Posts

উপন্যাস

দুই বন্ধুর ভয়ংকর ভালোবাসা

July 6, 2026

Md Habib islam

9
View

দুই কবুতরের শেষ দেখা

একটি ছোট্ট গ্রামের পাশে ছিল একটি বিশাল বটগাছ। সেই গাছের ডালে বাস করত দুটি সাদা কবুতর। একটির নাম ছিল শুভ্র, আর অন্যটির নাম ছিল শান্তি। তারা শুধু বন্ধু ছিল না, ছিল একে অপরের জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা। সকালে একসঙ্গে খাবারের খোঁজে বের হতো, দুপুরে নদীর ধারে বিশ্রাম নিত, আর সন্ধ্যায় একই বাসায় ফিরে আসত।

গ্রামের মানুষও তাদের খুব ভালোবাসত। অনেকেই প্রতিদিন উঠোনে চাল ছিটিয়ে দিত, আর শুভ্র ও শান্তি আনন্দে খেতে আসত। তাদের দেখে ছোট ছোট শিশুরা হাততালি দিত।

একদিন ভয়ংকর ঝড় শুরু হলো। কালো মেঘে পুরো আকাশ ঢেকে গেল। প্রবল বাতাসে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়তে লাগল। শুভ্র বলল, "শান্তি, আমাদের নিরাপদ কোথাও যেতে হবে।"

দুজন উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ঝড় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তারা একে অপরের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেল।

ঝড় থেমে গেলে শুভ্র চারদিকে শান্তিকে খুঁজতে লাগল। সে নদীর ধারে গেল, মাঠে গেল, গ্রামের প্রতিটি গাছের ডালে উড়ে উড়ে ডাকতে লাগল।

"শান্তি... তুমি কোথায়?"

কিন্তু কোথাও কোনো উত্তর নেই।

এদিকে শান্তিও আহত অবস্থায় দূরের এক বনে পড়ে ছিল। তার একটি ডানা আঘাত পেয়েছিল। সে উড়তে পারছিল না। প্রতিদিন সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত, "শুভ্র নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজছে। আমি যদি একবার তার কাছে যেতে পারতাম!"

দিন কেটে গেল। সপ্তাহ পার হয়ে মাস এল। তবুও তারা একে অপরকে খুঁজে পেল না।

একদিন এক বৃদ্ধ কৃষক আহত শান্তিকে দেখতে পেলেন। তিনি তাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে যত্ন করতে লাগলেন। পানি দিলেন, খাবার দিলেন, আর ধীরে ধীরে তার ডানা সুস্থ হয়ে উঠল।

ডানা ভালো হওয়ার পরও শান্তি সেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। তার একটাই লক্ষ্য—শুভ্রকে খুঁজে বের করা।

অন্যদিকে শুভ্র প্রতিদিন সেই পুরনো বটগাছের ডালে বসে অপেক্ষা করত। সূর্য উঠত, সূর্য ডুবত, ঋতু বদলাত, কিন্তু তার অপেক্ষা শেষ হতো না।

একদিন শান্তি অনেক দূর উড়তে উড়তে সেই গ্রামে ফিরে এল। কিন্তু সেখানে এসে দেখল, পুরনো বটগাছটি আর নেই। ঝড়ে ভেঙে পড়ার পর মানুষ সেটি কেটে ফেলেছে।

শান্তির চোখে জল চলে এল।

সে গ্রামের প্রতিটি কোণে শুভ্রকে খুঁজতে লাগল।

ঠিক সেই সময় শুভ্রও খাবারের খোঁজে অন্য দিক থেকে ফিরছিল। দুজনের মধ্যে দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েকটি গাছের। কিন্তু তারা কেউ কাউকে দেখতে পেল না।

সেদিন সন্ধ্যায় শান্তি গ্রামের পাশের একটি আমগাছে রাত কাটাল। আর শুভ্র রাত কাটাল নদীর ধারের একটি কদমগাছে।

পরদিন ভোরে শান্তি আবার উড়ে গেল অন্যদিকে। আর ঠিক কিছুক্ষণ পর শুভ্র এসে সেই আমগাছের ডালে বসে শান্তিকে খুঁজতে লাগল।

ভাগ্য যেন তাদের নিয়ে নিষ্ঠুর খেলা খেলছিল।

এভাবেই আরও কয়েকদিন কেটে গেল।

একদিন এক শিকারি জঙ্গলে জাল পেতে রাখল। খাবারের খোঁজে উড়তে উড়তে শুভ্র সেই জালে আটকা পড়ে গেল।

সে প্রাণপণে ডানা ঝাপটাতে লাগল।

ঠিক তখনই দূর থেকে শান্তি তার চিৎকার শুনতে পেল।

সে দ্রুত উড়ে এল।

শান্তি দেখল, তার প্রিয় বন্ধু জালের মধ্যে বন্দি।

নিজের জীবনের কথা না ভেবে সে জালের দড়ি ঠোঁট দিয়ে কাটতে শুরু করল।

শিকারি দৌড়ে আসছিল।

শুভ্র বলল, "শান্তি, তুমি চলে যাও। নিজেকে বাঁচাও।"

শান্তি চোখে জল নিয়ে বলল, "তোমাকে ছাড়া আমি কোথাও যাব না।"

সে আরও জোরে দড়ি কাটতে লাগল।

অবশেষে জালের একটি অংশ ছিঁড়ে গেল। শুভ্র মুক্ত হলো।

কিন্তু ঠিক তখনই শিকারি একটি পাথর ছুড়ে মারল।

পাথরটি শান্তির গায়ে আঘাত করল।

সে ধীরে ধীরে মাটিতে পড়ে গেল।

শুভ্র দ্রুত তার পাশে এসে বসল।

চোখে জল নিয়ে বলল, "তুমি কেন নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেললে?"

শান্তি দুর্বল কণ্ঠে হাসল।

"বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার মূল্য জীবন দিয়েও শোধ করা যায় না। তোমাকে বাঁচাতে পেরে আমি সুখী।"

এই কথাগুলো বলেই শান্তি চিরদিনের মতো চোখ বন্ধ করে দিল।

শুভ্র অনেকক্ষণ তার পাশেই বসে রইল।

সে আর কখনো সেই গ্রাম ছেড়ে কোথাও যায়নি।

প্রতিদিন ভোরে সে সেই জায়গায় এসে বসত, যেখানে শান্তি শেষবারের মতো তাকে বাঁচিয়েছিল।

গ্রামের মানুষ প্রায়ই দেখত, একটি একাকী সাদা কবুতর নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

কেউ জানত না, সে এখনও তার প্রিয় বন্ধুর অপেক্ষায় আছে।

সময় কেটে গেল, ঋতু বদলাল, নতুন পাখি এল, পুরোনো পাখি চলে গেল।

কিন্তু শুভ্রের হৃদয়ে শান্তির স্মৃতি কখনো মুছে গেল না।

একদিন খুব শান্ত একটি সকালে গ্রামের মানুষ দেখল, শুভ্র আর উড়ছে না।

সে সেই একই জায়গায় নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে, যেখানে শান্তি শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছিল।

গ্রামের সবাই তাদের দুজনকে পাশাপাশি কবর দিল।

সেই জায়গায় পরে একটি ছোট গাছ জন্ম নিল।

লোকেরা বলত, যখনই দুটি সাদা কবুতর সেই গাছের ওপর এসে বসে, তখন মনে হয় শুভ্র আর শান্তি আবারও একসঙ্গে আকাশে উড়ছে—এবার আর কোনো ঝড়, কোনো শিকারি বা কোনো বিচ্ছেদ তাদের আলাদা করতে পারবে না।

Comments

    Please login to post comment. Login