নবম শ্রেণির প্রথম দিন।
নতুন ক্লাস, নতুন বই, নতুন বন্ধু। সবাই যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, তখন ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল রাফি। পড়াশোনায় ভালো হলেও সে খুব চুপচাপ ধরনের ছেলে।
হঠাৎ ক্লাসে ঢুকল নতুন এক মেয়ে।
দুই বেনি করা, কাঁধে ব্যাগ, চোখে অদ্ভুত মায়া। নাম তার মায়া।
ক্লাস টিচার বললেন—
“মায়া, তুমি ওই খালি সিটটায় বসো।”
ভাগ্যের খেলায় সেই সিটটা ছিল রাফির পাশেই।
প্রথম দিন দুজনের খুব একটা কথা হয়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে খাতার নোট শেয়ার করা, টিফিন ভাগ করে খাওয়া, আর ছোট ছোট ঝগড়া থেকেই বন্ধুত্বটা গভীর হতে লাগল।
একদিন স্কুল ছুটির পরে বৃষ্টিতে আটকে গিয়েছিল তারা।
মায়া হেসে বলল—
“তুমি এত চুপচাপ কেন?”
রাফি একটু লজ্জা পেয়ে বলল—
“সব কথা সবাইকে বলতে ইচ্ছা করে না।”
মায়া মুচকি হেসে উত্তর দিল—
“তাহলে একদিন আমাকে বলো।”
সেদিন থেকেই যেন সব বদলে গেল।
তারা প্রতিদিন একসাথে স্কুলে আসত। ক্লাসের ফাঁকে চোখাচোখি হতো। পরীক্ষার আগে একে অপরকে পড়াত। পুরো স্কুল জানত— রাফি আর মায়া একে অপরকে ভালোবাসে।
কিন্তু ভালোবাসার গল্প কখনো এত সহজ হয় না।
দশম শ্রেণিতে ওঠার পর প্রথম বড় ঝগড়াটা হয়।
একটা ছোট ভুল বোঝাবুঝি। মায়া ভেবেছিল রাফি তাকে এড়িয়ে চলছে। রাগ করে কথা বলা বন্ধ করে দিল।
দুই সপ্তাহ কেউ কারও সাথে কথা বলেনি।
রাফি প্রতিদিন ক্লাসে এসে চুপচাপ মায়ার খালি মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকত। আর মায়া জানালার পাশে বসে লুকিয়ে কাঁদত।
শেষমেশ একদিন রাফি একটা ছোট্ট চিঠি দিল।
“রাগ করে থেকো, তবু দূরে যেও না। তোমাকে ছাড়া স্কুলটা খুব ফাঁকা লাগে।”
চিঠিটা পড়ে মায়া কেঁদে ফেলেছিল।
আবার সব ঠিক হয়ে গেল।
কিন্তু এটাই শেষ ব্রেকআপ ছিল না।
কলেজে ওঠার পর দূরত্ব বাড়ল। নতুন বন্ধু, নতুন ব্যস্ততা, অভিমান— সব মিলিয়ে তাদের সম্পর্ক বারবার ভেঙে যেত।
কখনো এক মাস কথা বন্ধ, কখনো ব্লক-আনব্লক, কখনো “এবার সত্যিই শেষ” বলা।
তবু আশ্চর্যভাবে কয়েকদিন পর আবার তারা ফিরে আসত একে অপরের কাছেই।
কারণ যতই তারা দূরে যাওয়ার চেষ্টা করুক, দিনশেষে দুজনেই বুঝত— পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি শান্তি তারা একে অপরের কাছেই পায়।
এক রাতে অনেক ঝগড়ার পর মায়া ফোনে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“আমরা কি সত্যিই একসাথে থাকতে পারব?”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
“জানি না ভবিষ্যৎ কী। কিন্তু একটা জিনিস জানি… আমি হাজারবার হারিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তোমাকেই খুঁজব।”
ওপাশে নীরবতা।
তারপর মায়ার কান্নাভেজা হাসি শোনা গেল।
বছর কেটে গেল।
একদিন পুরোনো স্কুলে রিইউনিয়ন ছিল। সেই একই মাঠ, একই করিডোর, একই ক্লাসরুম।
মায়া ধীরে ধীরে হাঁটছিল। হঠাৎ পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
“এই যে, শেষ বেঞ্চের পার্টনার…”
ঘুরে দাঁড়াতেই রাফিকে দেখে মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
রাফি এগিয়ে এসে বলল—
“আমরা অনেকবার আলাদা হয়েছি। এবার সারাজীবনের জন্য একসাথে থাকবে?”
মায়া চোখের জল মুছে হেসে বলল—
“আমরা তো কখনো সত্যি সত্যি আলাদা হইনি।”
সেদিন স্কুলের সেই পুরোনো মাঠে, বিকেলের নরম আলোয়, বারবার ভেঙে যাওয়া দুইটা হৃদয় আবার এক হয়ে গেল।
আর এবার আর কোনো ব্রেকআপ আসেনি।
6
View
Comments
-
Miss Nondini 3 hours ago
ভালোবাসা মানেই প্রিয় মানুষ টাকে বোঝা