Posts

ফিকশন

বর্তমান নিকৃষ্ট ভালোবাসা

July 15, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

7
View

নিকৃষ্ট ভালোবাসা
আধুনিক কলকাতার একটা সাধারণ কলেজ ক্যাম্পাস। প্রিন্সেপ ঘাটের কাছে না, বরং সল্টলেকের কোনো একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। এখানে ছেলেমেয়েরা আসে না শুধু পড়তে, বরং ইনস্টাগ্রামের ফিল্টার লাগিয়ে ছবি তুলতে, স্টোরি আপলোড করতে, আর কে কার সাথে কতটা ‘ভাইব’ মিলছে তা চেক করতে। এই জেনারেশনের প্রেম এখন আর হৃদয়ের ব্যাপার নয়, এটা একটা অ্যাপের নোটিফিকেশন। একদিন চ্যাট, পরের দিন ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, তার পরের দিন ব্লক। আর তার পরের দিন? নতুন প্রোফাইল স্ক্রল করা।
আরজুন ছিল এই ক্যাম্পাসের একটা সাধারণ ছেলে। বয়স বাইশ। কম্পিউটার সায়েন্সের সেকেন্ড ইয়ার। তার ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ার সংখ্যা মাত্র ৪৭২। বেশিরভাগই কলেজের বন্ধু আর কয়েকটা কাজিন। সে রোজ সকালে উঠে প্রথম কাজটা করে তার এক্সের স্টোরি চেক করে। না, সে এখনও ভুলতে পারেনি সোহিনীকে। সোহিনী তার সাথে ছয় মাস প্রেম করেছিল। প্রথম দিনই ডাইরেক্ট মেসেজ: “তোমার সেই হুডি টা কিন্তু দারুণ লাগছে।” দ্বিতীয় দিন ক্যাফেটেরিয়ায় কফি। তৃতীয় দিন “আমি তোমাকে মিস করছি” বলে ভয়েস নোট। আর ষোলো দিন পর? “সরি আরজুন, আমার এক্স ফিরে এসেছে। আমরা আবার ট্রাই করব।”
আরজুনের জীবনটা এখন এমনই। সে জানে, এই জেনারেশনে প্রেম মানে একটা টেম্পোরারি ডোপামিন হিট। কিন্তু তবু সে আশা করে। কারণ তার ফোনের স্ক্রিনে প্রতি রাতে নতুন নোটিফিকেশন আসে।
একদিন কলেজের ফেস্টে সে দেখল রিয়াকে। রিয়া ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের থার্ড ইয়ার। লম্বা চুল, কাজল চোখ, আর সেই হাসি যা ইনস্টাগ্রাম রিলসে পারফেক্ট লাগে। রিয়ার ফলোয়ার ১২ক। তার প্রত্যেক পোস্টে কমেন্টের বন্যা। “গর্ল ক্রাশ”, “কুইন”, “ম্যারেজ ম্যাটেরিয়াল”। আরজুন তার পোস্টে লাইক দিল। পরের দিন রিয়া তার স্টোরিতে রিপ্লাই করল: “থ্যাঙ্কস জুন ❤️”
সেই থেকে শুরু। চ্যাটিং। রাত দুটো পর্যন্ত। আরজুন লিখত, “তুমি না থাকলে আমার দিনটা অসম্পূর্ণ।” রিয়া রিপ্লাই করত, “আমিও তোমাকে অনেক মিস করি।” তারা কখনো দেখা করেনি তখনও, কিন্তু আরজুনের মনে হচ্ছিল এটা সত্যিকারের ভালোবাসা। সে তার বন্ধু রাহুলকে বলল, “ভাই, এবার সিরিয়াস। এটা আলাদা।”
রাহুল হাসল। “সিরিয়াস? তুই জানিস রিয়ার লাস্ট এক্স কে? সেই ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অভিজিৎ। তিন মাস চলেছিল। তার আগে ছিল সৌরভ। তার আগে? কে জানে। এই জেনারেশনে কেউ একা থাকে না জুন। সবাই অপশন রাখে।”
কিন্তু আরজুন শোনেনি। সে রিয়াকে প্রপোজ করল। একটা রাতে, ভয়েস কলে। রিয়া বলল, “আমিও তোমাকে লাইক করি। কিন্তু লেটস টেক ইট স্লো।” স্লো মানে কী? পরের সপ্তাহেই তারা ক্যাম্পাসের পিছনের ক্যাফেতে দেখা করল। রিয়া এসেছিল শর্ট ড্রেসে, মেকআপ করে। আরজুন তার হাত ধরল। সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, এটাই সেই ভালোবাসা যা সিনেমায় দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে?
পরের দিন রিয়ার ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে একটা ছবি। তাদের দুজনের সেলফি। ক্যাপশন: “New vibes ✨”। কমেন্টে বন্ধুরা লিখল, “কবে ব্রেকআপ?” “আর কতদিন চলবে?” আরজুন সেগুলো দেখে হাসল। কিন্তু ভিতরে একটা খোঁচা লাগল।
এই জেনারেশনের প্রেমের নিয়মগুলো অদ্ভুত। প্রথমে ফেসবুক স্ট্যাটাস চেক। কে কার সাথে ট্যাগ হয়েছে। তারপর হোয়াটসঅ্যাপ লাস্ট সিন। তারপর ইনস্টাগ্রাম ফলোয়িং লিস্ট চেক। রিয়া যখন তার এক্স অভিজিতের সাথে লাইক দিত, আরজুনের ঘুম হতো না। সে জিজ্ঞেস করত, “কেন লাইক দিলি?” রিয়া বলত, “এটা কিছু না। জাস্ট পাস্ট। তুই কি ইনসিকিউর?”
ইনসিকিউর। এই শব্দটা এখন প্রেমের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যে প্রশ্ন করে, সে ইনসিকিউর। যে চায় এক্সক্লুসিভিটি, সে টক্সিক। আর যে চুপ করে থাকে, সে ম্যাচিওর।
তাদের সম্পর্কটা দ্রুত এগোল। এক মাসের মধ্যে তারা শারীরিকভাবে কাছাকাছি হয়ে গেল। কলেজের হোস্টেলের পিছনে, বা রিয়ার ফ্ল্যাটে যখন তার রুমমেট ছিল না। কিন্তু প্রতিবারের পর রিয়া বলত, “এটা জাস্ট ফিজিক্যাল, রাইট? আমরা এখনও কমিটেড না।” আরজুন মাথা নাড়ত। কিন্তু তার হৃদয় বলত অন্য কথা।
একদিন সে রিয়ার ফোনে একটা মেসেজ দেখল। অন্য একটা ছেলে, নাম সায়ন। “বেবি, টুনাইট ফ্রি?” রিয়া লিখেছে, “আরজুন আছে। পরে কথা বলব।” আরজুনের সারা শরীর কাঁপতে লাগল। সে কনফ্রন্ট করল। রিয়া কাঁদল। “আমি কনফিউজড। তুমি ভালো, কিন্তু সায়নও অনেকদিনের বন্ধু। আমি একসাথে দুটো ম্যানেজ করতে পারছি না।”
সেই রাতে আরজুন প্রথমবার বুঝল, এই ভালোবাসা নিকৃষ্ট। এটা ভালোবাসা নয়, এটা অভ্যাস। অ্যাটেনশনের অভ্যাস। লাইকের অভ্যাস। শরীরের অভ্যাস।
কিন্তু সে ছাড়তে পারল না। পরের সপ্তাহে তারা আবার একসাথে। রিয়া বলল, “আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। সায়নকে ব্লক করেছি।” আরজুন বিশ্বাস করল। কারণ এই জেনারেশনে সবাই বিশ্বাস করতে চায়। সত্যটা জানলেও চোখ বন্ধ করে।
ক্যাম্পাসে আরও অনেক গল্প চলছিল। তার বন্ধু রাহুলের সাথে ছিল প্রিয়া। প্রিয়া প্রতি উইকেন্ডে ডেটিং অ্যাপে নতুন ছেলের সাথে মিট করত। রাহুল জানত, কিন্তু কিছু বলত না। কারণ সেও একই কাজ করত। তাদের প্রেম ছিল একটা ওপেন রিলেশনশিপের নাম। “আমরা ফ্রি। কিন্তু একসাথে আছি।” এই ফ্রিডমের নামে তারা একে অপরকে আঘাত করত।
আরেকটা মেয়ে, তানিয়া। সে চারজনের সাথে একসাথে চ্যাট করত। একজনকে বলত হাজবেন্ড, একজনকে বেবি, একজনকে জানু। যখন কেউ ধরা পড়ত, সে কাঁদত। “আমি তো ভালোবাসি সবাইকে। কেন বুঝতে পারো না?”
এই হলো বর্তমান জেনারেশনের প্রেম। টিন্ডার, বাম্বল, ইনস্টাগ্রাম। সবকিছু স্ক্রিনের পিছনে। কেউ কারো গভীরে যায় না। সবাই শুধু সারফেস দেখে। লুকস, বডি, স্ট্যাটাস, ফলোয়ার। কেউ জিজ্ঞেস করে না, “তোমার স্বপ্ন কী? তোমার ভয় কী? তুমি কাঁদলে কী করো?”
আরজুন আর রিয়ার সম্পর্কটা তিন মাস চলল। তারপর একদিন রিয়া বলল, “আমি ব্রেকআপ চাই। আমার নতুন কলেজে ট্রান্সফার হয়েছে। লং ডিসট্যান্স কাজ করবে না।” আরজুন জানত এটা মিথ্যে। সে রিয়ার স্টোরি দেখেছিল। নতুন একটা ছেলের সাথে। নাম রোহান। ইঞ্জিনিয়ার। গাড়ি আছে।
সেই রাতে আরজুন তার রুমে বসে কাঁদল। তার ফোনে শত শত চ্যাট। পুরনো প্রেমিকাদের। সবাই একই প্যাটার্ন। প্রথমে মিষ্টি কথা, তারপর শারীরিক, তারপর বোরড, তারপর নতুন কেউ।
সে তার ডায়েরিতে লিখল:
“এই ভালোবাসা নিকৃষ্ট। এটা কোনো ভালোবাসা নয়। এটা একটা খেলা। আমরা সবাই খেলোয়াড়। কেউ জিতে না। সবাই হারে। হারে নিজেকে। হারে বিশ্বাস। হারে সত্যিকারের অনুভূতি। আমরা সবাই জানি এটা ভুল, তবু করি। কারণ একা থাকার ভয়টা আরও বড়।”
পরের দিন কলেজে সে দেখল রিয়া রোহানের সাথে হাত ধরে ঘুরছে। তারা হাসছে। সেলফি তুলছে। ক্যাপশন দেবে “Found my peace 💕”। আরজুন মাথা নিচু করে চলে গেল। তার বুকের ভিতরটা ফাঁকা।
কিন্তু গল্প এখানে শেষ নয়।
কয়েক মাস পর আরজুন নিজেও বদলে গেল। সে এখন ডেটিং অ্যাপে অ্যাকটিভ। প্রতি উইকেন্ডে নতুন মেয়ের সাথে মিট করে। একজনের সাথে দুই দিন, আরেকজনের সাথে তিন দিন। সে আর কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসে না। সে শুধু সময় কাটায়। শরীর কাটায়। অ্যাটেনশন কাটায়।
একদিন তার সাথে দেখা হলো একটা মেয়ের। নাম অঙ্কিতা। সে আলাদা। সে চ্যাট করে না রাত দুটো পর্যন্ত। সে বলে, “আমি সময় নিতে চাই।” আরজুন প্রথমে হাসল। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝল, এটাই সত্যিকারের কিছু হতে পারে।
কিন্তু তার মনের ভিতরের নিকৃষ্ট অংশটা বলল, “না। এটা আবার ঠকাবে। সবাই ঠকায়।” সে অঙ্কিতাকে দূরে সরিয়ে দিল। আবার ফিরে গেল পুরনো সাইকেলে। নতুন মেয়ে, নতুন চ্যাট, নতুন শারীরিক সম্পর্ক, নতুন ব্রেকআপ।
এই হলো আজকের প্রেম। নিকৃষ্ট ভালোবাসা। যেখানে হৃদয় নেই, শুধু স্ক্রিন আছে। যেখানে প্রতিশ্রুতি নেই, শুধু অপশন আছে। যেখানে ভালোবাসা নয়, শুধু ব্যবহার আছে।
কলেজ শেষ হয়ে গেল। আরজুন চাকরি পেল একটা আইটি কোম্পানিতে। সেখানেও একই জিনিস। অফিসের মেয়েরা, পার্টিতে ড্রিঙ্ক, হোটেল রুম, পরের দিন “সরি, আমি রেডি না”। সবাই একই নাটকের অভিনেতা।
একদিন সে রিয়াকে দেখল রাস্তায়। রিয়া এখন বিয়ে করেছে। তার হাতে বিয়ের আংটি। সে আরজুনকে দেখে হাসল। “কেমন আছিস?” আরজুন বলল, “ভালো।” কিন্তু চোখে চোখ রাখতে পারল না।
রাতে বাড়ি ফিরে সে তার পুরনো ডায়েরি খুলল। লিখল:
“আমরা সবাই নিকৃষ্ট হয়ে গেছি। ভালোবাসার নামে আমরা নিজেদেরকে বিক্রি করে দিয়েছি। সস্তা লাইকের জন্য, সাময়িক উষ্ণতার জন্য। কেউ আর সত্যিকারের ভালোবাসতে চায় না। কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কষ্ট দেয়। আর আমরা কষ্ট সহ্য করতে শিখিনি। আমরা শুধু সোয়াইপ করতে শিখেছি।”
গল্পটা এখানে শেষ হয় না। কারণ এই নিকৃষ্ট ভালোবাসা চলতেই থাকে। প্রতি জেনারেশনে আরও নিকৃষ্ট হয়। আরও দ্রুত। আরও অর্থহীন।
আরজুন আজও ফোন হাতে বসে আছে। স্ক্রল করছে। নতুন প্রোফাইল। নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু তার হৃদয়টা অনেক আগেই মরে গেছে। সে জানে, এই খেলায় কোনো বিজয়ী নেই। শুধু হারা খেলোয়াড়রা আছে। যারা হাসতে হাসতে নিজেদেরকে শেষ করে দিচ্ছে।


 

 🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments

    Please login to post comment. Login