Posts

নন ফিকশন

নজরুলের জীবনী: দশম পর্ব

July 10, 2026

Md Josam

26
View

🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments

নজরুলের জীবনী: দশম পর্ব
কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল চিকিৎসা, সম্মান, স্মৃতির আলোয় ডুবে থাকা এবং অমরত্বের এক অপূর্ব মিশ্রণ। ১৯৪২ সালের পর থেকে পিক্স ডিজিজ নামক বিরল নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়। এই রোগ ধীরে ধীরে তাঁর মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশকে আক্রান্ত করে, কথা বলার ক্ষমতা কেড়ে নেয়, স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যায়, শারীরিক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এবং তাঁকে ধীরে ধীরে নীরব করে দেয়। তিনি আর নতুন কবিতা লিখতে পারতেন না, নতুন গান রচনা করতে পারতেন না, এমনকি সাধারণ দৈনন্দিন কথাবার্তাও তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারতের বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীকালে ভিয়েনায় পাঠানো হয়। সেখানকার বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন যে এই রোগের কোনো স্থায়ী চিকিৎসা তখনকার চিকিৎসাবিজ্ঞানে সম্ভব ছিল না।
কিন্তু এই অসুস্থতার মাঝেও তাঁর আগের সৃষ্টিগুলো সমাজে অব্যাহত গতিতে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। তাঁর হাজার হাজার গান গ্রামের মাঠে, শহরের রাস্তায়, স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠানে এবং বাড়ির আঙিনায় গাওয়া হতে থাকে। বিদ্রোহী কবিতা যুবকদের মনে আগুন জ্বালিয়ে দিত, তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাত। তাঁর গল্প ও নাটকে সমাজের নিপীড়িত মানুষের জীবনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠত – দরিদ্র কৃষকের ঋণের জাল, শ্রমিকের অমানবিক পরিশ্রম, নারীর প্রতি অবিচার এবং ধর্মের নামে চলা শোষণ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার তাঁকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। ঢাকায় তাঁর চিকিৎসার পূর্ণ ব্যবস্থা করা হয়। তিনি আর কথা বলতে পারতেন না, কিন্তু তাঁর চোখে এখনও সেই পুরনো জীবনের ছায়া দেখা যেত – সেই অসীম সংগ্রাম, সেই অফুরন্ত সৃষ্টি, সেই অদম্য বিদ্রোহের আগুন।
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে পুরো বাংলাদেশ এবং ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চল গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। তাঁর সমাধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থাপিত হয়। প্রতি বছর তাঁর জন্মদিন এবং মৃত্যুবার্ষিকীতে ব্যাপক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাঁর গান রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে, স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠানে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এবং সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে গাওয়া হয়। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি তাঁর অনেক গানকে জাতীয় পর্যায়ে সম্মান দেওয়া হয়।
তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল অতুলনীয় এবং বৈচিত্র্যময়। প্রায় চার হাজার গান, দুই হাজারের বেশি কবিতা, শতাধিক ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক এবং প্রবন্ধ তিনি রেখে গেছেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার এক নতুন স্রোত আনেন। গজলকে বাংলায় জনপ্রিয় করে তোলেন, শ্যামাসংগীত এবং রণসংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করেন। তাঁর লেখায় বিপ্লবের আহ্বান, মানবতার গভীর বাণী, সাম্যের দৃঢ় দাবি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নারী অধিকারের সোচ্চার কণ্ঠ সবসময় উপস্থিত ছিল। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে সারাজীবন অক্লান্তভাবে কথা বলেছেন এবং লিখেছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য এবং প্রভাবশালী। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে তাঁর লেখা এবং বক্তৃতা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান সৈনিকদের মনে অসীম শক্তি যুগিয়েছে। আজও বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর রচনা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তাঁর লেখা শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যের সীমানায় আবদ্ধ নয়, তা সমগ্র বাঙালি জাতির চেতনার অংশ হয়ে উঠেছে।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল অসীম সংগ্রামের। প্রমীলা দেবীর সঙ্গে সংসার জীবন, সন্তানদের লালনপালন, দীর্ঘদিনের অর্থাভাবের সঙ্গে লড়াই – সবকিছু তাঁকে কখনো থামতে দেয়নি। অসুস্থতার সময়ও পরিবার তাঁর পাশে অটলভাবে দাঁড়িয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা তাঁর স্মৃতি রক্ষা এবং তাঁর সৃষ্টিকে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছেন।
নজরুলের জীবন একটি সম্পূর্ণ মহাকাব্যের মতো। দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে খ্যাতির উজ্জ্বল শিখরে ওঠা, বারবার কারাবাসের যন্ত্রণা থেকে অসুস্থতার সঙ্গে অবিরাম লড়াই, এবং শেষ পর্যন্ত অমরত্ব লাভ – এই পুরো যাত্রা ছিল অনন্য এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি দেখিয়ে গেছেন যে কোনো প্রতিকূলতাই একজন সৃজনশীল মানুষকে চিরতরে দমাতে পারে না যদি তাঁর মধ্যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকে। তাঁর সৃষ্টি বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়েছে। তাঁর আদর্শ আজও সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক। সম্প্রীতি, সাম্য, বিদ্রোহ, মানবতা এবং ন্যায়ের বাণী তাঁর লেখায় চিরকাল বেঁচে থাকবে এবং নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে।
দশটি পর্বে তাঁর পুরো জীবনকাহিনী সমাপ্ত হলো। তিনি শারীরিকভাবে চলে গেছেন কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর বিদ্রোহী চেতনা আজও প্রতিধ্বনিত হয় প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। তিনি চিরকালের বিদ্রোহী কবি, চিরকালের নজরুল। জয় নজরুল। জয় বাংলার অমর কণ্ঠস্বর। তাঁর নাম চিরকাল অমর হয়ে থাকুক বাংলা সাহিত্যের আকাশে।

Comments

    Please login to post comment. Login