সকাল ছয়টা বেজে আটাশ মিনিট। মোবাইলের অ্যালার্ম অনেকক্ষণ ধরেই বাজছে। ঘুম ভাঙার পরও সিনথন বিছানা ছাড়ল না। ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে ঘুম নেই। ক্লান্তিও নেই। শুধু এক ধরনের শূন্যতা।
ঘরের জানালাটা আধখোলা। ভোরের বাতাসে পর্দাটা আস্তে আস্তে দুলছে। দূরের মসজিদ থেকে ফজরের আজানের শেষ অংশ ভেসে আসছে। এই সময়টা একসময় তার খুব প্রিয় ছিল। কারণ এই সময়েই প্রায় প্রতিদিন একটা মেসেজ আসত।"ঘুম থেকে উঠেছ?"
কখনও—
"আজ সূর্যটা দেখেছ?"
আবার কখনও—
"আজকে দেরি করে ঘুমিও না।"
সেই মেসেজগুলো আর আসে না। অনেক দিন হলো আসে না। তবুও অ্যালার্ম বন্ধ করার আগে সিনথনের আঙুল আজও অবচেতনভাবে মেসেজ আইকনের ওপর গিয়ে থামে। প্রতিদিন। একইভাবে। তারপর সে নিজেই হালকা হাসে। একটা এমন হাসি, যেটার মধ্যে আনন্দ নেই। শুধু নিজের ওপর বিস্ময় আছে।
"আমি এখনও কেন এমন করি?"
প্রশ্নটা প্রতিদিন আসে। উত্তরটা কোনোদিন আসে না।
মেসের ঘরটা খুব বড় নয়। একটা খাট। একটা টেবিল। কয়েকটা বই। দেয়ালের কোণে একটা পুরোনো ব্যাগ। টেবিলের ওপর একটা শুকিয়ে যাওয়া মানিপ্ল্যান্ট। গাছটায় শেষ কবে পানি দেওয়া হয়েছে, সিনথনের মনে নেই। তার নিজের জীবনটার মতোই গাছটাও যেন ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে। সে উঠে জানালার কাছে গেল। রাস্তার ওপারে একটা বয়স্ক মানুষ হাঁটছেন। তার পাশে ছোট্ট একটা মেয়ে। মেয়েটা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দৌড় দিল।
বৃদ্ধ লোকটা হেসে বললেন, "আস্তে মা... পড়ে যাবি।"
কথাটা শুনে সিনথনের বুকের ভেতর কোথাও অদ্ভুত একটা টান লাগল। কেন লাগল, সে জানে না। এখন প্রায় সব অনুভূতিরই কারণ সে খুঁজে পায় না।
ওয়াসরুম থেকে ফিরে এসে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। চোখের নিচে কালচে দাগ।দাড়ি কয়েক দিনের বাড়তি। সে অনেকক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে রইল।মনে হলো— আয়নার ভেতরের মানুষটা যেন তাকে চিনতে পারছে না।কখন যেন সে নিজের ভেতর থেকে একটু একটু করে হারিয়ে গেছে।
সাতটার দিকে মেসের সবাই বের হতে শুরু করল। রুমমেট রিফাত দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
— আজ কলেজে যাবি?
সিনথন ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বলল,
— দেখি।
— "দেখি" মানে?
— জানি না।
রিফাত আর কিছু বলল না। কারণ সে জানে, গত কয়েক মাস ধরে সিনথনের সব উত্তরের শেষ একই জায়গায় গিয়ে থামে—
"জানি না।"
সিনথন ধীরে ধীরে শার্টটা গায়ে চাপাল। পকেটে ফোন রাখল। তারপর হঠাৎ থেমে গেল। আবার ফোনটা বের করল। স্ক্রিন অন করল। কোনো নোটিফিকেশন নেই। তবুও সে সেই পুরোনো চ্যাটটা খুলল।
উপরে লেখা—
অরু।
আর কিছু নয়।
কোনো ছবি নেই।
কোনো নতুন বার্তা নেই।
শুধু পুরোনো কথোপকথনের নীরবতা। সে কিছু লিখল না। কিছু মুছলও না। শুধু কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আবার ফোনটা বন্ধ করে দিল। এটা এমন এক অভ্যাস, যেটা ভাঙার জন্য সে অনেকবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অভ্যাসগুলো কখনও কখনও মানুষের চেয়েও বেশি একগুঁয়ে হয়।
বাইরে আকাশটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসছে। শহর জেগে উঠছে। দোকানের শাটার খুলছে। রিকশার ঘণ্টা বাজছে। মানুষ তাদের দিনের শুরু করছে। সবাই কোথাও না কোথাও যাচ্ছে। শুধু সিনথনের মনে হয়—
সে অনেক দিন ধরে কোথাও যাচ্ছে না। সে শুধু সময়ের সঙ্গে হাঁটছে। জীবনের সঙ্গে নয়। সেদিন সকালে সে জানত না—
এই সাধারণ দিনটাই তার জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ দিনের শুরু হতে যাচ্ছে। আর খুব শিগগিরই সে এমন দুজন মানুষের সঙ্গে দেখা করবে, যাদের জীবনের ক্ষত তার নিজের ক্ষতের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তবুও, অদ্ভুতভাবে… তাদের তিনজনের ভেতরে একই প্রশ্ন বেঁচে আছে। একটি প্রশ্ন, যার উত্তর কেউ জানে না।
কীভাবে মানুষ সত্যকে বিশ্বাস করে, কিন্তু সেই সত্যকে জীবনে মানিয়ে নিতে পারে না?
সিনথন কখনো ভাবেনি, একজন মানুষকে হারানোর পর সবচেয়ে কঠিন কাজটা তাকে ভুলে যাওয়া নয়। সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো—
তার অনুপস্থিতির সঙ্গে বেঁচে থাকা শেখা। কারণ মানুষ চলে গেলে শুধু একজন মানুষ চলে যায় না। তার সঙ্গে চলে যায় কিছু অভ্যাস। কিছু অপেক্ষা। কিছু ছোট ছোট মুহূর্ত, যেগুলো তখন খুব সাধারণ মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে বোঝা যায়, সেই সাধারণ মুহূর্তগুলোর মধ্যেই জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ লুকিয়ে ছিল।
চায়ের দোকানটা মেস থেকে বেশি দূরে নয়। সিনথন প্রতিদিন সেখানে যায় না। কিন্তু যখন যায়, তখন একই বেঞ্চে বসে। দোকানের ডান পাশের শেষ বেঞ্চ। যেখান থেকে রাস্তার পুরোটা দেখা যায়। কেন ওই জায়গাটা তার পছন্দ, সে নিজেও জানে না। হয়তো কারণ, একসময় অরু ওই বেঞ্চেই বসেছিল। অনেক বছর আগে। একটি বিকেলে। এক কাপ চা নিয়ে। সেদিন খুব সাধারণ একটা দিন ছিল। তাদের কথাগুলোও খুব সাধারণ ছিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে। স্বপ্ন নিয়ে। ছোট ছোট ইচ্ছা নিয়ে। কেউ জানত না, কিছু বছর পর সেই কথাগুলোই একজন মানুষের কাছে স্মৃতির সবচেয়ে ভারী অংশ হয়ে থাকবে।
"ভাই, চা।"
দোকানের ছেলেটা কাপটা রেখে গেল। সিনথন মাথা নাড়ল। চায়ের ধোঁয়া উঠছে। সে কাপটা হাতে নিল। কিন্তু পান করল না। দোকানের পাশে বসা দুজন মানুষ গল্প করছে। একজন বলছে,
— "সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যায়।"
কথাটা শুনে সিনথনের চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যায়। এই কথাটা সে অনেকবার শুনেছে। বন্ধুরা বলেছে। পরিবার বলেছে। নিজেকেও অনেকবার বলেছে। কিন্তু একটা বিষয় সে বুঝতে পারে না। যদি সত্যিই সব ঠিক হয়ে যায়… তাহলে কিছু কিছু সকাল এখনও এত ভারী লাগে কেন?
সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। ভেতরে একটি পুরোনো কাগজ। অনেকবার ভাঁজ করা। কাগজটা বের করবে কি না, সে কয়েক সেকেন্ড ভাবল। তারপর আবার রেখে দিল। সে জানে, ওই কাগজে নতুন কিছু নেই। তবুও সে জানে, কিছু জিনিস আমরা নতুন কিছু পাওয়ার জন্য দেখি না। আমরা দেখি, কারণ পুরোনো জিনিসের মধ্যেও একটা পরিচিত অনুভূতি থাকে। যেমন পুরোনো বাড়ির গন্ধ। যেমন ছোটবেলার কোনো গান। যেমন এমন একজন মানুষের নাম, যে এখন আর আমাদের জীবনের অংশ নয়।
দুপুরে সিনথন কলেজে গেল। অনেক দিন পর। ক্লাসে বসে সে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে ছিল। শিক্ষক কিছু একটা বুঝিয়ে বলছেন। চারপাশের সবাই লিখছে। কিন্তু তার খাতার পাতা খালি। পাশের বন্ধু জিজ্ঞেস করল,
— "কী হয়েছে তোর?"
সিনথন বলল,
— "কিছু না।"
এই "কিছু না" শব্দটার ভেতরে কত কিছু লুকিয়ে থাকে, সেটা শুধু যে বলে সে-ই জানে।
ক্লাস শেষে সে কলেজের মাঠে এসে বসে পড়ল। মাঠে কয়েকজন ছেলে খেলছে। তাদের হাসির শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে। একজন ছেলে গোল মিস করে সবাইকে হাসাচ্ছে। সিনথন তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো—
মানুষ কত সহজে বর্তমান মুহূর্তে বেঁচে থাকে। একটা গোল মিস করেও হাসতে পারে। একটা ভুল করেও আবার দৌড়াতে পারে। কিন্তু বড় হওয়ার পর আমরা কেন পারি না?
কেন একটা হারানো জিনিসের কাছে বারবার ফিরে যাই?
বিকেলের দিকে আকাশে মেঘ জমল। সিনথন ধীরে ধীরে মেসের দিকে হাঁটছিল। রাস্তার পাশে একটি ছোট বইয়ের দোকান তার চোখে পড়ল। দোকানের সামনে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটি দোকানের তালার দিকে তাকিয়ে আছেন। অদ্ভুতভাবে স্থির। সিনথন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। লোকটির হাতে একটি পুরোনো চাবি। তিনি চাবিটা তালার কাছে নিলেন। কিন্তু থেমে গেলেন। যেন হঠাৎ মনে পড়ল—
যে দরজা খোলার জন্য তিনি এসেছেন, সেই দরজাই আর নেই।
লোকটি কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে চলে গেলেন। সিনথন দাঁড়িয়ে রইল। কেন জানি না, দৃশ্যটা তার মনে দাগ কাটল। সে জানত না লোকটি কে। জানত না তার গল্প কী। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডে সে একটা অদ্ভুত জিনিস অনুভব করল। লোকটির চোখে যে শূন্যতা ছিল… সেটা তার নিজের চোখের মতো।
সন্ধ্যায় মেসে ফিরে সিনথন জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সে বৃষ্টি দেখছিল। হঠাৎ তার ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল এলো। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। অচেনা নম্বর। সাধারণত সে ধরত না। কিন্তু আজ কেন যেন ধরল। ওপাশ থেকে একজন বলল,
— "আপনি কি সিনথন?"
সিনথন কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
— "জি।"
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর কণ্ঠটি বলল,
— "আপনার সঙ্গে একটা বিষয় নিয়ে কথা ছিল।"
সিনথনের বুকের ভেতর অজানা একটা অনুভূতি হলো। কারণ অনেক দিন পর কেউ তার কাছে কোনো কথা বলতে চেয়েছে।কিন্তু সে জানত না—
এই ফোন কলই তাকে এমন এক যাত্রার দিকে নিয়ে যাবে, যেখানে সে প্রথমবার নিজের কষ্টকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে শিখবে।
সিনথন কিছুক্ষণ ফোনটা কানে ধরে চুপ করে রইল। ওপাশের মানুষটিও কিছু বলছে না। দুজন মানুষের মধ্যে এমন এক নীরবতা তৈরি হলো, যেখানে কথা না বলেও অনেক কিছু বলা হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সিনথন বলল,
— "আপনি কে?"
ওপাশ থেকে শান্ত একটি কণ্ঠ ভেসে এলো,
— "আমার নাম রাশেদ। হয়তো আমাকে আপনি চেনেন না।"
সিনথন ভ্রু কুঁচকে গেল।
— "তাহলে আমার নম্বর পেলেন কীভাবে?"
কিছুক্ষণ নীরবতার পর লোকটি বলল,
— "একজনের কাছ থেকে।"
— "কার?"
লোকটি উত্তর দিল না।
বরং বলল,
— "আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।"
সিনথনের ভেতরে একটা অস্বস্তি তৈরি হলো।
এই সময়ে, এইভাবে কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করে না।
সে কিছুটা কঠিন গলায় বলল,
— "কোনো সমস্যা হয়েছে?"
— "না। সমস্যা হয়তো আপনার না। কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে, যার উত্তর হয়তো আপনিও খুঁজছেন।"
সিনথন চুপ করে গেল। কথাটা অদ্ভুত। কিন্তু আরও অদ্ভুত হলো—কথাটা তার ভেতরে কোথাও গিয়ে লাগল। কারণ সত্যিই তো… সে কি কোনো উত্তর খুঁজছে না?
পরদিন বিকেলে শহরের একটি ছোট ক্যাফেতে দেখা করার কথা হলো। সিনথন ঠিক সময়ের দশ মিনিট আগে পৌঁছে গেল। অভ্যাসবশত। সে সবসময় আগে পৌঁছায়। একসময় অরু তাকে বলেছিল, "তুমি সব জায়গায় এত আগে যাও কেন?" সে হেসে বলেছিল, "অপেক্ষা করতে আমার ভালো লাগে।" অরু তখন মজা করে বলেছিল, "একদিন দেখবে, বেশি অপেক্ষা করাটাই তোমার সমস্যা হয়ে যাবে।"সেদিন কথাটা খুব সাধারণ মনে হয়েছিল। আজ মনে হয়, কিছু মানুষ অজান্তেই ভবিষ্যতের কথা বলে যায়। ক্যাফের এক কোণের টেবিলে বসেছিল রাশেদ। প্রথম দেখায় তাকে খুব সাধারণ একজন মানুষ মনে হলো। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। চোখে ক্লান্তি। কিন্তু মুখে এক ধরনের শান্ত ভাব। সিনথন সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই লোকটি উঠে দাঁড়াল।
— "সিনথন?"
— "জি।"
— "বসুন।"
দুজন বসে পড়ল। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। রাশেদ যেন কিছু একটা ভাবছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন,
— "আপনি কি কখনো এমন কিছু হারিয়েছেন, যেটা হারানোর পরও আপনার মনে হয়েছে সেটা এখনও আপনার জীবনের অংশ?"
প্রশ্নটা শুনে সিনথন চমকে গেল। কারণ এটাই তো তার গল্প। কিন্তু সে অপরিচিত একজন মানুষকে সেটা বলতে চাইল না।
সে শুধু বলল, — "সবাই কিছু না কিছু হারায়।" রাশেদ হালকা হাসলেন।
— "ঠিক বলেছেন। কিন্তু সবাই হারানোর পর একইভাবে বাঁচে না।" সিনথন তাকিয়ে রইল। রাশেদ আবার বললেন,
— "কেউ কেউ হারানো জিনিসটাকে স্মৃতি বানিয়ে রাখে। আর কেউ কেউ অজান্তেই সেটাকে নিজের বর্তমান বানিয়ে ফেলে।"
কথাগুলো শুনে সিনথনের মনে হলো, লোকটি যেন তার ভেতরের কোনো বন্ধ দরজায় হাত দিয়েছে।
রাশেদ টেবিলের ওপর রাখা কাপের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "আমি একজন মানুষকে খুঁজছিলাম।"
— "কাকে?"
— "যে বুঝতে পারবে।"
— "কী?"
রাশেদ জানালার বাইরে তাকালেন। বাইরে মানুষ হাঁটছে। গাড়ি চলছে। শহর তার স্বাভাবিক গতিতে চলছে। তিনি ধীরে বললেন, — "যে বুঝবে, জীবনে সব হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার জন্য নয়। কিছু জিনিস শুধু আমাদের শেখানোর জন্য আসে।"
সিনথন কিছু বলল না। কারণ সে এই কথাটা শুনতে চায়নি। কিন্তু তার মন এই কথাটাকে অস্বীকারও করতে পারছিল না।
সেদিন রাশেদ বেশি কিছু বললেন না। শুধু যাওয়ার আগে একটি ঠিকানা দিলেন।
— "সময় হলে এখানে আসবেন।"
সিনথন কাগজটা নিল। ঠিকানাটা দেখল। শহরের বাইরে একটি পুরোনো বাড়ি। সে জিজ্ঞেস করল, — "কেন যাব?"
রাশেদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন,
— "কারণ হয়তো আপনার নিজের গল্পটা আপনি যতটা জানেন, তার চেয়ে বেশি কিছু আছে সেখানে।"
রাতে সিনথন ঘুমাতে পারল না। বারবার রাশেদের কথাগুলো মনে পড়ছিল। "কিছু জিনিস শুধু আমাদের শেখানোর জন্য আসে।" সে নিজেকে প্রশ্ন করল—
সে কি সত্যিই ইনায়াকে হারিয়েছে?
নাকি সে হারিয়েছে সেই মানুষটাকে, যে ইনায়ার সঙ্গে থাকলে নিজেকে মনে করত? দুইটার মধ্যে পার্থক্যটা এতদিন সে ভাবেনি।
ঘড়িতে রাত ২টা।সিনথন বিছানা থেকে উঠে বসল।মোবাইল হাতে নিল। আবার সেই নাম। অরু। কিন্তু আজ প্রথমবার… চ্যাট খুলেও সে আগের মতো শান্তি পেল না। বরং একটা প্রশ্ন জেগে উঠল। যদি অরু সত্যিই তার জীবনের অতীত হয়ে থাকে.. তাহলে সে কেন প্রতিদিন নিজের বর্তমানকে তার জন্য থামিয়ে রাখছে?
এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে ছিল না।
কিন্তু সে বুঝতে পারল—
প্রশ্নটা এবার সত্যিই তার ভেতরে জন্ম নিয়েছে। আর কিছু প্রশ্নের জন্মই মানুষের পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
পরদিন সকালটা আগের দিনের মতোই ছিল। সূর্য উঠেছে। রাস্তা ব্যস্ত হয়েছে। মানুষ তাদের নিজ নিজ কাজে বেরিয়ে পড়েছে। পৃথিবীর কোথাও কিছু থেমে নেই। কিন্তু সিনথনের ভেতরে একটা ছোট পরিবর্তন শুরু হয়েছে। বাইরের কেউ সেটা বুঝতে পারবে না। কারণ মানুষের ভেতরের পরিবর্তনগুলো বেশিরভাগ সময় শব্দ করে আসে না। সেগুলো আসে নীরবে। একটা প্রশ্নের মাধ্যমে। একটা অস্বস্তির মাধ্যমে। একটা উপলব্ধির মাধ্যমে। সিনথন অনেকক্ষণ ঠিকানার কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছোট্ট একটি কাগজ। তাতে শুধু একটি ঠিকানা। কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছিল, কাগজটার ভেতরে যেন কোনো অজানা দরজা লুকিয়ে আছে। সে জানত না, দরজার ওপাশে কী আছে। তবুও তার ভেতরের একটা অংশ সেখানে যেতে চাইছিল। আরেকটা অংশ ভয় পাচ্ছিল।কারণ অনেক সময় মানুষ উত্তর খুঁজতে ভয় পায়। কারণ উত্তর পাওয়ার পর আর আগের মতো অজুহাত ধরে বেঁচে থাকা যায় না।
দুপুরের দিকে সে শহরের বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বাসে বসে জানালার পাশে তাকিয়ে ছিল। রাস্তার দুই পাশে মানুষ। কেউ জমিতে কাজ করছে। কেউ দোকানের সামনে বসে আছে। কেউ সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকের জীবনেই কোনো না কোনো গল্প আছে। এই কথাটা আগে সে জানত। কিন্তু অনুভব করত না। আজ যেন প্রথমবার মনে হলো—
প্রত্যেক মানুষই নিজের অদৃশ্য যুদ্ধ নিয়ে বেঁচে আছে। শুধু আমরা একে অপরের যুদ্ধ দেখতে পাই না।
প্রায় এক ঘণ্টা পর সে ঠিকানার সামনে পৌঁছাল। একটি পুরোনো বাড়ি। বাড়ির সামনে ছোট বাগান। কিছু ফুল গাছ। কিছু শুকিয়ে যাওয়া পাতা। দরজার পাশে একটি কাঠের চেয়ার। সেখানে একজন বৃদ্ধ মানুষ বসে আছেন। সাদা পাঞ্জাবি। চোখে মোটা চশমা। হাতে একটি পুরোনো বই। সিনথন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বৃদ্ধ মানুষটি বই থেকে চোখ তুলে তাকালেন। হালকা হাসলেন।
— "তুমি সিনথন?"
সিনথন অবাক হলো।
— "জি। আপনি কীভাবে জানলেন?"
বৃদ্ধ লোকটি বললেন,
— "যে মানুষকে কেউ নিজের কষ্টের কাছে পাঠায়, তার মুখ দেখেই বোঝা যায়।"
সিনথন কোনো উত্তর দিল না।
বৃদ্ধ লোকটির নাম ছিল মাহবুব সাহেব। রাশেদ তার কথা বলেছিল। কিন্তু সিনথন জানত না, কেন এই মানুষটির কাছে তাকে আসতে বলা হয়েছে। মাহবুব সাহেব তাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। ঘরটা খুব সাধারণ। কিন্তু একটা জিনিস সিনথনের চোখে পড়ল। ঘরের এক পাশে একটি ছোট টেবিল। টেবিলের ওপর দুইটি কাপ। একটি কাপ নতুন। অন্যটি পুরোনো। সিনথন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মাহবুব সাহেব সেটা লক্ষ্য করলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।
কিছুক্ষণ পর তিনি চা নিয়ে এলেন। দুটি কাপ। একটি নিজের সামনে রাখলেন। অন্যটি সিনথনের সামনে। সিনথন কাপ হাতে নিল। কিন্তু তার চোখ বারবার দ্বিতীয় কাপটার দিকে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
— "আপনি কি কারও অপেক্ষা করছেন?"
মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
— "হ্যাঁ।"
— "কিন্তু তিনি কি আসবেন?"
বৃদ্ধ মানুষটির চোখে এক মুহূর্তের জন্য গভীর শূন্যতা দেখা দিল।
তিনি শান্তভাবে বললেন,
— "না।"
সিনথন চুপ হয়ে গেল।
— "তাহলে?"
মাহবুব সাহেব কাপের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "এই প্রশ্নটাই তো আমি নিজেকে প্রতিদিন করি।"
ঘরটা নীরব হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর মাহবুব সাহেব বললেন,
— "আমার ছেলে চা খুব পছন্দ করত।"
সিনথন মন দিয়ে শুনছিল।
— "প্রতিদিন সকালে সে বলত, বাবা, চা বানানোর সময় চিনি কম দিও।"
বৃদ্ধ মানুষটি হালকা হাসলেন।
— "কিন্তু চা খাওয়ার সময় আবার বলত, আজ একটু মিষ্টি বেশি হলে ভালো হতো।"
হাসিটা কয়েক সেকেন্ড পর মিলিয়ে গেল।
— "মানুষ চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে কষ্টের বিষয় কী জানো?"
সিনথন চুপ।
— "তার বড় কোনো স্মৃতি নয়।"
তিনি দ্বিতীয় কাপটার দিকে তাকালেন।
— "তার ছোট ছোট অভ্যাসগুলো।"
সিনথনের বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। কারণ সে বুঝতে পারছিল—
এই মানুষটির কষ্ট আর তার কষ্ট এক নয়। কিন্তু কোথাও যেন একই। মাহবুব সাহেব বললেন, — "আমি জানি আমার ছেলে আর আসবে না।" একটু থেমে বললেন,
— "কিন্তু আমার হাত এখনও মাঝে মাঝে দুই কাপ চা বানিয়ে ফেলে।"
সিনথন কিছু বলতে পারল না। কারণ প্রথমবার সে নিজের কষ্টের বাইরে অন্য কারও কষ্টকে অনুভব করল। সেদিন সে বুঝল—
কিছু মানুষ অতীতকে ধরে রাখে ভালোবাসার কারণে। আর কিছু মানুষ ধরে রাখে, কারণ ছেড়ে দিলে মনে হয় নিজের একটা অংশও হারিয়ে যাবে।
বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় সিনথনের হাতে সেই ঠিকানার কাগজটা ছিল। কিন্তু এবার তার সঙ্গে আরেকটা জিনিস যোগ হয়েছে। একটি প্রশ্ন। যে প্রশ্নের উত্তর তাকে খুঁজতেই হবে। সে কি সত্যিই অরুকে ভালোবাসে? নাকি সে শুধু সেই সময়টাকে আঁকড়ে ধরে আছে, যখন অরু ছিল?
মানুষ নিজের মুখ দেখার জন্য আয়না ব্যবহার করে। কিন্তু জীবনের কিছু মানুষ আসে, যারা আমাদের এমন কিছু দেখিয়ে দেয়—যা কোনো আয়নাও দেখাতে পারে না। তারা আমাদের চেহারা দেখায় না। দেখায় আমাদের ভেতরটা। সিনথনের জন্য মাহবুব সাহেব তেমন একজন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।
সেদিনের পর কয়েকদিন সিনথন নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তন অনুভব করছিল। বাইরে থেকে কিছুই বদলায়নি। সে এখনও সকালে ঘুম থেকে ওঠে। চা খায়। ক্লাসে যায়। রাতে জানালার পাশে বসে থাকে। কিন্তু একটা জিনিস বদলেছে। আগে সে শুধু নিজের কষ্টের ভেতরে ডুবে থাকত। এখন মাঝে মাঝে তার মনে হয়—
পৃথিবীতে আরও অনেক মানুষ আছে, যারা হাসছে, কথা বলছে, স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছে… কিন্তু তাদের ভেতরেও হয়তো এমন কিছু গল্প আছে, যা কেউ জানে না।
মাহবুব সাহেবের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সিনথন আবারও তার কাছে গিয়েছিল। কোনো বিশেষ কারণে নয়। শুধু কথা বলার জন্য। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যে মানুষটাকে সে কয়েকদিন আগেও চিনত না, তার কাছে নিজের অনেক কথা বলতে সহজ লাগছিল। হয়তো কারণ—
অপরিচিত মানুষদের কাছে আমরা অনেক সময় এমন সত্য বলতে পারি, যা পরিচিতদের কাছে বলা যায় না। কারণ তারা আমাদের পুরোনো পরিচয় দিয়ে বিচার করে না।
একদিন বিকেলে মাহবুব সাহেব বললেন, — "তুমি কি কখনো ভেবেছ, মানুষ কেন একই জায়গায় বারবার ফিরে যায়?" সিনথন বলল,
— "অভ্যাসের জন্য?"
বৃদ্ধ মানুষটি হাসলেন।
— "অভ্যাস তো একটা কারণ। কিন্তু আসল কারণ অন্য।"
— "কী?"
— "কারণ সেই জায়গার সঙ্গে আমাদের একটা পুরোনো পরিচয় জড়িয়ে থাকে।"
সিনথন চুপ করে রইল। মাহবুব সাহেব বললেন, — "তুমি যদি কোনো বাড়িতে দশ বছর থাকো, বাড়িটা শুধু ইট-পাথর থাকে না। সেখানে তোমার একটা অংশ থেকে যায়।"
একটু থেমে তিনি বললেন,
— "মানুষের ক্ষেত্রেও তাই।"
কথাটা শুনে সিনথনের মনে অরুর কথা এলো।
অরু। এই নামটা এখনও তার জীবনের সবচেয়ে নীরব শব্দ। আগে নামটা শুনলেই তার মুখে হাসি আসত। এখন একই নাম শুনলে বুকের ভেতর একটা চাপ অনুভব হয়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো—
দুটো অনুভূতিই একই মানুষের জন্য।
সেই রাতেই সিনথন অনেক দিন পর অরুর ছবি খুলল। সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু এবার আগের মতো নয়। আগে সে ভাবত— "যদি সবকিছু আবার আগের মতো হতো?" আজ প্রথমবার তার মনে হলো— "সবকিছু কি সত্যিই আগের মতো হওয়া সম্ভব?" প্রশ্নটা খুব সাধারণ। কিন্তু এই প্রশ্নের ভেতরেই তার দীর্ঘদিনের আটকে থাকা জীবনের প্রথম ফাটল তৈরি হলো।
কয়েকদিন পর রাশেদ আবার ফোন করল।
— "সিনথন, কেমন আছ?"
— "ভালো।"
রাশেদ হেসে বলল,
— "তুমি এখনও এই উত্তরটা খুব সহজে দাও।"
সিনথন অবাক।
— "মানে?"
— "মানুষ যখন সত্যিই ভালো থাকে, তখন তাকে বারবার বলতে হয় না।"
সিনথন কিছু বলল না।
রাশেদ বলল,
— "তোমার সঙ্গে আরেকজনের দেখা করাতে চাই।"
— "কে?"
— "একজন ব্যবসায়ী।"
সিনথন একটু অবাক হলো।
— "ব্যবসায়ী?"
— "হ্যাঁ। কিন্তু তার গল্প ব্যবসার না।"
দুই দিন পর সিনথন শহরের পুরোনো অংশে গেল। সেখানে একটা ছোট রাস্তা। রাস্তার শেষে একটি পুরোনো দোকান। দোকানের সাইনবোর্ডের অর্ধেক ভেঙে গেছে।ধুলো জমেছে। কিন্তু নামটা এখনও পড়া যায়। "কাদের বুক হাউস" দোকানের সামনে একজন মানুষ বসে আছেন। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। হাতে একটি কাপড়। তিনি ধীরে ধীরে দোকানের পুরোনো তাক পরিষ্কার করছেন। যদিও দোকানের ভেতরে আর কোনো বই নেই।
সিনথন কাছে যেতেই লোকটি তাকালেন।
— "তুমি সিনথন?"
সিনথন অবাক হলো।
আবারও একই ব্যাপার।
দ্বিতীয়বার কোনো অপরিচিত মানুষ তার নাম জানে।
— "জি।"
লোকটি মৃদু হাসলেন।
— "আমি কাদের।"
তারপর দোকানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "এটাই আমার সব ছিল।"
সিনথন দোকানের ভেতরে তাকাল। খালি তাক। ধুলো। পুরোনো কাঠের গন্ধ। কিন্তু কাদের সাহেবের চোখে মনে হচ্ছিল, তিনি এখনও একটি জীবন্ত দোকান দেখছেন। তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
— "জানো, মানুষ ভাবে জিনিস হারালে কষ্ট হয়।"
একটু থেমে বললেন,
— "আসলে কষ্ট হয়, যখন সেই জিনিসের সঙ্গে নিজের একটা পরিচয়ও হারিয়ে যায়।"
সিনথন কিছু বলল না। কারণ সে বুঝতে পারছিল— এই মানুষটির গল্পও হয়তো তার নিজের গল্পের মতো। শুধু হারানোর জায়গাটা আলাদা। একজন হারিয়েছে একজন মানুষকে। একজন হারিয়েছে একটি জীবনকে। কিন্তু দুজনের মনই এখনও অতীতের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কাদের সাহেব কিছুক্ষণ দোকানের সামনে বসে রইলেন। তার হাতে থাকা কাপড়টা তখনও তার আঙুলের মধ্যে। তিনি মাঝে মাঝে তাকের ধুলো মুছছেন, আবার থেমে যাচ্ছেন। সিনথনের কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগছিল। কারণ দোকানটা দেখে মনে হচ্ছিল, এখানে আর কিছু নেই। কিন্তু কাদের সাহেবের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি এখনও প্রতিদিন একজন ক্রেতার অপেক্ষায় আছেন।
সিনথন জিজ্ঞেস করল,
— "আপনি কি আবার দোকান খুলবেন?"
কাদের সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর মৃদু হাসলেন।
— "এই প্রশ্নটা সবাই করে।"
— "আপনার উত্তর কী?"
তিনি দোকানের ভেতরের দিকে তাকালেন।
— "জানি না।"
সিনথন অবাক হলো।
— "আপনি জানেন না?"
কাদের সাহেব বললেন,
— "আগে হলে বলতাম, অবশ্যই খুলব। আবার শুরু করব।"
একটু থেমে বললেন,
— "কিন্তু এখন বুঝি, সবকিছু আবার শুরু করা যায় না।"
কাদের সাহেব ধীরে ধীরে গল্প শুরু করলেন। ২৮ বছর আগে তিনি এই দোকান শুরু করেছিলেন। তখন দোকানটা খুব ছোট ছিল। একটা কাঠের তাক। কয়েকটা পুরোনো বই। আর তার নিজের স্বপ্ন। প্রথম দিকে দিনে খুব বেশি বিক্রি হতো না। অনেক দিন এমন গেছে, যখন সারাদিন দোকানে বসে থেকেও একটা বই বিক্রি হয়নি। তবুও তিনি রাতে বাড়ি ফিরতেন হাসিমুখে। কারণ তার মনে হতো— আজ না হোক, কাল হবে।
জানো সিনথন, কাদের সাহেব বললেন, "মানুষ যখন কোনো কিছু শূন্য থেকে তৈরি করে, তখন সেটা শুধু একটা জিনিস থাকে না। তিনি দোকানের দেয়ালে হাত রাখলেন। এখানে আমার ঘাম আছে। আমার যৌবন আছে। আমার অনেক রাত জেগে থাকা আছে। আমার পরিবারের হাসি আছে। তার গলা একটু ভারী হয়ে এলো। এই দোকানটা শুধু আমার রোজগারের জায়গা ছিল না। এটা ছিল আমার পরিচয়।"
এক রাতে বৈদ্যুতিক সমস্যার কারণে আগুন লেগেছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সব শেষ। হাজার হাজার বই। বছরের পর বছর জমিয়ে রাখা স্মৃতি। সবকিছু। মানুষ এসে বলেছিল, "আবার শুরু করুন কাদের ভাই। আপনার তো অভিজ্ঞতা আছে। আবার দাঁড়িয়ে যাবেন।" কাদের সাহেব সবার কথা শুনেছেন। মাথা নেড়েছেন। কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি—
কিছু জিনিস হারালে শুধু জিনিস হারায় না।সঙ্গে একটা পুরোনো মানুষও হারিয়ে যায়।
সিনথন ধীরে বলল,
— "তাহলে আপনি প্রতিদিন এখানে আসেন কেন?"
কাদের সাহেব হাসলেন।
কিন্তু সেই হাসির মধ্যে আনন্দ ছিল না।
— "আমি নিজেও জানি না।"
তারপর বললেন,
— "শরীর অনেক সময় মনের আগেই অভ্যাস শিখে ফেলে।"
তিনি রাস্তার দিকে তাকালেন।
— "আগে সকাল আটটায় দোকান খুলতাম।"
"এখনও সকাল আটটার দিকে আমার পা আমাকে এখানে নিয়ে আসে।"
সিনথনের হঠাৎ অরুর কথা মনে পড়ল। সে বুঝতে পারল, তার আর কাদের সাহেবের মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল আছে। কাদের সাহেব প্রতিদিন একটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়ান। আর সিনথন প্রতিদিন একটি নামের সামনে এসে দাঁড়ায়। দুজনেই জানে— ফিরে যাওয়ার রাস্তা নেই। তবুও মন বারবার একই জায়গায় ফিরে যায়।
কাদের সাহেব হঠাৎ বললেন,
— "তোমার গল্পটা কী?"
প্রশ্নটা শুনে সিনথন চুপ করে গেল।
এতদিন সবাই তাকে প্রশ্ন করেছে—
"কী হয়েছে?"
কিন্তু খুব কম মানুষ জিজ্ঞেস করেছে—
"তোমার গল্পটা কী?"
সে ধীরে বলল,
— "একজন মানুষ ছিল।"
কাদের সাহেব কিছু বললেন না।
শুধু শুনতে থাকলেন।
— "যে আমার জীবনের অনেকটা জায়গা দখল করে ছিল।"
একটু থেমে বলল,
— "এখন সে নেই।"
কাদের সাহেব শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন,
— "চলে গেছে?"
সিনথন মাথা নাড়ল।
— "হ্যাঁ।"
— "মারা গেছে?"
সিনথন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— "না।"
কাদের সাহেব বুঝলেন। আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। কারণ কিছু হারানোর ব্যাখ্যা শব্দে দেওয়া যায় না।
সেদিন সন্ধ্যায় সিনথন বাড়ি ফেরার সময় একটা বিষয় বুঝতে পারল। এতদিন সে ভাবত— তার কষ্টের কারণ শুধু অরু। কিন্তু আজ প্রথমবার মনে হলো— হয়তো অরু নয়।
হয়তো সমস্যা হলো, সে এখনও সেই সময়টার মধ্যে বেঁচে আছে, যখন অরু তার জীবনের অংশ ছিল।
রাতে ঘুমানোর আগে সে আবার ফোন হাতে নিল। অরুর চ্যাট খুলল।আগের মতো দীর্ঘ সময় তাকিয়ে রইল না। শুধু কয়েক সেকেন্ড। তারপর ফোনটা রেখে দিল। এটা কোনো বড় পরিবর্তন ছিল না। কেউ দেখলে বুঝতও না। কিন্তু মানুষের ভেতরের বড় পরিবর্তনগুলো অনেক সময় এমন ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়।
সিনথন এখন তিনজন মানুষকে চেনে। নিজেকে। মাহবুব সাহেবকে। আর কাদের সাহেবকে। তাদের গল্প আলাদা। কিন্তু প্রশ্ন একই। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তার যাত্রা এখনো বাকি। কারণ হারিয়ে যাওয়া জিনিসকে ছেড়ে দেওয়া আর তাকে ভুলে যাওয়া—এক জিনিস নয়।
মানুষের জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সে হঠাৎ বুঝতে পারে— সে এতদিন যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল, আসলে সেই প্রশ্নটাই ঠিকভাবে বুঝতে পারেনি। সিনথনের ক্ষেত্রেও তেমনই হচ্ছিল। সে ভেবেছিল, তার সমস্যা হলো অরুকে হারানো। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে তার মনে হচ্ছে— সমস্যা হয়তো অরু নয়। সমস্যা হলো, অরু চলে যাওয়ার পরেও তার ভেতরের একটা অংশ এখনও সেই পুরোনো সময়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
কাদের সাহেবের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কয়েকদিন সিনথন খুব বেশি কথা বলেনি। সে শুধু দেখছিল। নিজেকে দেখছিল। মাহবুব সাহেবকে দেখছিল। কাদের সাহেবকে দেখছিল। আর আশ্চর্যভাবে, তিনটি আলাদা জীবনের মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল খুঁজে পাচ্ছিল। মাহবুব সাহেব প্রতিদিন দুই কাপ চা বানান। যদিও দ্বিতীয় কাপের মানুষটি আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কাদের সাহেব প্রতিদিন দোকানের সামনে দাঁড়ান। যদিও সেই দোকান আর আগের মতো কখনো খুলবে না। আর সিনথন প্রতিদিন অরুর নামের দিকে তাকায়। যদিও সে জানে, সেই নামের পাশে আর কোনো নতুন বার্তা আসবে না।
এক বিকেলে সিনথন মাহবুব সাহেবের বাড়িতে বসে ছিল। বৃদ্ধ মানুষটি চা বানাচ্ছিলেন। সিনথন এবার খেয়াল করল— মাহবুব সাহেব সত্যিই দুই কাপ চা বানাচ্ছেন। একটি তার জন্য। আরেকটি নিজের জন্য। না। দ্বিতীয় কাপটি তার নিজের জন্য নয়। সেটি রাখা হয় টেবিলের অন্য পাশে। যেখানে কেউ বসে না।
সিনথন ধীরে বলল,
— "আপনি কি কখনো চেষ্টা করেছেন এই অভ্যাসটা বন্ধ করতে?"
মাহবুব সাহেব চা ঢালতে ঢালতে থেমে গেলেন।
— "কোনটা?"
— "দুই কাপ চা বানানো।"
বৃদ্ধ মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— "অনেকবার।"
— "তারপর?"
— "পারিনি।"
— "কেন?"
মাহবুব সাহেব জানালার বাইরে তাকালেন।
— "কারণ আমার মাথা জানে, সে নেই।"
একটু থেমে বললেন,
— "কিন্তু আমার হাত এখনও সেটা মানতে শেখেনি।"
কথাটা সিনথনের মনে গভীরভাবে গিয়ে লাগল। কারণ এই একটা বাক্যের মধ্যে যেন তার নিজের গল্পও লুকিয়ে ছিল।
তার মাথা জানে— অরু আর তার জীবনে নেই।
তার মাথা জানে— অরু এখন অন্য একটি জীবনের অংশ।
তার মাথা জানে— অপেক্ষা করার কোনো অর্থ নেই।
কিন্তু তার হাত?
তার অভ্যাস?
তার স্মৃতি?
তারা এখনও সেই পুরোনো জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে।
সেদিন রাতে সিনথন নিজের ঘরে বসে একটা পুরোনো ডায়েরি খুলল। অনেক দিন পর। শেষ কয়েক পৃষ্ঠায় অরুর লেখা কিছু কথা ছিল। খুব সাধারণ কথা। কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নয়। কোনো নাটকীয় বাক্য নয়। এক জায়গায় লেখা ছিল— "মানুষকে ভালোবাসা মানে তাকে নিজের করে পাওয়া নয়।"
সিনথন আগে এই লাইনটা পড়ে কষ্ট পেয়েছিল। আজ পড়ে থেমে গেল। সে ভাবল— তাহলে কি সত্যিই ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়?
পরদিন কাদের সাহেবের দোকানে গেল সে। দেখল, কাদের সাহেব আগের মতোই বসে আছেন। কিন্তু আজ একটা পার্থক্য আছে। তিনি পুরোনো বইগুলো পরিষ্কার করছেন। সিনথন অবাক হয়ে বলল,
— "দোকানে তো বই নেই।"
কাদের সাহেব হেসে বললেন,
— "জানি।"
— "তাহলে?"
— "কিছু কাজ আমরা ফলাফলের জন্য করি না।"
তিনি ধুলো মুছতে মুছতে বললেন,
— "কখনো কখনো করি, কারণ কাজটার সঙ্গে আমাদের একটা সম্পর্ক থাকে।"
সিনথন বলল, — "আপনি কি আবার দোকান খুলতে চান?"
কাদের সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— "আগে চাইতাম।"
— "এখন?"
তিনি রাস্তার দিকে তাকালেন।
— "এখন মনে হয়, আমি দোকানটা ফিরে পেতে চাই না।"
সিনথন অবাক।
— "তাহলে?"
কাদের সাহেব ধীরে বললেন,
— "আমি শুধু সেই মানুষটাকে খুঁজছিলাম, যে এই দোকানটা তৈরি করেছিল।"
সিনথন কিছু বলতে পারল না। কারণ এই কথাটা যেন তার নিজের জন্যও বলা। সে কি সত্যিই অরুকে ফিরে পেতে চায়?
নাকি সে সেই পুরোনো সিনথনকে ফিরে পেতে চায়— যে হাসত। যে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখত। যে কোনো কিছুকে হারানোর ভয় পেত না।
সন্ধ্যায় ফেরার পথে তার মনে হলো— জীবনে কিছু মানুষ আসে আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য। আর কিছু মানুষ আসে আমাদের নিজেদের সম্পর্কে শেখানোর জন্য। অরু হয়তো তার জীবনে থাকার জন্য আসেনি। হয়তো এসেছিল তাকে একটা সত্য শেখানোর জন্য। কিন্তু সেই সত্য গ্রহণ করার ক্ষমতা তার এখনও তৈরি হয়নি।
সেদিন রাতে অনেক দিন পর সিনথন অরুর ছবি খুলে কাঁদল না। শুধু কিছুক্ষণ দেখল। তারপর খুব ধীরে বলল, "ভালো থেকো।" এই দুইটি শব্দ বলতে তার অনেক সময় লেগেছিল। কারণ কখনো কখনো কাউকে মুক্তি দেওয়ার আগে— নিজেকেই মুক্তি দিতে হয়।
সিনথন ভেবেছিল, কাউকে ছেড়ে দেওয়া মানে হয়তো একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আর তার কথা মনে না পড়া। কিন্তু সে ভুল ছিল। মানুষকে ছেড়ে দেওয়া কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এটা ধীরে ধীরে ঘটে। যেমন অন্ধকার ঘরে হঠাৎ আলো জ্বালালে চোখ কিছুক্ষণ কিছু দেখতে পায় না। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু পরিষ্কার হয়। মনও ঠিক তেমন। একটা সত্যকে গ্রহণ করার জন্য সময় লাগে। এরপর থেকে সিনথনের একটা নতুন অভ্যাস হলো। সে প্রতিদিন নিজের কাছে একটা প্রশ্ন করত। "আজ আমি কি গতকালের চেয়ে একটু বেশি বর্তমানের মধ্যে ছিলাম?"
প্রশ্নটা খুব ছোট।
কিন্তু উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ নিজের সঙ্গে মিথ্যা বলা সবচেয়ে সহজ।
একদিন বিকেলে রাশেদ আবার তাকে ফোন করল।
— "কেমন আছ?"
সিনথন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— "আগের চেয়ে একটু ভালো।"
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রাশেদ বলল,
— "এই প্রথম তোমার উত্তরটা সত্যি মনে হলো।"
সিনথন হালকা হাসল।
— "আপনি সব বুঝে যান কীভাবে?"
রাশেদ বলল,
— "কারণ আমিও একসময় তোমার মতো ছিলাম।"
সিনথন অবাক হলো।
— "আপনি?"
— "হ্যাঁ।"
— "আপনার গল্প কী?"
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— "একদিন বলব।"
সেদিন রাতে সিনথন বুঝতে পারল—
যে মানুষ অন্যের কষ্ট বোঝে, তার নিজের জীবনেও হয়তো কোনো না কোনো অদৃশ্য ক্ষত থাকে। হয়তো সে কারণেই রাশেদ তাকে বুঝতে পারছে। কারণ কিছু অনুভূতি বই পড়ে শেখা যায় না। সেগুলো শুধু বেঁচে থেকে শেখা যায়।
কয়েকদিন পর সিনথন আবার কাদের সাহেবের দোকানে গেল। আজ দোকানের সামনে একটা ছোট পরিবর্তন। একটি নতুন কাঠের তাক রাখা হয়েছে। সিনথন অবাক হয়ে বলল,
— "এটা কী?"
কাদের সাহেব হাসলেন।
— "নতুন শুরু।"
সিনথন তাকিয়ে রইল।
— "আপনি কি আবার দোকান খুলছেন?"
কাদের সাহেব মাথা নাড়লেন।
— "না।"
তারপর বললেন,
— "আমি শুধু বুঝেছি, পুরোনো জায়গাকে সম্মান করা আর পুরোনো জায়গায় আটকে থাকা এক জিনিস নয়।"
তিনি তাকের ওপর কয়েকটি বই রাখলেন। মাত্র কয়েকটি বই। কিন্তু তার চোখে একটা শান্তি ছিল। সিনথন বলল, — "আপনি তো বলেছিলেন আগের মতো আর হবে না।"
কাদের সাহেব বললেন,
— "হবে না।"
একটু থেমে বললেন,
— "আগের মতো হওয়ার দরকারও নেই।"
এই কথাটা সিনথনের মনে অনেকক্ষণ রয়ে গেল। কারণ সে এতদিন একটা ভুল করে এসেছে। সে চেয়েছিল সবকিছু আগের মতো হয়ে যাক। অরু ফিরে আসুক। পুরোনো দিন ফিরে আসুক। পুরোনো নিজের মানুষটা ফিরে আসুক। কিন্তু জীবন কখনো পিছনের দিকে হাঁটে না। জীবন শুধু সামনে যাওয়ার সুযোগ দেয়। সেদিন সন্ধ্যায় সে মাহবুব সাহেবের কাছে গেল। বৃদ্ধ মানুষটি বারান্দায় বসেছিলেন।
সিনথন বলল,
— "আপনার সঙ্গে একটা কথা বলব?"
— "বলো।"
— "আপনি কি মনে করেন, কাউকে ভুলে যাওয়া দরকার?"
মাহবুব সাহেব মৃদু হাসলেন।
— "না।"
সিনথন অবাক।
— "না?"
— "মানুষকে ভুলে যেতে হয় না।"
তিনি বললেন,
— "মানুষকে তার সঠিক জায়গায় রাখতে হয়।"
সিনথন চুপ করে শুনছিল। মাহবুব সাহেব বললেন,
— "যে মানুষ চলে গেছে, তাকে যদি আমরা প্রতিদিনের জীবনের মাঝখানে বসিয়ে রাখি, তাহলে সে আমাদের বাঁচতে দেয় না।"
"কিন্তু তাকে যদি স্মৃতির জায়গায় রাখি, তাহলে সে আমাদের ভালো কিছু শিখিয়ে যেতে পারে।"
সিনথনের চোখ ভিজে উঠল। কারণ সে প্রথমবার বুঝল—
অরুকে ভুলে যাওয়া তার লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত, অরুর স্মৃতির সঙ্গে শান্তিতে বাঁচতে শেখা।
সেই রাতে সে অনেক দিন পর একটা কাজ করল। সে অরুর চ্যাট খুলল। অনেক পুরোনো ছবি ছিল। অনেক কথা ছিল। সে কিছুই মুছল না। কারণ মুছে ফেলাই সবসময় মুক্তি নয়। কখনো কখনো গ্রহণ করাটাই মুক্তি। সে শুধু ফোনটা বন্ধ করে রাখল। আর প্রথমবারের মতো মনে হলো— আজ সে অপেক্ষা করছে না। সে শুধু বেঁচে আছে।
কিন্তু সে জানত না… তার নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনও বাকি। কারণ অতীতকে বুঝতে শুরু করা সহজ। কিন্তু যখন অতীত হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায়… তখন সত্যিই বোঝা যায়, মানুষ কতটা বদলেছে।
মানুষ যখন নিজের ভেতরের সঙ্গে যুদ্ধ করে, তখন সে ভাবে—সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটা হয়তো অতীতে ছিল। কিন্তু সে জানে না, আসল পরীক্ষা আসে তখনই… যখন অতীত হঠাৎ বর্তমানের দরজায় এসে দাঁড়ায়। সিনথনের জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছিল। সে এখনও অরুকে মনে করে। কখনো কোনো গান শুনলে। কখনো কোনো পরিচিত রাস্তা দেখলে। কখনো কোনো বিকেলের আলোয়। কিন্তু পার্থক্যটা হলো—
আগে স্মৃতি তাকে টেনে নিয়ে যেত অতীতে। এখন সে স্মৃতির পাশে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে থাকতে পারে।
সে আর প্রতিবার হারিয়ে যায় না।
এক সকালে কলেজ থেকে ফেরার পথে হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কলটি ধরল। ওপাশ থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ।
একটি কণ্ঠ, যেটা শুনতে সে একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত।
— "সিনথন?"
তার হাত কেঁপে উঠল। কিছুক্ষণ সে কোনো শব্দ করতে পারল না। কারণ কিছু মানুষকে আমরা যতই ভুলে থাকার চেষ্টা করি না কেন… তাদের কণ্ঠ আমাদের স্মৃতির সবচেয়ে গভীর জায়গায় থেকে যায়।
— "হ্যাঁ..."
খুব ধীরে উত্তর দিল সে। ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর—
— "কেমন আছ?"
দুটি সাধারণ শব্দ। কিন্তু এই দুটি শব্দের ভেতরে সিনথনের কাছে যেন কয়েক বছরের পুরোনো দরজা খুলে গেল।
অরু।।ইনায়া আরু। যাকে সে নিজের মনে এখনও অরু নামেই ডাকত।যে মানুষটি একসময় তার প্রতিদিনের গল্প ছিল। এখন অন্য একটি জীবনের অংশ। অন্য একটি পরিবারের মানুষ। অন্য কারও পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষ।
সিনথন জানত, এই মুহূর্তটা একদিন আসতে পারে। কিন্তু সে কখনো ভাবেনি, সেই মুহূর্তে তার ভেতরে কী হবে। সে ভেবেছিল— হয়তো সে ভেঙে পড়বে।
হয়তো পুরোনো কষ্ট আবার ফিরে আসবে। কিন্তু আশ্চর্যভাবে… তার ভেতরে শুধু একটা গভীর নীরবতা তৈরি হলো।
অরু বলল— "অনেক দিন পর কথা হচ্ছে।" সিনথন জানালার বাইরে তাকাল।
— "হ্যাঁ।"
— "তুমি কি আমার ওপর রাগ করো?"
প্রশ্নটা শুনে সিনথন থেমে গেল। এই প্রশ্নের উত্তর সে অনেক বছর ধরে খুঁজেছে।
সে কি রাগ করে?
নাকি কষ্ট পায়?
নাকি শুধু মেনে নিতে পারেনি?
সে ধীরে বলল— "আগে করতাম।" অরু চুপ।
— "এখন?"
সিনথন কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— "এখন মনে হয়, রাগ করার মতো কেউ নেই।"
ওপাশে নীরবতা। কারণ কিছু সত্য খুব শান্তভাবে বলা হয়। কিন্তু তার ওজন অনেক বেশি। সিনথন বুঝতে পারল—
সে আজ প্রথমবার অরুর সঙ্গে কথা বলছে, কিন্তু আগের সেই মানুষ হিসেবে নয়। আজ সে এমন একজন মানুষ, যে হারানোর কষ্ট বুঝতে শিখেছে।
অরু ধীরে বলল — "তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো?"
সিনথন চোখ বন্ধ করল। কতবার সে এই প্রশ্নের উত্তর কল্পনা করেছে। কিন্তু আজ উত্তরটা অন্যরকম।
— "না।"
— "কেন?"
সিনথন বলল,
— "কারণ তুমি আমার কাছ থেকে কিছু কেড়ে নাওনি।"
একটু থেমে বলল,
— "জীবন শুধু আমাদের সবার জন্য আলাদা আলাদা রাস্তা বেছে নিয়েছে।"
অরু আর কিছু বলল না। সিনথনও না। দুজনেই বুঝতে পারছিল— কখনো কখনো সম্পর্কের শেষ মানেই ঘৃণা নয়। কিছু সম্পর্ক শেষ হয় শুধু সময়ের কারণে।
কল শেষ হওয়ার পর সিনথন অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। আগে হলে সে হয়তো আবার সেই পুরোনো স্মৃতির মধ্যে ডুবে যেত। কিন্তু আজ সে নিজের ভেতরে অন্য কিছু অনুভব করল। এক ধরনের শান্তি। ব্যথা ছিল। কিন্তু সেই ব্যথার সঙ্গে আর যুদ্ধ ছিল না।
সেদিন সন্ধ্যায় সে কাদের সাহেবের দোকানে গেল। কাদের সাহেব তাকে দেখে বললেন — "আজ তোমাকে একটু অন্যরকম লাগছে।"
সিনথন হেসে বলল,
— "আজ অতীতের সঙ্গে দেখা হয়েছে।"
কাদের সাহেব কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
— "তাহলে?"
সিনথন বলল,
— "আগের মতো ভয় লাগেনি।"
কাদের সাহেব মৃদু হাসলেন।
— "তাহলে বুঝবে, তুমি বদলাতে শুরু করেছ।"
কিন্তু কাদের সাহেব জানতেন না… সিনথনের সামনে এখনও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অপেক্ষা করছে।কারণ অতীতের সঙ্গে কথা বলা এক জিনিস। আর তাকে সত্যিকার অর্থে বিদায় দেওয়া আরেক জিনিস।
অতীতের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর মানুষ সাধারণত দুই ধরনের অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। কেউ আবার আগের জায়গায় ফিরে যেতে চায়। আর কেউ বুঝতে পারে, সে আসলে এতদিন যে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই দরজাটা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সিনথন কোন দলে পড়ে, সেটা সে নিজেও জানত না। কিন্তু সে এটুকু বুঝতে পারছিল—
তার ভেতরের পুরোনো ঝড়টা আর আগের মতো নেই।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তার প্রথম কাজ ছিল ফোন দেখা। কিন্তু আজ একটা পার্থক্য ছিল। সে অরুর কোনো মেসেজের অপেক্ষা করছিল না। সে শুধু দেখল, পৃথিবী আগের মতোই চলছে। রাস্তায় মানুষ যাচ্ছে। পাখি ডাকছে। চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠছে। জীবন কারও জন্য থেমে থাকে না। এই সত্যটা সে আগে জানত। কিন্তু আজ প্রথমবার অনুভব করল।
সেদিন দুপুরে সে মাহবুব সাহেবের কাছে গেল। বৃদ্ধ মানুষটি বারান্দায় বসে ছিলেন।
সিনথন বসতেই তিনি বললেন— "আজ তোমার চোখে আগের মতো ভার নেই।" সিনথন মৃদু হাসল।
— "হয়তো একটু কমেছে।"
মাহবুব সাহেব মাথা নাড়লেন।
— "কষ্ট কমে না সবসময়।"
সিনথন তাকাল।
— "তাহলে?"
— "মানুষ শক্ত হয়।"
কিছুক্ষণ পর মাহবুব সাহেব বললেন,
— "জানো, আমি একটা সময় ভাবতাম, আমার ছেলে চলে যাওয়ার পর আমার জীবন শেষ।" সিনথন মন দিয়ে শুনছিল।
— "আমি ভাবতাম, যদি আমি হাসি, তাহলে হয়তো আমি তাকে ভুলে যাচ্ছি।"
তার চোখ কিছুটা ভিজে উঠল।
— "পরে বুঝলাম, তাকে ভালোবাসার মানে নিজের জীবন থামিয়ে দেওয়া নয়।"
সিনথন ধীরে বলল — "কিন্তু অপরাধবোধ হয় না?"
মাহবুব সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন।
— "হয়।"
"অনেক হয়।"
"মনে হয়, আমি ভালো আছি মানে কি তাকে কম ভালোবাসছি?"
একটু থেমে বললেন,
— "কিন্তু ভালোবাসা আর কষ্ট এক জিনিস নয়, সিনথন।"
এই কথাটা সিনথনের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল। কারণ সে এতদিন একটা ভুল ধারণা নিয়ে বেঁচে ছিল। সে ভাবত— যত বেশি কষ্ট পাবে, তত বেশি প্রমাণ হবে যে সে অরুকে ভালোবাসে। কিন্তু হয়তো সত্যটা উল্টো। হয়তো কাউকে সত্যি ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো— তার স্মৃতি নিয়ে শান্তিতে বাঁচতে পারা।
সন্ধ্যায় কাদের সাহেবের দোকানে গেল সে। আজ দোকানের সামনে ছোট কয়েকজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। কাদের সাহেব তাদের কিছু বই দেখাচ্ছেন। সিনথন অবাক হলো। কারণ কয়েকদিন আগেও এই মানুষটি শুধু পোড়া দোকানের সামনে বসে থাকতেন। আজ তিনি আবার মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন।
সিনথন বলল — "আপনি আবার শুরু করলেন?"
কাদের সাহেব হেসে বললেন,
— "না।"
— "তাহলে?"
তিনি বইগুলো সাজাতে সাজাতে বললেন,
— "আমি নতুন কিছু শুরু করেছি।"
— "কী?"
— "পুরোনো স্বপ্নকে নতুন রূপ দিয়েছি।"
কাদের সাহেব বুঝিয়ে বললেন— তিনি আগের মতো বড় দোকান করতে পারবেন না। হয়তো পারবেনও না। কিন্তু তিনি এখন সপ্তাহে কয়েকদিন এলাকার ছোট বাচ্চাদের বই পড়তে দেন। যাদের বই কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের বই দেন।
তিনি বললেন — "আগে আমি বই বিক্রি করতাম।"
"এখন বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করি।"
সিনথন অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। তার মনে হলো— মানুষ আসলে হারানো জিনিস ফিরিয়ে আনে না। মানুষ হারানো জিনিসের অর্থ বদলে দেয়। কাদের সাহেব দোকান ফিরে পাননি। কিন্তু বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা হারাননি। মাহবুব সাহেব ছেলেকে ফিরে পাননি। কিন্তু তার ভালোবাসা হারাননি। তাহলে সিনথন কি অরুকে না পেয়েও নিজের ভালোবাসাকে সম্মান করতে পারে না?
সেদিন রাতে সে ডায়েরি খুলল। অনেক দিন পর লিখল। মাত্র কয়েকটি লাইন।
"কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে থাকার জন্য নয়। তারা আসে আমাদের ভেতরের কিছু দরজা খুলে দেওয়ার জন্য। তাদের হারানো মানে সব শেষ নয়। কখনো কখনো তাদের শেখানো জিনিস নিয়ে নতুনভাবে বাঁচা শুরু করা।"
ডায়েরি বন্ধ করার পর সিনথন জানালার পাশে দাঁড়াল। আকাশে চাঁদ উঠেছে। একসময় এই দৃশ্য দেখলে সে অরুকে মনে করত। আজও মনে পড়ল। কিন্তু আজ সেই স্মৃতির সঙ্গে কষ্টের চেয়ে কৃতজ্ঞতা বেশি ছিল।
তবে জীবন তখনও তার জন্য শেষ পরীক্ষা রেখে দিয়েছিল। কারণ মানুষ যখন ভাবে সে অতীতকে গ্রহণ করে ফেলেছে… তখনই কখনো কখনো জীবন তাকে আবার পরীক্ষা করে। আর সেই পরীক্ষার নাম— বিদায়।
বিদায় শব্দটা শুনতে খুব ছোট। মাত্র দুটি অক্ষর। কিন্তু একজন মানুষের জীবনে কখনো কখনো এই ছোট শব্দটিই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। কারণ বিদায় মানে শুধু কাউকে ছেড়ে যাওয়া নয়। কখনো কখনো বিদায় মানে নিজের পুরোনো একটা সংস্করণকে ছেড়ে আসা। সিনথন তখনও বুঝতে পারেনি, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদায় সামনে অপেক্ষা করছে।
কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। সিনথনের জীবন আগের মতোই চলছিল। ক্লাস। বই। চায়ের দোকান। মাহবুব সাহেবের সঙ্গে কথা। কাদের সাহেবের দোকানে যাওয়া। সবকিছু একই। কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা আর আগের মতো ছিল না। আগে সে প্রতিটি মুহূর্তে খুঁজত—কী হারিয়েছে।
এখন সে মাঝে মাঝে ভাবত—কী শিখেছে।
এই পরিবর্তন খুব বড় কিছু ছিল না। কিন্তু মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন সবসময় বড় ঘটনা দিয়ে আসে না। কখনো কখনো আসে একটি ছোট উপলব্ধি দিয়ে।
একদিন বিকেলে অরুর কাছ থেকে আবার ফোন এলো। সিনথন কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। আগের মতো বুক ধড়ফড় করল না। তবুও একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। সে কল ধরল।
— "হ্যালো।"
ওপাশে অরুর কণ্ঠ।
— "কেমন আছ?"
— "ভালো আছি। তুমি?"
— "ভালো।"
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। আগে এই নীরবতা তাদের কাছে অস্বস্তিকর ছিল। আজ এই নীরবতাই যেন অনেক কিছু বলে দিচ্ছিল।
অরু ধীরে বলল,
— "আমি তোমার কাছে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।"
সিনথন চুপ করে শুনছিল।
— "তুমি কি কখনো ভেবেছ, আমাদের জীবনটা অন্যরকম হতে পারত?"
প্রশ্নটা শুনে সিনথন কিছুক্ষণ নীরব রইল। এই প্রশ্নটা সে নিজেও বহুবার করেছে। যদি সেদিন অন্য সিদ্ধান্ত হতো?
যদি পরিস্থিতি অন্যরকম হতো?
যদি সময় তাদের পক্ষে থাকত?
কিন্তু এখন সে জানে— "যদি" শব্দটা মানুষের সবচেয়ে সুন্দর এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক কল্পনা। কারণ এর কোনো শেষ নেই।
সিনথন বলল — "হয়তো পারত।" অরু চুপ। তারপর সে বলল, — "তাহলে?" সিনথন জানালার বাইরে তাকাল। রাস্তার মানুষগুলো নিজেদের জীবনে ব্যস্ত। সে ধীরে বলল — "কিন্তু হয়নি।"
একটু থেমে বলল,
— "আর এখন যেটা হয়নি, সেটাকে সারাজীবন ধরে বাঁচানোর চেষ্টা করলে যেটা আছে সেটাও হারিয়ে ফেলব।"
ওপাশে অরুর নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সে বলল
— "তুমি অনেক বদলে গেছ।"
সিনথন হালকা হাসল।
— "হয়তো।"
— "আগে তুমি আমাকে ছেড়ে দিতে চাইতে না।"
সিনথন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— "আগে আমি ভাবতাম, ছেড়ে দেওয়া মানে ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়া।"
"এখন বুঝি..."
"কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়াই ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন রূপ।"
কল শেষ হওয়ার পর সিনথন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার চোখে পানি এসেছিল। কিন্তু এই কান্না আগের মতো ছিল না। আগে কান্নার মধ্যে ছিল হারানোর যন্ত্রণা। আজকের কান্নার মধ্যে ছিল গ্রহণ করার শান্তি।
সন্ধ্যায় সে কাদের সাহেবের দোকানে গেল। কাদের সাহেব তাকে দেখে বললেন, — "আজ তোমার মুখে শান্তি দেখছি।"
সিনথন বলল,
— "আজ একটা পুরোনো দরজা বন্ধ করেছি।" কাদের সাহেব কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
— "দরজা বন্ধ করেছ?"
"নাকি শুধু বুঝেছ, ওই দরজার ওপাশে আর তোমার যাওয়ার জায়গা নেই?"
সিনথন কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল — "হয়তো দ্বিতীয়টা।"
কাদের সাহেব হাসলেন।
— "তাহলে তুমি বুঝতে শুরু করেছ।"
সেদিন রাতে সিনথন অনেক দিন পর অরুর জন্য প্রার্থনা করল। তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য নয়। তার জীবন ভালো থাকার জন্য। কারণ ভালোবাসার সবচেয়ে পরিণত রূপ হয়তো এটাই—
যেখানে নিজের না পাওয়ার কষ্টের মাঝেও অন্য একজনের ভালো থাকা কামনা করা যায়। কিন্তু সিনথন জানত না… এই যাত্রার শেষ এখনও আসেনি। কারণ নিজের অতীতকে গ্রহণ করা এক বিষয়।৷ আর নিজের ভবিষ্যৎকে নতুন করে তৈরি করা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। এবার তাকে শিখতে হবে— শুধু হারানো জিনিসের সঙ্গে শান্তি করা নয়, বরং নিজের সঙ্গে আবার পরিচিত হওয়া।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটা বাইরের কারও সঙ্গে নয়।সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটা নিজের সঙ্গে। কারণ বাইরের মানুষকে বোঝানো সহজ। কিন্তু নিজের মনকে বোঝানো কঠিন। সিনথন অনেক দিন ধরে অন্যদের গল্প শুনেছে। মাহবুব সাহেবের অপেক্ষা। কাদের সাহেবের হারানো স্বপ্ন। অরুর চলে যাওয়া। কিন্তু এখন সে বুঝতে শুরু করেছে—সব গল্পের শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে হয় নিজের কাছেই। অরুর সঙ্গে শেষ কথোপকথনের পর কয়েকদিন সিনথন অনেক শান্ত ছিল। অদ্ভুত এক ধরনের শান্তি। যে শান্তির সঙ্গে একটু কষ্ট মিশে থাকে। যেমন বৃষ্টির পর ভেজা মাটির গন্ধ। যেখানে বিষণ্ণতা আছে, কিন্তু অস্বস্তি নেই।।সে এখনো অরুকে মনে করে। কিন্তু আর আগের মতো নয়। আগে সে ভাবত— "কেন সে আমার জীবনে নেই?"
এখন সে ভাবে—
"সে আমার জীবনে এসেছিল, সেটাই তো অনেক।"এই দুই চিন্তার মধ্যে পার্থক্য অনেক বড়।
এক বিকেলে সিনথন রাশেদের সঙ্গে দেখা করতে গেল। এতদিন সে শুধু রাশেদের কথা শুনেছে। কিন্তু রাশেদের নিজের গল্প শোনা হয়নি।।সিনথন বলল
— "আপনি সবসময় অন্যদের গল্প শোনেন।"
রাশেদ হাসল।
— "সবাই নিজের গল্প বলতে চায় না।"
— "আপনিও না?"
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— "আমারও একজন ছিল।"
সিনথন তাকাল।
রাশেদ ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
অনেক বছর আগে রাশেদের ছোট ভাই ছিল।।দুই ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো।।ছোটবেলায় একসঙ্গে বড় হওয়া।একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা।একসঙ্গে ঝগড়া করা।।তারপর জীবন তাদের আলাদা পথে নিয়ে যায়। রাশেদ নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ছোট ভাই নিজের জীবন নিয়ে। কথা কমে যায়। কিন্তু সম্পর্ক কখনো কমেনি।
একদিন হঠাৎ খবর আসে—তার ভাই আর নেই। সেদিন রাশেদের মনে হয়েছিল, পৃথিবী থেমে গেছে। কিন্তু পৃথিবী থামেনি।
মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি হলো—
নিজের ভেতর ঝড় চললেও বাইরের পৃথিবী স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে।
চা বিক্রি হয়।।বাস চলে। মানুষ হাসে। সূর্য ওঠে।
রাশেদ বলল — "আমি অনেক বছর নিজেকে দোষ দিয়েছি।" সিনথন জিজ্ঞেস করল,
— "কিসের জন্য?"
— "শেষ সময়ে পাশে ছিলাম না বলে।"
একটু থেমে বলল,
— "মনে হতো, যদি আরেকবার সুযোগ পেতাম..."
সিনথন চুপ করে শুনছিল। কারণ সে বুঝতে পারছিল। মানুষ শুধু হারানো মানুষকে আঁকড়ে ধরে না। মানুষ অনেক সময় হারানো সুযোগকেও আঁকড়ে ধরে।
রাশেদ বলল — "একদিন বুঝলাম, আমি আসলে আমার ভাইয়ের জন্য কাঁদছি না।" সিনথন অবাক হয়ে তাকাল।
— "তাহলে?"
— "আমি কাঁদছি সেই সময়টার জন্য, যেটা আর ফিরবে না।"
এই কথাটা শুনে সিনথনের মনে হলো, কেউ যেন তার মনের গভীরতম জায়গাটা পড়ে ফেলেছে।।কারণ সে এতদিন অরুকে হারানোর কষ্ট ভাবত। কিন্তু হয়তো সে কষ্ট পাচ্ছিল সেই দিনগুলোর জন্য— যে দিনগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না। সেদিন রাতে সিনথন বাড়ি ফিরে নিজের পুরোনো কিছু জিনিস বের করল। অরুর দেওয়া একটি কলম। একটি পুরোনো চিঠি। কিছু ছবি। সে এগুলো ফেলে দিল না। কারণ এখন সে জানে— অতীতকে ধ্বংস করলেই মানুষ মুক্ত হয় না। কখনো কখনো অতীতকে তার সঠিক জায়গায় রেখে দিলেই মানুষ মুক্ত হয়।।পরদিন সকালে সে অনেক দিন পর নিজের জন্য কিছু করল।একটা নতুন খাতা কিনল। প্রথম পাতায় লিখল—
"যে জিনিস চলে গেছে, তাকে ধরে রাখার চেষ্টা নয়। যে জীবন আছে, তাকে সুন্দর করার চেষ্টা।"
সেদিন বিকেলে সে আবার কাদের সাহেবের দোকানে গেল।।দেখল, কয়েকজন শিশু বসে বই পড়ছে। কাদের সাহেব তাদের গল্প শোনাচ্ছেন। সিনথন দাঁড়িয়ে দেখছিল।
তার মনে হলো—
এই মানুষটি তার দোকান হারিয়েছেন।।কিন্তু বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা হারাননি। মাহবুব সাহেব তার সন্তান হারিয়েছেন।।কিন্তু ভালোবাসার ক্ষমতা হারাননি।।আর সে...।সে অরুকে হারিয়েছে।।কিন্তু ভালোবাসতে শেখার ক্ষমতা হারায়নি।।সন্ধ্যার আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। সিনথন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আগের মতো তার মনে হচ্ছিল না যে জীবন তাকে কিছু থেকে বঞ্চিত করেছে।।বরং মনে হলো—
জীবন তাকে কিছু শিখিয়েছে। কিছু মানুষকে নিয়ে এসেছে। কিছু মানুষকে নিয়ে গেছে।।কিন্তু প্রতিটি ঘটনা তাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।সিনথন জানত না সামনে কী আছে। কিন্তু অনেক দিন পর প্রথমবার সে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারল। ভয় ছাড়া। অপেক্ষা ছাড়া।
শুধু একটা ছোট বিশ্বাস নিয়ে—
হারানো জিনিসের পরেও জীবন শেষ হয় না। জীবন নতুন অর্থ খুঁজে নিতে জানে।
অনেক সময় মানুষ ভাবে, পরিবর্তন মানে পুরোনো মানুষটাকে পুরোপুরি বদলে ফেলা। কিন্তু আসলে পরিবর্তন মানে নিজের ভেতরের ভাঙা অংশগুলোকে নতুনভাবে সাজানো। সিনথনও বদলে যাচ্ছিল। কিন্তু সে আর আগের সিনথনকে ঘৃণা করছিল না। যে মানুষটা দিনের পর দিন অরুর অপেক্ষা করেছে, যে মানুষটা একটি পুরোনো স্মৃতির মধ্যে আটকে ছিল—সেই মানুষটাকেও সে এখন বুঝতে পারছিল। কারণ সেই মানুষটিও তো ভালোবাসতে জানত। শুধু সে জানত না, ভালোবাসার পরেও কীভাবে বাঁচতে হয়।
এক সকালে সিনথন অনেক দিন পর তার পুরোনো ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
"কিছু মানুষকে হারানোর ভয়েই আমরা অনেক সময় বেঁচে থাকা ভুলে যাই।" সে লেখাটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তার মনে হলো, এই লাইনটা যেন তার নিজের জীবনের জন্যই লেখা। সে এতদিন ভাবত, অরুকে ছেড়ে দিলে তার ভালোবাসার অপমান হবে।
কিন্তু এখন বুঝতে পারছে— ভালোবাসার সম্মান কষ্টের পরিমাণে নয়।
ভালোবাসার সম্মান হলো, সেই অনুভূতিকে সুন্দরভাবে বহন করতে পারা। কয়েকদিন পর সিনথন আবার মাহবুব সাহেবের বাড়িতে গেল। আজ বাড়িটা অন্যরকম লাগছিল। আগের মতোই বারান্দা। আগের মতোই চেয়ার। আগের মতোই দুটি কাপ। কিন্তু একটা পরিবর্তন ছিল। দ্বিতীয় কাপটি আজ টেবিলের এক পাশে রাখা নেই। মাহবুব সাহেব একটি কাপেই চা খাচ্ছিলেন। সিনথন অবাক হয়ে তাকাল।
— "আজ দুই কাপ বানাননি?"
বৃদ্ধ মানুষটি মৃদু হাসলেন।
— "না।"
— "কীভাবে পারলেন?"
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— "আমি আমার ছেলেকে ভুলে যাইনি।"
"শুধু বুঝেছি, তার স্মৃতির জন্য আমাকে নিজের জীবন থামিয়ে রাখতে হবে না।"
সিনথনের চোখে পানি চলে এলো।
কারণ সে বুঝল—
গ্রহণ মানে ভুলে যাওয়া নয়।।গ্রহণ মানে সত্যের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করা।
সেদিন বিকেলে সে কাদের সাহেবের দোকানে গেল। দোকানের সামনে এখন ছোট একটি বোর্ড লাগানো।
লেখা—
"বই পড়ুন, স্বপ্ন দেখুন।"
সিনথন হেসে বলল,
— "আপনার দোকান তো আগের মতো হলো না।"
কাদের সাহেবও হাসলেন।
— "না, হয়নি।"
— "তবুও আপনি খুশি?"
তিনি চারপাশে তাকালেন।।কয়েকজন শিশু বই পড়ছে।তারপর বললেন,
— "আগে ভাবতাম, আমার দোকান আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।"
"এখন বুঝি, আমার কাজের অর্থই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।"
ফেরার পথে সিনথনের মনে হলো—।মানুষ আসলে হারানো জিনিসের জায়গা পূরণ করে না।।মানুষ শুধু নতুন অর্থ খুঁজে নেয়।
একটা সম্পর্ক শেষ হয়ে যেতে পারে। একটা স্বপ্ন ভেঙে যেতে পারে। একটা মানুষ চলে যেতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে জীবনের সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক মাস পর এক বিকেলে সিনথন হঠাৎ অরুর সঙ্গে দেখা করল। একটি সাধারণ রাস্তার মোড়ে। কোনো নাটকীয়তা ছিল না। কোনো সিনেমার মতো মুহূর্তও নয়। শুধু দুইজন মানুষ, যারা একসময় একে অপরের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
অরু হাসল।
— "কেমন আছ?"
সিনথনও হাসল।
— "ভালো আছি। সত্যি ভালো আছি।"
এইবার তার উত্তরটা মিথ্যা ছিল না।
অরু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— "তুমি বদলে গেছ।"
সিনথন বলল,
— "হয়তো।"
— "কীভাবে?"
সে আকাশের দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
— "আগে ভাবতাম, জীবন আমাকে যা দেয়নি সেটাই আমার গল্প।"
"এখন বুঝি..."
"জীবন আমাকে যা দিয়েছে, সেটাই আসল গল্প।"
দুজনের আর বেশি কথা হলো না। হওয়ার দরকারও ছিল না। কিছু সম্পর্কের শেষটা বড় কোনো কথার মাধ্যমে হয় না। কিছু সম্পর্ক নিঃশব্দেই নিজের জায়গা খুঁজে নেয়।
সেদিন রাতে সিনথন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। যে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে একসময় অপেক্ষা করত। আজও সে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পার্থক্য হলো— আগে সে অপেক্ষা করত কেউ ফিরে আসবে বলে। আজ সে অপেক্ষা করছে আগামীকাল আসবে বলে।
জীবনে কিছু মানুষ হারিয়ে যায়। কিছু স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিছু প্রশ্নের উত্তর কখনো পাওয়া যায় না। তবুও মানুষ বেঁচে থাকে। কারণ মানুষ শুধু পাওয়া জিনিস দিয়ে বাঁচে না। মানুষ বাঁচে গ্রহণ করার ক্ষমতা দিয়ে।
সিনথন শেষবারের মতো নিজের ডায়েরিতে লিখল— "আমি যা হারিয়েছি, তা আমার জীবন ছিল না। তা ছিল আমার জীবনের একটি অধ্যায়। অধ্যায় শেষ হয়েছে। কিন্তু বই এখনও শেষ হয়নি।"
সমাপ্ত।