Posts

নন ফিকশন

নজরুলের জীবনী: প্রথম পর্ব

July 9, 2026

Md Josam

Original Author Md Shamim Skder

Translated by Md Shamim Skder

7
View

নজরুলের জীবনী: প্রথম পর্ব – দুঃখের শৈশব থেকে বিদ্রোহী কবির উত্থান
(প্রায় ৪০০০ শব্দের বিস্তারিত আখ্যান)
কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল ধূমকেতু, যিনি দারিদ্র্যের অন্ধকার রাত্রিকে ভেদ করে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিলেন। তাঁর জীবন শুধু একজন কবির জীবন নয়, বরং এক অসম্ভব লড়াইয়ের ইতিহাস – যেখানে ছোটবেলার ক্ষুধা, অভাব, অপমান থেকে শুরু করে সাহিত্যিক খ্যাতির শিখরে আরোহণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ছিল কষ্টের, সংগ্রামের এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। এই প্রথম পর্বে আমরা তাঁর জন্ম থেকে শুরু করে প্রথম খ্যাতির দিকে যাত্রা পর্যন্ত বিস্তারিতভাবে অনুসরণ করব। এটি শুধু তথ্যের সংকলন নয়, বরং তাঁর জীবনের আত্মার স্পর্শ।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি: দুখু মিয়াঁর আগমন
১৮৯৯ সালের ২৪ মে (বঙ্গাব্দ ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন কাজী ফকির আহমদ এবং জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান। পিতা ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় পিরপুকুর মসজিদের ইমাম এবং হাজি পালোয়ানের মাজারের খাদেম। এই দায়িত্ব তাঁকে একটি নির্দিষ্ট আয় দিত, কিন্তু পরিবারটি ছিল দরিদ্র। নজরুলের পরিবার ছিল চুরুলিয়ার কাজী পরিবার – একটি মুসলিম তালুকদার পরিবার, যাদের ঐতিহ্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক।
জন্মের পর তাঁর ডাকনাম হয় "দুখু মিয়াঁ"। এই নামটি যেন ভবিষ্যতের কষ্টের পূর্বাভাস ছিল। পরিবারে তিন ভাই (নজরুল দ্বিতীয়) এবং এক বোন। ছোটবেলা থেকেই তিনি অভাবের ছায়ায় বেড়ে উঠেছিলেন। গ্রামের সাধারণ মুসলিম পরিবেশ, যেখানে কৃষি ও ছোটখাটো কাজকর্মই জীবিকা। কিন্তু নজরুলের মধ্যে ছিল এক অদম্য কৌতূহল এবং সৃজনশীলতা।
পিতার মৃত্যু ১৯০৮ সালে, যখন নজরুলের বয়স মাত্র ৯-১০ বছর। এই ঘটনা তাঁর জীবনে প্রথম বড় আঘাত। পিতার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব অনেকটাই তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে মসজিদের খাদেম এবং মুয়াজ্জিনের কাজ শুরু করেন। ভোরে আজান দেওয়া, মসজিদের দেখাশোনা, মক্তবে শিক্ষকদের সাহায্য করা – এসবই তাঁর দৈনন্দিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এই সময় তিনি মক্তবে কুরআন, হাদিস, ইসলামী দর্শন এবং ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন। ধর্মীয় শিক্ষা তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যে ইসলামী চেতনা এবং সাম্যের বাণীতে প্রকাশ পায়।
কিন্তু এই কাজগুলো শুধু জীবিকা নয়, কষ্টেরও ছিল। ছোট শরীরে ভারী দায়িত্ব, অর্থাভাব, পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখাশোনা – এসব তাঁকে অকালপক্ক করে তোলে। তবু এই কষ্টের মধ্যেই তিনি লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হন।
লেটো দলে যোগদান: সাহিত্যের প্রথম পাঠশালা
বাল্যকালে নজরুল লোকনাট্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তাঁর চাচা কাজী বজলে করিম ছিলেন লেটো দলের উস্তাদ। লেটো হলো রাঢ় অঞ্চলের একটি লোকশিল্প – কবিতা, গান, নাট্য এবং নৃত্যের মিশ্রণ। এই দলে যোগ দিয়ে নজরুল অভিনয়, গান রচনা এবং কবিতা লেখা শিখতে থাকেন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে অভিনয় করতেন এবং দলের জন্য গান ও নাটক লিখতেন।
এই সময়ে তিনি লিখেছিলেন চাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস ইত্যাদি। এগুলো লোকনাট্যের মাধ্যমে তাঁর প্রথম সৃজনশীল প্রকাশ। লেটো দলে থাকাকালীন তিনি বাংলা, সংস্কৃত সাহিত্য, পুরাণ এবং হিন্দু-মুসলিম উভয় ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত হন। এটি তাঁর মনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বীজ বপন করে, যা পরে তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হয়। তিনি বলতেন, হিন্দু-মুসলিমকে এক করে হ্যান্ডশেক করানোই তাঁর লক্ষ্য।
লেটো দল ত্যাগ করে ১৯১০ সালে তিনি আবার পড়াশোনায় ফিরে আসেন। প্রথমে সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে (রাণীগঞ্জ), পরে মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন। সেখানকার প্রধান শিক্ষক কুমুদরঞ্জন মল্লিক (বিখ্যাত কবি) তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হন। কিন্তু অর্থাভাবের কারণে স্কুল ফি দিতে না পারায় তিনি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এরপর তিনি কবিগানের দলে যোগ দেন এবং আসানসোলের ওয়াহিদ কনফেকশনারিতে রাঁধুনির কাজ করেন, চা স্টলে কাজ করেন।
১৯১৪ সালে ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে (বর্তমানে গভর্নমেন্ট নজরুল অ্যাকাডেমি) পড়েন। সেখানে বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি এবং হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত শিখেন। শিক্ষকরা তাঁর মেধা ও উৎসাহ দেখে মুগ্ধ হতেন। কিন্তু ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেওয়ার আগেই তিনি স্কুল ছেড়ে দেন।
সৈনিক জীবন: যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং প্রথম লেখা
১৯১৭ সালে, ১৮ বছর বয়সে নজরুল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে যোগ দেন। ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্পোরাল থেকে হাবিলদার (সার্জেন্ট) পদে উন্নীত হন। তিনি করাচি ক্যান্টনমেন্টে পোস্টেড হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধে অংশ না নিলেও সৈনিক জীবন তাঁকে নতুন অভিজ্ঞতা দেয় – শৃঙ্খলা, দেশাত্মবোধ, রাজনৈতিক সচেতনতা।
করাচিতে থাকাকালীন তিনি প্রথম গদ্য ও কবিতা লেখা শুরু করেন। সৈনিক জীবনের একাকিত্ব, যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তাঁর লেখায় প্রভাব ফেলে। ১৯২০ সালে যুদ্ধ শেষ হলে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি নেন এবং কলকাতায় চলে আসেন।
কলকাতায় সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যিক জীবনের সূচনা
কলকাতায় এসে নজরুল সাংবাদিকতায় যোগ দেন। তিনি নবযুগ, ধূমকেতু ইত্যাদি পত্রিকার সাথে যুক্ত হন। ধূমকেতু পত্রিকা তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় এবং এটি বিপ্লবী চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। তিনি ব্রিটিশ শাসনের তীব্র সমালোচনা করেন।
১৯২২ সালে তাঁর বিখ্যাত কবিতা "বিদ্রোহী" প্রকাশিত হয়। এই কবিতা তাঁকে রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে।
"বিদ্রোহী" কবিতার কয়েকটি লাইন (স্মরণীয়):
"আমি বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সে বিদ্রোহী!
আমি চিরদিনের শুন্যতা, আমি চিরদিনের অপূর্ণতা..."
এই কবিতায় তিনি সকল অত্যাচার, শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এটি যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করে। একই সময়ে "অগ্নিবীণা" কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যা তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে দেয়।
তিনি "প্রলয়োল্লাস", "ধূমকেতু" ইত্যাদি লেখেন। তাঁর লেখায় মানবতা, সাম্য, নারী মুক্তি, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা প্রকাশ পায়। তিনি গজল, শ্যামাসংগীত, রণসংগীত সবকিছুতেই দক্ষতা দেখান। প্রায় ৪০০০ গান রচনা করেন, যা নজরুলগীতি নামে পরিচিত।
ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তা
এই সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও কম কষ্টের ছিল না। ১৯২১ সালে নার্গিস আসার খানমের সাথে বিবাহ, পরে বিচ্ছেদ। ১৯২৪ সালে প্রমীলা দেবীর (আশালতা সেনগুপ্ত) সাথে বিবাহ। তাঁদের সন্তান কৃষ্ণ মুহম্মদ, সব্যসাচী ইত্যাদি।
ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে কারাবন্দী করে। জেলে থাকাকালীন তিনি "রাজবন্দীর জবানবন্দী" লেখেন। কারাগারেও তাঁর সৃজনশীলতা থামেনি।
বিশ্বখ্যাত কবি হওয়ার পথে
ছোটবেলার দুঃখ, লেটো দলের অভিজ্ঞতা, সৈনিক জীবন, সাংবাদিকতা – সবকিছু মিলে তাঁকে এক অনন্য কবিতে পরিণত করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেকে তাঁর প্রশংসা করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা এবং বিপ্লবী চেতনা নিয়ে আসেন। তাঁর লেখা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও অনুপ্রেরণা যোগায়।
এই পর্বে আমরা দেখলাম কীভাবে এক দরিদ্র গ্রামের ছেলে অভাব, কষ্টকে জয় করে সাহিত্যের শিখরে উঠলেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় – সংগ্রামই সাফল্যের চাবিকাঠি।

🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments
 

Comments

    Please login to post comment. Login