আজকের ধনবান গলাবাজ বাঙালির অপরকে ঘায়েল করবার প্রহরণ হলো অবৈধ রতিক্রিয়া, ধর্ষকাম আর নারী জননাঙ্গ ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলা। নারীকে অপমান করার উদ্দেশ্যে যৌন সহিংসতাকে কেন্দ্র করে গালি নির্মাণ করা হয়। নারী পুরুষের অধস্তন দাসানুদাস -এই পশ্চাৎপদ ভাবনা থেকে নারীকে ঘায়েল করবার হাতিয়ার ওইসব অশ্রাব্য, অপ্রকাশ্য ও অনির্বচনীয় গালিবাজি। যুক্তি, তর্ক, সভ্যতা, ভব্যতার ধার এরা ধারে না। একশ্রেণীর জেন-জিরা যেন জিঞ্জিরার কাউন্টারফিট গুডস। এমনকি ওইসব বেপথো জোয়ানদের জীবনদর্শন আত্মস্থ করবার প্রয়াস পাচ্ছেন কোনো কোনো অবিবেচক বুড়োরাও। এমনকি খোদ নারীদের কেউ কেউ ওই ফাঁদে পা রেখে হড়কে যাচ্ছে। পিতৃতন্ত্র বিপদ, আর পুরুষতন্ত্রে দীক্ষিত নারী ভয়াবহ বিপত্তি।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারত থেকে পাকিস্তান আলাদা করতে গিয়ে কাউকে গালি দিয়েছেন? মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ব্রিটিশদের থেকে ভারত স্বাধীন করতে গালিকে স্লোগান করেছেন? জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং, ফিদেল কাস্ত্রো, বিপ্লবী চে গুয়েভারা কোনো ভাষণে কাউকে একটা গালিও দিয়েছেন? হবস, লক, রুশো, জর্জ বার্নার্ড শ, লেনিন, বার্ট্রান্ড রাসেল, হেগেল প্রমুখ রাজনৈতিক তাত্ত্বিকের কোনো প্রবন্ধ কিংবা অভিভাষণে গালিবিদ্যা বলে কিছু আছে?
বাংলাদেশ আন্দোলনের শীর্ষ নেতা শেখ মুজিব এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক ও সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়া জনপরিসরে ভাষণ কিংবা রাজনৈতিক দর্শনে গালিকে প্রধান অস্ত্র করেছেন কখনো? ভাসানী, সোহরাওয়ার্দীর গালির খবর কেউ জানেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি নজরুল, জসীমউদ্দীন, শামসুর রাহমান কিংবা আল মাহমুদ কোনো লেখায় গালি নিয়ে কাব্য করেছেন?
আমরা এখানে যাদের নাম উল্লেখ করলাম আপনারা কি তাদের বড়? অপরপক্ষকে ঘায়েল করতে আপনাদেরকে কেন মুখনিঃসৃত দুর্গন্ধ ছড়াতে হয়? একজন কোমলমতি শিশু যদি আপনার কাছে জানতে চায় আপনাদের বহুলচর্চিত 'চ' ও 'শ' বর্গীয় প্রিয় শব্দবন্ধের অর্থ কী? কী জবাব দেবেন?
আপনারা গালি কেন দেন? কারণ আপনাদের মগজ বর্গা গেছে গালির মাস্টার সেফাতুল্লাহর কাছে। এটা গেল কীভাবে? কারণ আপনারা সেফাতুল্লাহর ভাষায় মূর্খ, ছোটলোক, অশিক্ষিত, বর্বর।
আপনারা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, ছোট করা বা নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠার জন্য গালি ব্যবহার করেছেন। কী এক অব্যক্ত বেদনায় তীব্র রাগ, অপমান বা হতাশা অনুভব করছেন, ওই আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না থাকায় উত্তেজিত পরিস্থিতিতে সহজেই গালির আশ্রয় নিচ্ছেন। এই গালি কখনওই আত্মবিশ্বাসের নয়, বরং ভেতরের দুর্বলতা, ভয় বা অযোগ্যতার অনুভূতি আড়াল করার একটি উপায় মাত্র। আপনারা কী যেন কী অর্জন করতে চাইছেন সেটা কিছুতেই পেরে উঠছেন না। তাহলে এই না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে অন্যকে গালি দিতে দিতেই আপনাদের এই সাধের মানবজীবন পার হয়ে যাবে?
মনোবিশ্লেষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের দৃষ্টিতে, গালি মানুষের অবদমিত আক্রমণাত্মক প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ। আর আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, এটি মস্তিষ্কের আবেগপ্রবণ অংশের দ্রুত প্রতিক্রিয়া, যা যুক্তিবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণকে সাময়িকভাবে গ্রাস করে ফেলে।
এই গালি কি কোনোমতেই রাজনীতির ভাষা হতে পারে?
এক কথায় উত্তর হলো, না -গালি সুস্থ রাজনীতির ভাষা হতে পারে না।
রাজনীতিতে তীব্র সমালোচনা, ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ বা কঠোর ভাষা ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু গালি যুক্তিকে দুর্বল করে, আলোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণে নামিয়ে আনে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও সংঘাতমুখী করে তোলে। যখন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীরা গালিকে স্বাভাবিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন সেই সংস্কৃতি সমাজের অন্য স্তরেও ছড়িয়ে পড়ে -সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষাঙ্গন, এমনকি পারিবারিক আলোচনাতেও।
আধুনিককালের ইতিহাসের নানা সময়ে এবং বিভিন্ন দেশে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশে গালি ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু কোনো কিছুর প্রচলন তাকে গ্রহণযোগ্য করে না। গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে অপমান করার মধ্যে নয়; বরং তথ্য, যুক্তি, নীতি ও জনসমর্থনের মাধ্যমে তাকে পরাজিত করার মধ্যে।
তাই গালি রাজনীতির বাস্তবতায় দেখা গেলেও, সেটিকে রাজনীতির আদর্শ ভাষা বা গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলা যায় না। একটি পরিণত গণতন্ত্রে কঠোর ভাষা থাকতে পারে, কিন্তু গালির জায়গা থাকা উচিত নয়।
বর্তমানের সময়ের প্রেক্ষিতে এই আলোচনাটা জরুরি। কারণ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রণাঙ্গনে বিজয়ী ও পরাজিত বিবদমান দুই গ্রুপের পরিস্থিতি সবাই জানেন এবং বুঝেন। এসব উল্লেখ করে আমার টাইমলাইনে গালিবাজির ধকল টেনে আনতে চাই না।
প্রার্থনা করি আমরা সবাই যেন স্বাভাবিক মনুষ্যত্বটুকু অর্জন করি। সকল বিকৃতি ও মানসিক বিকারের মূলোৎপাটন করে সবার সুন্দর সহাবস্থানে হাতধরাধরি করে ভালো থাকি।
লেখক: সাংবাদিক
৩ জুলাই ২০২৬
49
View