Posts

গল্প

মেঘনার বুকে কালবৈশাখী।

July 11, 2026

Shafin pro

9
View

মেঘনার বুকে কালবৈশাখী: এক জীবন্ত মৃত্যুর গল্পবিকেলের আকাশটা যখন বুড়িগঙ্গার বুকে হালকা লালচে আভা ছড়াচ্ছিল, তখন ঢাকা সদরঘাট থেকে আমাদের লঞ্চটি বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। চারপাশের পরিবেশটা ছিল বেশ শান্ত। ডেকে ঠাণ্ডা বাতাস, যাত্রীদের মৃদু গুঞ্জন আর ইঞ্জিনের চেনা ছন্দময় আওয়াজ—সব মিলিয়ে এক চমৎকার ভ্রমণের আমেজ তৈরি হয়েছিল। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে কেবিনে বসে গল্প করছিলাম। রাতের খাবারের পরিকল্পনা, বরিশালে গিয়ে কোথায় কোথায় ঘুরবো, সেসব নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছিল। কিন্তু আমরা কেউই জানতাম না, প্রকৃতির এক ভয়াবহ রূপ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।লঞ্চটি যখন ধীরলয়ে এগিয়ে চলল, তখন ঘড়িতে রাত প্রায় আটটা। নদী আরও চওড়া হতে শুরু করেছে। আমরা তখন চাঁদপুরের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছি। হঠাৎ করেই বাতাসের গতিপথ বদলে গেল। এতক্ষণ যে বাতাসটা গায়ে আরাম দিচ্ছিল, মুহূর্তেই তা যেন হিংস্র হয়ে উঠল। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখা গেল, মেঘের ঘন কালো চাদর পুরো আকাশকে গিলে খেয়েছে। চাঁদের আলো উধাও, চারপাশ একদম নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেল।কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রথম ঝাপটাটা এসে লাগল লঞ্চের গায়ে। বিশালাকার এক একটা ঢেউ এসে আছড়ে পড়তে লাগল ডেকের ওপর। লঞ্চটি ডান-বামে মারাত্মকভাবে দুলতে শুরু করল। কেবিনের ভেতরে থাকা জিনিসপত্র মেঝেতে পড়ে ছিটকে যেতে লাগল। বাইরে তখন বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর মেঘের তীব্র গর্জন। বুঝতে আর বাকি রইল না, আমরা মাঝনদীতে এক ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়েছি।মুহূর্তের মধ্যে পুরো লঞ্চজুড়ে এক নরককুণ্ড তৈরি হলো। ডেকের সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে কেবিনের মানুষ—সবার মুখে এক তীব্র আতঙ্কের ছাপ। নিচ তলা থেকে ভেসে আসতে লাগল শত শত মানুষের আর্তনাদ, হইচই আর কান্নাকাটি। মানুষ দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছে। কেউ আল্লাহর নাম জপছে, কেউ নিজের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছে। এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুর হাতছানি যেন চারপাশ থেকে আমাদের ঘিরে ধরল।আমরা যে কেবিনে ছিলাম, তার ঠিক পাশের টেবিল বা লাউঞ্জে বসা ছিলেন কয়েকজন মহিলা। ঝড় শুরু হতেই তাদের মধ্যে কান্নাকাটির রোল পড়ে গেল। এক মাঝবয়সী মহিলা তার দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, "ও আল্লাহ, আমাদের রক্ষা করো! আমার ছোট ছোট বাচ্চাদের তুমি বাঁচাও!" তাদের সেই বুকফাটা আর্তনাদ আমাদের হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিল। নিজের অজান্তেই চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসছিল। আসলেই, মৃত্যুর এত কাছাকাছি মানুষ যখন পৌঁছায়, তখন সমস্ত অহংকার, সমস্ত চাওয়া-পাওয়া ধূলিসাৎ হয়ে যায়।বাতাসের তীব্রতা এতই বেড়ে গিয়েছিল যে লঞ্চের ব্যালেন্স রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল নদীর পানি উপচে ডেকের ভেতর ঢুকে পড়ছে। এই চরম সংকটের মুহূর্তে আমরা খেয়াল করলাম, কেবিনের সামনে কিছু লাইফ বয়া (বয়াগুলো) ঝুলানো রয়েছে। যদি কোনো কারণে লঞ্চটি ডুবে যায়, তবে এই বয়াগুলোই হতে পারে বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। জীবনের তাগিদে আমরা কালবিলম্ব না করে কেবিনের সামনে থেকে সেই বয়াগুলো টেনে টেনে আমাদের কেবিনের ভেতরে নিয়ে এলাম। বয়াগুলো ভেতরে আনার পর মনে একটু সাহস পেলেও চারপাশের পরিস্থিতি সেই সাহসকে বারবার গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল।এদিকে লঞ্চের সারেং মশাই (চালক) তখন জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। মাঝনদীতে এই উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে লঞ্চ সোজা রাখা অসম্ভব ছিল। যেকোনো মুহূর্তে লঞ্চটি উল্টে যাওয়ার চরম ঝুঁকি ছিল। নদীর তীব্র স্রোত আর বাতাসের ধাক্কায় লঞ্চটি বারবার দিক হারাচ্ছিল। সারেং মশাই পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং যাত্রীদের প্রাণ বাঁচাতে সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি দূর থেকে নদীর চরে থাকা একটি ইফতারের (নদীর পাড়ে বা চরের শক্ত উঁচু স্থান বা মাটির স্তূপ) আবছা আলো বা আকৃতি দেখতে পেয়েছিলেন।তিনি কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে, লঞ্চের গতি বাড়িয়ে সোজা সেই চরের ইফতারের ওপর লঞ্চটি চালিয়ে উঠিয়ে দিলেন। তীব্র এক ঝাঁকুনি দিয়ে লঞ্চটি গিয়ে শক্ত মাটির ওপর আটকে গেল। ইঞ্জিনের গর্জন থেমে গেল, কিন্তু চারপাশের ঝড়ের তাণ্ডব কমেনি। লঞ্চটি কাত হয়ে রইল, তবে মাঝনদীতে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেল। সারেং মশাইয়ের এই উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসিকতার কারণেই শত শত প্রাণ এক নিশ্চিত সলিলসমাধি থেকে বেঁচে গেল।লঞ্চটি চরে আটকে গেলেও আমাদের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। বাইরে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি আর বাতাসের তাণ্ডব চলছে। জানিনা এই ঝড় আর কতক্ষণ স্থায়ী হবে। চারপাশের ঘুটঘুটে অন্ধকার আর ঢেউয়ের গর্জন এখনো আমাদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় বিচ্ছিন্ন, বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করার কোনো উপায় নেই।আমরা এখনো কেবিনের ভেতরে বয়াগুলো শক্ত করে ধরে বসে আছি। পাশের টেবিলের মহিলাদের কান্নার বেগ কিছুটা কমলেও তাদের ফিসফিসানি আর মোনাজাতের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সবাই এখন শুধু একটা প্রার্থনাই করছে—যেন ঝড়টা দ্রুত থেমে যায়। বেঁচে থাকার এই আকুল আকুতি, প্রকৃতির এই রুদ্র রূপের সামনে মানুষের এই অসহায়ত্ব আমাকে এক নতুন জীবনের শিক্ষা দিল। আমরা এখন শুধু ভোরের আলোর অপেক্ষায় প্রহর গুনছি, জানিনা আর কতক্ষণ এভাবে থাকতে হবে, তবে মনে আশা রাখছি—সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই আমাদের প্রাণ নিয়ে কুলে ফিরে যাওয়ার তৌফিক দেবেন।

Comments

    Please login to post comment. Login