নজরুলের জীবনী: তৃতীয় পর্ব
বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করার পর নজরুলের জীবন আরও তীব্র এবং বহুমুখী হয়ে ওঠে। কলকাতার সাহিত্যিক আড্ডায়, রাজনৈতিক সভায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। ধূমকেতু পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলেও তিনি নতুন নতুন পত্রিকায় লিখতে থাকেন। তাঁর লেখাগুলোতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ ছিল। তিনি লিখতেন যে শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করলে মানুষ কখনো মুক্তি পাবে না। এই সময় তিনি বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ প্রকাশ করেন। অগ্নিবীণার পর বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয়শিখা ইত্যাদি। প্রতিটি গ্রন্থে তাঁর কণ্ঠস্বর আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বিষের বাঁশিতে তিনি সমাজের ক্ষতগুলোকে উন্মোচিত করেন। ধর্মের নামে অন্ধত্ব, জাতপাতের বিভেদ, নারীর প্রতি অবিচার – সবকিছুর বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন। তাঁর কবিতায় মানুষের সমতা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়। যুবকরা এই লেখাগুলো পড়ে উদ্বুদ্ধ হত। অনেকে বলতেন, নজরুলের একটি কবিতা রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখার চেয়ে বেশি শক্তি ধারণ করে। কিন্তু এই খ্যাতির পাশাপাশি তাঁর উপর চাপও বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে নজরদারিতে রাখে। তিনি বারবার গ্রেপ্তার হন এবং জেলে যান। জেলজীবন তাঁর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু জেলের অন্ধকার কক্ষেও তিনি লিখে যান। তাঁর হাতের লেখা জেলের দেয়ালে, কাগজের টুকরোয় ছড়িয়ে পড়ে।
রাজবন্দীর জবানবন্দীতে তিনি লিখেছিলেন যে তিনি কোনো অপরাধ করেননি, শুধু সত্য কথা বলেছেন। এই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর সারা বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মানুষ বুঝতে পারে যে নজরুল শুধু কবি নন, একজন সত্যিকারের বিপ্লবী। তিনি শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি বলতেন, যতদিন না শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে ততদিন তাঁর লেখনী থামবে না। এই সময় তিনি অনেক ছোটগল্প লেখেন। তাঁর গল্পে গ্রামের দরিদ্র কৃষক, শহরের শ্রমিক, নিপীড়িত নারীর জীবন চিত্রিত হয়। গল্পগুলোতে তাঁর নিজের শৈশবের কষ্টের ছায়া পড়ে।
সংগীতের ক্ষেত্রেও নজরুল অসাধারণ অবদান রাখেন। তিনি শুধু কবিতা লিখতেন না, সুরও দিতেন। নজরুলগীতি নামে পরিচিত তাঁর গানগুলোতে বিভিন্ন সুরের মিশ্রণ ছিল। কখনো হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যাল, কখনো লোকসুর, কখনো আরবি-ফারসি প্রভাব। তিনি গজল রচনা করেন, শ্যামাসংগীত লেখেন, রণসংগীত তৈরি করেন। তাঁর গানে দেশাত্মবোধ এবং প্রেমের মিশ্রণ ঘটে। অনেক গায়ক তাঁর গান গেয়ে বিখ্যাত হন। গ্রামোফোন কোম্পানি তাঁর অনেক গান রেকর্ড করে। এই গানগুলো সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
ব্যক্তিগত জীবনে নজরুল অনেক চড়াই-উতরাই পার করেন। প্রমীলা দেবীর সঙ্গে তাঁর সংসার চলতে থাকে। সন্তানদের লালন-পালনের মধ্যেও তিনি লেখালেখি চালিয়ে যান। কিন্তু অর্থের অভাব ছিল স্থায়ী। তিনি প্রায়শই ধার করে চলতেন। সাহিত্যিক বন্ধুরা তাঁকে সাহায্য করতেন। তবু তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। তাঁর মধ্যে ছিল অদম্য জেদ। শৈশবের দুঃখ তাঁকে শক্তি দিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কষ্টই মানুষকে মহান করে।
১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে তাঁর স্বাস্থ্য ভাঙতে শুরু করে। অতিরিক্ত পরিশ্রম, জেলের কষ্ট, অনিয়মিত জীবনযাপন তাঁর শরীরকে দুর্বল করে। তিনি প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। কিন্তু তাতেও লেখা বন্ধ করেননি। তিনি নতুন নাটক লেখেন, উপন্যাসের খসড়া তৈরি করেন। তাঁর নাটকে সমাজের চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি অভিনয়ও করতেন কখনো কখনো। তাঁর বহুমুখী প্রতিভা সবাইকে মুগ্ধ করত।
রাজনৈতিকভাবে তিনি আরও সক্রিয় হন। তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকারের জন্য লড়াই করেন। তাঁর লেখায় মার্কসবাদী চিন্তাধারার প্রভাব পড়ে। তিনি লিখতেন যে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর না করলে দেশ স্বাধীন হলেও মানুষ মুক্তি পাবে না। এই চিন্তা তাঁকে অনেকের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে আবার অনেকের কাছে বিতর্কিতও করে। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে আরও নির্যাতন করে। কিন্তু তিনি ভয় পাননি।
এই সময় তিনি অনেক ভ্রমণ করেন। বাংলার বিভিন্ন জেলায় যান, সভা করেন, কবিতা পাঠ করেন। যেখানেই যান সেখানেই মানুষ তাঁকে ঘিরে ধরে। তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে অনেকে অশ্রুসিক্ত হন। তিনি সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতেন। তাঁর কবিতা জটিল ছিল না, সহজ এবং হৃদয়স্পর্শী ছিল। এই কারণে তিনি জনগণের কবি হয়ে ওঠেন।
তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকে। তিনি অনুবাদও করেন। আরবি, ফারসি, হিন্দি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে অনেককে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি শিশুসাহিত্যও লেখেন। শিশুদের জন্য গল্প, কবিতা লিখে তাদের মনে স্বপ্ন জাগাতেন। তাঁর সৃজনশীলতা ছিল অফুরন্ত। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা অনেকের জীবনভরের সমান।
কিন্তু এই সাফল্যের মাঝে তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখও ছিল। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা, স্ত্রীর স্বাস্থ্য, নিজের অসুস্থতা – সব মিলিয়ে জীবন কঠিন হয়ে উঠছিল। তবু তিনি হাসিমুখে লড়াই চালিয়ে যান। তাঁর চোখে ছিল স্বপ্ন – এক স্বাধীন, সমতার বাংলার স্বপ্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে তাঁর লেখা একদিন সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করবে।
তৃতীয় পর্বে আমরা দেখলাম কীভাবে খ্যাতির শিখরে উঠেও নজরুলের সংগ্রাম থামেনি। তাঁর লেখা, গান, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত জীবন সবকিছু মিলে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় তৈরি করেছে। পরবর্তী পর্বে তাঁর জীবনের আরও গভীর অধ্যায় আসবে। তাঁর সৃষ্টির পূর্ণতা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ।
নজরুলের এই যুগ ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে সক্রিয় সময়। তিনি প্রতিদিন নতুন কিছু সৃষ্টি করতেন। তাঁর ঘরে কাগজ, কলম, হারমোনিয়াম সবসময় প্রস্তুত থাকত। বন্ধুরা আসলে তিনি গান শোনাতেন, কবিতা পড়ে শোনাতেন। তাঁর উৎসাহ সবাইকে ছুঁয়ে যেত। কিন্তু শরীরের দুর্বলতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ডাক্তাররা বিশ্রামের পরামর্শ দিতেন, কিন্তু তিনি শুনতেন না। তাঁর মনে ছিল অসমাপ্ত কাজের ভিড়।
তিনি বাংলার নবজাগরণের এক অগ্রদূত হয়ে ওঠেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলতেন। ধর্মকে তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য দেখতেন, বিভেদের জন্য নয়। তাঁর এই চিন্তাধারা অনেককে প্রভাবিত করে। তিনি লিখতেন, ধর্ম যদি মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরায় তবে সেই ধর্মের কোনো মূল্য নেই। এই কথাগুলো আজও প্রাসঙ্গিক।
তাঁর গানে প্রেমের পাশাপাশি বিপ্লবের ডাক ছিল। একদিকে রোমান্টিক গজল, অন্যদিকে রণসংগীত। তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য লিখতেন, আবার যুদ্ধের ভয়াবহতাও লিখতেন। তাঁর লেখায় জীবনের সব রঙ মিশে ছিল। এই বৈচিত্র্যই তাঁকে অনন্য করে তোলে।
এভাবে নজরুলের জীবন এগিয়ে চলছিল। কষ্ট, সংগ্রাম, সৃষ্টি এবং অনুপ্রেরণার এক অবিরাম ধারা। তিনি কখনো পিছনে ফিরে তাকাননি। সামনে এগিয়ে গেছেন। তাঁর এই যাত্রা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। মানুষের মনে আশা জাগিয়েছে। এই পর্ব তাঁর সেই সক্রিয় জীবনেরই বিস্তারিত চিত্র। পরবর্তী অধ্যায়ে আরও অনেক কথা আছে। তাঁর জীবনের উত্থান-পতন, স্বপ্ন এবং বাস্তবতা।
🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
