Posts

ফিকশন

পৃথিবী সৃষ্টি

July 8, 2026

Md Josam

Original Author Md Shamim Skder

Translated by Md Shamim Skder

3
View

পৃথিবী সৃষ্টি
আল্লাহ তা'আলার অসীম কুদরতের এক অপূর্ব প্রকাশ হলো এই বিশাল পৃথিবী। এই মহাবিশ্বের অগণিত নক্ষত্র, গ্রহ, ছায়াপথের মাঝে আমাদের এই ছোট্ট গ্রহটি যেন একটি অলৌকিক নিদর্শন। আজকের এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব পৃথিবীর সৃষ্টির রহস্য, আল্লাহর সৃষ্টির উদ্দেশ্য, কীভাবে তিনি এই সৃষ্টি সম্পন্ন করলেন এবং সৃষ্টির পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় বর্ণনা নয়, বরং মানুষের জীবনের অর্থ, উদ্দেশ্য এবং দায়িত্বের এক গভীর অনুসন্ধান। পড়তে যেন এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে, তাই বিস্তারিতভাবে, আয়াত, হাদিস এবং চিন্তাশীল ব্যাখ্যাসহ এই গল্পটি তুলে ধরা হলো।
সৃষ্টির শুরু: আল্লাহর একক অস্তিত্ব
কল্পনা করুন, এক সময় ছিল যখন কোনো আকাশ ছিল না, কোনো পৃথিবী ছিল না, কোনো সূর্য-চাঁদ-তারা ছিল না। শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলা ছিলেন। তিনি ছিলেন একক, অদ্বিতীয়, চিরন্তন। কুরআন মজীদে আল্লাহ বলেন, “তিনি প্রথম, তিনি শেষ, তিনি প্রকাশ্য, তিনি অপ্রকাশ্য।” (সূরা হাদিদ: ৩)।
এই অবস্থায় আল্লাহ তাঁর কুদরতের মাধ্যমে সৃষ্টি শুরু করলেন। প্রথমে তিনি তাঁর আরশ সৃষ্টি করলেন, যা পানির উপর স্থাপিত ছিল। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর আরশ ছিল পানির উপর। তারপর তিনি কলম সৃষ্টি করলেন এবং লাওহে মাহফুজে সবকিছু লিখে দিলেন। এই লিখনের মধ্যে ছিল সৃষ্টির শুরু থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সব ঘটনা। এটি আল্লাহর পূর্বজ্ঞানের প্রমাণ।
এরপর আল্লাহ মহাবিশ্ব সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিলেন। কুরআনে বলা হয়েছে: “আকাশ ও পৃথিবী একত্রিত অবস্থায় ছিল, অতঃপর আমি তাদেরকে পৃথক করে দিলাম।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০)। এটি অনেকটা বিগ ব্যাং-এর মতো এক বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দেয়, যদিও কুরআন এটিকে আল্লাহর ইচ্ছার ফল হিসেবে বর্ণনা করে। আল্লাহ বলেন, “তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন, যা ধোঁয়ার মতো ছিল।” (সূরা ফুসসিলাত: ১১)। এই ধোঁয়া থেকে তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে আদেশ করলেন, “এসো, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়।” তারা বলল, “আমরা স্বেচ্ছায় আসছি।” এভাবে মহাবিশ্বের উপাদানগুলো গঠিত হতে শুরু করল।
এই সৃষ্টি ছয় দিনে সম্পন্ন হয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এটি উল্লেখ আছে, যেমন সূরা আল-আ'রাফ (৭:৫৪): “নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।” এখানে ‘দিন’ বলতে আমাদের ২৪ ঘণ্টার দিন নয়, বরং বিভিন্ন সময়কাল বোঝানো হয়েছে। কারণ আল্লাহর কাছে এক দিন হাজার বছর বা পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হতে পারে (সূরা সাজদাহ: ৫, সূরা মা'আরিজ: ৪)। আল্লাহ ক্লান্ত হন না, তাঁর কোনো অবসাদ স্পর্শ করে না।
পৃথিবীর বিশেষ সৃষ্টি: ধাপে ধাপে বর্ণনা
পৃথিবীকে আল্লাহ বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছেন। সূরা বাকারার ২৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে: “তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং সেগুলোকে সাত আকাশে রূপায়িত করলেন।” এখানে পৃথিবীকে প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত করে যে পৃথিবীকে মানুষের বাসস্থান হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছিল।
প্রথম দিনগুলোতে আল্লাহ পৃথিবীর ভিত্তি স্থাপন করলেন। তিনি পাহাড়-পর্বত স্থাপন করলেন যাতে পৃথিবী কম্পন না করে। কুরআনে বলা হয়েছে: “আমি পৃথিবীকে বিছানা বানিয়েছি এবং পাহাড়কে খুঁটি।” (সূরা নাবা: ৬-৭)। তারপর তিনি সমুদ্র, নদী, ঝর্ণা সৃষ্টি করলেন। পানিকে জীবনের উৎস বানালেন। “আমি প্রত্যেক জীবিত বস্তুকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০)।
এরপর উদ্ভিদজগত। গাছপালা, ফলমূল, শস্য – সবকিছু। আল্লাহ বলেন, “তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীতে যা আছে তা সৃষ্টি করেছেন।” এই সবুজায়নের মাধ্যমে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করা হলো। জীবজন্তু সৃষ্টি করা হলো – পশু, পাখি, মাছ, কীটপতঙ্গ। সবকিছু এক সুসমন্বিত ব্যবস্থায়।
এই ধাপগুলোতে আল্লাহর কুদরতের অসীমতা প্রকাশ পায়। বিজ্ঞানীরা যখন বিগ ব্যাং, গ্রহের গঠন, জীবনের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা করেন, তখন তারা কুরআনের এই বর্ণনার সাথে মিল খুঁজে পান। কিন্তু কুরআন শুধু বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়, বরং আল্লাহর নিদর্শন। এগুলো দেখে মানুষ যেন চিন্তা করে, “এই সৃষ্টিতে কোনো ত্রুটি নেই।” (সূরা মুলক: ৩)।
কেন পৃথিবী সৃষ্টি করলেন আল্লাহ?
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আল্লাহ কেন এই বিশাল সৃষ্টি করলেন? কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে: “আমি জিন ও মানুষকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)। পৃথিবীকে তিনি মানুষের জন্য একটি পরীক্ষাক্ষেত্র বানিয়েছেন। “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন যে, তোমাদের মধ্যে কে আমলের দিক থেকে উত্তম।” (সূরা মুলক: ২)।
পৃথিবী সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো মানুষকে খলিফা (প্রতিনিধি) বানানো। আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেছিলেন, “আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা সৃষ্টি করতে চাই।” ফেরেশতারা বললেন, “আপনি কি এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে সেখানে অশান্তি সৃষ্টি করবে?” কিন্তু আল্লাহ বললেন, “আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।” (সূরা বাকারা: ৩০)। এখানে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এবং দায়িত্বের কথা উঠে আসে।
আল্লাহ পৃথিবীকে নেয়ামতপূর্ণ করেছেন যাতে মানুষ তাঁর শুকরিয়া আদায় করে। খাবার, পানি, বাতাস, সৌন্দর্য – সবকিছু তাঁর দান। সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো মানুষ আল্লাহকে চিনবে, তাঁর আদেশ পালন করবে এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেবে। এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয়, এটি একটি সাময়িক আবাস।
আদম (আ.)-এর সৃষ্টি এবং পৃথিবীতে আগমন
পৃথিবী প্রস্তুত হওয়ার পর আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করলেন। তিনি মাটি থেকে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন। “আমি মানুষকে শুকনো মাটি থেকে, কালো কর্দম থেকে সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আল-হিজর: ২৬)। তারপর তিনি তাতে রূহ ফুঁকে দিলেন। ফেরেশতাদের আদেশ করলেন আদমকে সিজদা করতে। ইবলিস অস্বীকার করল এবং অভিশপ্ত হলো।
আদম (আ.) এবং হাওয়া (আ.)কে জান্নাতে রাখা হয়েছিল, কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় তারা নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেললেন। আল্লাহ তাদের পৃথিবীতে পাঠালেন। এটি শাস্তি নয়, বরং পরিকল্পনার অংশ। পৃথিবীতে তারা খলিফা হিসেবে বসবাস শুরু করলেন। তাদের বংশধররা ছড়িয়ে পড়ল। নবী-রাসূলগণ আগমন করলেন – নূহ, ইবরাহিম, মূসা, ঈসা এবং সর্বশেষ মুহাম্মদ (সা.) – সবাই মানুষকে সত্যের পথ দেখাতে।
সৃষ্টির পরবর্তী সময়ে পৃথিবীতে নানা ঘটনা ঘটেছে – বন্যা, যুদ্ধ, সভ্যতার উত্থান-পতন। কিন্তু আল্লাহর ন্যায়বিচার সবসময় বজায় আছে। প্রত্যেক মানুষকে তার আমল অনুসারে প্রতিদান দেওয়া হবে।
দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ
পৃথিবী সৃষ্টির এই গল্প আমাদের শেখায় যে, এই বিশ্ব কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি একজন মহান স্রষ্টার সুনিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনা। আধুনিক বিজ্ঞান যখন বলে যে মহাবিশ্বের সৃষ্টি ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, তখন কুরআনের ‘ছয় দিন’কে বিভিন্ন যুগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। এতে কোনো বৈপরীত্য নেই, বরং সমন্বয় আছে।
এই সৃষ্টি আমাদেরকে বিনয়ী করে। আমরা যখন রাতের আকাশের দিকে তাকাই, তারকারাজির দিকে চোখ রাখি, তখন অনুভব করি আমাদের ছোট্টত্ব। কিন্তু একইসাথে আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি হিসেবে আমাদের মর্যাদা।
মানুষের দায়িত্ব হলো এই পৃথিবীকে সুন্দর রাখা, পরিবেশ রক্ষা করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। শোষণ, যুদ্ধ, অবিচার এই সৃষ্টির উদ্দেশ্যের বিরোধী।
উপসংহার: সৃষ্টির রহস্য এবং আমাদের যাত্রা
পৃথিবী সৃষ্টি শুধু অতীতের ঘটনা নয়, এটি আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের দিশা। আল্লাহ এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা তাঁকে চিনি, তাঁর ইবাদত করি এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুত হই। একদিন এই পৃথিবী ধ্বংস হবে, কিয়ামত সংঘটিত হবে, এবং আমরা আমাদের প্রভুর সামনে দাঁড়াব।
হে পাঠক, এই সৃষ্টির গল্প চিন্তা করুন। প্রতিটি সকালে সূর্যোদয় দেখে, প্রতিটি ফুলের সৌরভে, প্রতিটি শিশুর হাসিতে আল্লাহর কুদরত দেখুন। তাঁর শুকরিয়া আদায় করুন। তাঁর আদেশ পালন করুন। তাহলে এই পৃথিবীর সৃষ্টি আপনার জন্য সফলতার কারণ হবে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।

🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments

Comments

    Please login to post comment. Login