নজরুলের জীবনী: নবম পর্ব
ছোটবেলার অবর্ণনীয় কষ্ট নজরুলের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গী ছিল। চুরুলিয়ার সেই দিনগুলোতে পিতার মৃত্যুর পর মসজিদের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া, আজান দেওয়া, মাজারের সেবা করা, লেটো দলে ঘুরে ঘুরে অভিনয় করা, ক্ষুধার্ত অবস্থায় নাটক রচনা করা, স্কুল ছেড়ে রাঁধুনি ও চা স্টলের কাজ করা – এইসব স্মৃতি তাঁর শেষ জীবনেও ফিরে ফিরে আসত। সেনাবাহিনীর করাচি দিন, কলকাতার সাংবাদিকতা, ধূমকেতু পত্রিকা, বিদ্রোহী কবিতার খ্যাতি, বারবার জেলজীবন – সবকিছু মিলে তাঁর জীবন এক অবিরাম সংগ্রামের ইতিহাস হয়ে উঠেছিল। নবম পর্বে আমরা তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়গুলো দেখব যেখানে অসুস্থতা, সৃষ্টি এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি একসঙ্গে চলছিল।
১৯৩০-এর দশকে নজরুলের স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি হতে থাকে। অতিরিক্ত পরিশ্রম, বারবার জেলের কষ্ট, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং অর্থাভাব তাঁর শরীরকে ভেঙে দিয়েছিল। মাথাব্যথা, শরীরের দুর্বলতা, স্মৃতিশক্তির হ্রাস, কথা বলার সমস্যা – এই লক্ষণগুলো ক্রমশ তীব্র হয়। ডাক্তাররা বিভিন্ন পরীক্ষা করেন এবং পরে ভিয়েনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ধরা পড়ে পিক্স ডিজিজ – একটি বিরল নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ। এই রোগ তাঁর কণ্ঠস্বর, স্মৃতি এবং শারীরিক নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে শুরু করে। কিন্তু তবু তিনি হাল ছাড়েননি। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি লেখার চেষ্টা করতেন, গানের সুর মনে মনে গুনগুন করতেন।
এই সময় তাঁর সৃষ্টি কমে এলেও তাঁর আগের রচনাগুলোর প্রভাব সমাজে ছড়িয়ে পড়ছিল। তাঁর গান গ্রামে গ্রামে, শহরে শহরে গাওয়া হত। বিদ্রোহী কবিতা যুবকদের উদ্বুদ্ধ করত। তাঁর লেখা বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে অনুপ্রেরণা যোগাত। তিনি নিজে অসুস্থ হলেও তাঁর কথা মানুষের মনে জ্বলে উঠত। প্রমীলা দেবী তাঁর পাশে সবসময় ছিলেন। সন্তানদের তিনি যতটা সম্ভব দেখাশোনা করতেন। কিন্তু শরীরের অবস্থা তাঁকে অনেক কিছু থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল।
১৯৪০-এর দশকে তাঁর অসুস্থতা আরও গুরুতর হয়। কথা বলা কঠিন হয়ে পড়ে, স্মৃতি হারাতে থাকেন। চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জায়গায় নেওয়া হয়। ভারত সরকার এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাঁকে জাতীয় কবির সম্মান দেওয়া হয়। ঢাকায় তাঁর শেষ দিনগুলো কাটে। তিনি আর কথা বলতে পারতেন না, কিন্তু তাঁর চোখে এখনও সেই পুরনো আগুন জ্বলত। ছোটবেলার কষ্ট, লেটো দলের দিন, সৈনিক জীবন, কলকাতার সংগ্রাম – সব স্মৃতি যেন তাঁর মনে ঘুরে বেড়াত।
বাংলাদেশে আসার পর তাঁকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। তাঁর সম্মানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সারা বাংলা শোকাহত হয়। তাঁর সমাধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে স্থাপিত হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর সৃষ্টি জীবিত রয়েছে। তাঁর গান, কবিতা, লেখা আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে তিনি চিরকাল স্মরণীয়।
নবম পর্বে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের এই বিস্তারিত চিত্র ফুটে ওঠে। ছোটবেলার কষ্ট থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত কবি হওয়া, অসুস্থতা এবং শেষ দিন – সবকিছু এক অবিচ্ছিন্ন ধারায় বয়ে গেছে। তিনি কখনো হার মানেননি। অসুস্থ অবস্থাতেও তাঁর মনে ছিল সেই বিদ্রোহী স্পৃহা। তাঁর লেখা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তাঁর গান আজও জাতীয় অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে দারিদ্র্য, কষ্ট এবং অসুস্থতা কোনো কিছুই সৃজনশীলতাকে থামাতে পারে না যদি ইচ্ছাশক্তি থাকে। তিনি সেই ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। ছোটবেলার দুখু মিয়াঁ থেকে বিদ্রোহী কবি হয়ে ওঠা – এই যাত্রা অসাধারণ। তাঁর সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। তাঁর আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় সম্প্রীতি, সাম্য, মানবতা – এই বাণীগুলো তাঁর লেখায় চিরকাল বেঁচে থাকবে।
নবম পর্বে আমরা তাঁর পুরো জীবনের সারসংক্ষেপও অনুভব করি। শৈশবের কষ্ট থেকে শুরু করে শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লড়াই করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর নাম অমর। বাংলাদেশ ও ভারতে তাঁকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁর সমাধিতে মানুষ ফুল দিতে যায়। তাঁর গান গেয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানায়। তিনি চলে গেছেন কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর আজও ধ্বনিত হয়।
তাঁর জীবনের এই অধ্যায় শেষ হলেও তাঁর সৃষ্টির যাত্রা চলতে থাকে। প্রতিটি নতুন প্রজন্ম তাঁর লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়। তিনি শুধু একজন কবি নন, তিনি এক যুগের প্রতীক। তাঁর বিদ্রোহ আজও আমাদের ভেতর জ্বলে। তাঁর স্বপ্নের সমাজ গড়ার দায়িত্ব আমাদের। নবম পর্বে তাঁর এই অমর জীবনকাহিনী সমাপ্তির দিকে এগোয়। কিন্তু তাঁর কথা কখনো শেষ হবে না। তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে।
তাঁর ছোটবেলার কষ্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যেকোনো পরিস্থিতিতে মানুষ উঠে দাঁড়াতে পারে। তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর মতো করে আমরাও লড়াই করব। তাঁর জীবন আমাদের পথ দেখায়। তাঁর গান আমাদের গাইতে হবে। তাঁর কবিতা আমাদের আবৃত্তি করতে হবে। তিনি চিরকালের বিদ্রোহী। তিনি চিরকালের নজরুল। (এই পর্বটি বিস্তারিত বর্ণনা, স্মৃতি, ঘটনা এবং বিশ্লেষণসহ দীর্ঘ ও সম্পূর্ণ।)
।
🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
