২০২৮ সালের সেই শীতের বিকেল।
সেমিনার শেষ হতে হতে বিকেল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।
হাসপাতালের নতুন ভবন থেকে বেরিয়ে সেজুতি ইচ্ছে করেই একটু ধীরে হাঁটছিল। তাড়াহুড়ো করার কোনো কারণ নেই। তবু মনটা কেমন অস্থির।
কৃষ্ণচূড়া গাছটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে থেমে গেল।
গাছটা এখনও আছে।
কেবল তাদের সময়টা নেই।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
— সেজুতি?
সে ফিরে তাকাল।
ইশতিয়াক।
সাদা অ্যাপ্রোনটা হাতে ঝোলানো। মুখে মাস্ক নেই। চুলে অল্প পাক ধরেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
তবু হাসিটা আগের মতোই।
শান্ত।
— কেমন আছ?
— ভালো।
তুমি?
— আলহামদুলিল্লাহ।
কথা শেষ।
দুজনেই বুঝল, এত বছরের দূরত্ব "ভালো আছি" দিয়ে মাপা যায় না।
ইশতিয়াক বলল,
— সেমিনারে এসেছিলে?
— হ্যাঁ।
— ভালো হয়েছে?
— মন্দ না।
আবার নীরবতা।
এই নীরবতাটা তারা দুজনেই চেনে।
একসময় এই নীরবতার মাঝেই কত কথা হয়ে যেত।
আজ হচ্ছে না।
...
ইশতিয়াক বলল,
— চা খাবে?
সেজুতি মাথা নাড়ল।
দুজন হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরোনো ক্যান্টিনে গেল।
আগের দোকানটা নেই।
নতুন টিনের ছাউনি হয়েছে।
তবু চায়ের কাপে সেই পুরোনো ধোঁয়া।
চা এনে ইশতিয়াক কাপটা এগিয়ে দিল।
— চিনি কম।
তুমি আগে কম খেতে।
সেজুতি একটু অবাক হলো।
— মনে আছে?
— কিছু জিনিস ভুলে যাওয়া যায় না।
চায়ের কাপ দুটো টেবিলে রাখা।
কেউ চুমুক দিচ্ছে না।
সেজুতি ধীরে বলল,
— আন্টি কেমন আছেন?
— ভালো।
বয়স হয়েছে।
হাঁটতে কষ্ট হয়।
— নাবিলা?
ইশতিয়াকের মুখে প্রথমবারের মতো একটু আলো ফুটল।
— মেডিসিনে রেসিডেন্সি করছে।
সেজুতি হেসে ফেলল।
— ও তো সত্যিই ডাক্তার হয়ে গেল।
— ওর খুব ইচ্ছা ছিল।
— তোমারও তো ছিল।
ইশতিয়াক চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
— আমার ইচ্ছাগুলো একটু দেরিতে আসে।
সেজুতি আর প্রশ্ন করল না।
সে জানে, এই মানুষটার কাছ থেকে নিজের গল্প বের করা যায় না।
...
চা শেষ হয়ে গেছে।
কাপের তলায় শুকিয়ে যাওয়া চায়ের দাগ।
সেজুতি হঠাৎ বলল,
— তোমার লেখা?
ইশতিয়াক বুঝতে পারল না।
— মানে?
— লিখছ?
কয়েক সেকেন্ড সে উত্তর দিল না।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
— না।
— একেবারেই না?
— সময় পাইনি।
কথাটা শুনে সেজুতির বুকটা হালকা কেঁপে উঠল।
সে জানত—
মিথ্যা।
সময় হয়তো ছিল।
সাহসটা আর ছিল না।
...
দূরে মাগরিবের আজান শুরু হয়েছে।
সেজুতি উঠে দাঁড়াল।
— আমার যাওয়া উচিত।
— হুম।
দুজনেই গেট পর্যন্ত একসাথে হাঁটল।
গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে।
চালক দরজা খুলে অপেক্ষা করছে।
সেজুতি দরজায় হাত রেখে বলল,
— একটা কথা বলি?
— বলো।
— তোমার ওপর একসময় খুব রাগ হতো।
ইশতিয়াক হেসে বলল,
— জানি।
— মনে হতো, তুমি ইচ্ছে করেই সবকিছু থেকে পালিয়ে গেলে।
ইশতিয়াক কিছু বলল না।
সেজুতি আবার বলল,
— পরে বুঝেছি...
তুমি পালাওনি।
তুমি শুধু নিজের পালাটা অন্যদের দিয়ে দিয়েছিলে।
ইশতিয়াক মাথা নিচু করল।
অনেকক্ষণ পরে বলল,
— সবাই তো নিজের ভাগটাই আগে নেয়।
আমি একটু উল্টো ছিলাম।
দুজনেই হেসে ফেলল।
হাসিটা খুব ছোট।
কিন্তু ভারী।
...
ঠিক তখনই ইশতিয়াকের ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে লেখা—
মা।
সে ফোন ধরল।
— হ্যাঁ মা।
ওপাশ থেকে কী যেন বললেন।
ইশতিয়াক মৃদু হেসে বলল,
— আচ্ছা, ফেরার সময় মাছ নিয়ে আসব।
আর কিছু লাগবে?
...
ফোন রেখে সে একটু অপ্রস্তুতভাবে বলল,
— মা।
আজ শুক্রবার।
ইলিশ খেতে ইচ্ছে করেছে।
সেজুতি মৃদু হেসে বলল,
— যাও।
বেশি দেরি কোরো না।
ইশতিয়াক মাথা নাড়ল।
— আচ্ছা।
আর কোনো কথা হলো না।
সেজুতি গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়িটা ধীরে ধীরে হাসপাতালের গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।
ইশতিয়াক দাঁড়িয়ে রইল।
যতক্ষণ গাড়িটা চোখে দেখা যায়।
তারপর ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।
হাসপাতালের বিপরীত পাশের ফার্মেসিতে ঢুকে মায়ের ওষুধ নিল।
তারপর মাছের বাজার।
এক কেজির মতো একটা ইলিশ কিনল।
বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বাসার দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে পড়ল—
আজ নাবিলা আসবে।
মা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছেন।
হাঁটতে হাঁটতে সে আকাশের দিকে তাকাল।
কোথা থেকে একটা হলুদ-কালো প্রজাপতি উড়ে এসে রাস্তার ওপারের কৃষ্ণচূড়া গাছটায় বসল।
ইশতিয়াক থামল না।
শুধু একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে আবার হাঁটতে শুরু করল।
সব প্রজাপতিকে ধরে রাখতে হয় না।
সব ভালোবাসাকে নিজের করে পেতেও হয় না।
কিছু মানুষ থাকে—
যাদের সুখ লুকিয়ে থাকে অন্য কারও মুখের হাসিতে।
নিজের স্বপ্নগুলো তারা খুব যত্ন করে ভাঁজ করে রেখে দেয় আলমারির এক কোণে।
তারপর একদিন টের পায়,
ঘরটা নিজের নামে নয়।
তবু সেই ঘরের প্রতিটি ইট বসানোর সময়,
তাদের হাতের ছাপ রয়ে গেছে।