Posts

উপন্যাস

আমি বাঁধি তার ঘর-অধ্যায় ৪ : ঘরে ফেরা

July 17, 2026

Malwatt Oscar

6
View

২০২৯ সালের ফেব্রুয়ারি।

শুক্রবার।

আজ বহুদিন পর ছুটি পেয়েছে ইশতিয়াক।

সকালে মা বলেছিলেন,

— বাবা, বাজারে গেলে নাবিলার জন্য একটু গরুর মাংস নিয়ে আসিস। মেয়েটা কয়দিন ধরে নাইট ডিউটি করছে।

ইশতিয়াক শুধু হেসেছিল।

— আচ্ছা।

বাজারের ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পড়ল।

রাস্তার মোড়ে এসে দেখে নতুন একটা বইমেলা বসেছে।

খুব বড় কিছু না।

উপজেলা পরিষদের মাঠে ছোট ছোট স্টল।

স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা ঘুরছে।

কেউ বই কিনছে, কেউ ছবি তুলছে।

ইশতিয়াক জানে না কেন, পা দুটো আপনাআপনি ভেতরে ঢুকে গেল।

বহু বছর কোনো বইয়ের স্টলে দাঁড়ানো হয়নি।

একটা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে সে চুপচাপ বই উল্টেপাল্টে দেখছিল।

ঠিক তখনই পাশ থেকে একটা ছোট ছেলে বলল,

— আঙ্কেল, এই বইটা নিলে কেমন হয়?

তার বাবা হেসে বললেন,

— আমি বুঝি না বাবা। তুমি স্যারের কাছে জিজ্ঞেস করো।

ছেলেটা বইটা ইশতিয়াকের দিকে বাড়িয়ে দিল।

— আঙ্কেল, আপনি ডাক্তার?

ইশতিয়াক অবাক হয়ে তাকাল।

— কেন?

— আপনার গলায় তো স্টেথোস্কোপ।

সে খেয়ালই করেনি, হাসপাতাল থেকে বেরোনোর সময় স্টেথোস্কোপটা খুলে রাখা হয়নি।

ছেলেটা আবার বলল,

— আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই।

কোন বই পড়ব?

ইশতিয়াক বইটা হাতে নিল।

কয়েকটা পাতা উল্টে আবার ছেলেটার হাতে দিয়ে বলল,

— বইটা কিনে ফেলো।

পড়তে ভালো লাগবে।

ছেলেটার মুখে এমন একটা হাসি ফুটল, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জিনিস পেয়ে গেছে।

তার বাবা টাকা মিটিয়ে ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন।

যাওয়ার আগে ছেলেটা একবার হাত নেড়ে বলল,

— ধন্যবাদ, আঙ্কেল।

ইশতিয়াকও হাত নাড়ল।

অদ্ভুত একটা শান্তি লাগছিল।

ঠিক তখনই পাশের স্টল থেকে ভেসে এল—

— ইশতিয়াক?

সে ঘুরে দাঁড়াল।

সেজুতি।

তার পাশে এক ভদ্রলোক।

সম্ভবত স্বামী।

আর বছর পাঁচেকের একটা মেয়ে বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে।

মেয়েটার হাতে রঙিন বেলুন।

সেজুতি একটু এগিয়ে এল।

— কেমন আছ?

— ভালো।

তুমি?

— আলহামদুলিল্লাহ।

সেজুতি পাশে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলল,

— এ আমার স্বামী, আরিফ।

আর এ আমাদের মেয়ে, মেহর।

ইশতিয়াক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

— কী নাম তোমার?

— মেহর।

— কোন ক্লাসে পড়ো?

— ওয়ানে।

— বড় হয়ে কী হবে?

মেয়েটা একটুও না ভেবে বলল,

— ডাক্তার।

ইশতিয়াক হেসে ফেলল।

— খুব ভালো।

ভালো ডাক্তার হবে।

আরিফ ভদ্রলোকের মতো হাত বাড়িয়ে দিলেন।

— আপনার কথা অনেক শুনেছি।

ইশতিয়াক একটু অবাক হলো।

— আমার কথা?

সেজুতি মৃদু হেসে বলল,

— সব কথা না।

কিছু গল্প।

ইশতিয়াক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

কিছু গল্প অসম্পূর্ণ থাকলেই হয়তো সুন্দর থাকে।

কিছুক্ষণ সাধারণ কথাবার্তা হলো।

কে কোথায় আছে।

মা কেমন আছেন।

নাবিলা কী করছে।

এর বেশি কিছু না।

হঠাৎ মেহর দৌড়ে একটা প্রজাপতির পেছনে ছুটল।

হলুদ-কালো একটা প্রজাপতি।

সেজুতি তাড়াতাড়ি বলল,

— আস্তে মা! ধরতে যেও না।

মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— কেন?

সেজুতি হাসল।

— সব সুন্দর জিনিস হাতে ধরতে নেই।

দূর থেকে দেখলেও সুন্দর লাগে।

ইশতিয়াক এক মুহূর্ত সেজুতির দিকে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটা প্রজাপতির পেছনে আর দৌড়াল না।

শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওড়া দেখল।

বিদায় নেওয়ার সময় আরিফ বললেন,

— একদিন সময় করে আমাদের বাসায় আসবেন।

ইশতিয়াক ভদ্রভাবে মাথা নাড়ল।

— ইনশাআল্লাহ।

সে জানে, যাওয়া হবে না।

তবু এমন কিছু আমন্ত্রণ থাকে, যেগুলো না রাখলেও অসম্মান হয় না।

সেজুতি বলল,

— ভালো থেকো।

— তুমিও।

এইটুকুই।

এর বেশি কিছু বলার ছিল না।

বাজারের ব্যাগটা আবার হাতে নিল ইশতিয়াক।

মাংস কিনল।

মায়ের ওষুধ কিনল।

নাবিলার পছন্দের মিষ্টিও নিল।

বাসার গলিতে ঢুকতেই বারান্দা থেকে মা ডাকলেন,

— এত দেরি হলো কেন?

ইশতিয়াক হেসে বলল,

— বইমেলায় ঢুকে পড়েছিলাম।

— কিছু কিনলি?

ইশতিয়াক একটু ভেবে বলল,

— না।

আজ শুধু মানুষ দেখলাম।

মা কিছু বুঝলেন না।

হেসে ভেতরে চলে গেলেন।

রাতে সবাই একসাথে খেতে বসল।

মা বারবার নাবিলার প্লেটে মাংস তুলে দিচ্ছেন।

নাবিলা ডিউটির গল্প করছে।

ইশতিয়াক চুপচাপ শুনছে।

তার হঠাৎ মনে হলো—

এই তো সে যা চেয়েছিল।

মায়ের মুখে হাসি।

বোন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।

ঘরটায় আর অভাবের গন্ধ নেই।

নিজের জন্য খুব বেশি কিছু সে পায়নি।

কিন্তু যাদের জন্য ছুটেছিল,

তারা সবাই পৌঁছে গেছে।

খাওয়া শেষ করে বারান্দায় এসে দাঁড়াল ইশতিয়াক।

দূরে কারও বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছে।

একটা বাড়ি।

আরেকটা বাড়ি।

আরেকটা।

সে মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল,

— আলহামদুলিল্লাহ।

হঠাৎ একটা হলুদ-কালো প্রজাপতি বারান্দার রেলিংয়ে এসে বসল।

কয়েক মুহূর্ত স্থির থেকে আবার উড়ে গেল।

ইশতিয়াক আর তাকে থামানোর চেষ্টা করল না।

সব প্রজাপতি নিজের হয় না।

সব ভালোবাসাও না।

তবু কিছু ভালোবাসা থেকে যায়—

অভিমান ছাড়া,

দাবি ছাড়া,

নিঃশব্দ আশীর্বাদের মতো।

আর কিছু মানুষ সারাজীবন নিজের ঘর গড়তে পারে না।

তারা শুধু খুব যত্ন করে...

অন্য কারও ঘরে আলো জ্বেলে দেয়।

— সমাপ্ত —

Comments

    Please login to post comment. Login