উপন্যাস: শেষ চিঠির অপেক্ষা
তৃতীয় পর্ব: পূর্ণিমার রাতের প্রতীক্ষা
পূর্ণিমার রাত যেন আসতেই চাইছিল না। প্রতিটি মুহূর্ত নীলার কাছে এক একটি দীর্ঘ অপেক্ষা হয়ে উঠল। বারবার সে কাঠের বাক্সটি খুলে ছবিগুলো দেখছিল। কালো কালি দিয়ে মুছে দেওয়া সেই মুখটি যেন তার স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়ছিল, অথচ কিছুই স্পষ্ট মনে পড়ছিল না।
রাত নামতেই আকাশে গোল চাঁদ উঠল। চারদিকে অদ্ভুত এক নীরবতা। নীলা ধীরে ধীরে পুরোনো রেলস্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। বহু বছর ধরে বন্ধ হয়ে থাকা স্টেশনটি আগাছায় ভরে গেছে। মরিচা ধরা রেললাইন চাঁদের আলোয় রূপালি হয়ে জ্বলছিল।
হঠাৎ দূরে একটি লণ্ঠনের আলো দেখা গেল।
আলোটি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। নীলার বুকের ভেতর ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল।
একজন বৃদ্ধ সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে ক্লান্তি, কিন্তু কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি।
"তুমি এসেছ... আমি জানতাম তুমি আসবে।"
নীলা কাঁপা গলায় বলল, "আপনি কে? আর এতদিন ধরে আমাকে এসব চিঠি কে পাঠাচ্ছে?"
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরব থেকে পকেট থেকে একটি পুরোনো চাবি বের করলেন।
"এই চাবিটা তোমার বাবার। তিনি আমাকে বলেছিলেন, যদি কোনো দিন নীলা ফিরে আসে, তাহলে তাকে এটা দিয়ে দিও।"
নীলার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
"আমার বাবা? কিন্তু তিনি তো বহু বছর আগে..."
বৃদ্ধ ধীরে মাথা নাড়লেন।
"সব সত্য তুমি জানো না। তোমার বাবার মৃত্যুর গল্পটা সবাইকে যেমন বলা হয়েছিল, আসলে ঘটনাটা তেমন ছিল না।"
এই কথাটি শুনে নীলার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।
ঠিক তখনই দূরে হুইসেলের মতো এক অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল। অথচ এই স্টেশনে বহু বছর ধরে কোনো ট্রেন আসে না।
বৃদ্ধ হঠাৎ ভীত হয়ে চারদিকে তাকালেন।
"সময় খুব কম। এই চাবি নিয়ে স্টেশনের শেষ মাথায় যাও। সেখানে একটি পরিত্যক্ত গুদামঘর আছে। সত্যের প্রথম দরজা সেখানেই লুকিয়ে আছে।"
কথা শেষ হতেই হঠাৎ দমকা হাওয়া বইতে শুরু করল। চাঁদ কালো মেঘে ঢেকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য নীলা চোখ বন্ধ করল।
আবার চোখ খুলতেই সে দেখল—বৃদ্ধ কোথাও নেই।
শুধু মাটিতে পড়ে আছে একটি নতুন খাম।
খামের ওপর লাল কালিতে লেখা—
"শেষ চিঠি এখনও লেখা হয়নি..."
চলবে...