অহংকার মানুষের পতন ডেকে আনে। নদী নামের রূপবতী, উদ্ধত মেয়েটির ক্ষেত্রেও এই চিরন্তন সত্যটি অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল। নদী ছিল অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি (পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) মোস্তফা কামালের একমাত্র সন্তান। অগাধ সম্পদ আর বাবার ক্ষমতার দাপটে নদী মানুষকে মানুষ বলেই গণ্য করত না। তার কাছে গরিব-দুঃখীরা ছিল রাস্তার আবর্জনার মতো। উঠতে-বসতে সে সবাইকে অপমান করত, কাজের মানুষদের গায়ে হাত তুলত। তার এই অতিরিক্ত জিদ আর অহংকারে মোস্তফা কামাল এবং তার স্ত্রী মনে মনে চরম অশান্তিতে ভুগতেন। মেয়েকে বোঝানোর সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল।অন্যদিকে মোস্তফা কামালের পরম বন্ধু ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আমজাদ হোসেন। তার ছেলে আকাশ ছিল বাংলাদেশ পুলিশের একজন অত্যন্ত সৎ, সাহসী ও দেশপ্রেমিক এএসপি (সহকারী পুলিশ সুপার)। নদীকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং তার অহংকার চূর্ণ করে একটি সুস্থ জীবন দেওয়ার জন্য দুই বন্ধু মিলে একটি গোপন মহানাটক সাজানোর পরিকল্পনা করলেন।পরিকল্পনা অনুযায়ী, আকাশকে সাজানো হলো এক বকাটে, অশিক্ষিত সিএনজি চালক। একদিন নদী যখন তার দামি গাড়ি নিয়ে বের হলো, তখন সাজানো এক ঘটনার মাধ্যমে আকাশের সিএনজির সাথে তার গাড়ির সামান্য ধাক্কা লাগল। নদী গাড়ি থেকে নেমে আকাশকে চরম অপমান করল এবং থাপ্পড় মারতে গেল। ঠিক তখনই সেখানে হাজির হলেন নদীর বাবা মোস্তফা কামাল। তিনি পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী চরম ক্ষোভ দেখিয়ে বললেন, "তোর এই অহংকারের শাস্তি আমি দেব। এই সিএনজি ওয়ালার সাথেই তোর বিয়ে দেব।" নদী চিৎকার করে আকাশ-পাতাল মাথায় তুলল, কিন্তু বাবার জেদের কাছে তাকে হার মানতে হলো। দুই পরিবারের সম্মতিতে, খুব সাধারণ আয়োজনে নদী আর আকাশের বিয়ে হয়ে গেল। নদী জানতও না, তার বাসর রাত হতে চলেছে এক নোংরা বস্তির ছোট্ট ঘরে।নিচে এই নাটকীয় ও শিক্ষামূলক কাহিনীর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:অহংকারের পতন ও একটি নতুন সকালপ্রথম পরিচ্ছেদ: রূপের অহংকার ও বাবার নীরব দীর্ঘশ্বাসনদী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রূপ দেখছিল। তার পরনে লাখ টাকার লেহেঙ্গা। সে আজ তার এক বান্ধবীর জন্মদিনের পার্টিতে যাবে। রূপ আর বাবার অঢেল টাকা—এই দুই মিলে নদীকে এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি বানিয়ে তুলেছিল। তার চোখে চারপাশের সাধারণ মানুষগুলো ছিল কীটপতঙ্গের মতো।ঠিক তখনই তার ঘরের মেঝেতে মোছার জল একটু বেশি পড়ে যাওয়ায় সে বৃদ্ধ গৃহকর্মী রহিমনকে লাথি মেরে বসল।"চোখ নেই তোর বুড়ি? এত দামি কার্পেটটা ভিজিয়ে দিলি? দূর হ আমার সামনে থেকে!" নদীর চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।লিভিং রুমে বসে কফি খাচ্ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি মোস্তফা কামাল। মেয়ের এই আচরণে তার বুকটা ভেঙে গেল। তিনি দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করেছেন, অপরাধীদের শায়েস্তা করেছেন, কিন্তু নিজের মেয়েকে ভালো মানুষ বানাতে পারেননি।ঠিক তখনই তার বাড়িতে এলেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আমজাদ হোসেন। আমজাদ হোসেন বন্ধুর মলিন মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলেন, "কী রে কামাল? মুখটা এমন অন্ধকার কেন?"মোস্তফা কামাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "দোস্ত, নদীর অহংকার দিন দিন বেড়েই চলেছে। ও মানুষকে মানুষ মনে করে না। আমার এত সম্মান ও ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। আমি মরে গেলেও ও শান্তিতে বাঁচতে পারবে না।"আমজাদ হোসেন কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, "লোহাকে লোহা দিয়েই কাটতে হয়, কামাল। নদীর এই বিষদাঁত ভাঙতে হলে আমাদের একটা কঠিন নাটক করতে হবে। আমার ছেলে আকাশ তো এখন এএসপি। ও দেখতেও মাশাল্লাহ। আমরা নদীকে একটা কঠিন শিক্ষা দেব।"দুই বন্ধু মিলে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এক অদ্ভুত ও কঠোর পরিকল্পনা সাজালেন।দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: সিএনজি চালক আকাশ ও রাজপথের নাটকপরদিন সকালে নদী তার লাল রঙের স্পোর্টস কার নিয়ে তীব্র গতিতে বেরিয়ে পড়ল। ঢাকার এক ব্যস্ত মোড়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি পুরনো সিএনজি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আকাশ। তার পরনে ছিল নোংরা লুঙ্গি, গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, মুখে কয়েকদিনের না-কামানো দাড়ি।নদীর গাড়িটি আসতেই আকাশ সামান্য পাশ কাটিয়ে সিএনজিটা এমনভাবে ধরল যেন হালকা একটা ঘষা লাগে। নদী ব্রেক কষে গাড়ি থেকে নামল। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিল।"এই ছোটলোক, সিএনজিওয়ালা! তোর এত বড় সাহস? তুই জানিস এটা কার গাড়ি? তোর চৌদ্দ গোষ্ঠী বিক্রি করলেও এই গাড়ির একটা আয়না কেনার টাকা পাবি না!" নদী চিৎকার করে আকাশের কলার চেপে ধরল।আকাশ চিবুকে হাত বুলাতে বুলাতে বকাটেদের মতো করে বলল, "আরে আপা, চিল! রাস্তায় চললে একটু-আধটু ঘষা লাগতেই পারে। এর জন্য এত চিল্লাইতাছেন ক্যা? সুন্দরী মাইয়াগো মুখে এত চিল্লানি শোভা পায় না।"আকাশের এই সস্তা ও বকাটে আচরণে নদীর রাগ মাথায় চড়ে গেল। সে হাত তুলল আকাশকে থাপ্পড় মারার জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে মোস্তফা কামালের গাড়ি এসে থামল। মোস্তফা কামাল গাড়ি থেকে নেমে নদীকে থামালেন। তিনি আকাশকে দেখে নাটকীয়ভাবে বললেন, "তুমিই তো সেই ছেলে, যে কিছুদিন আগে আমার এক লোককে বাঁচিয়েছিলে? তোমার সাহস আর সততার কথা আমি ভুলিনি।"নদী অবাক হয়ে বলল, "বাবা! তুমি এই নোংরা সিএনজিওয়ালার পক্ষ নিচ্ছো?"মোস্তফা কামাল গম্ভীর গলায় বললেন, "হ্যাঁ নিচ্ছি। আর আজ তোর এই অহংকারের শেষ দেখব আমি। তুই এই সিএনজিওয়ালাকেই বিয়ে করবি। এটাই তোর শাস্তি।"নদী স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ভাবল বাবা হয়তো মজা করছেন। কিন্তু মোস্তফা কামাল ছিলেন অনড়। তিনি তখনই আকাশকে বললেন, "তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করবে?"আকাশ মাথা চুলকে বলল, "স্যার, আপনে বড় লোক। আপনার মাইয়া তো দেমাগী। তবে আপনে ডাকিলে আমি রাজি।"তৃতীয় পরিচ্ছেদ: বস্তির বাসর ও উত্তম-মাধ্যমনদীর সমস্ত কান্নাকাটি, চিৎকার আর আত্মহত্যার হুমকি কোনো কাজে এল না। মোস্তফা কামাল তার সমস্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে নদীকে প্রায় জোর করেই আকাশের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন। কোনো জাঁকজমক ছাড়াই কাজী অফিসে বিয়ে সম্পন্ন হলো। বিয়ের পর মোস্তফা কামাল নদীকে বললেন, "আজ থেকে তুই আমার মেয়ে নোস। এই সিএনজিওয়ালার ঘরেই তোর সংসার।"আকাশ নদীকে নিয়ে ঢাকার এক ঘিঞ্জি বস্তির এক কামরার টিনের ঘরে তুলল। ঘরের ভেতরে একটা ভাঙা চৌকি, একটা টেবিল ফ্যান আর কোণায় কয়েকটা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল। ঘরের দুর্গন্ধে নদীর বমি আসার উপক্রম হলো।নদী খাটে বসতে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, "আমি এই নোংরা জায়গায় থাকব না! আমি এখনই চলে যাব।"আকাশ দরজাটা আটকে দিয়ে তার বকাটে রূপ ধারণ করল। সে নদীর হাত ধরে এক ঝটকায় খাটে ফেলে দিল।"খবর্দার নদী! এটা তোর বাবার রাজপ্রাসাদ না। এটা আকাশের আস্তানা। এখানে থাকতে হলে আমার নিয়মে থাকতে হবে।"নদী আকাশকে লাথি মারতে গেল। আকাশ রাগ করে নদীর পিঠে দুমদাম কয়েকটা বসিয়ে দিল।"উত্তম-মাধ্যম না দিলে তোর এই ধনীর দুলালীর ভূত নামবে না!" আকাশ গর্জে উঠল।নদী জীবনে কখনো গায়ে আঘাত পায়নি। সে ব্যথায় ও অপমানে কাঁদতে লাগল। কিন্তু আকাশ ছিল কঠোর। সে নদীকে বলল, "কান্নাকাটি বন্ধ কর। কাল সকাল থেকে তোকে এই ঘরের সব কাজ করতে হবে। ঘর ঝাড়ু দিবি, রান্না করবি। না করলে ভাত পাবি না।"চতুর্থ পরিচ্ছেদ: অহংকারের অবসান ও পরিবর্তনের হাওয়াপরের এক মাস নদীর ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। প্রতিদিন সকালে আকাশ সিএনজি নিয়ে বেরিয়ে যেত। যাওয়ার আগে নদীকে ঘরের সব কাজ বুঝিয়ে দিয়ে যেত। নদী প্রথম প্রথম কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাত, কিন্তু ক্ষুধা আর আকাশের কঠোর শাসনের কাছে সে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো।আকাশের দেওয়া সেই 'উত্তম-মাধ্যম' এবং কঠোর শৃঙ্খলা নদীর ভেতরের অহংকারকে আস্তে আস্তে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল। নদী যখন দেখল বস্তির অন্য নারীরা কত কষ্ট করে সংসার চালায়, কীভাবে একে অপরকে সাহায্য করে, তখন তার মনের ভেতরের অন্ধকার দূর হতে লাগল। সে বুঝতে পারল, মানুষ গরিব হলেও তাদের একটা হৃদয় আছে, সম্মান আছে।একদিন রাতে আকাশ বাড়ি ফিরে দেখল নদী ভাঙা উনুনে চমৎকার ভাত আর আলুভর্তা রান্না করেছে। নদীর হাত দুটো পুড়ে লাল হয়ে গেছে, কিন্তু তার চোখে আর সেই অহংকারের আগুন ছিল না। সেখানে ছিল এক শান্ত, নম্র মেয়ের চাহনি।নদী আকাশের সামনে ভাতের থালা এগিয়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বলল, "তুমি খেয়ে নাও। সারাদিন তো অনেক কষ্ট করেছ।"আকাশ নদীর এই পরিবর্তন দেখে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো। সে বুঝল, তাদের নাটক সফল হয়েছে। নদীর ভেতরের আসল সোনার মেয়েটি জেগে উঠেছে।পঞ্চম পরিচ্ছেদ: সত্যের উন্মোচন ও ক্ষমার অশ্রুপরদিন সকালে নদী আকাশের পায়ে হাত দিয়ে কেঁদে ফেলল।"আমাকে মাফ করে দাও আকাশ। আমি মানুষকে মানুষ মনে করতাম না। আজ আমি বুঝতে পেরেছি, টাকার কোনো মূল্য নেই। মানুষের আসল পরিচয় তার ব্যবহারে। আমি আমার সব ভুলের জন্য সবার কাছে ক্ষমা চাই।"নদীর এই আন্তরিক পরিবর্তন দেখে আকাশের চোখও ভিজে এল। সে নদীকে টেনে তুলল এবং বলল, "নদী, তোমার এই ক্ষমা চাওয়ার দিনটির জন্যই আমরা অপেক্ষা করছিলাম।"ঠিক তখনই বস্তির সেই ছোট্ট ঘরের সামনে এসে থামল দুটি দামি পাজেরো গাড়ি। গাড়ি থেকে নামলেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আমজাদ হোসেন, তার স্ত্রী এবং নদীর বাবা মোস্তফা কামাল ও তার স্ত্রী।নদী তার বাবা-মাকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল। "বাবা, মা! আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি খুব অন্যায় করেছি।"মোস্তফা কামাল মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কেঁদে ফেললেন। আমজাদ হোসেন এগিয়ে এসে বললেন, "মা নদী, এবার শান্ত হও। তোমার কাছে আমাদের একটা বড় সত্য লুকানো আছে। আমাদের ক্ষমা করে দিও মা। আসলে এই সবকিছুই ছিল একটা নাটক।"নদী চোখ মুছে অবাক হয়ে তাকাল।আকাশ তখন ঘরের কোণ থেকে তার পুলিশের এএসপি-র নিখুঁত ইউনিফর্ম আর ক্যাপটি এনে নদীর সামনে দাঁড়াল। আকাশের এই রূপ দেখে নদী বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।আমজাদ হোসেন বললেন, "মা, আমার ছেলে আকাশ কোনো সিএনজিওয়ালা বা বকাটে নয়। ও বাংলাদেশ পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (এএসপি)। আর আমি কর্নেল আমজাদ। তোমার বাবা আর আমি বন্ধু। তোমার ভেতরের অহংকার দূর করে তোমাকে একজন আদর্শ মানুষ বানানোর জন্যই আমরা এই কঠোর নাটকের আশ্রয় নিয়েছিলাম।"নদীর মা এগিয়ে এসে নদীকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "মা, তুমি এতদিন যা করেছ, তা ছিল ভারী অন্যায়। কিন্তু আজ তুমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছ। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।"নদী আকাশের দিকে তাকাল। আকাশের চোখে তখন বকাটে ভাব নেই, সেখানে রয়েছে এক পরম ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার দৃষ্টি। নদী আকাশের বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ফেলল।মোস্তফা কামাল মুচকি হেসে বললেন, "চলো মা, নাটক শেষ। এবার আমরা যার যার নিজ বাড়িতে চলে যাই। তবে এবার তোমরা যাবে তোমাদের নিজেদের নতুন সংসারে।"বস্তির সেই অন্ধকার ঘর থেকে বের হয়ে নদী যখন আকাশের হাত ধরে গাড়িতে উঠল, তখন ভোরের সূর্য উদয় হচ্ছিল। সেই আলোয় নদীর মুখটা এক নতুন, অহংকারহীন, সুন্দর মানুষের আভায় জকমক করছিল।গল্পটি আপনাদের কেমন লেগেছে জানাবেন। ধন্যবাদ।