নজরুলের জীবনী: ষষ্ঠ পর্ব
ছোটবেলার অমানুষিক কষ্টের স্মৃতি নজরুলের মনে চিরকাল জ্বলজ্বল করত। চুরুলিয়ার সেই মাটির ঘর, পিতার মৃত্যুর পর মাত্র দশ বছর বয়সে মসজিদের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া, ভোরের আজান দেওয়ার সময় ক্ষুধার্ত পেট, মাজারের সেবায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো – এই সবকিছু তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রভাব ফেলেছিল। লেটো দলে যোগ দেওয়ার পর গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ভ্রমণ, অভিনয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা, কখনো দর্শক না পেলে খালি পেটে ফেরা, রাতে খোলা আকাশের নিচে ঘুমানো – এই কষ্ট তাঁকে শিখিয়েছিল মানুষের দুঃখ বুঝতে। সিয়ারসোল স্কুল, মাথরুন স্কুল, দরিরামপুর স্কুলে পড়ার সময় ফি না দিতে পেরে বারবার ছেড়ে দেওয়া, ওয়াহিদ কনফেকশনারিতে রাঁধুনির কাজ, আসানসোলের চা স্টলে কাজ করা – প্রতিটি মুহূর্ত ছিল সংগ্রামের।
এই ছোটবেলার কষ্টের গভীরতা তিনি পরবর্তী জীবনে বারবার ফিরিয়ে এনেছেন তাঁর লেখায়। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর করাচি ক্যান্টনমেন্টে বসে যখন প্রথম কবিতা লিখছিলেন তখনও গ্রামের সেই দিনগুলো তাঁকে তাড়া করত। ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্টে হাবিলদার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারতেন যে দারিদ্র্য সব জায়গায় একই। যুদ্ধ না দেখলেও সৈনিক জীবনের শৃঙ্খলা এবং কষ্ট তাঁর মনে নতুন চেতনা জাগিয়েছিল। ১৯২০ সালে সেনাবাহিনী থেকে ফিরে কলকাতায় এসে যখন সাংবাদিকতা শুরু করেন তখন তাঁর লেখায় ছোটবেলার সেই ক্ষুধা, অপমান এবং লড়াইয়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ধূমকেতু পত্রিকার সম্পাদনা করার সময় তিনি যে তীব্র ভাষায় ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করতেন তার মূলে ছিল গ্রামের জমিদারি শোষণ দেখা। বিদ্রোহী কবিতার প্রতিটি লাইনে যে আগুন ছিল তা ছোটবেলার জ্বালা থেকে জন্ম নিয়েছিল। অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয়োল্লাস – প্রতিটি গ্রন্থে তিনি সেই শৈশবের দুঃখকে বিপ্লবের হাতিয়ার বানিয়েছেন। তিনি লিখতেন যে যে শিশু ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করেছে সে কখনো অন্যায় মেনে নিতে পারে না।
১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি তাঁর খ্যাতি চূড়ায় পৌঁছায়। কলকাতার সাহিত্যিক মহলে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থাভাবও ছিল। প্রমীলা দেবীর সঙ্গে সংসার, সন্তানদের লালনপালন, বাড়িভাড়া, দৈনন্দিন খরচ – সব মিলিয়ে জীবন কঠিন। তিনি অনেক সময় ধার করে চলতেন। তবু লেখা থামাননি। রাত জেগে গান রচনা করতেন, সুর দিতেন। নজরুলগীতির সংখ্যা বেড়ে চলছিল। তিনি গজল, শ্যামাসংগীত, রণসংগীত, দেশাত্মবোধক গান – সবকিছুতে অসাধারণ দক্ষতা দেখান। তাঁর গানে ছোটবেলার লেটো দলের সুর মিশে ছিল।
রাজনৈতিক সক্রিয়তাও বাড়তে থাকে। শ্রমিক ও কৃষক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সভা করেন, বক্তৃতা দেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করে। জেলে বসে তিনি আরও তীব্র লেখা লেখেন। রাজবন্দীর জবানবন্দীতে তিনি শুধু নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেননি, সমগ্র শোষিত মানুষের কথা বলেছেন। জেল থেকে বেরিয়ে আবার একই গতিতে লেখালেখি চালিয়ে যান। তাঁর শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল। অতিরিক্ত পরিশ্রম, অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, জেলের কষ্ট – সব মিলিয়ে তিনি প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। ডাক্তাররা বিশ্রামের পরামর্শ দিলেও তিনি শুনতেন না।
এই সময় তিনি অনেক নাটক ও উপন্যাসের খসড়া তৈরি করেন। তাঁর নাটকে সমাজের চিত্র ফুটে ওঠে – দরিদ্র কৃষকের ঋণের জাল, নারীর অবরোধ, ধর্মীয় অন্ধত্ব। তিনি শিশুসাহিত্যও লেখেন যাতে নতুন প্রজন্ম তাঁর মতো কষ্ট না করে। অনুবাদের কাজও করেন। আরবি-ফারসি সাহিত্য থেকে বাংলায় অনুবাদ করে নতুন চিন্তা ছড়িয়ে দেন। তাঁর প্রবন্ধগুলোতে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণ ছিল।
ছোটবেলার কষ্ট তাঁকে মানবতাবাদী করে তুলেছিল। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তিনি বলতেন ধর্ম মানুষকে এক করবে, বিভক্ত করবে না। তাঁর লেখায় ইসলামী চেতনার পাশাপাশি হিন্দু ঐতিহ্যের সম্মান ছিল। এই সমন্বয় তাঁকে অনন্য করেছিল। তিনি নারী অধিকারের জন্য লিখতেন কারণ তিনি মায়ের কষ্ট দেখেছেন। শ্রমিকদের পক্ষে লিখতেন কারণ তিনি নিজে শ্রম করেছেন।
ষষ্ঠ পর্বে নজরুলের জীবনের এই বহুমুখী সংগ্রামকে বিস্তারিত দেখা যায়। খ্যাতির শিখরে থেকেও তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সভা করতেন। মানুষ তাঁকে দেখে উদ্বুদ্ধ হত। তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে অনেকে অশ্রু ফেলত। তিনি কখনো অহংকার করেননি। ছোটবেলার দুঃখ তাঁকে নম্র রেখেছিল।
তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি সত্ত্বেও সৃজনশীলতা থামেনি। নতুন গান, নতুন কবিতা, নতুন গল্প – প্রতিদিন কিছু না কিছু তৈরি করতেন। বন্ধুরা আসলে তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে গান গেয়ে শোনাতেন। তাঁর ঘর ছিল সাহিত্যের আড্ডাখানা। কিন্তু অভ্যন্তরে ছিল অবিরাম যন্ত্রণা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ, স্ত্রীর স্বাস্থ্য, নিজের শরীর – সব নিয়ে চিন্তা। তবু তিনি হাসতেন এবং লিখতেন।
এই পর্বে তাঁর জীবনের সেই অংশটুকু ফুটে ওঠে যেখানে ছোটবেলার কষ্ট এবং পরবর্তী সাফল্য একসঙ্গে মিলেমিশে আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কষ্ট ছাড়া কোনো সৃষ্টি সম্ভব নয়। তাঁর সমগ্র জীবন এই বিশ্বাসের প্রমাণ। ষষ্ঠ পর্বে আমরা দেখি কীভাবে এক দরিদ্র শিশু থেকে তিনি বাংলার বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠলেন। তাঁর লড়াই আজও অনুপ্রেরণা। তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে নতুন প্রজন্ম লড়াই করতে শেখে।
নজরুলের এই যুগ ছিল সৃষ্টি এবং সংগ্রামের। তিনি কখনো থামেননি। সামনে এগিয়ে গেছেন। তাঁর জীবনের এই অধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পরবর্তী পর্বে তাঁর জীবনের আরও গভীরতা, অসুস্থতা এবং শেষ দিনগুলোর কথা আসবে। কিন্তু ছোটবেলার সেই কষ্ট সবসময় তাঁর সঙ্গে ছিল – তাঁর শক্তি, তাঁর জ্বালা, তাঁর অনুপ্রেরণা হিসেবে।
।
🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
