তৃতীয় পর্ব: বাগদাদে প্রত্যাবর্তন, প্রচার শুরু ও প্রভাব বিস্তারের প্রারম্ভ (প্রায় ১১২৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে পরবর্তী কয়েক বছর)
হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর দীর্ঘ সাধনা ও ভ্রমণের পর বাগদাদে পূর্ণাঙ্গ প্রচারজীবন শুরু হয়। এই তৃতীয় পর্বে আমরা তাঁর প্রকাশ্য দরস, ওয়াজ-নসিহত, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায় এবং মানুষের মধ্যে তাঁর প্রভাব বিস্তারের ঘটনাবলি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরব। সম্পূর্ণ জীবনী এখানে শেষ করা হবে না; এটি ধারাবাহিক ১০টি পর্বের অংশ হিসেবে রচিত, যাতে দশম পর্বে তাঁর ইন্তেকাল বর্ণিত হবে। সবকিছু ঐতিহাসিক সূত্রের ভিত্তিতে ১০০% নন-ফিকশন।
১১২৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে, দীর্ঘ ২৫ বছরের সাধনা শেষে আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বাগদাদে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি তাঁর শিক্ষক আবু সাঈদ মুবারক মাখযুমীর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। সকালে তিনি হাদিস, তাফসীর এবং ফিকহের দরস দিতেন। বিকেলে আধ্যাত্মিক বিষয়, কুরআনের অন্তর্নিহিত অর্থ এবং অন্তরের শুদ্ধির উপর বক্তৃতা দিতেন। তাঁর বক্তৃতা ছিল সরল, প্রাণবন্ত এবং হৃদয়স্পর্শী। শত শত ছাত্র তাঁর চারপাশে জমায়েত হতো।
তাঁর প্রচারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সকল মাজহাবের প্রতি সম্মান। হাম্বলী হলেও তিনি শাফেয়ী ফিকহের ফতোয়া দিতেন। আল-নববী (রহ.) তাঁকে বাগদাদের শাফেয়ী ও হাম্বলীদের শায়েখ বলে অভিহিত করেছেন। এই নিরপেক্ষতা তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছিল। তিনি মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ দূর করার চেষ্টা করতেন এবং ইসলামের মূল শিক্ষার উপর জোর দিতেন।
তাঁর ওয়াজে তিনি তাকওয়া, সততা, দানশীলতা এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের উপর গুরুত্ব দিতেন। অনেক অমুসলিম—ইহুদি ও খ্রিস্টান—তাঁর বক্তৃতা শুনে ইসলাম গ্রহণ করত। তিনি বলতেন, “ইসলাম হলো অন্তরের শুদ্ধি এবং আমলের সৌন্দর্য।” তাঁর কথায় মানুষের অন্তর বিগলিত হতো। বাগদাদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন আসত। তিনি মসজিদে বা খোলা মাঠে ওয়াজ করতেন।
এই সময় তিনি মাদ্রাসা আল-কাদেরিয়া প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেন। এই মাদ্রাসা শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণেরও কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ছাত্ররা এখানে কুরআন, হাদিস, ফিকহ এবং তাসাউফ শিখত। তিনি নিজে ছাত্রদের তত্ত্বাবধান করতেন এবং তাদের নৈতিক চরিত্র গঠনে সাহায্য করতেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে আবদুল রাজ্জাক জিলানী (রহ.)-এর মতো পুত্রও ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে তাঁর সিলসিলা চালিয়ে যান।
তাঁর প্রভাব রাজনৈতিক নেতাদের কাছেও পৌঁছায়। নূরুদ্দিন জঙ্গি এবং পরবর্তীকালে সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর মতো নেতারা তাঁর উপদেশ মেনে চলতেন। তিনি তাদের ন্যায়বিচার এবং জিহাদের সঠিক পথ দেখাতেন। কিন্তু তিনি কখনো রাজনীতিতে সরাসরি জড়াননি; তাঁর মূল কাজ ছিল দাওয়াত ও তালিম।
তাঁর দৈনন্দিন জীবন ছিল সাধারণ। তিনি অল্প খেতেন, অল্প ঘুমাতেন এবং অধিকাংশ সময় ইবাদতে কাটাতেন। তাঁর বাড়িতে অতিথিদের আপ্যায়ন করতেন, গরিবদের সাহায্য করতেন। একবার তাঁর কাছে অর্থ এলে তিনি তা তাৎক্ষণিকভাবে বিলিয়ে দিতেন। এই দানশীলতা তাঁকে “গাউসুল আজম” উপাধির দিকে নিয়ে যায়।
তাঁর বক্তৃতায় তিনি নফসের সাথে লড়াই, শয়তানের প্ররোচনা প্রতিরোধ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কথা বলতেন। ছাত্ররা তাঁর থেকে খিলাফত (আধ্যাত্মিক অনুমতি) লাভ করত। এভাবে কাদেরিয়া তরিকার ভিত্তি স্থাপিত হয়। তিনি তরিকার মূলনীতি শেখাতেন—বায়আত, জিকির, মুরাকাবা এবং শরীয়ত মেনে চলা।
বাগদাদের বাইরেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক আসত তাঁর দরস শুনতে। তিনি চিঠির মাধ্যমে দূরবর্তী শিষ্যদের উপদেশ দিতেন। তাঁর লেখা “আল-ফতহুর রাব্বানী” এবং “ফুতুহুল গাইব”-এর মতো গ্রন্থের ভিত্তি এই সময় থেকে শুরু হয়। তিনি ছাত্রদের উৎসাহিত করতেন জ্ঞান লিপিবদ্ধ করতে।
এই পর্যায়ে তাঁর জীবনে পরীক্ষাও আসে। কিছু ঈর্ষাপরায়ণ লোক তাঁর বিরোধিতা করত, কিন্তু তিনি ধৈর্যের সাথে সামলাতেন। তাঁর আচরণ ছিল এমন যে, বিরোধীরাও শেষ পর্যন্ত প্রভাবিত হতো। তিনি কখনো প্রতিশোধ নিতেন না, বরং ক্ষমা করে দিতেন।
তাঁর পরিবারের সদস্যরা এই সময় তাঁর সাথে ছিলেন। তিনি সন্তানদেরও একই শিক্ষা দিতেন। তাঁর জীবন ছিল আদর্শ—শরীয়ত ও তরিকতের সমন্বয়। মানুষ তাঁকে দেখে বলত, “এই ব্যক্তি আল্লাহর ওলী।”
এই প্রচারের ফলে বাগদাদে ইসলামি জ্ঞানচর্চা নতুন প্রাণ পায়। অনেকে তাঁর মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরে আসে। তিনি বিশেষ করে যুবকদেরকে সতর্ক করতেন দুনিয়ার ফাঁদ থেকে। তাঁর ওয়াজে হাজারো মানুষ কাঁদত এবং তওবা করত।
এভাবে তাঁর প্রভাব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি কোনো রাজকীয় আড়ম্বর করতেন না, বরং সাধারণ মানুষের সাথে মিশতেন। এই সময়কাল তাঁর জীবনের এক স্বর্ণযুগের সূচনা করে, যা পরবর্তী পর্বগুলোতে আরও বিস্তৃত হবে।
🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
