উপন্যাস: শেষ চিঠির অপেক্ষা
চতুর্থ পর্ব: গোপন গুদামঘরের রহস্য
খামটি হাতে নিয়ে নীলা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে তখন আবার সেই অদ্ভুত নীরবতা। মনে হচ্ছিল, পুরোনো স্টেশনটি যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে এবং কোনো এক লুকানো সত্য প্রকাশের অপেক্ষা করছে।
কাঁপা হাতে নীলা খামটি খুলল। ভেতরে ছিল একটি ছোট কাগজ।
কালো কালিতে লেখা—
“নীলা, যদি তুমি এই চিঠি পাও, তাহলে বুঝবে তুমি সত্যের দরজায় পৌঁছে গেছ। কাউকে বিশ্বাস করার আগে নিজের চোখে সবকিছু দেখে নিও। তোমার বাবার রেখে যাওয়া সত্য গুদামঘরের ভেতরে লুকিয়ে আছে। — একজন অপেক্ষমাণ মানুষ”
চিঠির নিচে কোনো নাম ছিল না।
নীলার মনে হাজার প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। কে এই চিঠি লিখেছে? তার বাবা কেন এত বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে রেখেছিলেন? আর এত বছর পর কেন সবকিছু আবার সামনে আসছে?
সে শক্ত করে চাবিটা হাতে ধরল এবং স্টেশনের শেষ মাথার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
কিছু দূর এগিয়ে যেতেই সে দেখতে পেল একটি পুরোনো গুদামঘর। দরজায় মরিচা ধরে গেছে, দেয়ালে লতাপাতা উঠে গেছে। মনে হচ্ছিল, বহু বছর ধরে কেউ এখানে আসেনি।
নীলা দরজার কাছে গিয়ে চাবিটি তালায় ঢোকাল।
একবার ঘুরাতেই—
কড় কড় শব্দ করে দরজাটি খুলে গেল।
ভেতরে অন্ধকার। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে নীলা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। চারদিকে পুরোনো বাক্স, ধুলো জমা কাগজ আর কিছু ভাঙা আসবাব পড়ে আছে।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটি কাঠের বাক্সের ওপর।
বাক্সটির ওপর লেখা ছিল—
“নীলার জন্য”
তার বুক কেঁপে উঠল।
সে ধীরে ধীরে বাক্সটি খুলল। ভেতরে ছিল কিছু পুরোনো ছবি, একটি ডায়েরি এবং একটি চিঠি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“যদি কখনো আমার মেয়ে এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে সে যেন জানে—আমি তাকে কখনো ছেড়ে যাইনি।”
নীলার চোখে পানি জমে উঠল।
সে দ্রুত পরের পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।
সেখানে লেখা ছিল তার বাবার জীবনের এক অজানা গল্প। এমন কিছু ঘটনা, যা নীলা কোনোদিন জানত না।
হঠাৎ গুদামঘরের বাইরে কারো পায়ের শব্দ শোনা গেল।
নীলা থেমে গেল।
কে যেন ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে আসছে।
তারপর একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—
“নীলা... তুমি অবশেষে সত্যটা খুঁজে পেয়েছ।”
নীলা ভয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন, যাকে দেখে তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
কারণ সেই মানুষটির মুখ—
ছবিতে কালো কালি দিয়ে মুছে দেওয়া সেই মুখের মতোই ছিল।
মানুষটি ধীরে বলল—
“তোমার বাবা আমাকে শেষ চিঠিটা তোমার কাছে পৌঁছে দিতে বলেছিলেন... কিন্তু তার আগে তোমাকে জানতে হবে, কেন সবাই তোমার কাছ থেকে এই সত্য লুকিয়েছিল।”
নীলা কিছু বলতে পারল না।
শুধু তার হাতে থাকা পুরোনো চিঠিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
চিঠির ওপরে লেখা ছিল—
“আমার মৃত্যুর পরও যদি নীলা অপেক্ষা করে, তবে এই চিঠি তার কাছে পৌঁছাবে...”
আর ঠিক তখনই গুদামঘরের বাইরে আবার সেই পুরোনো ট্রেনের হুইসেলের শব্দ শোনা গেল।