Posts

ফিকশন

সময়ের মূল্য

July 14, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

5
View

সময়ের মূল্য
রাজধানীর একটা পুরনো অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে বসে ছিলেন বৃদ্ধ অমলেন্দু। সত্তর বছর বয়স। শরীরটা আর আগের মতো নেই। হাঁটুতে ব্যথা, চোখে ঝাপসা ভাব। সামনে শহরের আলো জ্বলছে, কিন্তু তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে অন্য একটা ছবি। যৌবনের সেই দিনগুলো। যখন সময় ছিল অফুরন্ত, যখন মনে হতো জীবনটা একটা অসীম মাঠ, যেখানে দৌড়াতে দৌড়াতে কখনো শেষ হবে না। কিন্তু আজ, এই ছাদে বসে, তিনি বুঝতে পারছেন—সময় কখনো অফুরন্ত নয়। সে চুপিচুপি চলে যায়, কোনো নোটিশ না দিয়ে।
অমলেন্দুর জীবনটা শুরু হয়েছিল একটা ছোট গ্রামে। বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। মা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। গ্রামের স্কুলে প্রথম হয়ে মাধ্যমিক পাস করলেন। সবাই বলত, “অমলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।” কলকাতায় গিয়ে কলেজে ভর্তি হলেন। সেখানে বন্ধুরা, নতুন শহর, নতুন স্বপ্ন। প্রথম দিকে সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সময়ের সাথে খেলা শুরু হল। বন্ধুদের সাথে আড্ডা, সিনেমা, কফি হাউসের আলোচনা। “জীবন তো একবারই আসে, উপভোগ কর,”—এই কথাটা তাঁর মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। পড়াশোনা পিছিয়ে যেতে লাগল। পরীক্ষার আগের রাতে রাত জেগে নোটস তৈরি করা, কিন্তু সেটাও অভ্যাস হয়ে গেল না। ফলাফল? গ্র্যাজুয়েশনে খুব সাধারণ রেজাল্ট। চাকরির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ভাবলেন, কিন্তু সময় তো আর অপেক্ষা করে না। বন্ধুরা চাকরি পেয়ে যাচ্ছে, কেউ বিদেশে, কেউ বড় কোম্পানিতে। অমলেন্দু তখনও “একটু আরাম করে নিই” বলে দিন কাটাচ্ছেন।
বিয়ে হল একটা ভালো মেয়ের সাথে। নাম রুমা। রুমা ছিলেন ধীরস্থির, পরিশ্রমী। তিনি সবসময় বলতেন, “অমল, সময় নষ্ট করো না। আমাদের সংসার গড়তে হবে।” কিন্তু অমলেন্দুর কানে সেসব ঢুকত না। চাকরি পেলেন একটা সরকারি অফিসে। প্রথমদিকে উৎসাহ ছিল। কিন্তু অফিসের পর বন্ধুদের সাথে ক্লাবে যাওয়া, তাস খেলা, গল্প করা—এসবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। প্রমোশনের সুযোগ এলেও প্রস্তুতি নিতে পারলেন না। “পরে দেখা যাবে,” বলে পিছিয়ে দিতেন। রুমা ছেলে-মেয়েকে মানুষ করতে একাই লড়াই করতেন। অমলেন্দু বাড়ি ফিরতেন রাত করে, কখনো বন্ধুদের সাথে মদ্যপান করে। “জীবনটা উপভোগ করছি,”—এটাই ছিল তাঁর যুক্তি।
বছর গড়িয়ে যেতে লাগল। ছেলে বড় হল, মেয়ে বিয়ে হল। অমলেন্দু রিটায়ার করলেন। সেই সময়টা যখন তিনি ভাবলেন, এবার আরামে থাকব, তখনই শরীরটা বিগড়ে গেল। ডায়াবেটিস, প্রেশার, হার্টের সমস্যা। রুমা চলে গেলেন হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাকে। একা হয়ে গেলেন অমলেন্দু। ছেলে বিদেশে, মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে। সন্ধ্যায় ছাদে বসে তিনি ভাবেন—কী করলাম জীবনে? কত স্বপ্ন ছিল। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা, বড় কিছু করার স্বপ্ন, পরিবারকে সুখী করার ইচ্ছা। সবই সময়ের অপচয়ে হারিয়ে গেছে।
একদিন ছাদে বসে তাঁর পাশে এসে বসলেন প্রতিবেশী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নির্মলবাবু। নির্মলবাবুর বয়সও প্রায় একই। কিন্তু তাঁর চোখে একটা আলো আছে। তিনি বললেন, “অমল, কী ভাবছ?” অমলেন্দু সব খুলে বললেন। নির্মলবাবু হাসলেন। “তোমার গল্পটা অনেকেরই। সময়ের মূল্য বুঝতে আমরা সবাই দেরি করে ফেলি।”
নির্মলবাবু নিজের জীবনের গল্প বলতে শুরু করলেন। তিনি ছিলেন গরিব ঘরের ছেলে। বাবা মারা গিয়েছিলেন ছোটবেলায়। মা রান্না করে সংসার চালাতেন। নির্মল প্রতিদিন ভোরে উঠে পড়তেন, স্কুলের পর টিউশনি করতেন। কলেজে পড়ার সময়ও একইভাবে চলত। সময়কে কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি। প্রতিটা মুহূর্তকে মূল্যবান মনে করতেন। ফলে তিনি অধ্যাপক হয়েছিলেন, বই লিখেছিলেন, অনেক ছাত্রকে গড়ে তুলেছিলেন। বুড়ো বয়সেও তাঁর দিন ভরা। লেখালেখি করেন, ছাত্রদের সাথে যোগাযোগ রাখেন, বাগান করেন। “সময় নষ্ট করিনি বলে আজ অনুশোচনা নেই,” বললেন তিনি।
অমলেন্দুর চোখে জল এল। তিনি ভাবতে লাগলেন তাঁর নিজের জীবনের অনেক ঘটনা। যৌবনে একটা বড় প্রজেক্টের সুযোগ এসেছিল। কিন্তু “পরে দেখা যাবে” বলে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। ছেলেকে নিয়ে সময় কাটানোর কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু অফিসের পর আড্ডা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মেয়ের সাথে খেলার সময় ছিল না। রুমার সাথে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা সবসময় পিছিয়ে যেত। এখন সব স্মৃতি হয়ে গেছে, কিন্তু সেগুলোতে আনন্দের চেয়ে অনুশোচনা বেশি।
সময়ের মূল্য কী? এটা শুধু ঘড়ির কাঁটা নয়। এটা জীবনের প্রতিটা শ্বাস। প্রতিটা সেকেন্ডে আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিই—সেটা কাজে লাগাব, নাকি নষ্ট করব। অনেকে যৌবনে ভাবে, “আমার তো অনেক সময় আছে।” কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এসে বুঝতে পারে, সেই সময় আর ফিরে আসবে না। অমলেন্দু মনে করলেন তাঁর এক বন্ধু রতনের কথা। রতন ছিলেন খুব পরিশ্রমী। সকালে উঠে ব্যায়াম, অফিস, বাড়িতে পড়াশোনা, পরিবারের সাথে সময়। তিনি একটা ছোট ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সময়কে কাজে লাগিয়ে সেটাকে বড় করেছিলেন। আজ তিনি সুখী, স্বাস্থ্যবান, পরিবারের সাথে আছেন। অথচ অমলেন্দু এখন একা।
এই গল্পটা শুধু অমলেন্দুর নয়। আমাদের সবার। আজকের যুবকরা মোবাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করে, ভিডিও দেখে, অপ্রয়োজনীয় আড্ডায় সময় নষ্ট করে। পরে বলবে, “পড়াশোনা করব।” কিন্তু সুযোগ চলে যায়। ছাত্রজীবনে যারা সময় নষ্ট করে, পরীক্ষায় খারাপ করে, চাকরি পায় না। তারপর বিয়ে, সংসার—চাপ বাড়ে। বয়স বাড়লে শরীর দুর্বল হয়, স্বপ্নগুলো অপূর্ণ থেকে যায়। অনেকে বৃদ্ধ বয়সে বিছানায় শুয়ে ভাবে, “যদি সেদিন সময় নষ্ট না করতাম। যদি সেই সুযোগটা কাজে লাগাতাম।” কিন্তু ততদিনে সময় ফুরিয়ে গেছে।
সময়ের মূল্য বোঝার জন্য ছোট ছোট উদাহরণ অনেক। একজন কৃষক সকাল থেকে খেতে কাজ করে। প্রতিটা মুহূর্তকে কাজে লাগায়। ফসল ভালো হয়। একজন শিল্পী যদি প্রতিদিন অনুশীলন না করে, তাহলে দক্ষতা আসে না। একজন লেখক যদি প্রতিদিন না লেখেন, তাহলে বই শেষ হয় না। সময়কে ভাগ করে নেওয়া দরকার। সকালে উঠে এক ঘণ্টা পড়াশোনা বা ব্যায়াম, দিনের কাজ, সন্ধ্যায় পরিবার, রাতে বিশ্রাম। কিন্তু আমরা অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থাকি। একটা ভিডিও দেখতে দেখতে ঘণ্টা কেটে যায়। “আরেকটা দেখি”—এই বলে রাত জেগে যাই। সকালে উঠতে দেরি হয়, দিন নষ্ট হয়।
অমলেন্দু নির্মলবাবুর কথা শুনে একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। যতদিন বেঁচে আছেন, সময়কে কাজে লাগাবেন। ছাদে বসে তিনি গল্প লেখা শুরু করলেন। নিজের অভিজ্ঞতা লিখতে লাগলেন। যাতে অন্যরা শিক্ষা নিতে পারে। ছেলেকে ফোন করে বললেন, “বাবা, সময় নষ্ট করিস না। প্রতিটা দিনকে মূল্যবান কর।” মেয়েকে বললেন, “মা, তোর সাথে আরও সময় কাটাতে চাই।” ধীরে ধীরে তাঁর জীবনে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হল। শরীর দুর্বল, কিন্তু মনটা জেগে উঠল।
সময়ের মূল্য বোঝার জন্য আমাদের অনেক কিছু করতে হয় না। শুধু প্রতিদিনের রুটিনে সচেতন হতে হয়। ঘুম থেকে উঠে প্রথমে নিজেকে প্রশ্ন করো—আজকের এই চব্বিশ ঘণ্টায় আমি কী কী করব যাতে আমার জীবন এগোয়? অপ্রয়োজনীয় কথা কম বলো, অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম কমাও। বই পড়ো, নতুন কিছু শেখো, পরিবারের সাথে সময় কাটাও, শরীরের যত্ন নাও। যারা এটা করে, তারা বৃদ্ধ বয়সে হাসিমুখে বলতে পারে, “আমি সময়কে কাজে লাগিয়েছি।”
অমলেন্দুর গল্পটা চলতে থাকে। তিনি প্রতিদিন ছাদে বসে নোটবুকে লিখতেন। তাঁর লেখায় উঠে আসত যৌবনের ভুলগুলো। কীভাবে একটা ছোট অলসতা বড় ক্ষতি করে। কীভাবে বন্ধুদের সাথে অর্থহীন আড্ডা জীবনের মূল্যবান সময় কেড়ে নেয়। তিনি লিখতেন, “সময় টাকার মতো। খরচ করলে ফুরিয়ে যায়, কিন্তু সঠিক জায়গায় খরচ করলে লাভ হয়। ভুল জায়গায় খরচ করলে শুধু অনুশোচনা থাকে।”
একদিন তাঁর ছেলে দেশে এল। অমলেন্দু তাকে সব বললেন। ছেলে শুনে চুপ করে গেল। সে নিজেও অনেক সময় নষ্ট করছিল বিদেশে। পার্টি, ট্রাভেল, কিন্তু ক্যারিয়ারে এগোচ্ছিল না। বাবার কথায় সে বুঝল। ফিরে গিয়ে নতুন করে শুরু করল। মেয়েও বাবার সাথে আরও সময় কাটাতে লাগল। অমলেন্দুর জীবনের শেষ দিনগুলো সুন্দর হয়ে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, দেরিতে হলেও সময়ের মূল্য বোঝা যায়। আর সেটা বুঝলে জীবনটা আরও মূল্যবান হয়।
আমরা সবাই অমলেন্দু হতে পারি, আবার নির্মলবাবুও হতে পারি। নির্ভর করে আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর। আজকের এই মুহূর্তটা কাজে লাগাও। বই পড়ো, লক্ষ্য স্থির করো, ছোট ছোট অভ্যাস গড়ে তোলো। সময়কে শত্রু ভেবো না, বন্ধু ভাবো। সে তোমার সাথে আছে, যতক্ষণ না তুমি তাকে হারিয়ে ফেলো। বৃদ্ধ বয়সে যেন অনুশোচনা না হয়, সেজন্য আজ থেকেই শুরু করো। প্রতিটা দিনকে শেষ করে বলো, “আজ আমি সময়কে মূল্য দিয়েছি।”
অমলেন্দু একদিন মারা গেলেন। কিন্তু তাঁর লেখা নোটবুকটা ছেলে-মেয়ের কাছে রয়ে গেল। তারা সেটা পড়ে অনুপ্রাণিত হল। অনেককে শেয়ার করল। সময়ের মূল্যের গল্পটা ছড়িয়ে পড়ল। অনেক যুবক সেটা পড়ে নিজের জীবন বদলে ফেলল। তারা বুঝল, জীবনটা ছোট। কিন্তু সঠিকভাবে কাটালে অসীম হয়ে ওঠে।
সময় কখনো ফিরে আসে না। কিন্তু তার মূল্য বুঝে যারা চলতে পারে, তারা জয়ী হয়। এই গল্পটা তোমার জন্য, আমার জন্য, সবার জন্য। আজ থেকে শুরু করি। সময়কে কাজে লাগাই। যাতে বৃদ্ধ বয়সে হাসতে পারি, না কেঁদে বলতে হয় “যদি...”

🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments

    Please login to post comment. Login