নজরুলের জীবনী: চতুর্থ পর্ব
নজরুলের খ্যাতি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন তাঁর জীবন আরও ব্যস্ত, চ্যালেঞ্জপূর্ণ এবং সৃজনশীলতায় ভরপুর হয়ে উঠল। কলকাতার সাহিত্যিক মহলে তিনি এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। ধূমকেতু পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পরও তিনি নানা পত্রিকায় লিখতে থাকেন। তাঁর লেখায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ, শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং মানুষের অধিকারের দাবি স্পষ্টভাবে উঠে আসে। এই সময় তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ করেন – অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয়োল্লাস ইত্যাদি। প্রতিটি গ্রন্থে তাঁর বিদ্রোহী সত্তা আরও তীব্র এবং পরিণত হয়ে ওঠে।
অগ্নিবীণায় তিনি আগুনের মতো ভাষায় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আহ্বান জানান। বিষের বাঁশিতে সমাজের ক্ষতগুলোকে উন্মোচিত করেন। ভাঙার গানে ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন গড়ার ডাক দেন। প্রলয়োল্লাসে বিপ্লবের উন্মাদনা ফুটে ওঠে। এই গ্রন্থগুলো প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুবসমাজের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মানুষ তাঁর লেখা মুখে মুখে আবৃত্তি করত। তাঁর কবিতার ছন্দ ছিল দুরন্ত, ভাষা ছিল তীক্ষ্ণ এবং আবেগ ছিল অপরিসীম।
শুধু কবিতা নয়, এই সময়ে তিনি ছোটগল্প, উপন্যাসের খসড়া এবং নাটকও লেখেন। তাঁর গল্পগুলোতে গ্রামের দরিদ্র কৃষকের জীবন, শহরের শ্রমিকের কষ্ট, নারীর প্রতি অবিচার এবং সমাজের নানা অসঙ্গতি ফুটে উঠত। নাটকগুলোতে তিনি সমাজের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে দর্শকদের চিন্তা করতে বাধ্য করতেন। তাঁর লেখার ভাষা ছিল সহজবোধ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী। এই কারণে সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
রাজনৈতিকভাবে তিনি আরও সক্রিয় হন। শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। কমিউনিস্ট চিন্তাধারার প্রতি তাঁর আকর্ষণ বাড়তে থাকে। তিনি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করার কথা বলতেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। প্রতিবার জেল থেকে বেরিয়ে তিনি আরও তীব্র লেখনী চালিয়ে যান। জেলের অন্ধকার কক্ষেও তাঁর সৃজনশীলতা থামেনি। তিনি সেখানে অনেক গান ও কবিতা রচনা করেন।
এই সময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও নানা চড়াই-উতরাই চলছিল। প্রমীলা দেবীর সঙ্গে সংসার চালাতে গিয়ে অর্থাভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হত। সন্তানদের লালনপালনের মাঝে তিনি লেখালেখি চালিয়ে যান। তাঁর গানের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। নজরুলগীতি জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছায়। তিনি বিভিন্ন ধরনের সুরে গান রচনা করতেন – কখনো হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যালের গভীরতা, কখনো লোকসুরের সরলতা, কখনো আরবি-ফারসি গজলের মাধুর্য। তাঁর গান গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ড হয়ে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
তাঁর সাহিত্যিক জীবনের এই পর্যায়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। তিনি শুধু কবি নন, একজন সংগীতজ্ঞ, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক এবং বিপ্লবী চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর লেখা হাজার হাজার মানুষকে প্রভাবিত করে। তিনি বাংলার নবজাগরণের এক অগ্রদূত হয়ে ওঠেন। তাঁর লেখায় ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটে। তিনি ধর্মকে মানুষের কল্যাণের জন্য দেখতেন, বিভেদের জন্য নয়।
।
🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
