দ্বিতীয় পর্ব: অচেনা হাতের লেখা
সারারাত নীলার চোখে ঘুম আসেনি। টেবিলের ওপর রাখা চিঠিটা বারবার হাতে নিয়ে পড়ছিল সে। কাগজে পুরোনো দিনের গন্ধ, আর লেখাগুলো যেন হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা কিছু কথা।
সকালের প্রথম আলো জানালায় পড়তেই নীলা সিদ্ধান্ত নিল—চিঠির রহস্য তাকে জানতেই হবে।
চিঠির নিচে ছোট করে লেখা ছিল একটি ঠিকানা। বহু বছর আগে যে গ্রামের নাম সে ভুলে যেতে চেয়েছিল, সেই নামই আবার তার সামনে ফিরে এসেছে।
দুপুরের বাসে করে নীলা রওনা দিল। পথের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি গাছ যেন তাকে অতীতের কোনো স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছিল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছিল।
গ্রামে পৌঁছে সে দেখল, অনেক কিছু বদলে গেছে। পুরোনো স্কুল নেই, মাঠে এখন নতুন বাড়ি। কিন্তু বিশাল বটগাছটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই।
ঠিকানাটি অনুসরণ করে সে একটি ছোট, নিরিবিলি বাড়ির সামনে পৌঁছাল। দরজায় কড়া নাড়তেই এক বৃদ্ধা দরজা খুললেন।
"তুমি কি নীলা?"—বৃদ্ধার কণ্ঠে বিস্ময়।
নীলা অবাক হয়ে মাথা নাড়ল।
বৃদ্ধা ভেতরে গিয়ে একটি কাঠের বাক্স নিয়ে এলেন। বাক্সটি নীলার হাতে দিয়ে তিনি বললেন, "এটা অনেক বছর ধরে তোমার জন্য রেখে দিয়েছি। যে মানুষটি এটা রেখে গিয়েছিল, সে বলেছিল—একদিন তুমি অবশ্যই আসবে।"
কাঁপা হাতে বাক্সটি খুলতেই নীলা দেখতে পেল পুরোনো কিছু ছবি, শুকিয়ে যাওয়া একটি গোলাপ, আর খামের ভেতরে রাখা আরেকটি চিঠি।
চিঠির ওপর বড় অক্ষরে লেখা—
"এটাই আমার শেষ চিঠি নয়... আসল সত্যটা জানতে হলে আগামী পূর্ণিমার রাতে পুরোনো রেলস্টেশনে এসো।"
চিঠিটি পড়ে নীলার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। এতদিন যে অতীতকে সে শেষ হয়ে গেছে ভেবেছিল, তা যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠল।
বাক্সের এক কোণে রাখা একটি ছবির দিকে তাকিয়ে নীলা হঠাৎ থমকে গেল। ছবিতে সে নিজে ছিল, কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির মুখটি কালো কালি দিয়ে ইচ্ছে করেই মুছে দেওয়া হয়েছে।
কে সেই মানুষ? কেন তার পরিচয় লুকিয়ে রাখা হলো? আর পূর্ণিমার রাতে রেলস্টেশনে কী অপেক্ষা করছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নীলা ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। দূরের আকাশে তখন কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে, যেন আসন্ন ঝড় শুধু প্রকৃতিতেই নয়—তার জীবনেও।
চলবে...