Posts

ফিকশন

নদীর পরিচয়

July 14, 2026

Sifat Rahman

8
View

দূরের পাহাড়ের কোলে, যেখানে সকালের প্রথম আলো সোনালি রেশমের মতো ছড়িয়ে পড়ে, সেখান থেকে জন্ম নিয়েছিল সে। তার নাম ছিল মেঘনা। কিন্তু সে নিজেকে কখনো শুধু নামে চিনত না। সে ছিল একটি জীবন্ত সত্তা—প্রাণের স্রোত, স্মৃতির সাক্ষী, মানুষের হাসি-কান্নার সঙ্গী।
মেঘনার জন্মদিনে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ত। পাহাড়ের খাঁজ থেকে ঝরনা নেমে তার শরীরে মিশে যেত। ছোট্ট শিশুর মতো সে প্রথমে খেলতে খেলতে নেমে আসত উপত্যকায়। তার জল ছিল স্বচ্ছ, ঠান্ডা, আর এতটাই নরম যে পাথরও তার স্পর্শে হেসে উঠত। গ্রামের শিশুরা তার কূলে এসে পা ডুবিয়ে বলত, “মেঘনা দিদি, আজ গান গাও।” আর মেঘনা তার স্রোতের মধ্যে দিয়ে পাথরের সঙ্গে কথা বলে এক অদ্ভুত সুর তুলত—যেন সেই সুরে লুকিয়ে ছিল পৃথিবীর প্রথম ঘুমের লোরি।
কিন্তু নদী তো শুধু খেলার জন্য জন্মায় না। সে বড় হয়। আর বড় হতে হতে সে দেখতে থাকে মানুষের জীবন।
দ্বিতীয় অধ্যায়: স্মৃতির ভার
বছরগুলো গড়িয়ে যেতে যেতে মেঘনা দেখল, তার দু’পাশে গ্রাম বসছে। প্রথমে কয়েকটা কুঁড়েঘর, তারপর মাটির বাড়ি, পরে ইটের বাড়ি। তার জলে মানুষ স্নান করত, মাছ ধরত, নৌকা ভাসাত। বিয়ের উৎসবে তার কূলে উলুধ্বনি উঠত। আর বর্ষায় যখন তার শরীর ফুলে উঠত, মানুষ ভয়ে তার নাম নিয়ে ডাকত—“মা মেঘনা, রক্ষা করো।”
একদিন এক বুড়ো মাঝি, নাম তার করিম মিয়া, তার নৌকায় বসে মেঘনাকে বলেছিল, “তুই আমার সবচেয়ে পুরনো বন্ধু। আমার বাবা তোর জলে মাছ ধরত, আমি ধরি, আমার ছেলেও ধরবে। কিন্তু তুই কি কখনো আমাদের মনে রাখিস রে?”
মেঘনা উত্তর দিতে পারেনি। কারণ নদীর ভাষা মানুষ সবসময় বোঝে না। কিন্তু সে মনে মনে বলেছিল—“আমি সব মনে রাখি। তোমার বাবার হাসি, তোমার প্রথম প্রেমের চিঠি যেটা তুমি আমার জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলে, তোমার ছেলের প্রথম সাঁতার। সব।”
কিন্তু একটা সময় এল যখন মানুষ বদলে গেল। তারা মেঘনার জলে কলকারখানার বর্জ্য ফেলতে শুরু করল। তার স্বচ্ছ জল কালো হয়ে গেল। মাছ মরে ভেসে উঠল। গ্রামের শিশুরা আর তার কূলে খেলতে আসত না। তারা বলাবলি করত, “মেঘনা এখন বিষাক্ত।”
সেই দিনগুলোতে মেঘনা কাঁদত। তার কান্না ছিল বন্যা। সে তার বুকের ভিতর জমিয়ে রাখা সব দুঃখ ঢেলে দিত দু’পাশের মাঠে। কিন্তু মানুষ বুঝত না। তারা বলত, “নদীটা খারাপ হয়ে গেছে।”
তৃতীয় অধ্যায়: অপরিচিত পরিচয়
এক বর্ষার রাতে, যখন আকাশ আর নদী একাকার হয়ে গিয়েছিল, একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল মেঘনার কূলে। তার নাম ছিল আফিয়া। বয়স আঠারো। চোখে গভীর বিষাদ। সে শহর থেকে পালিয়ে এসেছিল। তার বাবা তাকে জোর করে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন এক অপরিচিত ছেলের সঙ্গে। আফিয়া সেই রাতে মেঘনার জলে ঝাঁপ দিতে চেয়েছিল।
কিন্তু ঠিক যখন সে পা বাড়িয়েছে, মেঘনা তার স্রোত থামিয়ে দিল। জলের উপর এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল। আফিয়া দেখল, জলের মধ্যে তার নিজের প্রতিবিম্ব নয়—একটি নারীর মূর্তি। সেই নারীর চুল ছিল জলের ঢেউয়ের মতো, চোখে পাহাড়ের দূরত্ব।
“কে তুমি?” আফিয়া ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল।
“আমি যাকে তুমি মেঘনা বলো,” উত্তর এল জলের গভীর থেকে। “আমার আসল পরিচয় কি জানো? আমি শুধু জল নই। আমি তোমাদের ইতিহাস। আমি তোমাদের মা-বোনের হাসি, বাবা-ভাইয়ের ঘাম, শিশুদের স্বপ্ন। আমাকে মেরে ফেললে তোমরা নিজেদেরই মেরে ফেলবে।”
আফিয়া কেঁদে ফেলল। সেই রাতে সে মেঘনার কূলে বসে তার জীবনের গল্প বলল। আর মেঘনা শুনল। নদী প্রথমবারের মতো একজন মানুষের সঙ্গে পুরোপুরি কথা বলতে পারল।
সকাল হলে আফিয়া চলে গেল না। সে গ্রামে থেকে গেল। সে মানুষদের ডেকে বলতে শুরু করল, “মেঘনা আমাদের মা। আমরা তাকে বিষ দিচ্ছি।”
প্রথমে কেউ বিশ্বাস করেনি। কিন্তু আফিয়া হাল ছাড়েনি। সে স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে মেঘনার কূলে পরিষ্কার করতে নামল। তারা প্লাস্টিক তুলল, ময়লা সরাল। ধীরে ধীরে আরও মানুষ যোগ দিল। বুড়ো করিম মিয়া তার পুরনো নৌকা নিয়ে এসে বলল, “আমিও আছি।”
চতুর্থ অধ্যায়: যাত্রা ও পরিবর্তন
বছরখানেক পর মেঘনার জল আবার স্বচ্ছ হতে শুরু করল। কিন্তু সে জানত, এটা শুধু শুরু। তার আসল পরিচয় এখনো লুকিয়ে আছে।
একদিন আফিয়া তার সঙ্গে বসে বলল, “মেঘনা, তুমি কে আসলে? শুধু নদী?”
মেঘনা তার জলের মধ্যে অনেক দূরের ছবি দেখাল। সে দেখাল প্রাচীনকালের কথা—যখন এই অঞ্চলে কোনো মানুষ ছিল না, শুধু বন আর পাহাড়। সে দেখাল কীভাবে সে বন্যায় গ্রাম বাঁচিয়েছে, কীভাবে তার জলে ফসল ফলেছে, কীভাবে তার তীরে প্রেম হয়েছে, বিচ্ছেদ হয়েছে, জন্ম হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে।
“আমার পরিচয় একটাই,” মেঘনা বলল, “আমি সংযোগ। আমি যা কিছুকে আলাদা মনে হয়, তাদের মিলিয়ে দিই। পাহাড়কে সমুদ্রের সঙ্গে, অতীতকে ভবিষ্যতের সঙ্গে, মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে।”
আফিয়া বুঝল। সে তার নিজের জীবনেও এই সংযোগ খুঁজে পেল। সে শহরে ফিরে গিয়ে লেখালেখি শুরু করল। তার লেখায় মেঘনার গল্প ছড়িয়ে পড়ল। লোকজন আসতে শুরু করল দূর-দূরান্ত থেকে। তারা মেঘনাকে দেখতে, তার জলে হাত ডুবিয়ে অনুভব করতে।
কিন্তু একটা বড় চ্যালেঞ্জ এল। সরকার ঠিক করল মেঘনার উপর বড় একটা বাঁধ বানাবে। বলল, “বিদ্যুৎ লাগবে, উন্নয়ন লাগবে।”
গ্রামের মানুষ বিভক্ত হয়ে গেল। কেউ বলল, “বাঁধ হলে চাকরি হবে।” কেউ বলল, “বাঁধ হলে মেঘনা মরে যাবে।”
আফিয়া আর করিম মিয়া মিলে আন্দোলন শুরু করল। কিন্তু সবচেয়ে বড় লড়াইটা মেঘনা নিজেই লড়ল।
পঞ্চম অধ্যায়: বন্যার গান
বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার আগের রাতে মেঘনা তার পুরনো শক্তি ফিরে পেল। সে আকাশের সঙ্গে কথা বলল। সে পাহাড়ের সঙ্গে কথা বলল। আর সেই রাতে এমন প্রবল বৃষ্টি নামল যে বাঁধের কাজ বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু এবার তার বন্যা ছিল আলাদা। সে কারো ঘর ভাসায়নি। শুধু বাঁধের জায়গাটুকুতে জল জমিয়ে রেখেছিল।
সকালে যখন ইঞ্জিনিয়াররা এল, তারা দেখল অদ্ভুত দৃশ্য। মেঘনার জলে হাজার হাজার ফুল ভাসছে। আর জলের উপর লেখা হয়েছে (প্রাকৃতিকভাবে পলি দিয়ে)—“আমাকে মেরো না। আমি তোমাদেরই অংশ।”
সেই দৃশ্য দেখে অনেকের চোখে জল চলে এল। আন্দোলন আরও জোরদার হল। অবশেষে সরকার বাঁধের পরিকল্পনা বাতিল করল।
শেষ অধ্যায়: চিরকালের পরিচয়
বছরের পর বছর কেটে গেল। আফিয়া এখন একজন বিখ্যাত লেখিকা। তার প্রথম বইয়ের নাম “মেঘনার পরিচয়”। করিম মিয়া আর বেঁচে নেই, কিন্তু তার নাতি এখন মেঘনার কূলে নৌকা ভাসায়। গ্রামের শিশুরা আবার মেঘনার গান শোনে।
এক সন্ধ্যায় আফিয়া তার ছোট মেয়েকে নিয়ে মেঘনার কূলে এসে বসল। মেয়েটি জিজ্ঞাসা করল, “মা, মেঘনা কে?”
আফিয়া হেসে বলল, “সে আমাদের পরিচয়। যতদিন সে বেঁচে থাকবে, ততদিন আমরাও বেঁচে থাকব।”
মেঘনা তার জলের মধ্যে হালকা ঢেউ তুলে হাসল। তার পরিচয় এখন আর শুধু নদী নয়। সে এখন একটি জীবন্ত কবিতা, একটি অমর গল্প, একটি চিরকালীন সেতু—মানুষ আর প্রকৃতির মাঝে।
সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। মেঘনার জলে লাল-কমলা আলো ছড়িয়ে পড়ছিল। আর সেই আলোয় মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো কখনো শেষ হয় না। তারা শুধু বয়ে চলে, যেমন নদী বয়ে চলে।

Comments

    Please login to post comment. Login