সোনার হরিণ ও এক জীবনের খতিয়ানএক শান্ত দুপুর ও স্কুলের সোনালী দিনগুলোগ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ধরে হেঁটে আসছিল বছর চোদ্দর কিশোর হামিদ। পরনে সাদা শার্ট আর নীল রঙের হাফ প্যান্ট। কাঁধে ঝোলানো চটের ব্যাগ, যার ভেতরে গোটা চারেক বই আর কয়েকটা দোমড়ানো-মোচড়ানো খাতা। তখন আশির দশকের শেষভাগ। হামিদের চোখে তখন একরাশ স্বপ্ন। পড়াশোনায় সে যে খুব একটা খারাপ ছিল, তা নয়। তবে ক্লাসের ফার্স্ট বয় হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও তার কোনোদিন ছিল না। তার মন পড়ে থাকত গ্রামের খোলা মাঠে, বন্ধুদের সাথে নদী সাঁতরে পার হওয়া কিংবা বৈশাখী ঝড়ে আম কুড়ানোর মাঝে।হামিদের বাবা রহমান মিয়া ছিলেন একজন অতি সাধারণ কৃষক। সামান্য কিছু জমিজমা চাষবাস করে কোনোমতে চারজনের সংসার টেনে নিতেন। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সেই সংসারে হামিদ ছিল বড় সন্তান। তাই রহমান মিয়া সবসময় হামিদকে বলতেন, "বাবা রে, মন দিয়ে পড়ালেখা কর। চাকরি-বাকরি না করলে এই চাষার জীবনে কিন্তু সুখ নাই।" হামিদ মাথা নাড়ত, কিন্তু মনে মনে সে অন্য কিছু ভাবত। তার স্কুলেরই এক বন্ধু, মজিদের বড় ভাই বছর দুয়েক আগে কুয়েত গিয়েছেন। কিছুদিন পর পরই মজিদদের বাড়িতে রঙিন খাম আসত, আর সেই খামের ভেতরে থাকত বিদেশের চকচকে টাকা। মজিদ স্কুলে এসে নতুন জাঁকজমকপূর্ণ কলম, দামি ঘড়ি দেখাত। পুরো গ্রামে মজিদদের পরিবার রাতারাতি 'বড়লোক' বনে গেল। মাটির ঘর ভেঙে সেখানে ইটের দেয়াল উঠল।কিশোর হামিদের কাঁচা মনে সেই দিনই প্রথম 'বিদেশ' শব্দটা একটা জাদুকরী মন্ত্রের মতো গেঁথে গিয়েছিল। সে ভাবত, পড়ালেখা করে পনেরো-কোটি মানুষের এই দেশে একটা ভাঙাচোরা কেরানির চাকরি পাওয়ার জন্য এত যুদ্ধ করার কী দরকার? তার চেয়ে বিদেশ গেলেই তো জীবনটা এক লহমায় বদলে যায়। স্কুল জীবনের শেষ দিনগুলোতে যখন শিক্ষকেরা সবাইকে জিজ্ঞেস করতেন, "ভবিষ্যতে কে কী হতে চাও?" কেউ বলত ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা শিক্ষক। হামিদ মনে মনে বলত, "আমি বিদেশ যাব।" এই চিন্তাটাই তার ভেতরে এক ধরনের অলসতা আর উদাসীনতার জন্ম দিতে শুরু করেছিল।যৌবনের প্রারম্ভ এবং প্রথম হাতছানিএসএসসি পরীক্ষা কোনোমতে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করল হামিদ। রহমান মিয়া চাইলেন ছেলেকে শহরের কলেজে ভর্তি করাতে। কিন্তু হামিদের মন তখন বিষিয়ে উঠেছে। পড়াশোনার প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তার সমবয়সী অনেকেই তখন বাবার সাথে মাঠে কাজ করছে, কিংবা শহরের কোনো দোকানে শিক্ষানবিস হিসেবে ঢুকছে। হামিদের সামনেও বেশ কয়েকবার ভালো ভালো সুযোগ এসেছিল। গ্রামেরই এক কাকা, যিনি ঢাকা শহরে একটা কাপড়ের পাইকারি ব্যবসা করতেন, তিনি হামিদকে ডেকে বলেছিলেন, "হামিদ, তুই আমার সাথে ঢাকায় চল। ব্যবসাটা শিখবি, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবি।"হামিদ সেদিন কাকার প্রস্তাব হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল। মনে মনে ভেবেছিল, "কাকার দোকানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খাটব সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য? তার চেয়ে বিদেশ যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করলেই তো এক মাসেই কাকার পুরো বছরের আয়ের সমান টাকা কামানো সম্ভব।" যখনই কোনো কাজের সুযোগ আসত, তখনই হামিদের মাথায় ওই একই চিন্তা চাড়া দিয়ে উঠত—"আমি তো বিদেশ চলেই যাব, তবে এই ছোটখাটো কাজ করে সময় নষ্ট করার কী দরকার?"এইভাবে দেখতে দেখতে হামিদের বয়স বিশের কোঠায় পৌঁছাল। তার শরীর তখন টগবগ করছে যৌবনের শক্তিতে। কিন্তু সেই শক্তির কোনো সঠিক ব্যবহার হচ্ছিল না। সে কেবল চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিত আর শুনত কার ভাই ওমানে গেছে, কার মামা মালয়েশিয়া গিয়ে গাড়ি কিনেছে। এই সময় গ্রামে আগমন ঘটল লতিফ দালালের। লতিফ ছিল পাশের গ্রামের লোক, কিন্তু তার পরনে থাকত চকচকে শার্ট, চোখে কালো চশমা, আর হাতে দামি মোবাইল ফোন (যা তখন কেবল ধনীদের হাতেই দেখা যেত)। লতিফ গ্রামে এসে প্রচার করতে শুরু করল, সে খুব কম খরচে এবং নিশ্চিত গ্যারান্টিতে মানুষকে 'সোনার দেশ' সৌদি আরব এবং লিবিয়ায় পাঠাতে পারে।হামিদ লতিফের পাতা ফাঁদে পা দিতে এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে লতিফের সাথে দেখা করল। লতিফ হামিদের পিঠ চাপড়ে বলল, "হামিদ ভাই, তোমার মতো জোয়ান পোলারা এই দেশে পইড়া থাইকা জীবনটা নষ্ট করতেছ। আমারে মাত্র তিন লাখ টাকা দাও, তিন মাসের মাথায় তোমারে রিয়াদের বড় কোম্পানিতে ড্রাইভারির চাকরি দিয়া পাঠায় দিমু। মাসে লাখ টাকা বেতন।"পাসপোর্টের পেছনে ছোটা ও জমানো টাকার শ্রাদ্ধতিন লাখ টাকা! হামিদের বাবার পক্ষে এই টাকা জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। কিন্তু হামিদের মাথায় তখন বিদেশের ভূত চেপে বসেছে। সে বাড়িতে এসে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিল। মায়ের আঁচল ধরে কান্নাকাটি শুরু করল, "মা, তোমরা যদি এখন এই টাকাটা না দাও, তবে আমি কোনোদিন জীবনে কিছু করতে পারব না। বিদেশ গিয়া প্রথম তিন মাসেই আমি এই টাকা সুদে-আসলে ফেরত পাঠামু।"ছেলের মুখের দিকে চেয়ে মা রহিমা খাতুন চোখের জল মুছলেন। তিনি রহমান মিয়াকে রাজি করালেন। রহমান মিয়া বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাদের শেষ সম্বল, বসতভিটার পেছনের তিন বিঘা চাষের জমি বিক্রি করে দিলেন। যে জমি থেকে প্রতি বছর ঘরে ধান আসত, সেই জমি চলে গেল অন্যের হাতে। বিক্রি করা টাকা আর মায়ের সামান্য কিছু গয়না বন্ধক রেখে তিন লাখ টাকা তুলে দেওয়া হলো লতিফ দালালের হাতে।টাকা পেয়ে লতিফ বলল, "ঠিক আছে হামিদ, তোমার পাসপোর্টটা জমা দাও। আর তিন মাস অপেক্ষা কর।"শুরু হলো হামিদের অপেক্ষার পালা। প্রথম তিন মাস কেটে গেল দেখতে দেখতে। হামিদ রোজ সকালে উঠে নতুন জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াত আর ভাবত, আর কয়েকটা দিন পর সে প্লেনে উঠবে। কিন্তু তিন মাস পার হওয়ার পর যখন সে লতিফের কাছে গেল, লতিফ গম্ভীর মুখে বলল, "হামিদ ভাই, ভিসার একটু সমস্যা হইছে। আরবের শেখদের আইনের পরিবর্তন হইছে। তোমার ফাইলটা একটু আটকে গেছে। আর পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগবে, এম্বাসির বড় সাহেবকে ঘুষ দিতে হবে।"হামিদ আবার বাড়ি ফিরে এল। টাকা নেই, তাই সে মায়ের জমানো শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করার জন্য চাপ দিল। বিদেশ যাওয়ার তীব্র নেশায় সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে ভাবেনি যে এই পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগাড় করতে তার বাবার কপালে কতটা চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল। টাকা লতিফকে দেওয়া হলো। এইভাবে একে একে এক বছর, দুই বছর, পাঁচ বছর কেটে গেল। লতিফ আজ বলে সামনের মাসে ফ্লাইট, কাল বলে আগামী সপ্তাহে মেডিকেল টেস্ট। প্রতিবারই নতুন নতুন অজুহাত, আর প্রতিবারই কিছু না কিছু টাকার দাবি।ইতোমধ্যে হামিদের সমবয়সী বন্ধুরা যারা দেশে থেকে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছিল, তারা আস্তে আস্তে উন্নতি করতে লাগল। মজিদ একটা ছোট মুদির দোকান দিয়েছিল, পাঁচ বছরে সেটা একটা বড় মুদি মলে পরিণত হলো। গ্রামের অন্য এক ছেলে লেদ মেশিনের কাজ শিখে নিজের একটা ওয়ার্কশপ দিয়ে ফেলল। তারা সবাই বিয়ে করল, সংসার গোছাল, নিজেদের পায়ে দাঁড়াল। আর হামিদ? হামিদ তখনো লতিফ দালালের পেছনে পেছনে ঘুরছে। ঢাকা এম্বাসি, গুলশানের অফিস আর দালালদের ডেরায় ঘুরতে ঘুরতে হামিদের পায়ের জুতো ক্ষয়ে গেল। যখনই কেউ তাকে বলত, "হামিদ, তুই দেশে কিছু একটা কর।" হামিদ রেগে গিয়ে বলত, "তোরা বুঝবি না। আমার ভিসা প্রসেসিংয়ে আছে। আজ না হয় কাল আমি উড়াল দিমু। তোদের এই ছোটখাটো ব্যবসা কইরা আমার পোষাবে না।"মধ্যবয়সের হাহাকার ও হারিয়ে যাওয়া সময়দেখতে দেখতে ক্যালেন্ডারের পাতা উলটে গেল। বিশ বছরের সেই টগবগে যুবক হামিদ এখন পঁয়তাল্লিশ বছরের এক মধ্যবয়সী প্রৌঢ়। তার চুলের দু-পাশে পাক ধরেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির কালো দাগ। বাবা রহমান মিয়া বহু বছর আগেই ছেলের এই বিদেশ যাওয়ার দুশ্চিন্তা আর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মারা গেছেন। মা-ও শয্যাশায়ী। হামিদের আর বিয়ে করা হয়নি। কোন মুখে সে বিয়ে করবে? নিজের বলতে তো তার কোনো পরিচয় নেই। সে না প্রবাসী, না দেশের কোনো সফল নাগরিক।লতিফ দালাল এখন আর গ্রামে থাকে না। সে শহরে বড় অফিস নিয়েছে। হামিদের মতো শত শত যুবকের টাকা আত্মসাৎ করে সে এখন কোটিপতি। হামিদ যখনই লতিফের অফিসে যেত, লতিফের কর্মচারীরা তাকে তাড়িয়ে দিত। মাঝে মাঝে লতিফের দেখা মিললে সে বলত, "হামিদ ভাই, তোমার বয়সটা একটু বেশি হয়ে গেছে তো, তাই ইমিগ্রেশনে সমস্যা হচ্ছে। তবে চিন্তা করো না, এবার রোমানিয়া বা পোল্যান্ডের দিকে চেষ্টা করছি। একটু সময় লাগবে।"একদিন হামিদ লতিফের অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। সে লতিফের পা জড়িয়ে ধরে বলল, "লতিফ ভাই, আমার আর বিদেশ যাওয়ার দরকার নাই। আমার বয়স শেষ। আমার টাকাটা আমায় ফেরত দিয়া দাও। আমি এই দেশে একটা ছোট দোকান দিয়া বাকি জীবনটা কাটাইয়া দিই।"লতিফ একটা কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল, "টাকা কি পকেটে থাকে নাকি হামিদ ভাই? তোমার টাকা তো এম্বাসির ফাইলে জমা পইড়া আছে। ফাইল ক্যানসেল করলে এক টাকাও ফেরত পাবা না। তার চেয়ে লাইনে থাকো, সুযোগ আইলে পাঠায় দিমু।"হামিদ সেদিন শূন্য হাতে, ভাঙা মন নিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছিল। গ্রামের বাজারে যখন সে হাঁটত, মানুষ তাকে নিয়ে কানাঘুষো করত—"ঐ দেখ, বিদেশের দালাল ধরতে ধরতে জীবন শেষ করা হামিদ যায়।" এই কথাগুলো তীরের মতো হামিদের বুকে বিঁধত। সে নিজের ঘরে বসে একা একা অন্ধকার রাতে কাঁদত। সে হিসাব করে দেখল, বিগত পঁচিশ বছরে সে লতিফ দালালকে ধাপে ধাপে প্রায় সাত থেকে আট লাখ টাকা দিয়েছে। আশির দশক বা নব্বইয়ের দশকের সেই আট লাখ টাকার মূল্য আজ কোটি টাকার সমান।সেদিন রাতে হামিদ নিজের ভাঙা ঘরের বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, "আমি কী করলাম নিজের জীবনের সাথে? যখন আমার শরীরে শক্তি ছিল, যখন আমার বুদ্ধি ছিল, তখন যদি আমি এই টাকাটা দিয়ে নিজের দেশে একটা কাপড়ের দোকান বা একটা পোল্ট্রি ফার্ম করতাম, তবে আজ আমি কোথায় থাকতাম! বিদেশের চাইতেও হয়তো বেশি আয় করতে পারতাম। নিজের মা-বাবার সেবা করতে পারতাম, একটা সুন্দর সংসার হতো। সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমি আমার বাস্তব জীবনটাই হারিয়ে ফেললাম। এখন আমার শেষ বয়স, না হলো বিদেশ যাওয়া, আর না হলো নিজের দেশে কোনো ব্যবসা করা। আমি এক জীবন্ত লাশ!"হসপিটালের শয্যা এবং শেষ অঙ্কষাট বছর বয়সে পদার্পণ করল হামিদ। শরীর আর আগের মতো চলে না। লিভারের সমস্যা আর তীব্র ডায়াবেটিসে তার শরীর ভেঙে পড়েছে। দেখভাল করার মতো কেউ নেই। দূর সম্পর্কের এক ভাগ্নে তাকে এসে মাঝে মাঝে একটু খাবার দিয়ে যেত। একদিন রাতে হামিদের তীব্র বুকে ব্যথা শুরু হলো। গ্রামের ডাক্তার এসে বললেন, তাকে অবিলম্বে শহরের বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।টাকা কোথায়? হামিদের কাছে তো একটা কানাকড়িও নেই। ভাগ্নে আর গ্রামের কয়েকজন মিলে চাঁদা তুলে হামিদকে শহরের এক সরকারি হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডে ভর্তি করিয়ে দিল। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে শুয়ে হামিদ সিলিং ফ্যানের ঘোরার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। সে ভাবছিল, তার পুরো জীবনটাই যেন ওই ফ্যানটার মতো একই জায়গায় গোল গোল ঘুরে কেটে গেল, কিন্তু কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারল না। তার সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত যৌবন লতিফ দালালের পকেটে চলে গেছে। আজ সে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, অথচ তার চিকিৎসার জন্য একটা টাকাও নেই।ঠিক এমন সময় হাসপাতালের ওই নোংরা, চুনকাম খসে পড়া ওয়ার্ডের দরজায় একটা শোরগোল শোনা গেল। পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে কয়েকজন লোক ভেতরে ঢুকল। হামিদের ভাগ্নে দৌড়ে এসে হামিদের কানের কাছে বলল, "মামা! মামা! চোখ খোল। দেখ কে আইছে!"হামিদ কোনোমতে চোখ মেলে তাকাল। দেখল, হুইলচেয়ারে বসা এক বৃদ্ধ লোক, তার গায়ে কয়েদির পোশাক, হাতে হাতকড়া। লোকটাকে চিনতে হামিদের এক মুহূর্তও সময় লাগল না। সে আর কেউ নয়—লতিফ দালাল! লতিফের চেহারা এখন মলিন, চোখে ভয়ের ছাপ।আসলে আইন তার নিজের গতিতেই চলে। লতিফ দালাল বিগত কয়েক দশক ধরে হাজারো মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছিল। অবশেষে পুলিশ তাকে এক বড় মানব পাচার ও অর্থ পাচারের মামলায় গ্রেপ্তার করেছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, লতিফের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। লতিফ নিজে এখন মরণব্যাধিতে আক্রান্ত, তাই মৃত্যুর আগে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে এবং সাজা কিছুটা কমানোর আশায় সে নিজে এসে পুলিশ কমিশনারের উপস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের তালিকা ধরে টাকা ফেরত দিচ্ছিল।লতিফ দালের সহকারী হামিদের শয্যার পাশে এসে দাঁড়াল। লতিফ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "হামিদ ভাই... আমারে মাফ কইরা দিও। তোমার জীবনের সোনালী সময়গুলা আমি খাইয়া ফেলছি। তোমার এই টাকার অভিশাপেই আজ আমার এই দশা। এই নাও তোমার সাড়ে সাত লাখ টাকা।"পুলিশ অফিসার হামিদের ভাগ্নের হাতে একটা চেক এবং কিছু নগদ টাকার বান্ডিল তুলে দিলেন।হামিদ কাঁপা কাঁপা হাতে টাকার বান্ডিলটা ছুঁয়ে দেখল। চকচকে নতুন নোটের গন্ধ। এই সেই টাকা, যার জন্য সে তার যৌবন বিক্রি করে দিয়েছিল। এই সেই টাকা, যা পাওয়ার জন্য সে তার বাবার জমি বিক্রি করেছিল, মাকে কষ্ট দিয়েছিল। আজ পঁয়ত্রিশ বছর পর টাকাটা তার হাতে ফিরে এসেছে।কিন্তু হামিদ হাসল না। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চরম তৃপ্তির ও করুণার হাসি। সে টাকার বান্ডিলটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, "টাকা... টাকা তো ফিরে আইল রে লতিফ ভাই। কিন্তু আমার হারিয়ে যাওয়া পঁচিশটা বছর কি তুই ফিরায় দিতে পারবি? আমার বাবার সেই আবাদি জমি কি ফিরায় দিতে পারবি? আমার যৌবন, আমার সংসার, আমার মার শেষ বয়সের হাসি... এইগুলা কোন এম্বাসিতে জমা আছে রে লতিফ?"লতিফ দালাল কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে মাথা নিচু করে হুইলচেয়ারে চড়ে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে গেল। গল্পটি কেমন লাগলো লিখে জানাবেন ধন্যবাদ।