এটা ছিল এমন এক যুদ্ধ, যার ফলাফলের ওপর নির্ভর করছিল সদ্য প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সম্রাজের ভবিষ্যৎ। সেদিন যদি সেই মুষ্টিমেয় মুসলিম পরাজিত হত, তাহলে চিরতরে মুসলিম জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত, হারিয়ে যেত ইসলাম নামক একটা ধর্ম।
যুদ্ধ শুরুর আগে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) মহান আল্লাহর দরবারে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে দোয়া করেছিলেন:
"হে আল্লাহ! এই ক্ষুদ্র দলটি যদি আজ ধ্বংস হয়ে যায়, তবে পৃথিবীতে আপনার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না।"
এ ছিল এমন একটি যুদ্ধ, যেখানে উভয় পক্ষেই অনেক আত্মীয়-স্বজন ছিল। যেখানে পিতা বিরুদ্ধের লড়ছেন পুত্র, চাচা বিরুদ্ধে ভাতিজা, ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই। কিন্তু সত্য-মিথ্যার প্রশ্নে আজ তারা দুই দলে বিভক্ত। এক দল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত, আরেক দল ইসলামের চিহ্ন মুছে ফেলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কোনো পার্থিব স্বার্থ বা দ্বন্দ্ব নয়—শুধু সত্য মিথ্যার পার্থক্যের জন্যই তারা আজ নিজেদের রক্তের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। এই যুদ্ধ ছিল হক ও বাতিলের মধ্যে প্রথম বড় সশস্ত্র সংঘর্ষ—একটি যুদ্ধ, যা শুধু দুই বাহিনীর মধ্যে লড়াই ছিল না; বরং সত্য ও মিথ্যার আদর্শিক মুখোমুখি অবস্থান। যে যুদ্ধে জয় ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
***
দ্বিতীয় হিজরী সালের কোন একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) খবর পান, কুরাইশদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া হতে মক্কার পথে অগ্রসর হচ্ছে। যেই কাফেলায় ছিল প্রচুর ধন-সম্পদ, আর সেই কাফেলার নেতৃত্বে ছিল আবু সুফিয়ান। রাসূলুল্লাহ (সা.) কাফেলাটির পিছু ধাওয়া করার আহ্বান জানালেন।
***
“এখন প্রশ্ন আসতে পারে মহানবী (সা.) কি তাঁর সাহাবীদের নিয়ে ডাকাতি করতে যাচ্ছিলেন? (নাউজুবিল্লাহ)
=>না!! রাসূলুল্লাহ (সা.) বা তাঁর সাহাবীরা কেউ ডাকাত ছিলেন না, ডাকাতি করতে যাচ্ছিলেনও না। কুরাইশরা যেই অর্থ দিয়ে বাণিজ্যি করে আসছিল, পক্ষান্তরে সেই অর্থ ছিল মাক্কা থেকে হিজরত করে আসা মুহাজির সাহাবীদের। মক্কায় থাকা কালীন অনেক সাহাবীই ছিলেন বিপুল অর্থ সম্পর্দের মালিক। কিন্তু মাত্র ১বছর আগে মাক্কা থেকে হিজরত করে আসার সময় কেউ কিছুই সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারেন নি। কেননা তাঁদের আসতে হয়েছিল মৃত্যু পরোয়ানা কাধে করে। আর তাঁদের হিজরতের পর কাফেররা সাহাবীদের বাড়ি ঘর অর্থ সম্পদ সব কিছু উপর লুটপাট চালায়। আর আজ সেই অর্থ দিয়ে কাফেররা বানিজ্য করে আসছিল। যেখানে এই বিপুল অর্থ যদি কোন ভাবে মক্কায় পৌছাতে পারে তাহলে পরবর্তীতে সেই অর্থ মদিনার নবগঠিত মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারতো। আর সেসব কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) এই কাফেলার ধন-সম্পদ নিজেদের হস্থগত করার আহ্বান জানান”।
***
যাইহোক তবে দ্রুত বের হওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) বেশি একটা সময় পাননি, তাই তিনি ৩১৩ জন সাহাবী নিয়ে বের হয়ে পড়েন। তাদের সঙ্গে ছিল ২টি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। সাহাবীরা পালাক্রমে এগুলিতে আরোহন করতেন।
এদিকে আবু সুফিয়ান গুপ্তচর মারফত এই সংবাদ পায়, তাই সে ঘুরপথ হয়ে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে অন্য পথে দ্রুতগতিতে বিপজ্জনক স্থান অতিক্রম করে চলে যায়। উল্লেখ্য মক্কা থেকে সিরিয়া যাওয়ার যেই রাস্তা সেটা মদিনার ঠিক পাস দিয়ে যায়, আর এখন মদিনা যেহেতু মুসলিমদের দখলে, তাই আবু সুফিয়ান আগে থেকেই সতর্ক ছিল।
***
মদিনাকে এড়িয়ে যাওয়ার আগে সে দামদাম ইবনে আমর গিফারিকে মক্কায় আবু জাহলের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের খবর পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য। দামদাম মক্কার মরুভূমিতে এসেই তার উটের নাক কেটে দেয়, হাওদা উল্টিয়ে এবং নিজের জামা ছিঁড়ে ফেলে, এবং উটের ওপর বসেই চিৎকার করে বলছে, “হে কুরাইশগণ, মহাবিপদ! মহাবিপদ! তোমাদের ধন সম্পদ আবু সুফিয়ানের কাছে। মুহাম্মাদ তার সহচরদেরকে ঐ সম্পদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। মনে হয় তোমরা তা আর রক্ষা করতে পারবে না। সাহায্য করতে অগ্রসর হও! সাহায্য করতে অগ্রসর হও!”
এ সংবাদ শুনে কুরাইশরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে, এ প্রস্তুতি থেকে কুরাইশদের কোন গণ্যমান্য লোক আজ বাদ পড়েনি। কেবলমাত্র আবু লাহাব তাঁর পরিবর্তে আসী ইবনে হিশাম ইবনে মুগীরাকে পাঠায়। আবু লাহাব তাঁর কাছে চার হাজার দিরহাম পেত, সে ঋণ শোধ করতে পারে নি, তাই সে আবু লাহাবের বদলে যুদ্ধে যায়। প্রস্তুতি নেয়া সম্পন্ন হলো এবং রণাঙ্গনে যাওয়ার জন্য সবাই বদ্ধপরিকর হলো। তখন তাঁদের মনে এই ভয় হলো যে এই সুযোগে তাঁদের প্রতিপক্ষ কিনানা গোত্র যদি তাঁদের পিছন থেকে হামলা চালায়। এ আশংকা তাদেরকে যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত করে তুলছিল। তখন ইবলিস সুরাকা ইবনে মালিকের আকৃতি ধারণ করে তাদের কাছে এসে জানায়, “আমি তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক থাকছি যেন কিনানা গোত্র তোমাদের ওপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ করতে না পারে।” এ আশ্বাসে তারা দ্রুতবেগে মক্কা ত্যাগ করলো।
***
রাসূলুল্লাহ (সা.) রাওহা নামক স্থানে পৌঁছে খবর পেলেন আবু সুফিয়ানের কাফেলা নিরাপদে উপকূল ধরে চলে গেছে, এবং কুরাইশরা তাদের বাণিজ্য কাফিলাকে রক্ষা করার জন্য সদলবলে মক্কা থেকে যাত্রা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ খবর সাহাবীদের জানালেন এবং কি করা উচিত সে সম্পর্কে সকলের পরামর্শ চাইলেন। সর্বপ্রথম আবু বকর (রা.) উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর মতামত অতি চমৎকারভাবে ব্যক্ত করলেন। এরপর মিকদাদ ইবনে আমর (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন,
“সেই আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে—আপনি যদি আমাদেরকে ঘোড়া ছুটিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বলেন, তাহলে আমরা তাই করব। আপনি যেদিকে যেতে বলবেন, আমরা সেদিকেই যাব। এমনকি বারাকুল গামাদ পর্যন্ত যেতে বললেও আমরা পিছপা হব না।”
মিকদাদ (রা.)-ও বলেন, “হযরত মুসা (আ.)-এর অনুসারীরা যেমন বলেছিল, আমরা তেমন বলব না। তারা বলেছিল, 'তুমি ও তোমার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসে থাকব।’ আর আমরা বলছি: আমরা আপনার ডান, বাম, সামনে এবং পেছন থেকে যুদ্ধ করব।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) মিকদাদ (রা.)-কে ধন্যবাদ দিলেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করলেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) আনসারদের সম্বোধন করলেন, “তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।"
আনসারদের এত গুরুত্বদানের কারণ ছিল এই যে, তারা ছিল মুসলমানদের সহায়। আকাবাতে বাইয়াতে তারা বলেছিলো, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি যত দিন আমাদের আবাসভূমিতে না যাবে ততদিন আমরা আপনার দায়িত্ব নিতে অপারগ। যখন আপনি আমাদের কাছে যাবেন তখন আমরা আপনাকে সেভাবে রক্ষা করব যেভাবে আমরা আমাদের ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীদেরকে রক্ষা করি” এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) আশংকা করেছিলেন যে, আনসাররা হয়তো মনে করতে পারে যে, মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলেই কেবল তারা তাকে সাহায্য করবে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) যদি মাদিনার বাহিরে শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে তাকে সাহায্য করা তাঁদের দায়িত্ব নয়। তাই তিনি যখন আনসারদেরকে সম্বোধন করলেন তখন সা'দ ইবনে মুয়ায (রা.) বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি বোধ হয় আমাদের মতামত জানতে চাচ্ছেন।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “হ্যাঁ।”
সা'দ (রা.) বললেন, “আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার দাওয়াতকে সত্য বলে স্বীকার করেছি। আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি যে বিধান নিয়ে এসেছেন তা পরম সত্য। আর এই প্রত্যয়ের ভিতরেই আমরা আপনার কাছে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, আমরা আপনার নির্দেশ মানবো ও আনুগত্য করবো। হে আল্লাহর রাসূল, তাই আপনি যা ভাল মনে করেন, করুন। আমরা আপনার সাথে আছি। সেই আল্লাহর শপথ যিনি আপনাকে মহাসত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, সামনের এই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আপনি যদি তার অথৈ পানিতে নামেন, আমরাও আপনার সাথে নামবো। আমাদের একটি লোকও আপনাকে ছেড়ে পেছনে থাকবে না। আগামীকাল যদি আপনি আমাদের সাথে নিয়ে শত্রুর মুখোমুখি হতে চান, তাতেও আমাদের কোন আপত্তি নেই। আমরা যুদ্ধে ধৈর্যশীল এবং শত্রুর মুকাবিলায় সংকল্পে অবিচল। আশা করি, আল্লাহ আপনাকে আমাদের এমন তৎপরতা দেখবার সুযোগ দেবেন, যাতে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভর করে আমাদের নিয়ে আপনি এগিয়ে চলুন।”
এই সাহসী কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত খুশি হন। তিনি বলেন, “তাহলে সামনে চলো এবং সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহ আমাকে কাফেরদের দুই দলের একটির ওপর বিজয় দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। আমি কাফের নেতাদের নিহত হওয়ার স্থানগুলো দেখতে পাচ্ছি।”
***
২য় হিজরির ১৭ই রমজান, মদিনা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে মুসলিম ও কুরাইশরা প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.), আর কুরাইশ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ইসলামের চিরশত্রু আবু জাহেল। নবুওয়াতের ১৫ বছর পর সে ১ হাজার সৈন্য নিয়ে বদরের প্রান্তরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
***
মুসলিমরা বদরের প্রান্তরে অবস্থান করছিল কিছুটা সুবিধা জনক জায়গায়। উল্লেখ্য পথিকদের তৃষ্ণা মেটাতে বদরে অনেক গুলি পানির কুপ ছিল। মুসলিমরা সেখানের কিছু কুপ দখল করে নেয়, এবং বাকিগুলো ধ্বংস করে দেয়, এই কারণে যে কাফেরদের পানি ছাড়াই যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়, এটা ছিল নিছক রণকৌশলেরই অংশ।
***
কাফেররা বদরের প্রান্তরে পৌছেই দেখতে পায় মুসলিমরা কুপগুলো দখল করে নিয়েছে, এবং বাকি গুলো ধ্বংস করে দিয়েছে।
আসওয়াদ ইবনে আবদুল আসাদ মাখযুমী ছিল কুরাইশদের মধ্যে চরম অসৎ ও গুণ্ডা স্বভাবের লোক। সে ঘোষণা করল, “মুসলমানদের নিয়ন্ত্রিত কূপ থেকে আমি পানি পান করবো। কিংবা তা ভেঙ্গে ফেলবো। এতে যদি আমার মৃত্যুও ঘটে, পরোয়া করি না।”
এই বলে সে ময়দানে নামলে হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) তার মুখোমুখি হলেন। দুইজনের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ চলাকালে হামযা আসওয়াদের পায়ে তরবারীর আঘাত করলে, তার পা কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ সময় সে কূপের কাছেই ছিল। সে চিৎ হয়ে পড়ে গেল এবং তার পা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটতে লাগলো। সে পুনরায় হামাগুড়ি দিয়ে, নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কূপের সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়লো। হামযা তার পিছু ধেয়ে গেলেন এবং কূপের সীমানার ভেতরেই তাকে হত্যা করলেন।
***
যুদ্ধের শুরুতেই এক এক করে ময়দানে এগিয়ে আসে কুরাইশদের তিন যোদ্ধা—উতবা ইবনে রাবিয়া, তার ভাই শায়বা ইবনে রাবিয়া, এবং তার পুত্র ওয়ালিদ ইবনে উতবা। উতবা মুসলিমদের দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান জানালে, মদিনার তিনজন আনসার সাহাবী আউফ ও মুয়াওয়েব ইবনে হারেস (রা.) (দুইভাই) ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) তাদের মোকাবিলার জন্য এগিয়ে আসেন।
উতবা বললঃ “তোমারা কারা”
তারা বললেনঃ “আমরা আনসার”
তখন উতবা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “তোমরা তো মদিনার কৃষক, তোমাদের দিয়ে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই।”
অতঃপর একজন চিৎকার করে বললো, “হে মুহাম্মাদ, আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে যারা আমাদের সমকক্ষ, তাদরেকে পাঠাও।”
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) উবাইদা ইবনে হারেস (রা.), হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.) ও আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)-কে পাঠালেন। তারা কুরাইশ যোদ্ধাদের মুখোমুখি হওয়ার পর হামযা (রা.) উতবাকে বললেন,“কি হে উতবা, এবার তুমি কি তোমার সমকক্ষ প্রতিপক্ষ পেয়েছ?”
তখন উতবা বলে, “ঠিক আছে। এবার মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিপক্ষ পাওয়া গেছে।”
***
মুসলিম বাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ বীর উবাইদা (রা.) উতবার বিরুদ্ধে, হামযা (রা.) শাইবার বিরুদ্ধে এবং আলী (রা.) ওয়ালীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। হামযা (রা.) শাইবাকে এবং আলী (রা.) ওয়ালীদকে পাল্টা আঘাত হানার সুযোগ না দিয়ে প্রথম আঘাতেই দুজনকে হত্যা করলেন, কিন্তু উতবার সাথে উবাইদা (রা.)-এর কিছুক্ষন লড়াই হয়, এতে তারা দুইজনই আহত হন। তখন তার সাহায্যে হামজা (রা.) ও আলি (রা.) এগিয়ে এসে উতবাকে হত্যা করেন।
তিন বীর যোদ্ধা মৃত্যুতে কুরাইশদের মনবল অনেক খানি ভেঙ্গে যায়।
***
এরপর উভয় পক্ষ একযোগে পরস্পরের কাছাকাছি এগিয়ে এলো । রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদেরকে বলে দিলেন, তিনি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তারা যেন হামলা না করে। তিনি বললেন, “কুরাইশরা তোমাদের ঘেরাও করে ফেললে তীর নিক্ষেপ করে তাদেরকে হটিয়ে দিও।”
যুদ্ধের ঠিক আগমুহুর্তে রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে তাঁর প্রতিশ্রুত সাহায্য প্রেরণের জন্য দোয়া করতে লাগলেন । তিনি বলতে লাগলেন, “হে আল্লাহ, এই মুষ্টিমেয় মুসলমান যদি আজ ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে আপনার ইবাদত করার জন্য কেউ থাকবে না।”
***
তিন বীরের পতন দেখে কুরাইশ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় প্রবল সংঘর্ষ। মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম যোদ্ধার বিপরীতে ছিল ১ হাজার কুরাইশ সেনা।
আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠছিল অস্ত্রের শব্দ, আহত মানুষের আর্তনাদ ও উট-ঘোড়ার চিৎকারে। দুই পক্ষের মধ্যে চলতে থাকে হামলা পালটা হামলা।
***
যুদ্ধের এক পর্যায়ে দেখা যায় ইসলামের চিরশত্রু আবু জাহেল এক যায়গায় আহত হয়ে আছে, তাঁর এই অবস্থা করেছে মদিনার দুই কিশোর সাহাবী। দুই সাহাবীর হামলায় গুরুত্বর আহত হয় সে। আহত অবস্থায় সে নিজেকে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু সেই সময় সে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর চোখে পড়েন, ইবনে মাসউদ (রা.) তাকে দেখতে পেয়েই ছুটে গিয়ে হত্যা করেন। মক্কায় থাকার সময় তিনিই আবু জাহেলের হাতে বারবার অপমানিত হয়েছিলেন—তাকে 'রাখাল' বলে গালি দিত এবং মারধর করত। আজ সেই ‘রাখাল’-এর হাতেই আবু জাহেলের পরিণতি ঘটে।
সেদিন বদরের প্রান্তরে প্রতিশোধ নেন আরেক নির্যাতিত সাহাবী, হযরত বিলাল (রা.)। তিনি নিজ হাতে হত্যা করেন এক সময়ের তার নির্যাতক মনিব, উমাইয়াকে।
***
আবু জাহেলের মৃত্যুতে কুরাইশ বাহিনী ভেঙে পড়ে, তারা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার যুদ্ধে কুরাইশদের ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দি হয়। নিহতদের মধ্যে ছিল হিজরতের রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রকারীরাও। মুসলিমদের শহীদ হন মাত্র ১৪ জন—৬ জন মুহাজির এবং ৮ জন আনসার।
***
যুদ্ধ শেষ রাসূলুল্লাহ (সা.) নিহতদের ভেতরে আবু জাহলের লাশ আছে কিনা খুঁজে দেখার নির্দেশ দিলে, ইবনে মাসউদ (রা.) তার মস্তক ছিন্ন করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে যান এবং বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, এটা আল্লাহর দুশমন আবু জাহলের মাথা।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “সত্যি কি তাই?”
ইবনে মাসউদ (রা.) বললেন, “আল্লাহর কসম, সত্যি।”
ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আবু জাহলেরমাথা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে রাখলে তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।
পরে রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরাইশ নেতৃবৃন্দের লাশ কুয়ার মধ্যে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিলেন। উমাইয়া ইবনে খালাফ ছাড়া আর সবার লাশ নিক্ষেপ করা হলো। উমাইয়ার লাশ তার সামরিক পোশাকের মধ্যে ফুলে সেঁটে গিয়েছিল। সাহাবীরা যখন তাকে পোশাক থেকে ছাড়াবার চেষ্টা করলে তার গোশ্ত ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগলো। এ অবস্থা দেখে তাঁরা তাকে যেমন ছিল তেমনভাবেই রেখে মাটি ও পাথর চাপা দিলেন।
***
বদর ছিল একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ, কিন্তু এর প্রভাব ছিল বহু দূরপ্রসারী। কুরাইশরা মনে করত মুসলিমরা তাদের দয়ায় বেঁচে আছে, কিন্তু বদরের পর তারা বুঝে যায় যে মুসলিমরা একটি সংগঠিত ও শক্তিশালী জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই যুদ্ধের মাধ্যমে শুধু কুরাইশ নয়, পুরো আরব বুঝে যায়—ইসলাম এখন অপ্রতিরোধ্য এক শক্তি।