Posts

গল্প

সিকিউরিটি গার্ড থেকে সুপারস্টার।

July 8, 2026

Shafin pro

19
View

ভাগ্যের ফের: সিকিউরিটি গার্ড থেকে সুপারস্টারঅধ্যায় ১: ক্ষুধার জ্বালা এবং একটি ভাঙা স্বপ্নঢাকার ফুটপাতে যখন দুপুরের তপ্ত রোদ এসে পড়ে, তখন পিচঢালা রাস্তা থেকে যেন আগুনের হল্কা বের হয়। সেই রোদের চেয়েও বেশি আগুন জ্বলছিল তেইশ বছরের তরুণ আকাশের পেটে। গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আকাশের। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো বোঝা এসে পড়ে তার কাঁধে। তীব্র মেধা থাকা সত্ত্বেও শুধু ক্ষুধার জ্বালায় আর টাকার অভাবে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।কোনো রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই আর এক মুঠো ভাতের জোগাড় করতে আকাশ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে। সম্বল বলতে ছিল শুধু অনার্সের সার্টিফিকেট আর বুকভরা একরাশ দীর্ঘশ্বাস। ঢাকায় এসে হাজারটা দরজায় ঘুরেও কোনো সম্মানজনক চাকরি মেলেনি। অবশেষে নিরুপায় হয়ে পেটের দায়ে সে একটা সিকিউরিটি এজেন্সিতে যোগ দেয়। সেখান থেকেই তার ডিউটি পড়ে দেশের এক নম্বর মেগাস্টার 'আরিয়ান' সাহেবের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের মেইন গেটে।নীল রঙের সিকিউরিটি গার্ডের পোশাক, মাথায় টুপি আর পায়ে ভারী বুট পরে যখন আকাশ গেটে দাঁড়িয়ে থাকত, তখন তার চোখের কোণে প্রায়ই জল জমে যেত। সে ভাবত, "আমি কি এই জন্য এত কষ্ট করে গ্রাজুয়েশন শেষ করলাম?" কিন্তু ভাগ্য যে তার জন্য অন্য এক রাজপথ তৈরি করে রাখছিল, তা আকাশ জানত না।অধ্যায় ২: সেই ভাগ্য পরিবর্তনের দিনআরিয়ানের অ্যাপার্টমেন্টে বেশ কয়েকদিন ধরে ডিউটি করার পর আকাশ সবার বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে। নম্র ব্যবহার আর শিক্ষিত মার্জিত আচরণের কারণে আরিয়ান সাহেবও তাকে বেশ পছন্দ করতেন।সেদিন ছিল এক বিশেষ দিন। আরিয়ানের নতুন সিনেমার শুটিং চলছিল তাদের অ্যাপার্টমেন্টেরই বিশাল ছাদ এবং লিভিং রুমে। চারদিকে লাইট, ক্যামেরা, আর ক্রুদের হইচই। আকাশ নিচে গেটে দাঁড়িয়ে ডিউটি করছিল। ওপর থেকে হঠাৎ খবর এল, এক চরম বিপর্যয় ঘটে গেছে।সিনেমায় আরিয়ানের ছোট ভাইয়ের চরিত্রে যে উঠতি নায়কের অভিনয় করার কথা ছিল, সে এক মারাত্মক ভুল করে বসেছে। ডেট গুলিয়ে ফেলে সে আজকেই এক জরুরি ডাবিং আর অন্য শুটিংয়ের জন্য বিদেশে উড়াল দিয়েছে। এদিকে লাইভ লোকেশন, প্রতিদিনের লাখ লাখ টাকার খরচ, পুরো শুটিং ইউনিট তৈরি। পরিচালক কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। প্রযোজক রাগে ফুঁসছেন।ঠিক তখন আরিয়ান সাহেব একটু ফ্রেশ হতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। নিচে চোখ পড়তেই তার নজর গেল গেটে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশের দিকে। আকাশের লম্বা গড়ন, ধারালো চোয়াল আর চুল কাটার স্টাইল দূর থেকে দেখতে অনেকটাই আরিয়ানের মতো।আরিয়ান মনে মনে ভাবলেন, "ছোট্ট একটা রোল তো, শুধু কয়েকটা পাসিং শট আর দুটো সংলাপ। এবারের শুটিংটা এই সিকিউরিটি গার্ডকে দিয়েই চালিয়ে নেওয়া যাক!" আরিয়ান ওপর থেকেই চিৎকার করে উঠলেন, "আকাশ! এই আকাশ, এদিকে আসো তো!"অধ্যায় ৩: ডিরেক্টরের চোখে নতুন মুখমালিকের ডাক শুনে আকাশ বুক ঢিপঢিপানি নিয়ে ওপরে ছুটে গেল। লিভিং রুমে ঢুকতেই পরিচালক রাগে-ক্ষোভে চিল্লাচ্ছিলেন। আরিয়ান আকাশকে দেখিয়ে পরিচালককে বললেন, "রাশেদ ভাই, একটু শান্ত হন। এই ছেলেটাকে দেখুন।"পরিচালক রাশেদ সাহেব চশমাটা ঠিক করে আকাশের দিকে তাকালেন। নিখুঁতভাবে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বললেন, "আরে আরিয়ান! একে তো মেকআপ দিলে হুবহু তোমার ছোট ভাইয়ের মতোই দেখাবে! স্ক্রিনে দারুণ মানাবে।"আরিয়ান অমনি চওড়া হাসি দিয়ে বলে উঠলেন, "আরে ও তো আজ থেকে আমার ভাই-ই! রাশেদ ভাই, ও কিন্তু সাধারণ কেউ না। ও গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করা শিক্ষিত ছেলে। ও পারবে।"আকাশ তো অবাক! সে আমতা আমতা করে বলল, "স্যার, আমি তো কোনোদিন অভিনয় করিনি। আমি কীভাবে..."আরিয়ান আকাশের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "কোনো ভয় নেই আকাশ। আমি আছি তো। পোশাকটা ছেড়ে এই কস্টিউমটা পরে নাও।"অধ্যায় ৪: লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন!শুরু হলো আকাশের জীবনের প্রথম শুটিং। লাইটের তীব্র আলো যখন আকাশের চোখে মুখে পড়ল, প্রথম শটে সে কিছুটা নার্ভাস ছিল। কিন্তু পরিচালক যখন বুঝিয়ে দিলেন যে তাকে একজন সৎ এবং দুঃখী ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করতে হবে, আকাশ তখন নিজের জীবনের সব কষ্টকে সেই চরিত্রের ভেতর ঢেলে দিল।"অ্যাকশন!" বলার সাথে সাথেই আকাশের মুখ থেকে যে সংলাপ বের হলো, তা শুনে সেটের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের ভাষা আর কণ্ঠের গভীরতা সবাইকে মুগ্ধ করল। এক টেকেই শট ওকে হয়ে গেল!পরিচালক খুশিতে তালি দিয়ে উঠলেন। আরিয়ান এসে আকাশকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "তুমি তো ফাটিয়ে দিয়েছ, আকাশ!" সেই দিন থেকে সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্মটা চিরতরে আলমারিতে তুলে রাখা হলো। একের পর এক সিনেমায় সে সাইড নায়ক বা সহ-অভিনেতা হিসেবে কাজ করতে লাগল।অধ্যায় ৫: ডাবল লাইফ ও মাস্টার্স জয়সিনেমার রঙিন দুনিয়ায় পা রাখলেও আকাশ তার অতীত এবং শিক্ষার গুরুত্ব ভুলে যায়নি। অভিনয়ের পাশাপাশি সে রাতে জেগে পড়াশোনা করত। শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে ভ্যানিটি ভ্যানে বসে সে বই পড়ত। ইউনিটের অনেকেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত, "সাইড নায়ক আবার এত পড়াশোনা দিয়ে কী করবে?" কিন্তু আকাশ তার লক্ষ্যে স্থির ছিল।কঠোর পরিশ্রমের ফলশ্রুতিতে এক এক করে তিন বছর কেটে গেল। এর মধ্যে আকাশ তার মাস্টার্স ডিগ্রি সাফল্যের সাথে শেষ করল। যেদিন মাস্টার্সের রেজাল্ট বের হলো, আকাশ আনন্দে কেঁদে ফেলেছিল। সে প্রমাণ করেছে যে ক্ষুধার জ্বালায় সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করলেও মেধা কখনো মরে যায় না।অধ্যায় ৬: বড় ভাইয়ের সেই মহৎ অফারমাস্টার্স শেষ করার ঠিক পরের দিন আরিয়ান সাহেব আকাশকে তার পার্সোনাল অফিসে ডেকে পাঠালেন। আকাশের মনে মনে একটু ভয় ছিল, কোনো ভুল হলো কি না।টেবিলের ওপাশে বসে আরিয়ান এক গম্ভীর মুখে চশমাটা খুললেন। তারপর একটি নতুন সিনেমার স্ক্রিপ্ট আকাশের সামনে এগিয়ে দিলেন। আকাশ দেখল, সিনেমার নাম 'রাজপুত্র', আর মূল নায়কের চরিত্রের জায়গায় লেখা—'আকাশ'।আকাশ চমকে উঠে বলল, "ভাইয়া, এটা কী? মূল নায়কের চরিত্রে আপনার থাকার কথা না?"আরিয়ান হাসলেন। পরম স্নেহে বললেন, "আকাশ, তুই এতদিন সাইড হিরো হিসেবে অনেক কষ্ট করেছিস। সাথে নিজের মাস্টার্সটাও শেষ করলি। তোর সততা আর ডেডিকেশন আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি আর এই ছবিতে অভিনয় করব না। তুই এখন থেকে মূল নায়কের অভিনয় করবি আমার ছবিতে। আমি এই ছবির প্রযোজক।"আকাশের চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে আরিয়ানের পা ছুঁয়ে সালাম করল।অধ্যায় ৭: সুপারহিট এবং সাফল্যের শিখরে'রাজপুত্র' সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পর দেশের সিনেমা হলে যেন ঝড় বয়ে গেল। আকাশের অভিনয়, মারপিট, আবেগ এবং শিক্ষিত যুবকের নিখুঁত উপস্থাপন দেশের মানুষকে পাগল করে তুলল। রাতারাতি সিনেমাটি ব্লকবাস্টার সুপারহিট তকমা পেল।অল্প দিনের ভেতরেই আকাশ দেশের এক নম্বর সুপারহিট নায়ক হয়ে উঠল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, তার অভিনয় দক্ষতা এবং সুঠাম চেহারার কারণে দেশের বাইরে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তার সিনেমা প্রশংসা পেতে শুরু করল। বিদেশি বড় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তাকে চুক্তিবদ্ধ করার জন্য লাইনে দাঁড়াল। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ওপার বাংলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার নাম ছড়িয়ে পড়ল।অধ্যায় ৮: ভাগ্যের রাজপুত্রএকদিন এক আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে সেরা অভিনেতার পুরস্কার নেওয়ার জন্য যখন আকাশের নাম ঘোষণা করা হলো, তখন পুরো মিলনায়তন করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল।আকাশ স্টেজে উঠে মাইক্রোফোনটা হাতে নিল। তার পরনে তখন বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের স্যুট। সে হাত জোড় করে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলল:"আজ থেকে কয়েক বছর আগে আমি ক্ষুধার জ্বালায় পড়াশোনা বন্ধ করে এক নায়কের বাড়ির গেটে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নিয়েছিলাম। সেদিন যদি পেটের ক্ষুধা আমাকে তাড়া না করত, তবে হয়তো আজ আমি এই সিনেমার রঙিন দুনিয়ায় আসতাম না। জীবনটা এমনই। কষ্ট আর কান্না থাকবেই, কিন্তু সততা আর চেষ্টা থাকলে ভাগ্য একদিন ধরা দিতে বাধ্য। জীবনটার এমনি ভাগ্য থাকলে, ঈশ্বর যদি সহায় থাকেন—তবে মানুষের সাধ্য কী তাকে ঠেকায়!"পুরো হলরুম দাঁড়িয়ে আকাশকে সম্মান জানাল। সিকিউরিটি গার্ডের সেই টুপিটা আজ এক রাজমুকুটে পরিণত হয়েছে।গল্পটি কেমন লাগলো লিখে জানাতে পারেন। ধন্যবাদ

Comments

    Please login to post comment. Login