নজরুলের জীবনী: পঞ্চম পর্ব
ছোটবেলার কষ্ট নজরুলের জীবনের মূল সুর হয়ে উঠেছিল। চুরুলিয়া গ্রামের সেই সাধারণ মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া দুখু মিয়াঁর শৈশব ছিল অভাব, অনটন আর দায়িত্বের ভারে ভারাক্রান্ত। পিতা কাজী ফকির আহমদ মসজিদের ইমাম এবং মাজারের খাদেম ছিলেন। মাত্র দশ বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর নজরুলকে সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়। ভোরবেলায় আজান দেওয়া, মসজিদের পরিচর্যা, মক্তবে শিক্ষকদের সাহায্য করা, হাজি পালোয়ানের মাজারের সেবা – এসব কাজে ছোট্ট শরীরটা ক্লান্ত হয়ে পড়ত। পরিবারের অন্য সদস্যদের খাওয়ানো, মায়ের দুঃখ দেখা, ভাইবোনদের দেখাশোনা করা – এই কষ্টগুলো তাঁকে অকালপক্ক করে তোলে।
মক্তবে কুরআন, হাদিস, ইসলামী দর্শন শেখার পাশাপাশি তিনি লেটো দলে যোগ দেন। চাচা বজলে করিমের প্রভাবে লেটোর গান, নাটক, কবিতার জগতে প্রবেশ করেন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে অভিনয় করা, নিজে গান লেখা, নাটকের জন্য সংলাপ তৈরি করা – এই অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যিক জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়। লেটো দলে থাকাকালীন তিনি চাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণের মতো নাট্য রচনা করেন। ক্ষুধার্ত অবস্থায় মঞ্চে অভিনয় করা, দর্শকদের কাছ থেকে পয়সা নেওয়া, আবার না পেলে খালি পেটে ফিরে আসা – এই কষ্টগুলো তাঁর মনে গভীর দাগ কাটে। তিনি দেখেছিলেন গ্রামের দরিদ্র মানুষের জীবন, জমিদারের অত্যাচার, ধর্মের নামে শোষণ। এসবই পরবর্তীকালে তাঁর বিদ্রোহী কবিতার জ্বালা হয়ে ওঠে।
স্কুলে ভর্তি হয়ে সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুল, মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুল, দরিরামপুর স্কুল – কিন্তু প্রতিবারই ফি দিতে না পেরে ছেড়ে দিতে হয়। রাঁধুনির কাজ, চা স্টলের কাজ, কবিগানের দলে যোগ দেওয়া – ছোটবেলার এই সংগ্রাম তাঁকে মানুষের দুঃখ বুঝতে শেখায়। তিনি নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়াতেন, নিজের জামা বিক্রি করে বই কিনতেন। এই কষ্টের মধ্যেই তিনি আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, বাংলা সাহিত্য শিখে নেন। পুরাণ, হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্য তাঁর মনে মিশে যায়। ছোটবেলার এই দুঃখই তাঁকে সাম্যের কবি বানিয়েছে।
পঞ্চম পর্বে এই ছোটবেলার কষ্টের পূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে যখন তিনি পরবর্তী জীবনে সেই স্মৃতি লেখায় ফিরিয়ে আনেন। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরও করাচিতে বসে তিনি গ্রামের সেই দিনগুলোর কথা ভাবতেন। প্রথম কবিতা ও গদ্যে সেই ক্ষুধা, অপমান, দায়িত্বের ভার প্রতিফলিত হয়। বিদ্রোহী কবিতায় যে আগুন, তা ছোটবেলার জ্বালা থেকেই জন্ম নিয়েছিল। তিনি লিখতেন, “আমি দুখু মিয়াঁ, আমি সেই যে ছোটবেলায় ক্ষুধার্ত শিশু।”
সেনাবাহিনী থেকে ফিরে কলকাতায় যখন তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন, তখনও ছোটবেলার সেই কষ্ট তাঁকে তাড়া করে। ধূমকেতুতে লেখা প্রতিটি প্রবন্ধে তিনি শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলেন কারণ তিনি নিজে সেই শোষণ দেখেছেন। জেলে বসে রাজবন্দীর জবানবন্দীতে তিনি সেই শৈশবের স্মৃতি উল্লেখ করেন যেখানে তিনি মসজিদের খাদেম হিসেবে অন্নের জন্য লড়াই করেছেন।
প্রমীলা দেবীর সঙ্গে সংসার করার সময় সন্তানদের জন্য তিনি চিন্তা করতেন যেন তাদের জীবনে তাঁর মতো কষ্ট না আসে। কিন্তু নিজের জীবনে অর্থাভাব, অসুস্থতা তাঁকে আবার সেই ছোটবেলার দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যেত। তিনি গান লিখতেন যেখানে দুঃখের সুর ছিল তাঁর শৈশবেরই প্রতিধ্বনি। নজরুলগীতির অনেক গানে গ্রামের সেই আজানের সুর, লেটোর ঢোলের আওয়াজ, ক্ষুধার্ত রাতের কান্না মিশে আছে।
ছোটবেলার এই কষ্ট তাঁকে কখনো ভাঙতে পারেনি বরং শক্তি দিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে দুঃখই মানুষকে মহান করে। তাঁর সমস্ত সৃষ্টিতে – কবিতা, গান, গল্প, নাটকে – এই কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। তিনি লিখেছেন যে যারা কষ্ট করে না তারা কখনো সত্যিকারের বিদ্রোহী হতে পারে না। তাঁর জীবনের পঞ্চম পর্বে এই ছোটবেলার বিস্তারিত কষ্টের স্মৃতি তাঁর পরবর্তী সংগ্রামের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
জেল থেকে বেরিয়ে যখন তিনি আবার লেখনী ধরেন তখনও সেই দুখু মিয়াঁর ছায়া তাঁর পিছু ছাড়েনি। তিনি দেখেছিলেন সমাজের যে অন্ধকার, তা তাঁর শৈশবেরই বড় সংস্করণ। তাই তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি শব্দ ছিল সেই কষ্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তিনি নারীদের জন্য লিখতেন কারণ তিনি দেখেছিলেন মায়ের কষ্ট। শ্রমিকদের জন্য লিখতেন কারণ তিনি নিজে শ্রম করে খেয়েছেন। ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা বলতেন কারণ ছোটবেলায় তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ দেখেছেন লেটো দলে।
এইভাবে ছোটবেলার কষ্ট নজরুলের সমগ্র জীবনকে আলোকিত করেছে। পঞ্চম পর্বে আমরা সেই মূল স্রোতকে বিস্তারিতভাবে অনুভব করি যা তাঁকে বিশ্বখ্যাত কবি বানিয়েছে। তাঁর দুঃখের শৈশব না থাকলে হয়তো এই বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর জন্মাত না। তিনি নিজেই বলেছিলেন, আমার কবিতা আমার জীবনেরই আয়না। সেই আয়নায় সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল ছোটবেলার সেই কষ্টের ছবি।
তাঁর জীবনের এই অধ্যায়ে কষ্টের সঙ্গে সৃষ্টির সমন্বয় ঘটে। তিনি অসুস্থ শরীর নিয়েও লিখে যান কারণ ছোটবেলায় শিখেছিলেন কষ্টকে জয় করতে হয়। তাঁর সন্তানদের কাছে তিনি সেই গল্প বলতেন যাতে তারা শক্তি পায়। তাঁর বন্ধুরা জানতেন যে নজরুলের শক্তির উৎস তাঁর শৈশবের সেই লড়াই। এই কষ্টই তাঁকে অমর করে রেখেছে।
পরবর্তী পর্বগুলোতে তাঁর জীবনের আরও অধ্যায় আসবে যেখানে এই ছোটবেলার কষ্টের প্রভাব আরও গভীরভাবে দেখা যাবে। নজরুলের জীবন একটানা সংগ্রামের ইতিহাস, যার শুরু সেই চুরুলিয়ার গ্রামের দিনগুলো থেকে।
।
🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
