✦মহানবীর﷽জীবনী✦
পর্ব ৭: খিলাফতে রাশেদার সূচনা, আবু বকরের যুগ, রিদ্দা যুদ্ধসমূহ, কুরআন সংকলন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রসার (হিজরি ১১ থেকে হিজরি ১৩ পর্যন্ত)
নবীজি ﷺ-এর ইন্তেকালের পর মদিনায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সাহাবীরা একত্রিত হয়ে সাকীফা বনু সাঈদায় বৈঠক করেন। আনসাররা তাদের নেতৃত্ব চান, কিন্তু আবু বকর সিদ্দীক (রা.), উমর (রা.) এবং আবু উবাইদা (রা.)-এর যুক্তিতে সিদ্ধান্ত হয় যে খিলাফত কুরাইশদের মধ্যে থাকবে। আবু বকর (রা.) প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন। তিনি সাহাবীদের উদ্দেশে ভাষণ দেন: “আমি তোমাদের উপর শাসক নই, বরং তোমাদের সেবক। যদি সঠিক পথে চলি তাহলে সাহায্য করো, ভুল হলে সংশোধন করো।” এই নির্বাচন ইসলামী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রথম উদাহরণ।
আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকাল ছিল মাত্র দুই বছর কয়েক মাস, কিন্তু এ সময়ে ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত হয়। নবীজি ﷺ-এর ইন্তেকালের খবর ছড়িয়ে পড়লে আরবে বিদ্রোহ দেখা দেয়। অনেক গোত্র জাকাত দিতে অস্বীকার করে, কেউ নবুওয়ত দাবি করে (মুসাইলিমা কাজ্জাব, তুলাইহা প্রমুখ)। এগুলোকে রিদ্দা যুদ্ধ বলা হয়। আবু বকর (রা.) দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন যে জাকাত ইসলামের রুকন, কোনো আপোস নয়।
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করা হয়। প্রথমে মুসাইলিমার বিরুদ্ধে ইয়ামামার যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে অনেক হাফিজে কুরআন শহীদ হন। খালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের পরাজিত করা হয়। তুলাইহা, সাজাহ প্রমুখকে দমন করা হয়। বাহরাইন, ওমান, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চলে। এ যুদ্ধগুলোতে ইসলামী সেনাবাহিনীর কৌশল, ঘোড়ার ব্যবহার এবং নৈতিকতা দেখা যায়। যুদ্ধবন্দীদের সাথে উত্তম আচরণ করা হয় এবং অনেকে ইসলাম গ্রহণ করে।
রিদ্দা যুদ্ধের সময় আবু বকর (রা.)-এর দূরদর্শিতা প্রকাশ পায়। তিনি বলতেন, “যদি আমরা এখন দুর্বলতা দেখাই তাহলে ইসলাম ধ্বংস হয়ে যাবে।” খালিদ (রা.)-এর সাথে অন্য সেনাপতি যেমন ইকরিমা, শুরাহবিল প্রমুখও অসাধারণ ভূমিকা রাখেন। এ যুদ্ধগুলো শেষ হওয়ার পর আরব উপদ্বীপ পুরোপুরি ইসলামের অধীনে আসে।
এ সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয় কুরআন সংকলন। ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক হাফিজ শহীদ হওয়ায় উমর (রা.) আবু বকর (রা.)-কে পরামর্শ দেন যে কুরআন একত্রিত করা দরকার। আবু বকর (রা.) প্রথমে দ্বিধায় পড়েন কারণ নবীজি ﷺ এমন কাজ করেননি। কিন্তু উমর (রা.)-এর যুক্তিতে রাজি হন। জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি লিখিত আয়াত, হাফিজদের স্মৃতি এবং সব প্রমাণ যাচাই করে একত্রিত করেন। এ সংকলন চামড়া, হাড়, পাতায় লেখা হয়। এটি ছিল কুরআনের প্রথম মুসহাফ। পরবর্তীকালে উসমান (রা.)-এর যুগে এর কপি বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।
আবু বকর (রা.)-এর যুগে প্রশাসনিক সংস্কারও হয়। তিনি বিভিন্ন প্রদেশে গভর্নর নিয়োগ করেন। অর্থনীতিতে জাকাত, উশর, ফাই, গনিমতের সঠিক বিতরণ নিশ্চিত করেন। দরিদ্রদের জন্য বাইতুল মাল প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি নিজে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। একবার খাদ্যের অভাবে তিনি উটের দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর খিলাফতকালে ইসলামী আইনের প্রয়োগ শুরু হয়।
রিদ্দা যুদ্ধের পর ইরাক ও সিরিয়ার দিকে অভিযান শুরু হয়। খালিদ (রা.) ইরাকে ফারসি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। হিরা, আনবার প্রভৃতি অঞ্চল জয় হয়। সিরিয়ায়ও অগ্রগতি ঘটে। এ অভিযানগুলোতে মুসলিম সেনাবাহিনীর নৈতিকতা, যুদ্ধকৌশল এবং স্থানীয় জনগণের সাথে আচরণ ইসলামের আকর্ষণ বাড়ায়। অনেক খ্রিস্টান ও ইহুদি মুসলিমদের ন্যায়পরায়ণতা দেখে ইসলাম গ্রহণ করে।
আবু বকর (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়লে উমর (রা.)-কে পরবর্তী খলিফা নিয়োগের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, “আমি যদি ভুল করি তাহলে তোমরা সংশোধন করো।” ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর দাফন নবীজি ﷺ-এর পাশে হয়। তাঁর খিলাফতকাল ছিল সংকটময় কিন্তু তিনি ইসলামী রাষ্ট্রকে সংহত করেন।
এ সময়কার আরও বিস্তারিত ঘটনা: বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদল মদিনায় আসে। আবু বকর (রা.) তাদের ইসলামের শিক্ষা দিতেন। মহিলা সাহাবীরা যেমন আসমা বিনতে আবু বকর (রা.), উম্মে সালামা (রা.) পরামর্শ দিতেন। দাসমুক্তির হার বৃদ্ধি পায়। শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকে। কুরআন তেলাওয়াত ও হাদিস চর্চা অব্যাহত থাকে।
রিদ্দা যুদ্ধের কৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যায় খালিদ (রা.)-এর দ্রুত গতিবিধি, গুপ্তচর ব্যবস্থা এবং স্থানীয় মিত্রদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন অসাধারণ ছিল। ইয়ামামার যুদ্ধে মুসাইলিমার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুসলিমদের ত্যাগ অবিস্মরণীয়। এ যুদ্ধে কুরআনের সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়।
আবু বকর (রা.)-এর ব্যক্তিগত জীবন ছিল সরল। তিনি নবীজি ﷺ-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ছিলেন। হিজরতে তাঁর সাথে থেকে তিনি প্রমাণ করেছিলেন আল্লাহর উপর ভরসা। তাঁর খিলাফতে ইসলামের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি পায় যা পরবর্তী যুগের বিজয়ের ভিত্তি হয়।
এ পর্বে আরও উল্লেখযোগ্য যে, আবু বকর (রা.)-এর সময়ে বিভিন্ন প্রদেশে বিচারক নিয়োগ, কর ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেনাবাহিনীর সংগঠন এবং দাওয়াতি কাজ অব্যাহত থাকে। অনেক নতুন মুসলিম ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করে। এ যুগে কোনো বড় অভ্যন্তরীণ বিভেদ হয়নি কারণ খলিফার ন্যায়পরায়ণতা এবং সাহাবীদের ঐক্য।
উমর (রা.)-এর খিলাফতের সূচনা হয় আবু বকর (রা.)-এর মৃত্যুর পর। তিনি আরও বিস্তৃত অভিযান পরিচালনা করবেন পরবর্তী পর্বে। এ সময়কাল প্রমাণ করে যে নবীজি ﷺ-এর উত্তরাধিকারীরা কীভাবে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। প্রতিটি সিদ্ধান্তে শূরা (পরামর্শ), ন্যায় এবং তাকওয়া প্রাধান্য পেয়েছে।
🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
