কারবালার খন্ড় গল্প
কারবালার প্রান্তরে তখন জোহরের রক্তিম সূর্য মাথার ওপর। চারদিকে তপ্ত বালুকারাশি, আর ফোরাত নদীর পানির কলকল ধ্বনি দূর থেকে শোনা গেলেও ইমাম শিবিরের জন্য তা ছিল নিষিদ্ধ।
তৃষ্ণার্ত আলী আসগর ও এক ফোঁটা পানির হাহাকার
রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) তখন একে একে তাঁর ভাই, সন্তান, ভাতিজা এবং বিশ্বস্ত সঙ্গীদের হারিয়ে একাকী দাঁড়িয়ে আছেন। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় যেন কারবালার বিষাদ ছড়িয়ে পড়ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বিবি রুবাবের (ইমাম হোসেনের স্ত্রী) তাঁবু থেকে একটি ক্ষীণ, দুর্বল কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। ইমাম হোসেন (রাঃ) তাঁবুর ভেতরে প্রবেশ করে দেখলেন, তাঁর ৬ মাসের ফুটফুটে শিশু সন্তান আলী আসগর তৃষ্ণায় ছটফট করছে। তিন দিন ধরে ফোরাতের এক ফোঁটা পানিও পৌঁছায়নি এই তাঁবুতে। ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মায়ের বুকেও দুধ নেই। পানির অভাবে শিশুটির ঠোঁট দুটি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, গলার আওয়াজ বুজে এসেছে।
বিবি রুবাব অশ্রুসজল চোখে ইমামের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"হে আল্লাহর রাসূলের দৌহিত্র, বড়দের অপরাধ যাই হোক, এই নিষ্পাপ শিশু তো কোনো যুদ্ধ বোঝে না। আপনি ওকে শত্রু শিবিরের সামনে নিয়ে যান। হয়তো ওর এই শুকনো মুখ আর অবুঝ কান্না দেখে ওদের পাথরের মতো হৃদয়ে দয়া জাগবে। ওরা ওকে এক ফোঁটা পানি দিলেও দিতে পারে।"
ইমাম হোসেন (রাঃ) আলী আসগরকে নিজের চাদরের নিচে লুকিয়ে উমরের ইবনে সা’দের বিশাল ইয়াজিদ বাহিনীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। শত্রুরা ভাবল, ইমাম হয়তো নিজের কোনো শেষ অস্ত্র নিয়ে এসেছেন।
কিন্তু ইমাম হোসেন (রাঃ) যখন চাদরটি সরালেন, তখন কুফার নির্মম সৈন্যরা দেখতে পেল এক দেবদূতের মতো শিশুকে, যার চোখ দুটি তৃষ্ণায় আধবোজা। ইমাম হোসেন উচ্চকণ্ঠে বললেন:
"হে কুফাবাসী! তোমাদের সাথে আমার বিরোধ, আমার রক্ত তোমরা চাও। কিন্তু এই ৬ মাসের শিশুটির অপরাধ কী? সে তো তোমাদের বিরুদ্ধে তরবারি ধরেনি। যদি তোমরা আমাকে পানি দিতে অস্বীকার করো, তবে অন্তত এই নিষ্পাপ শিশুটিকে কয়েক ফোঁটা পানি দাও। দেখো, তৃষ্ণায় ও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।"
ইমামের এই আকুল আবেদনে ইয়াজিদ বাহিনীর সাধারণ সৈন্যদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। অনেকের চোখেই পানি চলে এলো। কেউ কেউ বলতে লাগল, "একটি শিশুর সাথে এমন নির্মমতা কীভাবে সম্ভব?"
সৈন্যদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখে কুখ্যাত সেনাপতি ওমর ইবনে সা’দ ভয় পেয়ে গেল। সে তার সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং লক্ষ্যভেদী তীরন্দাজ হারমালা ইবনে কাহিল-কে ডেকে বলল, "হোসেনের কথা বন্ধ করো। ওর কথার জাদু সৈন্যদের দুর্বল করে দিচ্ছে। ওই শিশুর ফয়সালা করো।"
হারমালা এক গহীন অন্ধকার হৃদয়ের মানুষ ছিল। সে তার ধনুকে তিন ফলার একটি বিষাক্ত, ভারী তীর যুক্ত করল, যা সাধারণত বুনো উট বা হাতি শিকারের জন্য ব্যবহৃত হতো।
ইমাম হোসেন (রাঃ) তখনও শিশুটিকে হাতের ওপর নিয়ে পানির অপেক্ষা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে হারমালার ধনুক থেকে তীরটি তীব্র গতিতে ছুটে এলো।
তীরটি এসে সরাসরি বিদ্ধ হলো ৬ মাসের শিশু আলী আসগরের ছোট্ট নরম গলায়। তীরটি এতই বিশাল ও শক্তিশালী ছিল যে, তা শিশুর গলা ভেদ করে ইমাম হোসেনের নিজের বাহুতে গিয়ে বিঁধল।
আলী আসগর কাঁদেনি। কেবল একটি তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে বাবার হাতের ওপর ডানা কাটা পাখির মতো ছটফট করে উঠল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় শেষ হাসি, আর চিরতরে শান্ত হয়ে গেল সে।
ইমাম হোসেন (রাঃ) স্তব্ধ হয়ে গেলেন। নিষ্পাপ শিশুর গরম রক্তে তাঁর হাত ভিজে গেল। তিনি সেই রক্ত অঞ্জলি ভরে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিতে চাইলেন, কিন্তু পরক্ষণেই এক অদৃশ্য বাণী যেন তাঁকে থামিয়ে দিল—"যদি এই নিষ্পাপ শিশুর রক্ত মাটিতে পড়ে, তবে কিয়ামত পর্যন্ত এই মাটি আর কোনো ফসল ফলাবে না।"
ইমাম সেই রক্ত নিজের মুখে ও দাড়িতে মাখলেন এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন:
"হে আল্লাহ! এই কুরবানি তুমি কবুল করো। আমার ওপর এই মুসিবত সহ্য করা সহজ, কারণ তুমি তা দেখছ।"
সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল শিশুটির মরদেহ নিয়ে মা বিবি রুবাবের সামনে যাওয়া। ইমাম হোসেন (রাঃ) তাঁবুর দিকে এগোচ্ছিলেন, আবার থমকে যাচ্ছিলেন। যে মা পানির আশায় সন্তানকে পাঠিয়েছিলেন, তাকে এই রক্তাক্ত লাশ কীভাবে দেখাবেন?
অবশেষে তিনি তাঁবুর পেছনে গিয়ে নিজের তরবারি দিয়ে একটি ছোট কবর খনন করলেন। আলী আসগরের ছোট্ট দেহটি সেখানে শুইয়ে দেওয়ার আগে বিবি রুবাবকে ডাকলেন।
সন্তানের এই দশা দেখে মায়ের বুক ফাটানো আর্তনাদে কারবালার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু আহলে বায়তের এই মহিয়সী নারী আল্লাহর ইচ্ছার সামনে মাথা নত করলেন। ইমাম হোসেন (রাঃ) নিজের হাতে তাঁর কলিজার টুকরোকে কারবালার তপ্ত বালুর নিচে দাফন করলেন।