🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️

রহস্যময় লঞ্চ দুর্ঘটনা
বরিশালের ছোট্ট গ্রাম খড়মপুর। নদীর কূলে বাঁশের তৈরি ছোট ছোট ঘরগুলো যেন প্রকৃতির সাথে মিশে একাকার হয়ে আছে। সকালবেলায় সূর্যের প্রথম আলো যখন নদীর পানিতে পড়ে সোনালি ঝিলিক তুলত, তখন রাহিমা তার বাঁশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসত। তার বয়স সতেরো। লম্বা কালো চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমেছে, চোখ দুটো সরল ও গভীর, আর ঠোঁটে সবসময় একটা নরম হাসি লেগে থাকত। গ্রামের মানুষজন তাকে দেখে বলত, “রাহিমা যেন নদীর মতোই শান্ত, কিন্তু ভিতরে ঝড় লুকিয়ে আছে।”
মা মারা গেছে তিন বছর আগে। জ্বরে ভুগে অকালে চলে গিয়েছিলেন। সেই দিনগুলোর কথা রাহিমা এখনো ভুলতে পারেনি। মা’র শেষ সময়ে সে ঘরের কোণায় বসে কাঁদছিল, আর মা তার হাত ধরে ফিসফিস করে বলেছিলেন, “মা, তোর ভাইটাকে দেখিস। বাবাকে সাহায্য করিস।” সেই কথা রাহিমার বুকে গেঁথে আছে। বাবা আব্দুল মজিদ একা হাতে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন। দিনে নদীতে মাছ ধরেন, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বসেন। বাবার হাতে কড়া পড়া, চোখে অবসাদ, কিন্তু মেয়ের জন্য সবসময় একটা আলাদা নরমতা।
ছোট ভাই রিয়াজ, বয়স মাত্র আট। সারাদিন আপুর পিছু পিছু ঘুরে। রাহিমা তাকে স্কুলে নিয়ে যায়, গল্প শোনায়, খাবার খাইয়ে দেয়। সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বুড়ো বটগাছের নিচে বসে রাহিমা রিয়াজকে রূপকথা বলত—রাজপুত্তুর, পরীর গল্প, আর মেঘনা নদীর আত্মাদের কথা। গ্রামের মেয়েরা বলত, “রাহিমা যেন মায়ের ছায়া।” রাহিমা নিজেও স্বপ্ন দেখত। একদিন শহরে গিয়ে পড়াশোনা করবে, চাকরি করবে, বাবা আর ভাইকে নিয়ে সুখের সংসার গড়বে। কিন্তু অভাবের সংসারে স্বপ্নগুলো প্রায়ই ভেসে যেত নদীর স্রোতে।
এবার সব বদলে যাবে। চাচা ঢাকায় একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে তার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। প্রথমবারের মতো সে একা শহরে যাচ্ছে। বাবা অনেকদিন আপত্তি করেছিলেন। “মা, শহর খুব খারাপ। মেয়ে একা যাবে কী করে?” কিন্তু অভাবের সংসারে এই সুযোগ ফেলে দেওয়া যায় না। রাহিমা নিজেও ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে সাহস সঞ্চয় করেছিল।
বিদায়ের দিন সকালে রাহিমা ঘরের উঠোনে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছিল। নদীর পাড়ে বুড়ো বটগাছটা, যেখানে সে ছোটবেলায় রিয়াজকে কোলে নিয়ে গল্প বলত। গ্রামের মেয়েরা এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। “সাবধানে যাস রাহিমা। শহর খুব খারাপ জায়গা। লোভী মানুষ আর অন্ধকার রাস্তা।” কেউ কেউ তার হাতে লাল ফিতা বেঁধে দিল, “এটা পরে রাখিস, দুষ্টু আত্মা দূরে থাকবে।” রিয়াজ তার ছোট হাতে আপুর শাড়ির আঁচল ধরে টানছিল, “আপু যাবি না! আমি একা কী করব?” রাহিমা তার চোখ মুছে বলল, “ভাই, আমি তোকে ঢাকা থেকে লাল গাড়ি এনে দেব। কথা দিলাম।”
বিকেলে তারা তিনজন সদরঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। নৌকা করে নদী পার হয়ে বাসে উঠল। যাত্রাপথে বাবা অনেক গল্প বললেন—তাঁর যৌবনের নদী ভ্রমণের কথা, মা’র সাথে প্রথম দেখার কথা। রিয়াজ উত্তেজিত হয়ে জানালায় মুখ লাগিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। সদরঘাটে পৌঁছাতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল। চারপাশে প্রচণ্ড ভিড়। লোকজন হাঁকডাক করছে, লঞ্চের হর্ন বাজছে, চা-বিস্কুটের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে। নদীর পানিতে আলোর প্রতিফলন নাচছে। রাহিমার বুক কাঁপছিল। তার হাত ঘামছে। সে বাবার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল।
“বাবা, আমি একা যাব কীভাবে? ঢাকায় কেউ চিনি না।” তার গলা ভেঙে গেল।
বাবা চোখ মুছলেন। গলা কাঁপিয়ে বললেন, “মা, ভয় পাস না। লঞ্চ নিরাপদ। আমি তোদের সাথে উঠে দিয়ে আসব। রিয়াজকে নিয়ে ফিরে যাব।” রিয়াজ লাফাচ্ছিল, “আপু, ঢাকায় গিয়ে আমার জন্য একটা বড় খেলনা গাড়ি আনবি কিন্তু! লাল রঙের! আর চকলেট!”
লঞ্চের নাম এমভি মিরাজ-৪। পুরনো, কাঠের তৈরি, দুই তলা। নিচের ডেকে গাদাগাদি যাত্রী, উপরের ডেকে কয়েকটা ছোট কেবিন। বাবা তিনজনের টিকিট কেটে তাদের নিয়ে উঠলেন। লঞ্চ ছেড়ে দিল। বুড়িগঙ্গার কালো পানি কেটে এগিয়ে চলল। রাহিমা জানালার ধারে বসে বাইরে তাকিয়ে রইল। নদীর দু’পাশে আলোর ঝলকানি, মাছ ধরার নৌকা ভেসে যাচ্ছে, দূরে গ্রামের আলো জ্বলছে। রিয়াজ সবকিছু দেখে অবাক হয়ে প্রশ্ন করছিল—“ওটা কী আপু? ওই নৌকায় আলো কেন জ্বলছে? ওই লোকটা কী করছে?” বাবা চুপচাপ বসে আছেন, মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।
রাহিমা লঞ্চের যাত্রীদের সাথে কথা বলতে শুরু করল। একজন বয়স্ক যাত্রী বললেন, “মা, মেঘনা নদী খুব খারাপ। এখানে অনেক লঞ্চ ডুবেছে। আমি নিজে দেখেছি।” আরেকজন মহিলা ফিসফিস করে বললেন, “শোনো, রাতে যদি কোনো অচেনা মহিলা তোমার কাছে আসে, কথা বলো না। ওরা আত্মা।” রাহিমা হাসল, কিন্তু ভিতরে একটা অস্বস্তি হলো। রাত বাড়তে লাগল। লঞ্চ মেঘনায় পড়ল। আকাশ মেঘলা হয়ে এসেছে। হালকা ঝড়ো হাওয়া বইছে। অনেক যাত্রী ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ কেউ গল্প করছে, কেউ গান গাইছে। রাহিমা ঘুমাতে পারছিল না। তার মনে পুরনো গল্পগুলো ঘুরছিল—গ্রামের বুড়িরা যেসব লঞ্চডুবির কথা বলত। মেঘনা নদীর নিচে নাকি অসংখ্য আত্মা আছে, যারা নতুন যাত্রীদের টেনে নেয়। সে নিজেকে বোঝাল, “এসব শুধু গল্প।”
হঠাৎ লঞ্চটা একটু ঝাঁকি খেল। আলো কমে গেল। জেনারেটর সমস্যা বলে ঘোষণা হলো। অন্ধকারে শুধু টর্চ আর মোবাইলের আলো। রাহিমা পানি খেতে উঠল। ডেকের এক কোণায় এক বৃদ্ধা বসে আছে। তার চোখ অদ্ভুতভাবে জ্বলছে। শাড়িটা পুরনো, শরীর রোগা। “মা, এই লঞ্চে আগেও অনেক দুর্ঘটনা হয়েছে। মেঘনা কখনো তার ঋণ ভোলে না,” বৃদ্ধা ফিসফিস করে বলল। “যারা বেঁচে ফিরেছে, তারা আর স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেনি। তারা সবসময় পানির ডাক শোনে।” রাহিমা শিউরে উঠে দ্রুত ফিরে এল।
রিয়াজ ঘুমিয়ে পড়েছে। বাবা চিন্তিত মুখে বাইরে তাকিয়ে আছেন। মাঝরাতে লঞ্চ আবার জোরে কেঁপে উঠল। পানি নিচ থেকে ঢুকতে শুরু করেছে। প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি। তারপর চিৎকার শুরু হলো। “লঞ্চ কাত হচ্ছে! সবাই সাবধান! জীবন জ্যাকেট পরো!” যাত্রীরা হুড়োহুড়ি শুরু করল। লাইফ জ্যাকেটের সংখ্যা খুব কম। কেউ কেউ ধাক্কাধাক্কি করে একে অপরকে ফেলে দিচ্ছে। রাহিমা রিয়াজকে জাগিয়ে তুলল। “ভাই, উঠ! আমরা বেরিয়ে যাব!” বাবা তাদের হাত ধরে ডেকের দিকে ছুটলেন। লঞ্চ দ্রুত কাত হয়ে যাচ্ছে। যাত্রীরা একে অপরের উপর পড়ছে। মহিলারা কাঁদছে, শিশুরা চিৎকার করছে। পানি হাঁটু পর্যন্ত উঠে গেছে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে, বাতাস প্রবল।
রাহিমা রিয়াজকে একটা কাঠের টুকরো ধরিয়ে দিয়ে বলল, “শক্ত করে ধর! আমি তোকে ছাড়ব না কখনো!” স্রোত প্রবল। লঞ্চ পুরোপুরি উল্টে গেল। বিশাল ঢেউ তাদের আলাদা করে দিল। রাহিমা চিৎকার করল, “রিয়াজ! রিয়াজ!” সে সাঁতার কেটে ভাইয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করল। রিয়াজের ছোট হাত পানির উপর ভাসছে। “আপু... আমাকে বাঁচাও!” তার গলা ভেঙে যাচ্ছে, চোখে অসীম ভয়। রাহিমা হাত বাড়াল, কিন্তু একটা বড় ঢেউ তাকে সরিয়ে দিল। রিয়াজের মাথা পানির নিচে চলে গেল। সে আর উঠল না।
রাহিমা কেঁদে উঠল। “নাাাা! ভাই আমার!” পানি তার মুখে ঢুকে যাচ্ছে। সে হাঁপাচ্ছে, শরীর ঠান্ডায় অবশ হয়ে আসছে। বাবাকে খুঁজছিল। দূরে বাবার গলা শুনল, “রাহিমা! সাঁতার কাট মা! ভয় পাস না!” কিন্তু পরক্ষণে একটা ভারী কাঠের টুকরো বাবার উপর পড়ল। তার চিৎকার থেমে গেল চিরতরে। রাহিমা একা। ঠান্ডা পানিতে ভাসছে। চারপাশে চিৎকার, কান্না, ডুবে যাওয়া মানুষের গোঙানি। হঠাৎ সে অনুভব করল—কেউ তার হাত ধরেছে। সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখে অসীম কষ্ট ও শূন্যতা। “আমার সাথে আয় মা। তোকে বাঁচাব। এই নদী অনেককে নিয়েছে, কিন্তু তোকে নেবে না আজ।”
রাহিমা আর লড়তে পারল না। অজ্ঞান হয়ে গেল।
সকালে উদ্ধারকারীরা তাকে তীরে পেল। চারপাশে মৃতদেহের সারি। রিয়াজ আর বাবার লাশ উদ্ধার হয়েছে। রাহিমা একা বেঁচে গেল। তার শরীরে আঁচড়, মাথায় চোট। কিন্তু সবচেয়ে বড় চোট তার মনে। ঢাকায় চাচার বাসায় সে থাকল। প্রথম কয়েকদিন সে কথা বলত না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত। রাতে ঘুমায় না। প্রতি রাতে স্বপ্নে রিয়াজ ডাকে, “আপু, আমাকে বাঁচাও। পানির নিচে খুব ঠান্ডা।” বাবা বলে, “মা, তুই কেন বেঁচে গেলি? আমরা তো তোর জন্যই ছিলাম।” সে চিৎকার করে ঘুম থেকে উঠে বসে। চাচা-চাচি চিন্তায় পড়লেন। ডাক্তার দেখানো হলো, কিন্তু কোনো ওষুধ কাজ করত না।
বছর কয়েক পর রাহিমা লিখতে শুরু করল। তার বই প্রকাশিত হলো—“মেঘনার আত্মা”। বইয়ে সে সেই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত লিখেছে—রিয়াজের হাসি, বাবার চোখের অসহায়তা, পানির নিচের ঠান্ডা স্পর্শ, সেই সাদা শাড়ির মহিলার ফিসফিস। বইটি জনপ্রিয় হলো। অনেকে পড়ে কেঁদেছে। কিন্তু এক রাতে তার ঘরে সেই লাল ফিতা পড়ে আছে, যেটা রিয়াজের মাথায় বাঁধা ছিল। জানালার বাইরে নদীর দিক থেকে অনেক ছায়া আসছে। তারা ফিসফিস করে ডাকছে। রাহিমা বুঝতে পারল, সে আর কখনো একা নয়।
রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। অফিসিয়াল রিপোর্ট বলে যান্ত্রিক ত্রুটি আর খারাপ আবহাওয়া। কিন্তু যারা বেঁচে ফিরেছে, তারা জানে—মেঘনার পানির নিচে শত শত আত্মা অপেক্ষা করছে। তারা নতুন যাত্রীদের টেনে নেয়। রাহিমা এখন তাদেরই একজন। প্রতি পূর্ণিমায় সে শুনতে পায় রিয়াজের কণ্ঠ। “আপু... আমরা এখানে একা... তুমিও আয়...”
লঞ্চ ডোবার বাস্তবতা ও কারণসমূহ
বাংলাদেশে লঞ্চ দুর্ঘটনা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। মেঘনা, পদ্মা, যমুনাসহ বড় নদীগুলোতে প্রতি বছর শত শত মানুষ লঞ্চডুবিতে প্রাণ হারায়। এর প্রধান কারণগুলো নিম্নরূপ:
১. অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই: লঞ্চগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী তোলা হয়। ঈদ, পূজা বা অন্যান্য উৎসবে এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়।
২. পুরনো ও অরক্ষিত লঞ্চ: অনেক লঞ্চ ২০-৩০ বছরের পুরনো। ইঞ্জিন, হাল, কাঠামো সবই দুর্বল। লাইফ জ্যাকেট ও লাইফবোটের সংখ্যা অপর্যাপ্ত।
৩. খারাপ আবহাওয়া ও ঝড়: বর্ষাকালে হঠাৎ ঝড়, বৃষ্টি ও প্রবল স্রোতে লঞ্চ উল্টে যায়।
৪. অদক্ষ চালক ও অব্যবস্থাপনা: অনেক চালকের লাইসেন্স নেই বা অভিজ্ঞতা কম। রাতের বেলায় চলাচলের সময় সতর্কতা কম থাকে।
৫. দুর্নীতি ও তদারকির অভাব: বিআইডব্লিউটিএ-এর তদারকি দুর্বল। লঞ্চ মালিকরা টাকা দিয়ে অনিয়ম চালিয়ে যান।
এসব দুর্ঘটনা এড়াতে সরকারি তদারকি বাড়ানো, আধুনিক লঞ্চ ব্যবহার, যাত্রী সচেতনতা এবং আবহাওয়া পূর্বাভাসের উন্নতি জরুরি। গল্পের মতো আত্মার টান নয়, বাস্তবে এগুলো মানুষের অবহেলা ও লোভের ফল। যারা নদীপথে ভ্রমণ করেন, তাদের সতর্ক থাকতে হবে। নদী কখনো তার ঋণ ভোলে না—এটা শুধু গল্প নয়, বাস্তবতাও।