Posts

নন ফিকশন

নজরুলের জীবনী: সপ্তম পর্ব

July 10, 2026

Md Josam

Original Author Md Shamim Skder

Translated by Md Shamim Skder

30
View

নজরুলের জীবনী: সপ্তম পর্ব
ছোটবেলার সেই অবর্ণনীয় কষ্ট নজরুলের জীবনকে চিরকাল ছাপিয়ে রেখেছিল। চুরুলিয়া গ্রামের মাটির ঘরে জন্ম নেওয়া, পিতা ফকির আহমদের মৃত্যুর পর মাত্র দশ বছর বয়সে মসজিদের খাদেম এবং মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব নেওয়া, ভোরের আজান দেওয়ার সময় হিমেল হাওয়ায় কাঁপা শরীর, মাজারের সেবায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো, মক্তবে পড়ানোর পাশাপাশি নিজে পড়া – এই সবকিছু তাঁর রক্তে মিশে গিয়েছিল। লেটো দলে যোগ দেওয়ার পর গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ভ্রমণ করা, অভিনয় করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা, কখনো দর্শক না পেলে অনাহারে রাত কাটানো, খোলা আকাশের নিচে ঘুমানো, চাষার সঙ, শকুনীবধ, দাতা কর্ণের মতো নাটক রচনা করা – এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে জীবনের কঠিন সত্য শিখিয়েছিল। সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুল, মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুল, দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি হয়েও ফি না দিতে পেরে বারবার ছেড়ে দেওয়া, ওয়াহিদ কনফেকশনারিতে রাঁধুনির কাজ করা, আসানসোলের চা স্টলে দিনরাত খাটা – প্রতিটি দিন ছিল অসীম কষ্টের।
এই ছোটবেলার কষ্ট তাঁর সমস্ত সৃষ্টির মূলে ছিল। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর করাচিতে বসে যখন প্রথম গদ্য ও কবিতা লিখছিলেন তখনও গ্রামের সেই ক্ষুধার্ত দিনগুলো তাঁকে তাড়া করত। হাবিলদার পদে উন্নীত হয়েও তিনি সৈনিক জীবনের কষ্ট অনুভব করেছিলেন। ১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে সাংবাদিকতা শুরু করার পর ধূমকেতু পত্রিকায় লেখা প্রতিটি প্রবন্ধে তিনি শোষিত মানুষের কথা বলেছেন কারণ তিনি নিজে সেই শোষণের শিকার ছিলেন। বিদ্রোহী কবিতার দুরন্ত ছন্দ, অগ্নিবীণার আগুন, বিষের বাঁশির তীক্ষ্ণতা, ভাঙার গানের ধ্বংসলীলা, প্রলয়োল্লাসের বিপ্লবী আহ্বান – সবকিছুর পেছনে ছিল শৈশবের সেই জ্বালা।
সপ্তম পর্বে আমরা তাঁর জীবনের সেই পর্যায় দেখব যেখানে খ্যাতি, সংগ্রাম, অসুস্থতা এবং অবিরাম সৃষ্টি একসঙ্গে চলছিল। ১৯২০-এর দশকের শেষভাগে নজরুলের খ্যাতি সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে। কলকাতার সাহিত্যিক আড্ডায়, রাজনৈতিক সভায়, গ্রামের মাঠে তিনি ছিলেন কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু এই খ্যাতির পেছনে ছিল অসীম পরিশ্রম। তিনি দিনরাত লিখতেন, গান রচনা করতেন, সুর দিতেন, সভা করতেন, জেল খাটতেন। প্রমীলা দেবীর সঙ্গে সংসার চালাতে গিয়ে অর্থাভাব লেগেই ছিল। সন্তানদের লালনপালন, বাড়িভাড়া, দৈনন্দিন খরচ মেটাতে তিনি প্রায়শই ধার করতেন। তবু কখনো লেখা থামাননি।
তাঁর নজরুলগীতির সংখ্যা তখন হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তিনি হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যাল, লোকসুর, আরবি-ফারসি প্রভাব মিশিয়ে গান তৈরি করতেন। গজলের মাধুর্য, রণসংগীতের দাপট, শ্যামাসংগীতের ভক্তি, দেশাত্মবোধক গানের আবেগ – সবকিছুতে তিনি অসাধারণ। গ্রামোফোন কোম্পানি তাঁর গান রেকর্ড করত। সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে তাঁর গান গাওয়া হত। এই গানগুলোতে ছোটবেলার লেটো দলের ঢোলের আওয়াজ, মসজিদের আজানের সুর মিশে ছিল। তিনি গান লিখতেন প্রেমের, বিপ্লবের, দুঃখের, আশার। প্রতিটি গানে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত।
রাজনৈতিকভাবে তিনি আরও সক্রিয়। শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন – সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত। তিনি কমিউনিস্ট চিন্তাধারায় বিশ্বাসী হয়ে উঠছিলেন। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করার কথা বলতেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করে জেলে পুরত। জেলের অন্ধকার কক্ষে বসেও তিনি লিখতেন। রাজবন্দীর জবানবন্দী ছিল তাঁর সেই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি আরও তীব্রভাবে লিখতে শুরু করতেন। তাঁর লেখা যেন আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দিত সমাজে।
স্বাস্থ্যের অবনতি তখন স্পষ্ট। অতিরিক্ত পরিশ্রম, জেলের কষ্ট, অনিয়মিত জীবনযাপন তাঁর শরীরকে ভেঙে দিচ্ছিল। মাথাব্যথা, শরীরের দুর্বলতা, স্মৃতিশক্তির সমস্যা – এসব লক্ষণ দেখা দিচ্ছিল। ডাক্তাররা বিশ্রামের পরামর্শ দিতেন কিন্তু তিনি শুনতেন না। লেখার নেশা তাঁকে থামতে দিত না। তিনি নতুন নাটক লিখতেন, উপন্যাসের পরিকল্পনা করতেন, ছোটগল্প তৈরি করতেন। তাঁর গল্পে গ্রামের দরিদ্র কৃষকের জীবন, শহরের শ্রমিকের কষ্ট, নারীর অবরোধের যন্ত্রণা ফুটে উঠত। ছোটবেলার অভিজ্ঞতা এইসব রচনায় জীবন্ত হয়ে উঠত।
তিনি শিশুসাহিত্যে অনেক অবদান রাখেন। শিশুদের জন্য সহজ ভাষায় কবিতা, গল্প লিখতেন যাতে তারা অনুপ্রাণিত হয়। অনুবাদের কাজও চালিয়ে যান। বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করে নতুন চিন্তা ছড়িয়ে দেন। তাঁর প্রবন্ধগুলো ছিল গভীর বিশ্লেষণমূলক। রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি – সব বিষয়ে তিনি লিখতেন। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলতেন। নারীমুক্তির পক্ষে লিখতেন। তাঁর লেখায় সাম্যের বাণী স্পষ্ট।
সপ্তম পর্বে তাঁর জীবনের এই বহুমাত্রিক রূপ ফুটে ওঠে। খ্যাতির শিখরে থেকেও তিনি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি ছিলেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সভা করতেন, কবিতা পাঠ করতেন, গান গাইতেন। মানুষ তাঁকে ঘিরে ধরত। তাঁর কথা শুনে অনেকে চোখের জল ফেলত। তিনি কখনো অহংকার করেননি। ছোটবেলার দুঃখ তাঁকে নম্র রেখেছিল। তিনি বলতেন, আমি দুখু মিয়াঁ, আমার কষ্ট আমার শক্তি।
এই সময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও চ্যালেঞ্জ ছিল। সংসারের দায়িত্ব, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা, স্ত্রীর স্বাস্থ্য – সব মিলিয়ে মানসিক চাপ ছিল। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। রাত জেগে লিখতেন, সকালে সভা করতেন। তাঁর সৃজনশীলতা ছিল অফুরন্ত। মাত্র কয়েক বছরে তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা অনেকের পুরো জীবনের সমান। তাঁর কবিতা, গান, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ – সবকিছুতে তিনি নতুনত্ব এনেছেন। বাংলা সাহিত্যকে তিনি আধুনিক করে তুলেছেন।
ছোটবেলার কষ্টের কথা তিনি কখনো ভোলেননি। তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে সেই দিনগুলো। তিনি লিখেছেন যে যে শিশু ক্ষুধা সহ্য করেছে সে কখনো অন্যায় মেনে নেয় না। এই বিশ্বাস তাঁকে চালিত করেছে। সপ্তম পর্বে আমরা দেখি কীভাবে এক দরিদ্র গ্রামের ছেলে বাংলার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠলেন। তাঁর লড়াই, তাঁর সৃষ্টি, তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
তিনি বিশ্বাস করতেন যে কষ্টই মানুষকে মহান করে। তাঁর জীবন এই কথার জ্বলন্ত প্রমাণ। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি লিখে যান, গান গেয়ে যান, লড়াই করে যান। তাঁর এই অধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। পরবর্তী পর্বে তাঁর জীবনের আরও গভীরতা, অসুস্থতার তীব্রতা এবং শেষ দিনগুলোর কথা বিস্তারিত আসবে। কিন্তু ছোটবেলার সেই কষ্ট সবসময় তাঁর সঙ্গী ছিল – তাঁর শক্তির উৎস হিসেবে। নজরুলের জীবন এক অবিরাম সংগ্রামের মহাকাব্য। তিনি থেমে যাননি। সামনে এগিয়ে গেছেন। তাঁর কলম যেন আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দিয়েছে সমাজের অন্ধকারে। সেই আগুন আজও জ্বলছে।

🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments
 

Comments

    Please login to post comment. Login