Posts

সত্তাশ্রয়ী

ব্যথাতুর হৃদয়ের আর্তনাদ ও প্রতিদান

July 10, 2026

Abu Hanif

7
View

রাতের শুরু বা হয়তো শেষ প্রহর। মেথিকান্দা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বাতাস যেন কাঁদছিল। দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছিল, অথচ সেই শব্দের চেয়েও নিঃশব্দ ছিল এক বৃদ্ধা নারী বুবি। স্টেশনের মানুষ তাঁকে ডাকত "বুবি" নামে। কারও কাছে তিনি ছিলেন ভিক্ষুক, কারও কাছে স্টেশনের ঝাড়ুদার, আবার কারও কাছে নিঃশব্দ এক ছায়ামানবী।  কিন্তু তাঁর নিজের কোনো পরিচয় ছিল না।  তিনি ছিলেন বাক্‌প্রতিবন্ধী। জীবনের প্রায় সত্তরটি বছর পার করে ফেলেও কাউকে একটি পূর্ণ বাক্য বলতে পারেননি। পঁচিশ বছর আগে জীবন মৃত্যুর খেলাছলে একদিন ট্রেনে চড়ে তিনি এসেছিলেন এই স্টেশনের ফ্ল্যাটফর্মে। কেউ জানত না তিনি কোথা থেকে এসেছেন, কেন এসেছেন, কিংবা কাকে হারিয়ে এসেছেন। কেউ কোনোদিন জানতে চেষ্টাও করেনি। ধীরে ধীরে স্টেশনটাই হয়ে উঠেছিল তাঁর পৃথিবী বা আপন ভূবন।

ভিক্ষা করতেন বা কখনো কখনো স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করতেন। দিনের শেষে যা পেতেন, তার সামান্য অংশ খরচ করে বাকিটা জমাতেন। এভাবেই একদিন নয়, দু'দিন নয়—পঁচিশটি বছর কেটে গেল। সব মিলিয়ে জমেছিল মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা। হিসাব কষলে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে চার টাকা আটত্রিশ পয়সা করে জমেছিল। কিন্তু সেই টাকার ভেতরে লুকিয়ে ছিল তাঁর না বলা হাজারো স্বপ্ন বা গল্প যা কেউ কোনদিন শুনতেই চায়নি। আশা ছিল, হয়তো একদিন একটা ছোট্ট ঘর হবে বা কোনো হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খুঁজে বের করবেন।
হয়তো নিজের কবরের জন্য এক টুকরো মাটি কিনবেন। অথবা হয়তো শুধু এই বিশ্বাসটুকু আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন—যে, একদিন তাঁরও একটি ঠিকানা হবে।

কিন্তু মানুষের লোভ স্বপ্ন বোঝে না। সেই রাতেই কিছু দুর্বৃত্ত তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চল্লিশ হাজার টাকার জন্য তাঁকে নির্মমভাবে পেটাতে লাগল। তিনি কথা বলতে পারতেন না, ছিলেন বোবা। তাই সাহায্যের জন্য চিৎকারও করতে পারলেন না। সেদিন তাঁর বুকের ভেতর নিশ্চয়ই হাজারবার আর্তনাদ উঠেছিল। 
"বাঁচাও.. বাঁচাও.. বলে। কিন্তু সেই আর্তনাদের কোনো শব্দ ছিল না। তিনি কাকে ডাকছিলেন?
মাকে?
বাবাকে?
নাকি মহান আল্লাহকে?
কেউ জানে না।
রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত মুখ নিয়ে তিনি স্টেশনের একটি বেঞ্চে গিয়ে বসেছিলেন। চোখদুটো স্থির হয়ে ছিল রেললাইনের দিকে। মনে হচ্ছিল, জীবনের শেষ ট্রেনটির অপেক্ষায় আছেন। অবশেষে সেই ট্রেন এল। তবে সে ট্রেনে কোনো যাত্রী নিয়ে নয়।  মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে।

পরদিন মানুষ জানল—বুবি আর বেঁচে নেই। তার জমানো টাকাগুলোও নেই। তাঁকে যারা হত্যা করেছিল, তারা হয়তো সেই টাকা দিয়ে কয়েকদিন ভালো খাবে, আনন্দ বা ফুর্তি করবে। কিন্তু তারা এটা জানে না যে, তারা শুধু একজন বৃদ্ধাকে হত্যা করেনি; হত্যা করেছে পঁচিশ বছরের ত্যাগ, হাজারো স্বপ্নে বুনা নীরব এক গল্প ও একজন অসহায় মানুষের শেষ আশা বা সম্বলটুকুও।

বুবির জন্য কোনো শোকসভা হলো না। কোনো প্রতিবাদ মিছিল বের হলো না। কোনো সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় তাঁর ছবি ছাপা হলো না। এমনকি তাঁর কবরেও হয়তো কোনো নাম লেখা হলো না। দিন কেটে গেল। স্টেশনে আবার ট্রেন থামতে লাগল। মানুষ আসল, মানুষ চলে গেল। নতুন নতুন মুখের ভিড়ে কেউ আর খেয়াল করল না—যে দুইটি বৃদ্ধ পা প্রতিদিন প্ল্যাটফর্মে হাঁটত, সেগুলো আর কোনোদিন হাঁটবে না।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। এক বিকেলে ছোট্ট ছেলে তার বাবার হাত ধরে স্টেশনে এসেছিল। সে দেখল, যেখানে বুবি বসতেন, সেখানে একটি ছেঁড়া কম্বল পড়ে আছে। ছেলেটি বাবাকে জিজ্ঞেস করল, —"বাবা, এখানে যে দাদি থাকতেন, তিনি কোথায়?" বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুধু বললেন—"মানুষের নিষ্ঠুরতা তাঁকে আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে।" ছেলেটি নিজের টিফিনের জন্য জমিয়ে রাখা ছোট্ট সঞ্চয়ের বাক্সটি বাবার হাতে দিয়ে বলল,
—"বাবা, এই টাকা দিয়ে এমন মানুষের জন্য একটা ঘর বানিও, যাতে আর কোনো বুবিকে স্টেশনে রাত কাটাতে না হয়।" বাবার চোখ ভিজে উঠল।


হয়তো সেদিন প্রথমবারের মতো বুবির মৃত্যুর একটি সত্যিকারের প্রতিদান জন্ম নিল। একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা কোনো ভাষায় কথা বলতে পারেননি। কিন্তু তাঁর নীরব মৃত্যুও বাচ্চাটিকে শিখিয়ে গেল— মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় ধন-সম্পদ নয়, তার মানবতা। বিবেক আজ বিবর্জিত, তাইতো বিবেকের কাছে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন জাগে- মানুষ কত অসহায় ও নিষ্ঠুরও বটে।

আজ যে সমাজ অসহায় মানুষের কান্না শুনতে পায় না, একদিন সেই সমাজও নিজের বিবেকের সামনে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বুবি চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর নীরব আর্তনাদ আজও প্রতিটি রেলস্টেশনের বাতাসে ভেসে বেড়ায়— "আমাকে নয়, তোমাদের মানবতাকেই হত্যা করা হয়েছে..."। যে বোবা কথা বলতে পারেনি। অথচ তাঁর নীরব মৃত্যুই আজ হাজারো মানুষের বিবেককে প্রশ্ন করে— সত্যিই কি আমরা মানুষ?"

নোট - এই গল্পটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখা, যা গঠিত হয়েছে ০৪ জুলাই ২০২৬ রাতে মেথিকান্দা রেলস্টেশনের ফ্ল্যাটফর্মে (নরসিংদী) এবং ব্যক্তিটি মারা যায় ০৮ জুলাই ২০২৬ রাত ১.১০ মিনিট।

মোঃ আবু হানিফ

Comments

    Please login to post comment. Login