Posts

নন ফিকশন

নজরুলের জীবনী: অষ্টম পর্ব

July 10, 2026

Md Josam

Original Author Md Shamim Skder

Translated by Md Shamim Skder

30
View

নজরুলের জীবনী: অষ্টম পর্ব
ছোটবেলার সেই গভীর কষ্ট নজরুলের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে আলোকিত করেছিল। চুরুলিয়া গ্রামের সেই দিনগুলোতে পিতার মৃত্যুর পর মাত্র দশ বছর বয়সে মসজিদের খাদেম ও মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব নেওয়া, ভোরের আজান দেওয়ার সময় শীতের হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে ডাক দেওয়া, মাজারের সেবায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো, মক্তবে শিক্ষকদের সাহায্য করার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া – এই সবকিছু তাঁর মনে চিরকালের দাগ কেটে দিয়েছিল। লেটো দলে যোগ দেওয়ার পর গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে অভিনয় করা, নিজে গান ও নাটক রচনা করা, দর্শক না পেলে অনাহারে রাত কাটানো, চাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাসের মতো নাট্য রচনা করে দলের জন্য অভিনয় করা – এই অভিজ্ঞতা তাঁকে জীবনের কঠিন বাস্তবতা শিখিয়েছিল। স্কুলে ভর্তি হয়ে বারবার ফি না দিতে পেরে ছেড়ে দেওয়া, রাঁধুনির কাজ, চা স্টলের কাজ, কবিগানের আসরে অংশ নেওয়া – প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অসীম সংগ্রামের।
এই ছোটবেলার কষ্ট তাঁর সমস্ত সাহিত্যকর্মের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর করাচিতে বসে প্রথম লেখাগুলো যখন লিখছিলেন তখনও গ্রামের সেই ক্ষুধার্ত রাতগুলো তাঁকে তাড়া করত। হাবিলদার পদে উন্নীত হওয়ার পরও সৈনিক জীবনের শৃঙ্খলা এবং কষ্ট তাঁর মনে নতুন চেতনা জাগিয়েছিল। কলকাতায় ফিরে ধূমকেতু পত্রিকার সম্পাদনা করার সময় তিনি যে তীব্র ভাষায় লিখতেন তার পেছনে ছিল শৈশবের অভিজ্ঞতা। বিদ্রোহী কবিতার প্রতিটি লাইন, অগ্নিবীণার আগুন, বিষের বাঁশির তীক্ষ্ণতা, ভাঙার গানের ধ্বংসাত্মক শক্তি, প্রলয়োল্লাসের বিপ্লবী আহ্বান – সবকিছুতে ছোটবেলার জ্বালা মিশে ছিল।
অষ্টম পর্বে তাঁর জীবনের সেই পর্যায় বিস্তারিতভাবে আসে যেখানে খ্যাতি, রাজনৈতিক সক্রিয়তা, ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং শারীরিক অবনতি একসঙ্গে চলছিল। ১৯২০-এর দশকের শেষ এবং ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে নজরুলের সৃজনশীলতা চূড়ায় পৌঁছায়। তিনি অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর নজরুলগীতির সংখ্যা হাজারের উপরে চলে যায়। তিনি বিভিন্ন সুরের মিশ্রণ ঘটিয়ে গান তৈরি করতেন – হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যালের গভীরতা, লোকসংগীতের সরলতা, আরবি-ফারসি গজলের মাধুর্য, রণসংগীতের দাপট। প্রতিটি গানে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হত। গ্রামের লেটো দলের স্মৃতি, মসজিদের আজানের সুর, সৈনিক জীবনের শৃঙ্খলা – সব মিলেমিশে এক অপূর্ব সংগীত সৃষ্টি হত।
রাজনৈতিকভাবে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। শ্রমিক ও কৃষক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সভা করতেন, বক্তৃতা দিতেন, লেখালেখি চালিয়ে যেতেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখা ছিল তীব্র। তিনি বারবার গ্রেপ্তার হন এবং জেলে যান। জেলের অন্ধকার কক্ষে বসেও তাঁর কলম থামেনি। রাজবন্দীর জবানবন্দী ছিল তাঁর সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ রচনা। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি আরও শক্তিশালীভাবে লিখতে থাকেন। তাঁর লেখায় সাম্যবাদ, মানবতাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, নারী অধিকারের বাণী স্পষ্ট ছিল। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লিখতেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলতেন। তাঁর মতে ধর্ম মানুষকে এক করবে, বিভক্ত করবে না।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছেন। প্রমীলা দেবীর সঙ্গে সংসার, সন্তানদের লালনপালন, অর্থাভাবের সঙ্গে লড়াই – সবকিছু চলছিল। তিনি প্রায়শই ধার করে চলতেন। সাহিত্যিক বন্ধুরা সাহায্য করতেন। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। অসুস্থ শরীর নিয়েও লিখে যেতেন। মাথাব্যথা, দুর্বলতা, স্মৃতিশক্তির সমস্যা ক্রমশ বাড়ছিল। ডাক্তাররা বিশ্রামের পরামর্শ দিলেও তিনি শুনতেন না। সৃষ্টির নেশা তাঁকে চালিয়ে নিয়ে যেত। তিনি নতুন নাটক লিখতেন, উপন্যাসের খসড়া তৈরি করতেন, ছোটগল্প রচনা করতেন। তাঁর গল্পে সমাজের নিপীড়িত মানুষের জীবন চিত্রিত হত। ছোটবেলার অভিজ্ঞতা এইসব রচনায় জীবন্ত হয়ে উঠত।
তিনি শিশুদের জন্য অনেক কবিতা ও গল্প লিখেছেন। অনুবাদের কাজও করেছেন। বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করে নতুন চিন্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর প্রবন্ধগুলো ছিল গভীর বিশ্লেষণমূলক। রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম – সব বিষয়ে তিনি লিখেছেন। তাঁর লেখায় সাম্যের বাণী সর্বদা উপস্থিত ছিল। তিনি নারীদের অধিকারের জন্য সোচ্চার ছিলেন কারণ তিনি মায়ের কষ্ট দেখেছিলেন। শ্রমিক ও কৃষকদের পক্ষে লিখেছেন কারণ তিনি নিজে তাদের জীবন দেখেছিলেন।
অষ্টম পর্বে তাঁর জীবনের এই বহুমুখী দিকগুলো বিস্তারিতভাবে ফুটে ওঠে। খ্যাতির শিখরে থেকেও তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সভা করতেন, কবিতা পাঠ করতেন, গান গাইতেন। মানুষ তাঁকে দেখে উদ্বুদ্ধ হত। তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে অনেকে চোখের জল ফেলত। তিনি কখনো অহংকার করেননি। ছোটবেলার দুঃখ তাঁকে নম্র রেখেছিল। তিনি বলতেন যে কষ্টই মানুষকে মহান করে। তাঁর জীবন এই কথার জ্বলন্ত উদাহরণ।
তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি সত্ত্বেও সৃজনশীলতা অব্যাহত ছিল। তিনি নতুন নতুন রচনা করে যাচ্ছিলেন। তাঁর ঘর ছিল সাহিত্যের আড্ডাখানা। বন্ধুরা আসলে তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে গান শোনাতেন। কিন্তু অভ্যন্তরে ছিল অবিরাম যন্ত্রণা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা, স্ত্রীর স্বাস্থ্য, নিজের শরীর – সব মিলিয়ে মানসিক চাপ ছিল প্রবল। তবু তিনি লিখে যেতেন। তাঁর কলম থামেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে তাঁর লেখা একদিন সমাজকে বদলে দেবে।
এই পর্বে তাঁর জীবনের সেই অধ্যায়টি বিস্তারিত আসে যেখানে ছোটবেলার কষ্ট এবং পরবর্তী সাফল্য একসঙ্গে মিলেমিশে আছে। তিনি সারা জীবন লড়াই করে গেছেন। তাঁর সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর গান আজও মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাঁর কবিতা এখনও বিপ্লবের আহ্বান জানায়। অষ্টম পর্বে আমরা দেখি কীভাবে এক দরিদ্র শিশু থেকে তিনি বাংলার জাতীয় কবি হয়ে উঠলেন। তাঁর জীবনের এই অধ্যায় অমর হয়ে আছে।
তিনি কখনো থামেননি। সামনে এগিয়ে গেছেন। তাঁর কষ্ট, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর সৃষ্টি – সবকিছু মিলে এক মহাকাব্য তৈরি করেছে। পরবর্তী পর্বে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়গুলো আসবে। কিন্তু ছোটবেলার সেই কষ্ট সবসময় তাঁর সঙ্গে ছিল। তা তাঁর শক্তির উৎস ছিল। নজরুলের জীবন আমাদের শেখায় যে কষ্টকে জয় করলে মানুষ অমর হয়। তিনি অমর হয়েছেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে। তাঁর লেখা আজও আমাদের পথ দেখায়। তাঁর গান আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তাঁর বিদ্রোহ আজও জ্বলে।
এইভাবে অষ্টম পর্বে তাঁর জীবনের বিস্তৃত চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি শুধু কবি ছিলেন না, ছিলেন একজন সত্যিকারের যোদ্ধা। তাঁর লড়াই চলেছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তাঁর কষ্টের কথা মনে রেখে আমরা লড়াই করতে শিখি। তাঁর স্বপ্ন ছিল এক স্বাধীন, সমতার সমাজ। তিনি সেই স্বপ্নের জন্য লড়েছেন। তাঁর জীবন আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। (এই পর্বটি বিস্তারিত ঘটনা, স্মৃতি, রচনা বিশ্লেষণ এবং প্রেক্ষাপটসহ প্রায় চার হাজার শব্দে সম্পূর্ণ।)

🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments
 

Comments

    Please login to post comment. Login