আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা, যিনি সারা বিশ্ব জগতের মধ্যে একক কর্তৃত্বের অধিকারী। তিনি এক, অদ্বিতীয়। একজন মুসলিম হিসেবে আমরা সকলেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ভালোবাসা পেতে চাই। কারণ তিনিই এক মাত্র সত্তা, যার ভালোবাসা পেলে এই সারা বিশ্বজগতে আর কোন কিছুরই প্রয়োজন আসবে না। তাই এই মহান প্রবিত্র সত্তার ভালোবাসা পেতে হলে আমাদের কে এমন সব গুণ অর্জন করতে হবে যা তিনি আমাদের কে অর্জন করতে বলেছেন। আজকের প্রবন্ধে আমরা সেই সব গুণ নিয়ে আলোচনা করবো, যে সকল গুণের অধিকারী হলে আল্লাহ্ আমাদেরকে ভালবাসেন।
একটি সহীহ হাদিস দিয়ে শুরু করতে চাই। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ যখন আল্লাহ তা’আলা কোন বান্দাকে ভালবাসেন, তখন তিনি জিবরীল (আঃ) -কে ডেকে বলেন, আল্লাহ তা’আলা অমুক বান্দাকে ভালবাসেন, তুমিও তাকে ভালবাসবে। তখন জিবরীল (আঃ) তাকে ভালবাসেন এবং তিনি আসমানবাসীদের ডেকে বলেন, আল্লাহ তা’আলা অমুককে ভালবাসেন, অতএব তোমরাও তাকে ভালবাসবে। তখন আসমানবাসীরাও তাকে ভালবাসে। তারপর আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে দুনিয়াবাসীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা সৃষ্টি করা হয়। সহীহ বুখারী, খন্ড-৯, হাদিস নাম্বারঃ ৫৬১৪।
এই হাদিস থেকে আমরা পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারছি যে, যে ব্যক্তি কে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন তাকে পুরো বিশ্বজগৎ ভালবাসে। সে পুরো বিশ্বের মধ্যমণি হয়ে থাকবে। পুরো বিশ্ব তাকে শ্রদ্ধা করবে। পুরো বিশ্ব তার হাতের মুঠোয় চলে আসবে। তাহলে এখন আমাদের জেনে নেয়া উচিত আল্লাহ্ তাআলা কাকে ভালোবাসেন।
আল্লাহ্ তাআলা কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে আমাদের কে জানিয়ে দিয়েছে যে তিনি কাকে ভালোবাসেন। আসুন আমরা কোরআন ও হাদিস থেকে তা জেনে নেই।
১। মুত্তাকী
আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালবাসেন।
আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কোরআন এ বলেন,
فَإِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُتَّقِينَ ٧٦
তবে নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালবাসেন। আল ইমরান (৩) আয়াতঃ ৭৬
মুত্তাকী অর্থ হচ্ছে যাদের অন্তরে আল্লাহ তায়ালার ভয় আছে এবং যারা আল্লাহর আদেশ নিষেধ পালন করেন। যারা মুত্তাকী হবেন আল্লাহ্ তাদের ভালোবাসবেন।
২। তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারী
আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কোরআন এ বলেন,
إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلتَّوَّٰبِينَ وَيُحِبُّ ٱلْمُتَطَهِّرِينَ ٢٢٢
নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাহ্কারীদেরকে ভালবাসেন আর পবিত্রতা অবলম্বীদেরকেও ভালবাসেন। আল বাকারাহ (২) আয়াতঃ ২২২
অর্থৎ যিনি গুনাহ করেছেন এবং এ জন্য তওবাহ করেছেন এবং যিনি অপবিত্র অবস্থান থেকে দ্রুত পবিত্রতা অর্জন করেছেন, আল্লাহ্ উক্ত ব্যক্তিকে ভালোবাসেন।
৩। সৎকর্মশীল
আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কোরআন এ বলেন,
وَٱللَّهُ يُحِبُّ ٱلْمُحْسِنِينَ ١٣٤
এবং আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন। আল ইমরান (৩) আয়াতঃ ১৩৪
অর্থৎ যারা ঈমান আনার পর সৎ কাজ করবে, আল্লাহ্ তাদের ভালোবাসবেন।
৪। তাওয়াক্কুলকারী
আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কোরআন এ বলেন,
إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُتَوَكِّلِينَ ١٥٩
নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের কে ভালবাসেন। আল ইমরান (৩) আয়াতঃ ১৫৯
তাওয়াক্কুল এর অর্থ ভরসা করা, নির্ভর করা, স্বীকৃতি প্রদান করা। সব কিছুর জন্য শূধু আল্লাহর উপর ভরসা করা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যের উপর তাওয়াক্কুল করা শির্ক হিসেবে গণ্য হয়। সুতরাং যিনি সকল পরিস্থিতিতে, সকল কিছুর জন্য আল্লাহ্র উপর ভরসা করবেন, আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসবেন।
৫। ধৈর্যশীল
আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কোরআন এ বলেন,
وَٱللَّهُ يُحِبُّ ٱلصَّـٰبِرِينَ ١٤٦
এবং আল্লাহ ধৈর্যশীলগণকে ভালবাসেন। আল ইমরান (৩) আয়াতঃ ১৪৬
অর্থৎ সকল বিপদ আপদে, দুঃখ, দুর্দশায়, অনাহারে যারা ধৈর্য ধারণ করবেন, তারা আল্লাহ্র ভালোবাসা পাবেন।
৬। সুবিচারকারী
আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কোরআন এ বলেন,
إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُقْسِطِينَ ٩
নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন। আল হুজুরাত (৪৯) আয়াতঃ ০৯
যাকে বিচারিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তিনি কোন পক্ষ, ক্ষমতা, টাকা, খ্যাতি, ধনি, গরিব ইত্যাদি না দেখে ন্যায় বিচার করবেন, তিনি আল্লাহ্র ভালোবাসা পাবেন।
৭। আল্লাহ্র পথে যুদ্ধকারী
আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কোরআন এ বলেন,
إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلَّذِينَ يُقَـٰتِلُونَ فِى سَبِيلِهِۦ صَفًّۭا كَأَنَّهُم بُنْيَـٰنٌۭ مَّرْصُوصٌۭ ٤
নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে যেন তারা সীসা ঢালা প্রাচীর। আস-সাফ (৬১) আয়াতঃ ০৪
যারা আল্লাহ্র রাস্তাই অর্থাৎ ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করবেন এবং এমন ভাবে যে কোন দুঃখ, কষ্ট, ভয়, অনাহার এমন কি মৃত্যু ও তাদের কে ইসলাম প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ থেকে সরাতে পারবেন না, তাদের আল্লাহ্ ভালোবাসবেন।
৮। নবীজী (সঃ) কে অনুসরণকারী
আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কোরআন এ বলেন,
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِى يُحْبِبْكُمُ ٱللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَٱللَّهُ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ ٣١
তুমি বলঃ যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস তাহলে আমার নবী (সঃ) কে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসেন ও তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করেন; এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। আল ইমরান (০৩) আয়াতঃ ৩১
অর্থাৎ সব বিষয়ে রাসুল (সা.)-এর অনুসরণ জরুরি। যে ব্যক্তি রাসুল (সা.)-কে অনুসরণ করে সে মূলত মহান আল্লাহকেই অনুসরণ করে। একমাত্র রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য ও অনুকরণের মাধ্যমেই কেবল আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি, মুক্তি ও হেদায়েত পাওয়া সম্ভব। আর যে ব্যক্তি রাসুল (সা.) সব ক্ষেত্রে অনুসরণ করবে তাকে আল্লাহ্ তাআলা ভালোবাসবেন।
সম্মানিত মুসলিম ভাই ও বোনেরা, এতক্ষণ আমরা সেই সকল গুণাবলী নিয়ে আলোচনা করলাম যার অধিকারী হলে আল্লাহ্ আমাদের ভালোবাসবেন।
কাতাদা ইবনুন নু’মান (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা যখন কোন বান্দাহকে ভালবাসেন তাকে দুনিয়া(প্রাচুর্য) হতে বাঁচিয়ে রাখেন, যেমন তোমাদের কেউ তার রোগীকে পানি হতে বাঁচিয়ে রাখে (পানি স্পর্শ করলে যার অসুবিধা হবে, তাকে) । জামে' আত-তিরমিজি, খন্ডঃ ৫, হাদিস নাম্বারঃ ২০৪৩
আল্লাহতায়ালার ভালোবাসার বান্দার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হলো-তাকে আল্লাহ দ্বীনের বুঝ দান করবেন এবং সে অনুযায়ী বেশি বেশি নেক আমল করার সুযোগ দান করবেন।
হুমায়দ ইব্নু ‘আবদুর রহমান (রহঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আমি মু’আবিয়াহ (রাঃ)-কে খুৎবায় বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে দ্বীনের ‘ইল্ম দান করেন। আমি তো বিতরণকারী মাত্র, আল্লাহই (জ্ঞান) দাতা। সর্বদাই এ উম্মাত কিয়ামাত পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমের উপর কায়িম থাকবে, বিরোধিতাকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সহীহ বুখারী, খন্ড-০১, হাদিস নাম্বারঃ ৭১।
তাহলে আসুন আমরা বর্ণিত গুণাবলী গুলো অর্জন করি। তাহলে আল্লাহ্ আমাদের ভালোবাসবেন। আমরা তার প্রিয় পাত্র হয়ে যাবে। যা আমাদের দুনিয়াতে ও আখেরাতে সাফল্য দান করবে।