Posts

উপন্যাস

আমি বাঁধি তার ঘর-অধ্যায় ২ : যে ঘর নিজের ছিল না

July 17, 2026

Malwatt Oscar

4
View

২০২১ সালের জুন।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ তখনও পুরোপুরি থামেনি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কোভিড ওয়ার্ডে টানা ডিউটি করছে ইশতিয়াক।

পিপিই খুলে বেরোতে বেরোতে মনে হয়, যেন শরীরের সব শক্তি খুলে রেখে এসেছে।

তবু বাসায় ফিরেই বাবার ওষুধ, মায়ের বাজার, ছোট বোন নাবিলার কোচিংয়ের খোঁজ—সবকিছু তারই দেখতে হয়।

কেউ তাকে বাধ্য করেনি।

তবু কিছু মানুষ জন্ম থেকেই দায়িত্বের ভার তুলে নেয়।

প্রকাশনী থেকে ফিরিয়ে দেওয়া পাণ্ডুলিপিটা আলমারির ওপরই পড়ে আছে।

ধুলো জমছে।

ইশতিয়াক আর ছুঁয়েও দেখে না।

রাতে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়ার আগে মাঝে মাঝে শুধু তাকিয়ে থাকে।

মনে হয়—

সব স্বপ্নেরও কি মেয়াদ থাকে?

সেজুতি বদলায়নি।

যেদিনই দেখা হয়, কিছু একটা হাতে ধরিয়ে দেয়।

কখনো এক কাপ চা।

কখনো একটা সিঙ্গারা।

কখনো শুধু পাঁচ মিনিটের গল্প।

কিন্তু কখনো করুণা দেখায় না।

এই একটা জিনিসের জন্য ইশতিয়াক মেয়েটাকে আলাদা চোখে দেখতে শুরু করেছিল।

একদিন হাসপাতালের ক্যান্টিনে বসে দুজনে চা খাচ্ছিল।

সেজুতি হঠাৎ বলল,

— তুমি কখনো নিজের কথা ভাবো?

ইশতিয়াক চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে রইল।

— ভাবার সময় পাই না।

— সময় পাও না, নাকি নিজেকে সুযোগ দাও না?

ইশতিয়াক উত্তর দিল না।

অনেক প্রশ্নের উত্তর না দেওয়াই সহজ।

সেদিন সন্ধ্যায় সেজুতি প্রথম ইশতিয়াকের বাড়িতে গেল।

ছোট্ট ভাড়া বাসা।

টিনের চাল।

ড্রয়িংরুম আর শোবার ঘরের মাঝখানে একটা পাতলা পর্দা।

বাবা হুইলচেয়ারে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে।

মা পুরোনো সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই করছেন।

নাবিলা বই নিয়ে বসে আছে।

বাড়িটা ছোট।

কিন্তু অগোছালো নয়।

সেজুতি বুঝল—

সংসারটাকে টেনে রাখার জন্য একজন মানুষ নিজের জীবনটাকে আস্তে আস্তে খরচ করে দিচ্ছে।

ফেরার পথে সে বলল,

— তোমার বাবা খুব ভালো মানুষ।

ইশতিয়াক মৃদু হেসে বলল,

— আগে আরও ভালো ছিলেন।

অসুখ মানুষকে বদলে দেয়।

কখনো শরীর।

কখনো স্বপ্ন।

দিন গড়াতে লাগল।

ইন্টার্নশিপ শেষ হলো।

ইশতিয়াক বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে চেয়েছিল।

পারল না।

একটা প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি নিল।

বেতন খুব বেশি না।

কিন্তু মাসের শেষে টাকা হাতে আসে।

এখন সেটাই বড় কথা।

সেজুতির জন্য একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব আসতে লাগল।

মেয়েটা প্রতিবারই কোনো না কোনো অজুহাতে ফিরিয়ে দেয়।

তার মা একদিন বিরক্ত হয়ে বললেন,

— তুই কি সারাজীবন আইভুরু হয়ে থাকবে?

সেজুতি হেসে বলল,

— এখনো তো ডাক্তারই হলাম না।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

মেয়ের চোখে যে কারও জন্য অপেক্ষা আছে, সেটা তিনি বুঝতেন।

শুধু নামটা জানতেন না।

এক বর্ষার বিকেলে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল দুজন।

সেজুতি ধীরে বলল,

— একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

— করো।

— যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই...

তুমি খুঁজবে?

ইশতিয়াক অনেকক্ষণ চুপ রইল।

তারপর বলল,

— মানুষ যেটা হারানোর অধিকার রাখে না, সেটা খুঁজে লাভ কী?

সেজুতি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

— মানে?

ইশতিয়াক হালকা হেসে বলল,

— যার হারানোর কিছু নেই, তার খোজার কিছু নেই। কথা আছে আছে না চকচক করলেই সোনা হয়না। ভাগ্য যা দেয় তার মুল্য চোকাতে হয়। 

বৃষ্টির শব্দের মাঝেও কথাটা খুব স্পষ্ট শোনা গেল।

সেজুতি আর কিছু বলল না।

শুধু বাইরে তাকিয়ে রইল।

কয়েক মাস পর ইশতিয়াক জানতে পারল—

সেজুতির বিয়ে ঠিক হয়েছে।

ছেলেটা এবারের বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে ঢুকেছে, সহকারী কমিশনার।

ঢাকায় থাকে।

ভালো পরিবার।

সবাই খুব খুশি।

খবরটা শুনে ইশতিয়াকের ভেতরে অদ্ভুত একটা নীরবতা নেমে এল।

খারাপ লাগল।

একা লাগল।

কিন্তু আশ্চর্যভাবে তার মনে কোনো অভিযোগ জন্মাল না।

সেদিন রাতেই আলমারির ওপর রাখা পাণ্ডুলিপিটার ধুলো মুছে আবার তুলে রাখল।

নিজের মনে বলল,

"সব স্বপ্ন পূরণ করার জন্য জন্মায় না।

কিছু স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জন্মায়।"

বিয়ের এক সপ্তাহ আগে সেজুতি দেখা করতে চাইল।

চট্টগ্রাম মেডিকেলের সেই পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে।

দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

শেষ পর্যন্ত সেজুতি বলল,

— তুমি যদি একবার বলতে...

আমি হয়তো অপেক্ষা করতাম।

ইশতিয়াক মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

খুব আস্তে বলল,

— ঘরানির নিজের ঘরে চাল থাকে না, সেজুতি।

তোমাকে কোথায় রাখতাম?

সেজুতির চোখ ভিজে উঠল।

সে কাঁদল না।

শুধু বলল,

— সবাই নিজের ঘর বানায়।

তুমি সারাজীবন অন্যের ঘর বানাতে ব্যস্ত রইলে।

ইশতিয়াক হেসে ফেলল।

সেই হাসির ভেতর ক্লান্তি ছিল।

আক্ষেপ ছিল।

কিন্তু কোনো অনুতাপ ছিল না।

দূরে একটা হলুদ-কালো প্রজাপতি কৃষ্ণচূড়ার ডাল ছুঁয়ে উড়ে গেল।

দুজনেই তাকিয়ে রইল।

এবার আর কোনো কাক এসে তাকে ধরে নিয়ে গেল না।

তবু দুজনেই জানত—

সব সুন্দর জিনিসকে ধরে রাখা যায় না।

Comments

    Please login to post comment. Login