময়ে যাওয়ার এক ডিজিটাল চাবিকাঠি।

নীলয় স্ক্রিনে সালটা সেট করল: ২০১৬ সাল। আজ থেকে ঠিক ১০ বছর আগে।

তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুশোচনার দিন ছিল সেটি। সে বছর তার খামখেয়ালিপনা আর রাগের মাথায় বলা কিছু কথার কারণে তার পরম বন্ধু আবির দেশ ছেড়ে চিরতরে চলে গিয়েছিল। এরপর আর কখনো তাদের যোগাযোগ হয়নি। নীলয় সবসময় ভাবত, যদি সেদিনের সেই পাঁচটা মিনিট সে বদলে দিতে পারত!

ডিভাইসের নীল বোতামটা চাপতেই ল্যাবরেটরির বাতাস ভারী হয়ে উঠল। একটা তীব্র আলোর ঝলকানি, আর পরক্ষণেই নীলয় নিজেকে আবিষ্কার করল তার পুরোনো ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে।

চারপাশে তাকিয়ে নীলয়ের বুকটা কেঁপে উঠল। ঠিক ১০ বছর আগের সেই বিকেল! কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে ২০ বছর বয়সী আবির। ঠিক যেভাবে নীলয় মনে রেখেছিল।

নীলয় দৌড়ে আবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আবির তাকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে বলল, "কী রে নীলয়, এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন? আর তোর পরনের জামাকাপড় এমন অদ্ভুত কেন?"

নীলয় আবেগে আপ্লুত হয়ে আবিরের হাত দুটো চেপে ধরল। সে বলল, "আবির, আজ তুই যে সিদ্ধান্তের কথা বলবি, সেটা দয়া করে নিস না। আমি সেদিন তোকে যেসব খারাপ কথা বলতাম, সেগুলো মন থেকে বলিনি। তুই প্লিজ দেশ ছেড়ে যাস না। আমাদের বন্ধুত্বটা নষ্ট হতে দিস না।"

আবির কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে নীলয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল, "তুই হঠাৎ এসব কী বলছিস? আমি তো দেশ ছেড়ে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্তই নিইনি! আর তুই তো আমাকে কখনোই কোনো খারাপ কথা বলিসনি।"

নীলয় চমকে উঠল। "মানে? আজই তো আমাদের ঝগড়া হওয়ার কথা ছিল!"

আবির নীলয়ের কপালে হাত দিয়ে বলল, "তোর কি জ্বর এসেছে? আমরা তো সারা বিকেল একসাথে ল্যাবে কাজ করলাম। তুই তো আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, আমাদের মধ্যে ঝগড়া হবে কেন?"

হঠাৎ নীলয়ের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে বুঝতে পারল, সে আসলে অতীতে ফিরে আসেনি। সে চলে এসেছে একটি সমান্তরাল মহাবিশ্বে (Parallel Universe), যেখানে তার আর আবিরের বন্ধুত্ব কখনো নষ্টই হয়নি! টাইম মেশিন তাকে সময়ে পেছনে নিয়ে যায়নি, বরং মাত্রার দেয়াল ভেঙে অন্য এক পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে।

নীলয় পকেট থেকে নীল ডায়েরিটা বের করল। সে চাইলে এখনই বোতাম চেপে তার নিজের চেনা, একাকী পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারে। কিন্তু এই সমান্তরাল পৃথিবীতে আবির এখনো তার বন্ধু। এখানে কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো একাকীত্ব নেই।

নীলয় স্ক্রিনের দিকে তাকাল। হোম স্ক্রিনে একটা কাউন্টডাউন চলছে—আর মাত্র ৩০ সেকেন্ড বাকি। এর মধ্যে ফিরে না গেলে সে চিরতরে এই জগতেই আটকে যাবে।

একপাশে তার চেনা জগৎ, যেখানে সে সফল বিজ্ঞানী কিন্তু একা। অন্যপাশে এই জগৎ, যেখানে সে সাধারণ কিন্তু তার প্রিয় বন্ধুটি পাশে আছে।

১০... ৯... ৮...

নীলয় গভীর একটা শ্বাস নিল। তারপর পকেট থেকে নীল ডায়েরিটা বের করে ক্যাম্পাসের লেকের পানিতে ছুড়ে ফেলে দিল। ঘড়ির কাঁটা শূন্যে পৌঁছাল, আর ডিভাইসটি পানির নিচে হারিয়ে গেল।

আবির নীলয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, "কী ফেলে দিলি পানিতে?"

নীলয় আবিরের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল, "কিছু না রে, একটা কাল্পনিক ডায়েরি। চল, আজ তোকে চা খাওয়াব।"

নীলয় তার অতীত বদলাতে পারেনি, কিন্তু সে নিজের জন্য একটা নতুন এবং সুখী বর্তমান বেছে নিল।

Comments

    Please login to post comment. Login