পেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ইথিওপীয় আমেরিকান উপন্যাসিক দিনাও মেনগেস্তু। ইসরায়েলি ও ইহুদি লেখকদের বয়কট নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের জেরে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও বাকস্বাধীনতার সমতা নিয়ে নীতিগত মতবিরোধের কারণে মাত্র সাত মাস দায়িত্ব পালনের পর ১০ জুলাই তিনি পদত্যাগ করেন।
৯ জুলাই পেন আমেরিকার ওয়েবসাইটে ইসরায়েলি ও ইহুদি লেখকদের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা ও বর্জন নিয়ে ‘A Silent Moratorium’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এটি লিখেছেন পেন আমেরিকার সম্পাদকীয় পরিচালক লিসা টোলিন এবং সংস্থাটির প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা জেরাল্ডিন বাউম।
টোলিন ও বাউম বলেছেন, এই প্রতিবেদনে আমরা এমন সব ইহুদি ও ইসরায়েলি লেখকের কথা তুলে ধরেছি, যারা মনে করেন যে তাদের পরিচয়, জাতীয়তা কিংবা মতাদর্শের কারণে মূলধারার সাহিত্যজগৎ ক্রমশ তাদের দূরে সরিয়ে রাখছে। তারা উল্লেখ করেন, ৩০ জনেরও বেশি ইসরায়েলি ও ইহুদি লেখক এবং সাহিত্য সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইহুদি ও ইসরায়েলি লেখকরা এমন এক পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন যা তাদের সুনাম ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তাদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণে বাধ্য করেছে এবং অবাধে লেখালেখি ও সৃজনশীল কাজ করার পরিবেশকে সংকুচিত করে তুলেছে। লেখকদের এভাবে কোণঠাসা ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলার বিষয়টি পেন আমেরিকার মূল অঙ্গীকার অর্থাৎ সবার জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংস্কৃতি রক্ষা করার প্রতি এক বড় হুমকি।’
এদিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেনগেস্তু বলেছেন, পেন আমেরিকার প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনের সাংস্কৃতিক বয়কট আন্দোলনের প্রভাব যেভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে, তা ‘বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট ও স্যাংশনস’ (বিডিএস) আন্দোলনকে অন্যায়ভাবে কলঙ্কিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের বিষয়ে সংস্থার অভ্যন্তরে স্বচ্ছতার অভাব ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন এবং কর্মীদের অন্ধকারে রেখে এমন কাজ প্রকাশের নিন্দা জানান।
তিনি অভিযোগ করেন, সংস্থাটি সব লেখকের অধিকার সমানভাবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কিছু অধিকারের সুরক্ষায় সংস্থাটি যতটা সোচ্চার, ফিলিস্তিনি ও অন্যান্য কোণঠাসা লেখকদের ক্ষেত্রে সেই নীতি মানা হচ্ছে না। মেনগেস্তুর পদত্যাগের পর পেন আমেরিকা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা সাংস্কৃতিক বয়কটের বিরোধী। তবে বর্জন বা মতামত প্রকাশের অধিকারকে বাকস্বাধীনতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে তারা লেখকদের অধিকার রক্ষায় কাজ চালিয়ে যাবে।
‘রাইটার্স এগেইনস্ট দ্য ওয়ার অন গাজা’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে মেনগেস্তুর নীতিগত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে কেউ কেউ তার এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। লেখক ডেভিড জুইগ মেনগেস্তুর উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘আপনি বাকস্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার একটি সংস্থা চালানোর পর লেখকদের জাতীয়তার ভিত্তিতে কালো তালিকাভুক্ত করতে অস্বীকার করার কারণে পদত্যাগ করছেন। আপনার জন্মভূমি ইথিওপিয়ার লেখকদের কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে না কেন? ইথিওপিয়ার মানবাধিকার রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। রুশ, চীনা বা সিরীয় লেখকদের ক্ষেত্রেও আপনার পদক্ষেপ কী? কেবল ইসরায়েলি নাগরিকদের নিয়েই আপনার যত আপত্তি।’
এর আগে ২০২৪ সালে পেন আমেরিকার দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট সুজান নসেল গাজা যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনি লেখকদের প্রতি হুমকির বিষয়ে সোচ্চার হতে ব্যর্থতার অভিযোগে সংস্থাটির ভেতরে ও বাইরে সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেছিলেন। সে সময় পেন আমেরিকার জায়নবাদবিরোধীরা দাবি করেছেন, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সংঘাতকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করা উচিত। অপরদিকে ইসরায়েলের সমর্থকরা এটির বিরোধিতা করে বলেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া ভুল এবং বিপজ্জনক হতে পারে।
সূত্র: দ্য হলিউড রিপোর্টার