ভোর হতেই চারপাশ ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। গাছের ডালে বসা শালিকের ডাক, আর রাতভর জমে থাকা শিশিরের গন্ধ—সব মিলিয়ে সকালটা একদম শান্ত।
বাড়ির আঙিনার একপাশে তুলসী গাছ। অন্য পাশে কয়েকটা টবে গাঁদা আর জবা ফুল। রাতের বৃষ্টির হালকা ছোঁয়ায় পাতাগুলো এখনো চকচক করছে।
বাড়ির ভেতরে অবশ্য এখনো নীরবতা।(অবশ্য আরো একটা কথা আগে থেকে বলে নেওয়া ভালো। এখানে স্ত্রীর নাম হচ্ছে অনামিকা। আর স্বামীর নাম হচ্ছে শিহাব)। খাটের একপাশে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন স্বামী। অন্য পাশে স্ত্রী আগেই জেগে গেলেও সে উঠে পড়েনি।স্ত্রী পাশ ফিরেই তার স্বামীকে লক্ষ্য করে। সে বেশ কিছুক্ষণ তার প্রিয় স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
মুখে একটা অদ্ভুত মিষ্টি হাসি।
নিজের মনেই খুব আস্তে বলল—
— মানুষটা ঘুমাইলে কেমন যে লাগে।
স্বামী একটু নড়েচড়ে আবার আগের মতোই ঘুমিয়ে গেল।
স্ত্রী মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল—
— এত ঘুমাইলে সংসার চলব কিভাবে ?
অপর পক্ষের কোনো উত্তর নেই।
স্ত্রী বিছানা ছেড়ে ওজু করল। নামাজ পড়ল। নামাজ শেষে দু'হাত তুলে অনেকক্ষণ দোয়া করল।
দোয়া শেষে একবার স্বামীর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
"আল্লাহ, মানুষটা যেন সবসময় ভালো থাকে। সুখে থাকে।"
এরপর রান্নাঘরে গেল।
চুলায় পানি বসাল।
ধীরে ধীরে রান্নাবান্না কাজ করতে শুরু করল।
ঠিক তখনই ঘর থেকে ভেসে এল অলস একটা ডাক—
— ঐ... শুনছো...
স্ত্রী রান্নাঘর থেকেই উত্তর দিল—
— শুনতেছি।
— এক গ্লাস পানি দিবা?
— নিজেই আইসা খাও।
— আমার তো ঘুম পাইতেছে।
— ঘুম পাইলে আবার পানি ক্যান?
— স্বপ্নে পানি খাইতেছিলাম... তাই হঠাৎ ঘুম ভাইঙ্গা গেছে।
স্ত্রী হেসে হেসে বলল, আচ্ছা একটু দাড়াও দিচ্ছি। সে অতি অল্প সময় পরেই এক গ্লাস পানি নিয়ে ঘরে ঢুকে। ঢুকার পর লক্ষ্য করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষটা আবার চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে গেছে।
সে আলতু বলল—
— এই যে, পানি।
স্বামী চোখ না খুলেই হাত বাড়িয়ে দিল।
গ্লাসটা হাতে দিয়ে স্ত্রী বলল—
— চোখ খুইলা পানি খাও। না হয় পানি বিছানাই ঢাইলা দিবা।
পানি খাওয়া শেষ করে স্বামী আবার বালিশে মাথা রাখতেই স্ত্রী বলল—
— এইবার উঠবা?
— আর পাঁচ মিনিট।
— তোমার এই পাঁচ মিনিট শেষ হইতে হইতে আধা ঘণ্টা যায়।
— আমি কি করব এটা ঘড়ির দোষ।
— ঘড়ির আবার দোষ কী?
— আমারে তাড়াতাড়ি সময় দেখায়।
স্ত্রী এবার বালিশটা টেনে নিল।
— উঠবা, না বালিশ অনন্য জায়গাই রাখমু?
স্বামী হেসে বলল—
— ঠিক আছে, উঠতেছি।
কিন্তু উঠার বদলে আবার স্ত্রীর হাতটা ধরে ফেলল।
— এইদিকে একটু বসো না।
— না, পারবো অনেক কাজ আছে।
— দুই মিনিট।
— দুই মিনিট তো আর তোমার কাছে দুই মিনিট না।
স্বামী দুষ্টুমি করে বলল—
— কাজ তো প্রতিদিনই থাকে... কিন্তু এই সকালটা তো আর প্রতিদিন এভাবে আসবে না।
স্ত্রী একটু লজ্জা পেল।
— কথা শিখছো অনেক।
— সত্যি?
স্ত্রী হেসে মাথা নাড়ল।
স্বামী— আমি ভাবছিলাম যদি আরেকটু ঘুমাইতে পরতাম।
— না, তোমার অফিস করবো কেঠাই।
স্বামী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আহারে... বিয়ার আগে সকাল মানেই ছিল ঘুম। বিয়ার পরে সকাল মানেই দায়িত্ব।
স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—
— আর আমার?
— তোমার আবার কি?
— বিয়ার আগে সকাল মানেই ছিল বাবার বাড়ি। বিয়ার পরে সকাল মানেই তোমার জন্য চা বানানো।
কথাটা শুনে স্বামী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসে বলল—
— এই জন্যই তো তোমারে এতো ভালোবাসি।
স্ত্রী হেসে বলল—
— এইসব কথা দিয়া চিঁড়া ভিজানোর চেষ্টা করো না। যাও, মুখ ধুইয়া আসো। চা ঠান্ডা হইতেছে।
স্বামী দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল—
— আচ্ছা... কিন্তু একটা কথা।
— কি?
— আজ তোমারে কেমন জানি অন্যরকম সুন্দর লাগতেছে।
স্ত্রী অবাক হয়ে তাকাল।
— প্রতিদিনই তো একই মানুষ।
— মানুষ একই... কিন্তু প্রতিদিন নতুন লাগে।
স্ত্রী হেসে মাথা নিচু করল।
কিছুক্ষণ পরেই স্বামী মুখ ধুয়ে বারান্দায় এসে বসতেই স্ত্রী এক কাপ গরম চা এগিয়ে দিল।
— এই নাও।
স্বামী কাপটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিতেই মুখ কুঁচকে বলল—
— ইসস...! এত গরম!
স্ত্রী হেসে ফেলল।
— চা ঠান্ডা হইলে আবার কইবা, "চা খাওনের মজা নাই।"
— তাও ঠিক।
দু'জনে বারান্দায় পাশাপাশি বসে চা খেতে লাগল।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
হঠাৎ স্ত্রী বলল—
— আজ অফিসে যাইতেই হইবো?
— হ, একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।
— ছুটি নেওয়া যায় না?
স্বামী অবাক হয়ে তাকাল।
— ক্যান?
— এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।
স্বামী একটু ভেবে বলল—
— চাইলে আমি আমার ছুটি নিজেই মঞ্জুর করতে পারি। তবে বস আবার আমার ওপর মন্দ কথাও ঝাড়তে পারে।
— তাইলে যাও।
— ক্যান, তুমি কি কোন ভাবে চাচ্ছ আমি আজকে অফিসে না যাই।
স্ত্রী হালকা হেসে বিষয়টা এড়িয়ে গেল।
— আরে না। তুমি অফিসে যাইবা না ক্যান।
চা শেষ করেই স্বামী ঘরে ঢুকে আলমারি খুলল।
— আরে... আমার সাদা শার্টটা কই?
রান্নাঘর থেকে স্ত্রী বলল—
— ডান পাশে।
— ডান পাশ তো দেখছি না।
— নিচে দেখো।
— নিচেও নাই।
স্ত্রী এসে এক টানে শার্ট বের করে দিল।
— এইডা কী?
স্বামীর মনে চিন্তিত ভাব ।
— আমি তো এখানে শার্ট রাখি নাই?
শার্ট পরে এবার পাঞ্জাবির পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে গিয়ে স্বামী থমকে গেল।
— আরে... মানিব্যাগ?
স্ত্রী দূর থেকেই বলল—
— বালিশের নিচে।
স্বামী দৌড়ে গিয়ে দেখল, সত্যিই সেখানে।
— তুমি সব জানো কেমনে?
— কারণ তুমি যেখানে-সেখানে এলোমেলো করে রাখো, আর আমি পরে গুছিয়ে সঠিক জায়গায় রাখি।
স্বামী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
— সংসারে আমি শুধু নামেই আছি ।
—আরে না, তুমি আছো বলেই তো সংসারটা সংসার।
কথাটা শুনে স্বামী কিছুক্ষণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল।
স্ত্রী লজ্জা পেয়ে বলল—
— এইভাবে তাকায়া আছো ক্যান?
— কিছু না।
— কিছু তো একটা আছে।
— ভাবতেছিলাম, মানুষ এত যত্নশীল কেমনে হয়?
স্ত্রী মুচকি হেসে বলল—
— বেশি প্রশংসা করো না। পরে আবার বাসন মাজতে বলমু।
— ওরে বাবা! তাইলে তো প্রশংসা বন্ধ করতে হইবোই।সাথে সত্য কথাও কমাইতে হইবে।
আবার দু'জনেই হেসে উঠল।
রান্নাঘর থেকে নাস্তার গন্ধ ভেসে আসছে।
টেবিলে গরম পরোটা, ডিম ভাজি আর ডাল সাজিয়ে রেখে স্ত্রী বলল—
— খেয়ে নাও।
স্বামী চেয়ারে বসে বলল—
— তুমি খাইবা না ?
— আমি পরে খাইমু।
— না। একসাথে খাই।
স্ত্রী কিছু না বলে তার সামনে বসে পড়ল।
দু'জন একই প্লেট থেকে পরোটা নিয়ে খেতে শুরু করল।
বাইরে তখন সকালের ব্যস্ততা আরও বাড়ছে। কিন্তু ঘরের ভেতরে সময় যেন একটু ধীর হয়ে গেছে।
ঠিক সেই সময় স্ত্রীর চোখ পড়ল দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারে।
সে একবার তারিখটার দিকে তাকাল।
আবার স্বামীর দিকে তাকাল।
মনে মনে একটা চিন্তা করল।
স্ত্রীর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল, আবার কোথায় যেন একফোঁটা অপেক্ষাও জমে রইল…
নাস্তা শেষ করে স্বামী হাত ধুয়ে এসে চেয়ারে বসতেই স্ত্রী তোয়ালে এগিয়ে দিল।
— এই নাও।
— ধন্যবাদ।
— ওহ! আজকাল আবার ধন্যবাদও দাও নাকি?
— দেওন উচিত না?
— উচিত তো। তবে আজকে কেমন জানি বেশি ভদ্র ভদ্র লাগতেছে।
স্বামী বলল—
— আমার সব ভদ্রতা অভদ্রতা তোমার তরে ?
স্ত্রী মুচকি হাসলো।
স্বামী এবার ঘড়িটার দিকে তাকাল।
— ইস্! অনেক দেরি হইয়া গেল।
সে তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ গুছাতে লাগল।
মোবাইল, চার্জার, অফিসের আইডি কার্ড, মানিব্যাগ—সব একসঙ্গে ঢুকিয়ে আবার বের করল।
— আরে... আইডি কার্ড কই গেল?
স্ত্রী দরজার পাশে ঝোলানো শার্টটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল—
— ঐ যে তোমার কার্ড ঝুলতেছে।
স্বামী নিজের কপালে হালকা চাপড় মারল।
— আজকে যে কি হচ্ছে ।
— শুধু আজকে?
— মানে?
— এই অবস্থা তো প্রতিদিনই।
ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্বামী দরজার দিকে এগোতেই স্ত্রী হঠাৎ ডাক দিল—
— এই... শুনবা?
— কও।
— আজকের দিনটা কেমন মনে হইতেছে?
স্বামী এক মুহূর্ত ভেবে বলল—
— শুক্রবার... না থাক, আজ তো সোমবার!
স্ত্রী চোখ বড় বড় করে তাকাল।
স্বামী— অফিসে মিটিং আছে।
স্ত্রী— আমি সোমবার শুক্রবারের কোন কিছুই বলি নাই।
স্বামী আবার অনেকক্ষণ ভাবার ভান করল।
— না... আর তো কিছু মনে পড়তেছে না।
স্ত্রী মুখে হাসি রাখলেও বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে গেল।
— আচ্ছা... যাও।
স্বামী কাছে এসে বলল—
— কি হইছে?
— কিছু না।
— নিশ্চিত?
— হুম।
— বিকালে তাড়াতাড়ি আসুম।
— চেষ্টা কইরো।
স্বামী দরজা দিয়ে বের হয়ে আবার ফিরে এল।
— একটা জিনিস ভুলে গেছি।
স্ত্রীর চোখে মুহূর্তেই আলো ফুটে উঠল।
সে মনে মনে ভাবল—
"মনে পড়ছে বুঝি..."
স্বামী হাসতে হাসতে বলল—
— আমার হেলমেট!
স্ত্রীর মুখের সেই আলো আবার নিভে গেল।
— এই যে... টেবিলের ওপর।
— দেখছো! তুমি না থাকলে আমার কিছুই চলতো না।
— যাও, অফিসে দেরি হইতেছে।
— আচ্ছা, আসি।
— আল্লাহ হেফাজত করুক।
— আমিন।
স্বামী গেট পেরিয়ে রাস্তার দিকে হাঁটতে লাগল।
স্ত্রী দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
লোকটা মোড় ঘুরে চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার পরও সে দাঁড়িয়েই রইল।
বাতাসে তার ওড়নাটা উড়ছে।
সে ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে এসে দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের সামনে দাঁড়াল।
আজকের তারিখটায় লাল কলম দিয়ে ছোট্ট একটা গোল চিহ্ন দেওয়া।
নিজের হাতেই কয়েকদিন আগে এঁকেছিল।
আস্তে করে তারিখটার ওপর হাত বুলিয়ে বলল—
— মনে থাকলে ভালোই লাগতো...
তারপর নিজেই হেসে ফেলল।
— মানুষটা এমনই। সব ভুলে যায়।
রান্নাঘরে গিয়ে বাসন ধোয়া শুরু করল।
কাজ করতে করতে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়তে লাগল।
বিয়ের পর প্রথম জন্মদিন...
সকালে উঠে দেখেছিল, বালিশের পাশে একটা লাল গোলাপ।
তার সঙ্গে ছোট্ট একটা কাগজ।
তাতে লেখা ছিল—
"আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উপহার তুমি।"
সেই কাগজটা আজও সে যত্ন করে আলমারির ভেতর রেখে দিয়েছে।
হঠাৎ তার চোখ ভিজে উঠল।
সে নিজেকেই বলল—
— আজকে কি সত্যিই ভুলে গেল... নাকি চমক দিবো?
একবার মোবাইলটা হাতে নিল।
ভাবল, ফোন করে একটু ইঙ্গিত দেয়।
আবার নিজেই রেখে দিল।
— না... দেখি, নিজে নিজেই মনে করে কি না।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
দেয়ালের ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে নয়টা।
আর কোথাও একজন স্ত্রী, নীরবে একজন মানুষের একটি ফোনের অপেক্ষা করতে শুরু করল।স্বামী বাড়ি থেকে বের হয়ে হাঁটছে। সকালের রোদ তখনও খুব একটা তেজি হয়নি। রাস্তার ধারে কয়েকজন চায়ের দোকানে বসে খবরের কাগজ পড়ছে। কেউ চা খাচ্ছে, কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে।
চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দোকানদার চাচা ডাক দিলো—
— আরে বাবা, এক কাপ চা খাইয়া যাও।
সে হেসে বলল—
— আজ আর না চাচা। দেরি হইয়া গেছে।
— অফিসের মানুষদের দেরিই বেশি হয়।
— কি আর করমু!
হেঁটেই মূল সড়কে এসে একটা রিকশায় উঠল।
রিকশা এগোতে লাগল।
চারপাশে দোকানগুলো একে একে খুলছে। ফলের দোকানে তাজা লিচু, আম আর কলা সাজানো। রাস্তার পাশে স্কুলপড়ুয়া বাচ্চারা ইউনিফর্ম পরে দল বেঁধে হাঁটছে।
রিকশায় বসে সে মোবাইল বের করল।
অনেকগুলো নোটিফিকেশন।
অফিসের গ্রুপে একের পর এক মেসেজ।
ম্যানেজারের লেখা—
"সবাই ১০টার আগেই মিটিং রুমে উপস্থিত থাকবেন।"
স্বামী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আজকে আবার মিটিং!
কিছুক্ষণ পর অফিসের সামনে এসে রিকশা থামল।
ভাড়া দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই গার্ড সালাম দিল।
— আসসালামু আলাইকুম ভাই।
— ওয়ালাইকুম সালাম।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, সময়মতোই পৌঁছেছে।
নিজের ডেস্কে বসে কম্পিউটার চালু করতেই পাশের ডেস্ক থেকে সহকর্মী রাশেদ বলল—
— কি ভাই! আজ অনেক ফ্রেশ লাগতেছে।
— কই?
— ভাবি কি সকালে বিশেষ নাস্তা খাওয়াইছে নাকি?
সে হেসে বলল—
— আরে না। প্রতিদিন যেমন, আজও তেমন।
আরেক সহকর্মী সোহেল এসে বলল—
— চলেন, আগে এক কাপ কফি।
— না ভাই, মিটিং আছে।
— মিটিং তো থাকবেই। কফি না খাইলে ঘুম কাটবো কেমনে?
তিনজন মিলে ক্যান্টিনে গেল।
কফির কাপ হাতে নিয়ে গল্প শুরু হলো।
রাশেদ বলল—
— ভাই, বিয়ার পরে জীবন কেমন?
সে হেসে বলল—
— সংসার সুন্দর... তবে ভুল করলে খবর আছে।
সবাই হেসে উঠল।
সোহেল বলল—
— ভাবি রাগ করে?
— খুব বেশি না... তবে চুপ থাকলে বেশি ভয় লাগে।
— এইডা ঠিক কইছেন।
এমন সময় অফিসের পিয়ন এসে বলল—
— স্যার ডাকছেন। মিটিং শুরু হবে।
সবাই দ্রুত মিটিং রুমে ঢুকে পড়ল।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কাজের পরিকল্পনা, নতুন প্রকল্প আর লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা চলল।
মিটিং শেষ হতে হতে সবারই ক্লান্ত অবস্থা।
নিজের ডেস্কে ফিরে ফাইল খুলতেই রাশেদ আবার পাশে এসে দাঁড়াল।
— ভাই...
— হুম?
— একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
— কও।
— আজকে ভাবির জন্মদিন না?
কথাটা শুনেই তার হাত থেমে গেল।
মাউসের ওপর রাখা আঙুলটা যেন জমে গেল।
চোখ বড় হয়ে গেল।
মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— কি... কি কইলা?
রাশেদ অবাক হয়ে বলল—
— আরে! গত বছর তো কেক আনছিলেন। সবাইকে খাওয়াইছিলেন। তাই মনে আছিল।
স্বামীর বুকটা ধক করে উঠল।
মুহূর্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সকালের সব ঘটনা—
স্ত্রীর বারবার জিজ্ঞেস করা—
"আজ কে জানি কই তারিখ?"
"আজকের দিনটা কেমন মনে হইতেছে?"
"আর কিছু?"
সে নিজের কপালে হাত দিয়ে ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল।
মনে মনে বলল—
— ইয়া আল্লাহ...! আমি সত্যিই ভুলে গেছি!
ঠিক তখনই তার মোবাইলের স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
স্ক্রিনে স্ত্রীর নাম।
কিন্তু কোনো কল নয়...
শুধু একটি ছবি।
দু'জনের একসঙ্গে তোলা হাসিমাখা একটি পুরোনো ছবি, যেটা সে ওয়ালপেপার হিসেবে অনেক আগেই সেট করেছিল।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
সে আস্তে করে ফিসফিস করল—
— আজকে যাই হোক... ওর মুখে হাসি ফিরাইতেই হইবো।অফিসের চেয়ারে বসে আছে সে। সামনে কম্পিউটারের স্ক্রিনে ফাইল খোলা, কিন্তু চোখ দুটো সেখানে নেই।
মনে শুধু একটাই কথা—
"আমি কীভাবে এমন একটা দিন ভুলে গেলাম!"
সে একবার মোবাইলের দিকে তাকাল।
সময় সকাল ১১টা ২০।
মনে হলো এখনই ফোন দেয়।
আবার ভাবল—
"এখন ফোন দিলে বুঝে যাবে আমি ভুলে গিয়েছিলাম।"
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই রাশেদ এসে পাশে বসল।
— কী ভাই? মুখটা এমন ক্যান?
স্বামী ধীরে বলল—
— বড় ভুল কইরা ফেলছি।
— কী হইছে?
— আজ ওর জন্মদিন... আমি একদমই মনে রাখি নাই।
রাশেদ হেসে বলল—
— এইটাই নাকি! এইডা ঠিক করা যায়।
— কেমনে?
— অফিস শেষ হইলেই ফুল, কেক, একটা সুন্দর শাড়ি—সব কিনেন। তারপর একটা সারপ্রাইজ দেন।
এতে সে মাথা নাড়ল।
— কিন্তু ও অনেক কষ্ট পাইছে মনে হয়।
— কষ্ট পাইছে বলেই তো খুশিও বেশি হইবো।
কথাটা শুনে তার মনে একটু সাহস এল।
সে সিদ্ধান্ত নিল, আজ অফিস থেকে সোজা বাসায় যাবে না।
আগে বাজারে যাবে।
এদিকে...
ছোট্ট বাসাটায় তখন একা বসে আছে স্ত্রী।
সব কাজ শেষ। ঘর ঝাড়ু দেওয়া হয়েছে। রান্নাও প্রায় শেষ। তবু আজ কোনো কাজেই মন বসছে না। বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। বারবার মোবাইল হাতে নিচ্ছে। আবার রেখে দিচ্ছে। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে লেখা—
"মা কলিং..."
সে দ্রুত ফোন ধরল।
— আসসালামু আলাইকুম, মা।
— ওয়ালাইকুম সালাম মা। কেমন আছস?
— আলহামদুলিল্লাহ।
— শুভ জন্মদিন মা।
এতে অনামিকার মুখে ছোট্ট হাসি ফুটল।
— ধন্যবাদ, মা।
— জামাই কি সকালেই শুভেচ্ছা দিছে?
এক মুহূর্তের জন্য সে চুপ করে রইল।
তারপর হেসে বলল—
— হ... দিছে।
মিথ্যা কথাটা বলতে গিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।
মা আবার বললেন—
— আল্লাহ তোদের সুখে রাখুক।
— আমিন।
ফোনের শেষে অনামিকা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল—
— মিথ্যা কইলাম...
ঠিক তখনই আবার ফোন।
এবার তার কলেজের বান্ধবী।
— হ্যালো! শুভ জন্মদিন!
— ধন্যবাদ।
— আজকে কী প্ল্যান?
— কিছু না।
— দুলাভাই নিশ্চয়ই বাইরে নিয়া যাইবো?
অনামিকা মৃদু হেসে বলল—
— দেখা যাক।
আর কিছুক্ষণ গল্প করে ফোন রেখে দিল।
একটার পর একটা শুভেচ্ছা আসতে লাগল।
ফেসবুকে নোটিফিকেশন।মেসেঞ্জারে মেসেজ।হোয়াটসঅ্যাপে শুভেচ্ছা।
কিন্তু...যার ফোনটার জন্য সে সকাল থেকে অপেক্ষা করছে… সেই মানুষটার কোনো খবর নেই। সে ধীরে ধীরে উঠে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আলমারির ভেতর থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করল। বাক্সটার ভেতরে অনেক যত্ন করে রাখা আছে— একটা শুকিয়ে যাওয়া লাল গোলাপ। একটা ছোট্ট শুভেচ্ছা কার্ড। আর একটা ছবি। ছবিটা হাতে নিয়ে সে মৃদু হেসে বলল—
— আগে তো এক সপ্তাহ আগ থেকেই প্ল্যান করতা...
— এহন একটা "শুভ জন্মদিন" কথাটাও মনে নাই…
(অনামিকা নিতান্ত অতি অল্পতেই কান্না করে)
তার চোখের কোণে জল চিকচিক করতে লাগল।
সে দ্রুত হাতের আঁচল দিয়ে মুছে ফেলল।
নিজেকেই বলল—
— না... কাঁদলে চলবো না।
— হয়তো অফিসে অনেক ব্যস্ত।
— হয়তো ভুলে যায় নাই...
— হয়তো সন্ধ্যায় আইসা চমক দিবো...
এই "হয়তো" শব্দটাই তাকে এখনো আশা ছাড়তে দিচ্ছে না। কিন্তু অপেক্ষা যত দীর্ঘ হচ্ছে...
অভিমানটাও তত গভীর হয়ে উঠছে।
অন্য দিকে শিহাবের অফিসের ঘড়িতে তখন দুপুর একটা। লাঞ্চ ব্রেক শুরু হয়েছে। সবাই একে একে ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু শিহাব নিজের চেয়ারেই বসে আছে। সামনে খাবারের বক্স খোলা, তবুও এক লোকমাও মুখে তুলতে পারছে না।
রাশেদ এসে কাঁধে হাত রাখল।
— খাইতেছো না ক্যান?
— খিদাই লাগতেছে না।
— আরে ভাই। ডোন্ট ওয়ারি।
শিহাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
— বুঝতেছি না, কি করা উচিত।
— আগে একটা হিসাব করো। হাতে কত টাকা আছে?
সে মানিব্যাগ খুলল।
এক হাজার টাকার কয়েকটা নোট, কিছু খুচরা।
গুনে দেখল—
— তিন হাজার ছয়শো আশি টাকা।
রাশেদ বলল—
— শাড়ি, কেক, ফুল—এই টাকায় হবে?
— ভালো একটা শাড়ি কিনতে গেলে টান পড়বো।
ঠিক তখনই সোহেলও এসে বসল।
— কী আলোচনা?
রাশেদ সব খুলে বলল।
শুনে সোহেল হেসে বলল—
— এইটুকু নিয়া এত চিন্তা!
— চিন্তা না কইরা উপায় আছে?
— টাকা কম হইলে আমার কাছ থেইকা নিয়া নিও। মাস শেষে দিয়ো।
স্বামী মাথা নাড়ল।
— না ভাই, দেখি আগে।
সোহেল হেসে বলল—
— বন্ধুর কাছে টাকা নেওয়ায় লজ্জা কিসের?
রাশেদ যোগ করল—
— আজ ভাবির হাসিটাই আসল। টাকার হিসাব পরে কইরো।
কথাগুলো শুনে শিহাবের বুকটা হালকা হয়ে গেল।
সে মনে মনে ঠিক করল—
আজকের দিনটা কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। দুপুরের কাজ শেষ করেও তার মন বসছে না।প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। বিকেল পাঁচটা বাজতেই সে দ্রুত কম্পিউটার বন্ধ করল। ম্যানেজারের রুমে গিয়ে বলল—
— স্যার, আজ একটু জরুরি কাজ আছে।
ম্যানেজার হেসে বললেন—
— যান। কাল বাকি কাজ শেষ করবেন।
— ধন্যবাদ, স্যার। অফিস থেকে বের হয়েই বাজারের দিকে রওনা দিল।
রাস্তার দুই পাশে সারি সারি দোকান।
কোথাও মানুষের ভিড়, কোথাও বিক্রেতার হাঁকডাক। প্রথমে তারা গেল ফুলের দোকানে। দোকানজুড়ে লাল, সাদা, হলুদ, গোলাপি—নানারঙের ফুল। দোকানদার এগিয়ে এসে বলল—
— কী লাগবে ভাই?
শিহাব কিছুক্ষণ চারপাশে তাকিয়ে বলল—
— সুন্দর একটা গোলাপের তোড়া বানাইয়া দেন।
— কয়টা ফুল দিব?
সে একটু ভেবে বলল—
— বারোটা।
রাশেদ হেসে বলল—
— বারোটা ক্যান?
— জন্মদিন। একটা ডজন গোলাপই ভালো লাগবো। দোকানদার যত্ন করে তোড়াটা বানাতে লাগল। লাল গোলাপের ফাঁকে সাদা ছোট ছোট ফুল। সবুজ পাতা দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে রিবন বেঁধে দিল। তোড়াটা হাতে নিয়ে শিহাব কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ল...
বিয়ের পর প্রথমবারও সে এমনই এক তোড়া নিয়ে গিয়েছিল। তখন স্ত্রী লজ্জায় কিছুই বলতে পারেনি। শুধু ফুলগুলো বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে মুচকি হেসেছিল। স্মৃতিটা মনে পড়তেই তার ঠোঁটেও হাসি ফুটল।
বাজারের আলো তখন একে একে জ্বলতে শুরু করেছে। সন্ধ্যা নামছে। আর কোথাও...
একটা ছোট্ট বাড়িতে শিহাবের স্ত্রী অনামিকা এখনও দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবছে—
"আজ কি সত্যিই সে ভুলে গেছে... নাকি….?"
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা যেন বিদায় নেওয়ার আগে শেষবারের মতো চারপাশটাকে সোনালি রঙে রাঙিয়ে দিচ্ছে। বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনামিকা রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। দেয়ালের ঘড়িতে তখন বিকেল পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল লিস্ট খুলল। স্বামীর নামটা সবার ওপরে।
একবার আঙুল গেল কল বাটনের দিকে। আবার থেমে গেল। নিজের মনেই বলল—
— না... আমি ফোন দিমু না।
— যদি সত্যিই ভুলে গিয়া থাকে, তাইলে ফোন দিয়া মনে করাইয়া দেওয়ার কোনো মানে হয় না। সে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে হালকা বাতাস বইছে।
দূরের বাঁশঝাড় দুলছে। ঠিক তখনই আবার ফোন বেজে উঠল। এবার তার ছোট ভাই।
— আপু, শুভ জন্মদিন!
— ধন্যবাদ ।
ফোন রেখে সে রান্নাঘরে গেল। চুলার ওপর হাঁড়িতে ভাত গরম হচ্ছে।
ডাল ফুটছে। আজ সে স্বামীর প্রিয় গরুর মাংস রান্না করেছে। মাংস নাড়তে নাড়তে মনে পড়ল— "গত বছরও এই রান্নাটাই করছিলাম..."
এদিকে...
বাজারে কেকের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে শিহাব। কাঁচের ভেতর সারি সারি কেক সাজানো। চকলেট। ভ্যানিলা। রেড ভেলভেট। ব্ল্যাক ফরেস্ট।
দোকানদার হাসিমুখে এগিয়ে এল।
— কী ধরনের কেক লাগবে ভাই?
স্বামী কেকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে পড়ে গেল—
একদিন স্ত্রী হেসে বলেছিল,
— আমার চকলেট কেক খুব পছন্দ।
সে সঙ্গে সঙ্গে বলল—
— এক কেজির একটা চকলেট কেক দেন।
— দিচ্ছি, তবে কী লিখব?
স্বামী একটু চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল—
— লিখেন...
"শুভ জন্মদিন, আমার পৃথিবী।"
কেক কেনা শেষ। এবার বাকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস… উপহার। শাড়ির কেনা । বাজারের ভেতর আরও একটু সামনে এগিয়ে গেল।একটা বড় কাপড়ের দোকানের সামনে এসে থামল।কাঁচের ভেতরে নানারঙের শাড়ি সাজানো। নীল, লাল, মেরুন, সবুজ, হালকা গোলাপি।
শিহাব দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু একটাই কথা ভাবছে—
"ওর মুখে কোন রঙটা সবচেয়ে বেশি মানায়?"
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল...
দোকানের এক কোণে ভাঁজ করে রাখা একটা আকাশি-নীল শাড়ির ওপর।
অনামিকা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। স্বামীর নম্বরে কল দিল।
একবার...
দুইবার...
তিনবার…
তবে ধরল না। সে আবার কল দিল। এবারও একই অবস্থা। ফোনটা ধীরে ধীরে বিছানার ওপর রেখে দিল। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি আসার পূর্ণ আবাশ। ঘরের ভেতর এক জোড়া অপেক্ষারত চোখ। তখন শিহাব ফিরছে বাসার দিকে -হাতে একটা কেক,একটা নীল শাড়ি নিয়ে। শেষ পর্যন্ত বাড়ির সামনে এসে সে থমকে পৌছাল। দেখল, ঘরের জানালায় আলো জ্বলছে। শিহাব গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল। তারপর ধীরে ধীরে দরজায় নক করল।
টক... টক...
ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। আবার নক করল।
টক... টক... টক...
কিছুক্ষণ পর স্ত্রীর কণ্ঠ শোনা গেল—
— কে?
স্বামী ইচ্ছে করেই একটু দুষ্টুমি করল।
— আমি...
— আমি কে?
— দরজা খুললেই দেখবা।
ভেতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল—
— দরজা খুলার দরকার নাই।
স্বামী হেসে ফেলল।
— এত রাগ?
— রাগ না।
— তাইলে?
— কথা কইতে ইচ্ছা করতেছে না।
— পাঁচ মিনিটের জন্য দরজাটা খোলো।
— পাঁচ মিনিটও না।
— দুই মিনিট?
— না।
— এক মিনিট?
— না।
স্বামী বলছে— ঝির ঝির বৃষ্টিতে প্রায় ভিজে গিয়েছি।বলা যায়,ভেজা কাপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
অনামিকা নরম গলায় বলল—
— জানো... আজ অফিসে সারাদিন নিজের উপরই রাগ হইছে।
ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না।
( এতক্ষণে বাইরে দিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে।)
অনামিকা দরজা খুলছে। আর বলছে—
— এতক্ষণে আসার সময় হইলো?
স্বামী মাথা নিচু করে বলল—
— দেরি হইয়া গেছে।
— শুধু দেরি?
— না...
ভুলও হইছে।
— জানো, আমি কয়বার ফোন দিছি?
— জানি।
— জানো?
— ফোন দেখছি।
— ধরলা না ক্যান?
স্বামী একটু চুপ করে রইল।বলল- বাজারে ছিলাম। তারপর কেকের বাক্সটা সামনে এনে বলল—
—তোমার জন্য উপহার।
— আমার উপহার লাগবো না।
ঠিক তখনই আবার বিদ্যুৎ চলে গেল।
পুরো ঘর অন্ধকার।
স্ত্রী বলল—
— আরে... আবার কারেন্ট গেল!
স্বামী হাসতে হাসতে বলল—
— সমস্যা নাই।
এই অন্ধকারও আজ আমাদের পক্ষে।
সে ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট মোমবাতি বের করল।
স্ত্রী অবাক।
— তুমি আবার মোমও আনছো?
— শুধু মোম না...
অনেক কিছুই আনছি।
লাইটার দিয়ে মোম জ্বালাতেই ছোট্ট হলুদ আলোয় ঘরটা ভরে উঠল। সেই আলোয় স্ত্রীর মুখটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। স্বামী কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইল।
স্ত্রী লজ্জা পেয়ে বলল—
— কি দেখতেছো?
— মনে হইতেছে...
মোমবাতি না জ্বইলা...
তোমার মুখটাই আলো দিতেছে।
স্ত্রী মুখ ঘুরিয়ে মুচকি হেসে ফেলল।
— অনেক নাটক শিখছো দেখি।
শিহাব কেকের বাক্সটা টেবিলের ওপর রাখল। ধীরে ধীরে ঢাকনাটা খুলল।
চকলেট কেক। সাদা ক্রিমের ওপর সুন্দর করে লেখা— "শুভ জন্মদিন, আমার পৃথিবী।" লেখাটা দেখেই অনামিকা বিষ্মৃত হলো এবং সে কেকের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল—
— এইটা... আমার জন্য?
— আর কার জন্য হইবো?
— তুমি সকালে কিছুই বললা না...
আমি ভাবছিলাম...
শিহাব তার কথা শেষ হতে দিল না।
এক পা সামনে এগিয়ে এসে বলল—
— ভুলে যাই নাই।
একটুও না।
শিহাব একটা ছুরি হাতে নিয়ে বলল—
— কেক কাটবা?
অনামিকা মাথা নাড়ল।
— একা না।
— তাইলে?
— একসাথে।
শিহাব তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। দু'জনে একসঙ্গে কেক কাটল।
কেক কাটার পর শিহাব ছোট্ট একটা টুকরো তুলে স্ত্রীর দিকে বাড়িয়ে দিল। তারপর সেও একটা টুকরো তুলে দিল।
শিহাবের কাছে থাকা আরেকটা প্যাকেট এখনও খোলা হয়নি। স্ত্রী কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলল—
— ওই প্যাকেটটার মধ্যে কি আছে?
স্বামী শুধু রহস্যময় একটা হাসি দিল।
— এইটা...
আজকের রাতের সবচেয়ে সুন্দর সারপ্রাইজ।অনামিকা বারবার সেই প্যাকেটটার দিকে তাকাচ্ছে।
কৌতূহল আর ধরে রাখতে পারল না।
— আচ্ছা... এখন তো কও, ওইটার মধ্যে কী আছে?
স্বামী প্যাকেটটা দু'হাতে তুলে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
— খুলে দেখো।
স্ত্রী অবাক হয়ে বলল—
— আমি খুলমু?
— হুম। তোমার জিনিস তুমি খুলবা না তো কে খুলবো?
সে ধীরে ধীরে খুলল। খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক অপূর্ব নীল শাড়ি।একদম আকাশের মতো নীল। পাড়ে সাদা সূক্ষ্ম নকশা।সে শুধু শাড়িটার ওপর হাত বুলাচ্ছে। তারপর খুব আস্তে বলল—
— এইটা... আমার জন্য?
স্বামী মুচকি হেসে বলল—
— না, পাশের বাসার আন্টির জন্য।
স্ত্রী চোখ বড় বড় করে তাকাল।
— একদম ফাজিল হইছো।
স্বামী হেসে উঠল।
— তোমার জন্যই আনছি।
— মনে আছে?
— কী?
— একদিন রিকশায় যাইতেছিলাম...
তুমি বলছিলা,তোমার নীল পাঞ্জাবির সাথে যদি আমার নীল শাড়ি থাকতো।আমি তখন কিছু বলি নাই। কিন্তু কথাটা মনে রাখছিলাম।
তারপর স্ত্রী আস্তে করে বলল—
— একটা কথা কই?
— কও।
— শাড়িটা...
এখনই পরতে ইচ্ছা করতেছে।
স্বামী হেসে বলল—
— আমিও তাই বলি।
স্ত্রী— ঐ... শোনছো?
স্বামী হেসে ফেলল।
— হ্যাঁ, শোনছি। কও।
— একটু এইদিকে আসবা?
— ক্যান?
— শাড়ির আঁচলটা ঠিক হইতেছে না।
আঁচলটা বারবার কাঁধ থেকে পড়ে যাচ্ছে।
স্ত্রী একটু লজ্জা পেয়ে বলল—
— হাসবা না কিন্তু।
স্বামী — হাসুম না।
স্ত্রী — আঁচলটা ঠিক করে ধরো।
শিহাব— একটা কথা বলি?
— বলো।
— মনে হইতেছে...
আকাশটা আজ শাড়ি পরে আমার সামনে দাঁড়ায়া আছে।
স্ত্রী হেসে ফেলল।
— এত সুন্দর কথা কইতে শিখলা কবে?
— যেদিন থেইকা তোমারে ভালোবাসতে শিখছি।
স্ত্রী ধীরে ধীরে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
— জানো...
আজকের সবচেয়ে দামি উপহার শাড়িটা না।
— তাইলে?
— এই যে...
আমি যা যা বলি, তুমি সব মনে রাখো।
এই অনুভূতিটাই সবচেয়ে বড় উপহার।
আনামিকা— জানালার দিকে তাকিয়ে বলল—
— চল?
— কোথায়?
— সেই মাঠে...
যেখানে আমরা বৃষ্টিতে ভিজার কথা বলছিলাম।
শিহাব— তাই বলে রাতে?
— রাতে বলতে। কয়টা বাজে?
শিহাব — ৮টা৫৫
—থাক, চাইতেই হবে।
শিহাব — আচ্ছা, চল… তবে বারান্দায়। অন্য কোন এক সময় বাইরে যাইমো। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, হালকা বাতাস। খোলা চুল, কপালে টিপ। বারান্দার কার্নিশ বেয়ে ঝরনার মতো পানি পড়ছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি।
শিহাব চুপচাপ তাকিয়ে রইছে।
স্ত্রী হেসে বলল—
— কী দেখতেছো?
স্বামী বলল—
— কিছু না।
— কিছু না মানে?
— কিছুই না।
স্বামী- ভাবছিলাম... তোমারে নিয়ে পার্কে হাঁটমু, আইসক্রিম খামু, অনেক ছবি তুলমু। কিন্তু…
স্ত্রী— আস্তে করে তার হাতটা ধরল।
স্ত্রী- একটা কথা কই?
শিহাব - হুম।
স্ত্রী- তুমি এখনও বুঝলা না?
স্বামী- কী?
স্ত্রী- আমি কোথায় ঘুরতেছি, সেইটা আমার কাছে বড় না।
আমি কার সাথে ঘুরতেছি, সেইটাই বড়।
শিহাব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে স্ত্রীর হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
শিহাব- তাইলে... আমার এত চিন্তা করা লাগল ক্যান?
স্ত্রী- কারণ তুমি ভালোবাসো।
আর ভালোবাসার মানুষরা সবসময় ভাবে, "আরও ভালো কিছু করা যাইত।"
কিন্তু জানো?
সবচেয়ে দামি উপহার কখনোই সবচেয়ে দামী জিনিস না। সবচেয়ে দামি উপহার হলো—সময়। আজকে তুমি আমার পাশে আছো। এইটাই যথেষ্ট। শিহাব মৃদু হেসে বলল—
তবুও মনে হইতেছে তোমার জন্মদিনটা ঠিকমতো উদযাপন করতে পারলাম না।
স্ত্রী- কে কইছে?
শিহাব- আমি।
স্ত্রী- আচ্ছা, আমারে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।
শিহাব- আচ্ছা, প্রশ্নটা কি?
স্ত্রী- যদি আজকে তোমার কোন ব্যস্ততা না থাকতো। কিংবা যদি বৃষ্টি না আসতো। তবে হয়তো বাইরে গিয়া কোনো রেস্টুরেন্টে বসতাম। এতে কি এই বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাইতাম?
শিহাব- না।
স্ত্রী- এই ঠান্ডা বাতাসটা অনুভব করতে পারতাম?
শিহাব- না।
স্ত্রী- এইভাবে তোমার কাঁধে মাথা রাখার সুযোগ পাইতাম?
শিহাব মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
শিহাব- হয়তো না।
কিছুক্ষণ পর স্ত্রী আস্তে করে বলল—
স্ত্রী- জানো... ছোটবেলায় ভাবতাম জন্মদিন মানেই অনেক মানুষ, অনেক আয়োজন, অনেক উপহার।
শিহাব বলল—ভিতরে যাইবা?
স্ত্রী- না।
শিহাব-জ্বর/ ঠান্ডা লাগবো।
স্ত্রী- লাগুক।
এই মুহূর্তটার জন্য যদি একটু ঠান্ডাও লাগে...তবুও আফসোস থাকবো না।
কারণ... সব জন্মদিনে এমন বৃষ্টি থাকে না… আর সব বৃষ্টিতে এমন একজন মানুষও পাশে থাকে না।
—কাজেই জ্বর আইলে আইবো
শিহাব আস্তে করে তার কপাল থেকে ভেজা চুল সরিয়ে দিল।
— একটা প্রতিশ্রুতি দিবা?
— কী?
— কোনোদিন যদি আমি আবার ভুল করি...
রাগ করবা।
অভিমানও করবা।
কিন্তু আমার হাতটা ছাড়বা না।
স্ত্রী কিছু না বলে তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
— এইটাই উত্তর।
বৃষ্টিও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল।
আকাশের এক কোণে মেঘ সরে ছোট্ট একটা তারা দেখা দিল।স্ত্রী আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল— দেখো...
হয়তো আবার খুনসুটি হবে। আবার ছোট ছোট অভিমান হবে।
আবার মান-অভিমান ভেঙে হাসি ফিরবে।
কারণ… সংসার বড় বড় উপহারে নয়,
বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন, স্মৃতি, ক্ষমা আর ভালোবাসায় বেঁচে থাকে।