Posts

গল্প

স্বামী - দ্বিতীয় পর্ব

July 12, 2026

Rezwana Roji

Original Author শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Translated by রেজওয়ানা প্রধান

5
View

ফুলগুলি আঁচলে বাঁধা ,কাদাপাড়া বাগানের পথে বেরিয়ে পড়লুম।
নরেন বললে চলো তোমায় পৌঁছে দি। 
আমি বললুম না ,মন যেন বলে দিলে সেটা ভালো না । কিন্তু অদৃষ্ট কে ডিঙিয়ে যাব কি করে বাগানের ধারে এসে ভয়ে হতবুদ্ধি হয়ে গেল । সমস্ত নালাটা জ্বলে পরিপূর্ণ পার হয়ে কি করে? 
নরেন সঙ্গে আসেনি, কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে দেখছিল আমাকে চুপ করে দাঁড়াতে দেখে অবস্থাটা বুঝে নিতে তার দেরি হলো না। কাছে এসে বললে এখন উপায়? 
আমি কাঁদো কাঁদো হয়ে বললুম নালাই ডুবে মরি সেও আমার ভালো ,কিন্তু একলা এতদূর সদর রাস্তা ঘুরে আমি কিছুতেই যাব না। মা দেখলে -
কথাটা আমি শেষ করতেই পারলুম না।
নরেন হেসে বললে তার আর কি চলো তোমাকে সেই পিটুলি গাছটার উপর দিয়ে পার করে দেই ।
তাইতো বটে আহ্লাদে মনে মনে নিচে উঠলুম। এতক্ষন আমার মনে পড়েনি , যে খানিকটা দূরে একটা পিটুলি গাছ বহু কাল থেকে ঝরে উপরে নালার উপর ব্রিজের মত পড়ে আছে। ছেলেবেলায় আমি নিজেই তার উপর দিয়ে এপার ওপার হয়েচি।
খুশি হয়ে বললুম তাই চল-
নরেন তার চেয়েও খুশি হয়ে বললে কেমন মিষ্টি শোনালে বলতো! 
বললুম যাও-
সে বললে নির্বিঘ্নে পার না করে দিয়ে কি আর যেতে পারি! 
আমি আজও ভেবে পাইনি এ কথা কি করেই বা মনে এলো এবং কেমন করে বা মুখ দিয়ে বার করলুম কিন্তু সে যখন আমার মুখ পানে চেয়ে একটু হেসে বললে , দেখি তাই যদি হতে পারি - আমি ঘেন্নায় যেন মরে গেলুম,
সেখানে এসে দেখি পার হওয়া সোজা নয় ! একে তো স্থানটা গাছের ছায়ায় অন্ধকার ,তাতে পিটুলি গাছটায় জলে ভিজে যেমন পিছল তেমনি উঁচু-নিচু হয়ে আছে, তলা দিয়ে সমস্ত বৃষ্টির জল হুহু শব্দে বয়ে যাচ্ছে, আমি একবার পা বাড়াই একবার টেনে নেই,
নরেন খানিকক্ষণ দেখে বললে আমার হাত ধরে যেতে পারবে? 
বল্লুম পারবো কিন্তু তার হাত ধরে এমনি কাণ্ড করলুম যে সে কোনোমতে তাল সামলে এদিকে লাফিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করলে। কয়েক মুহূর্ত সে চুপ করে আমার মুখ পানে চেয়ে রইল তার পরেই তার চোখ দুটো যেন ঝকঝক করে উঠলো ।বললে দেখবে একবার সত্যিকারের কান্ডারী হতে পারি কিনা?
আশ্চর্য হয়ে বললুম কি করে? 
এমনি করে বলেই সে নত হয়ে আমার দুই হাটুর নিচে এক হাত ঘাড়ের নিচে অন্য হাত দিয়ে চোখের নিমিষে তার বুকের কাছে তুলে নিয়ে সেই গাছটার উপর পা দিয়ে দাঁড়ালো। আমি ভয়ে চোখ বুজে বাঁ হাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরলুম নরেন দ্রুত পদে পার হয়ে এপারে চলে এল । কিন্তু নামাবার আগে আমার ঠোঁট দুটোকে একেবারে যেন পুড়িয়ে দিলে। কিন্তু থাক গে! কম ঘেন্নায় কি আর এ দেহের প্রতি অঙ্গ অহর্নিশি গলায় দড়ি দিতে চায়।
শিউরুতে শিউরুতে বাড়ি চলে এলাম ঠোট দুটো তেমনি জ্বলতেই লাগলো বটে কিন্তু সে জ্বালা লঙ্কা মরিচখোরের জননীর মত যত জ্বলতে লাগলো জ্বালাত তৃষ্ণা  তত বেড়েই যেতে লাগলো।
মা বললেন ভালো মেয়ে তুই সদু, এলি কি করে ?নালাটা তো জলে জলমগ্ন হয়েছে দেখে এলুম ,সেই গাছটার উপর দিয়ে বুঝি হেঁটে এলি পড়ে মরতে পারলি নে?
না মা। সে পূর্ণ থাকলে আর এই গল্প লেখবার দরকার হবে কেন? 
তার পরদিন নরেন মামার সঙ্গে দেখা করতে এলো আমি সেখানেই বসেছিলুম তার পানে চাইতে পারলুম না , ককিন্তু আমার সর্বাঙ্গে কাটা দিয়ে উঠলো।
ইচ্ছে হলো ছুটে পালাই ,কিন্তু ঘরের পাকা  মেঝে যে চোরাবালির মত আমার পা দুটোকে একটু একটু করে গিলতে লাগলো ,আমি নড়তেও পারলুম না মুখ তুলে দেখতেও পারলুম না।
নরেনের যে কি অসুখ হলো তা শয়তান ই জানে, অনেকদিন পর্যন্ত আর সে কলকাতায় গেল না রোজ দেখা হতে লাগলো। মা মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে আমাকে আড়ালে ডেকে পাঠিয়ে বলতে লাগলেন, ওদের পুরুষ মানুষদের লেখাপড়ার কথাবার্তা হয় তুই তার মধ্যে হা করে বসে কি শুনিস বলতো? যা বাড়ির ভিতরে যা। এত বড় মেয়ের যদি লজ্জা শরম এতটুকু আছে! 
এক -পা এক- পা করে আমার ঘরে চলে যেতুম কিন্তু কোন কাজে মন দিতে পারতুম না ।টযতক্ষণ সে থাকতো তার অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর ও বিশ্রাম বাইরের পানে আমাকে টানতে থাকতো।
আমার মামা আর যাই হন তার মনটা প্যাঁচালো ছিল না। তাছাড়া লিখে পরে তর্ক করে ভগবানকে উড়িয়ে দেবার ফন্দিতেই সমস্ত অন্তঃকরণটা তার এমনি অনুক্ষণ ব্যস্ত হয়ে থাকতো যে তার নাকের ডগায় কি যে ঘটছে তা দেখতে পেতেন না।
আমি এই বড় একটা মজা দেখেছি জগতের সবচেয়ে নামজাদা নাস্তিকগুলোই হচ্ছে সবচেয়ে নিরেট বোকা। ভগবানের যে লীলার অন্ত নেই , তিনি যে এই না রূপেই তাদের পনের আনা মন ভরে থাকেন এ তারা টেরই পান না।
স প্রমাণ হোক অপ্রমান হোক তার ভাবনাতে সারাদিন কাটিয়ে দিয়ে বলে সংসারের মানুষগুলো কি বোকা ,তারা সকাল-সন্ধ্যায় বসে মাঝে মাঝে ভগবানের চিন্তা করে। আমারো ছিল সেই দশা। তিনি কিছুই দেখতে পেতেন না , কিন্তু মা তো তা নয় ‌তিনি যে আমার ওই মত মেয়ে মানুষ তার দৃষ্টিকে ফাঁকি দেওয়া তো সহজ ছিল না, আমি নিশ্চয়ই জানি মা আমাদের সন্দেহ করেছিলেন।
আর সামাজিক বাধা আমাদের দুজনের মধ্যে যে কত বড় ছিল এ শুধু যে তিনি জানতেন ।আমি জানতাম না তা নয়, ভাবলেই এই বিশ্রী দিকটাকে আমি দু হাতে ঠেলে রাখতুম। কিন্তু শত্রুর বদলে যে বন্ধুকেই ঠেলে ফেলেচি তাও টের পেতুম কিন্তু হলে কি হয়?
যে মাতাল একবার কড়া মদ খেতে শিখেছে জল দেওয়া মদে আর তার মন ওঠে না নির্জলা বিষয়ে আগুনে কলজে পুড়িয়ে তোলাতেই যে তখন তার মস্ত সুখ।
আর একটা জিনিস আমি কিছুতেই ভুলতে পারতুম না ।সেটা মজুমদারদের ঐশ্বর্যের চেহারা। ছেলেবেলা মায়ের সঙ্গে কতদিনই তো তাদের বাড়িতে বেড়াতে গেছি সেই সব ঘর দোর ছবি দেওয়াল গিরি ,আলমারি, সিন্দুক, আসবাবপত্রের সঙ্গে কোন একটা ভাবি ছোট একতলা শ্বশুরবাড়ির কদাকার মূর্তি কল্পনা করে মনে মনে আমি যেন শিউরে উঠতুম।
মাসখানেক পরে একদিন সকালবেলা নদী থেকে স্নান করে বাড়িতে পা দিয়েই দেখি ,, বারান্দার উপর একজন পৌর গোছের বিধবা স্ত্রীলোক মায়ের কাছে বসে গল্প করছে আমাকে দেখে মাকে জিজ্ঞাসা করলে এইটি বুঝি মেয়ে?
মা ঘাড় নেড়ে বললেন হ্যাঁ মা এই আমার মেয়ে বাড়ন্ত গরন নইলে-
স্ত্রী লোকটি হেসে বললেন তা হোক ছেলেটির বয়সও প্রায় 30 দুজনের মানাবে ভালো আর ওই শুনতেই দোজবড়ে নইলে যেন কার্তিক।

Comments

    Please login to post comment. Login