Posts

গল্প

রাইগাঁথা

July 18, 2026

Sabikun Nahar Auntu

Original Author সাবিকুন নাহার অন্তু

88
View

তোমরা কি কখনও বাতাসের ঘর দেখছো? ছেড়া কাপড়ের দেয়াল দিয়ে ঘেরা একটা ফিনফিনে ঘর। মোটামুটি বর্গাকৃতি একটা ঘরে এটে যায় অনেকজন। এমনই একটা ধূলোঝড়ে আলিশান ঘরে থাকে রাই। ওর মা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সরঞ্জাম নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে কাজে। কখন না খেয়ে কখনও সামান্য জলমুড়ি কোনরকম নাকে মুখে গুঁজে বেরিয়ে যায়। টুকটাক রান্না জানায় স্বামী ভবঘুরে হলেও জীবন চলে যায় মা মেয়ের কোন রকম। কম আয়ের কর্মজীবী মানুষের জন্য রাঁধতে প্রতিদিনের মতো আজও তৈয়ারি করছে শান্তা।

‘আইজকাও গুমেত্তে উঠতে দেরী অইয়া গেলো। ছেমড়ি তোরে কত কইলাম সময়মত জাগান দিবি’, হাতের তালুতে রাখা দাঁতের মাজনটা দাঁতে ঘষতে ঘষতে কথা বলছে শান্তা। রাই এর বাবা ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে মেয়েকে একাই বড় করে চলেছে সে। কাজ না করলে পেটে ভাত জুটবে না, এই কথাটা জীবন তাকে ভালোমতোই উপলব্ধি করিয়েছে। প্রতিদিন চোখ মেলেই নিজেকে সুধায়, হার মানা যাইবো না শান্তা, যত কষ্টই আসুক যুদ্ধ কইরা যাইতে অইবো। রাতের শেষে বাজারে অবহেলায় গড়াগড়ি খেতে থাকা পটল, আলু, সারাদিনের গরমে নরম হয়ে আসা মাছ; এগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। সকালে হলুদ, লবণ মরিচের মায়া করে রাঁধলেও গরম গরম ধোঁয়াওঠা ভাত তরকারি সবাই কব্জি ডুবিয়ে খায়। আসলে হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে রিক্সাচালক, পরিবহন শ্রমিক, রাজমিস্ত্রীদের মুখে তখন সবকিছুই রোচে, হোক তা শান্তার আধসিদ্ধ সবজি।

এত অভাবে মাঝে শান্তার ঘরে একমাত্র খুশি তার মেয়ে রাই। আঁধারেও আলোয় ছেয়ে থাকে তার ঘর। তার রাজকন্যা রাই চুপচাপ ঘরের ভেতর লেখাপড়া করে, ভাঙা আয়নায় চুল বাঁধে, পুতুলের বিয়ে দেয়। সারাদিন এভাবেই কেটে যায় কারণ এপাড়ায় রাই এর কোন বন্ধু নেই। তার চেয়ে বয়সে তিন চার বছরের বড় মেয়েরা আছে, তাদের কথাবার্তা আচার আচরণ ওর ভালো লাগে না। তার ভালো লাগে তার পাঠশালার আপাকে। ওহ! বলাই হয়নি, আমাদের রাই কিন্তু ক্লাস টু তে পড়ে। যদিও ক্লাস টু অনুযায়ী তার বয়স কিছুটা বেশি। কিন্তু আপা বলেছে তাতে কোন সমস্যা নেই। কারণ শিক্ষার কোন বয়স নেই। ফুটপাত ধরে একটুদূর হাঁটলেই একটা ছোট পরিত্যক্ত বাড়ি। তার নিচতলায় দুইজন ভাইয়া আর আপু সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চাদের পড়ান। প্রতিদিন সে পাঠশালায় সময়মত চলে যায় আবার সময়মত ফিরে আসে। পাঠশালার নাম ‘আলোর মিছিল’

মোটা কাপড়ের স্তরের উপর ফিনফিনে প্লাস্টিক পেপার। এমন ছাউনি ভেদ করে চাঁদের আলো আসে না, তবে পুরোনো হতে হতে যে দেয়াল ছিড়ে জায়গায় জায়গায় যে ফুটো দেখা দিয়েছে, সে ফাঁকফোকড় গলে কখনো কখনো আলো এসেও পড়ে। তবে সে আলো উপভোগ এর উপায় থাকে না। ফুটপাত ঘেঁষে সাঁই করে চলে যাওয়া বড় বড় গাড়ির ছুঁড়ে যাওয়া ধুলোঝড় চারিপাশ ঝাপসা করে রাখে।

রাই প্রায়ই পাটি পাতা মেঝেয় বসে আপনমনে একা একা কথা বলে। অনবরত একদিকে তাকিয়ে কথা বলে যায়। অনেকদিন ধরেই রাই, কিছু কথা একজনকে বলবে বলে ঠিক করে রেখেছে কিন্তু বলতে পারছে না।  শান্তা একদিন পর্দার আড়াল থেকে খেয়াল করলে রাইকে জিজ্ঞেস করে,

‘কি রে রাই, তুই কি কস একলা একলা?’, রাই একটু চমকে পেছনে তাকায় আর অপ্রস্তুতভাবে হাসে।

‘কিছুনা আম্মা’

বালিশের নিচ থেকে কিছু একটা বের করে রাই। শান্তা দেখলো রাই এর হাতে অনেকগুলো চকলেট।

‘এতগুলি লজেন। কেডায় দিসে তোরে?’

‘ফজলু মামু।’

‘অওওও….ফজলু ভাই৷ হ্যায় তো দিবোই। হ্যায় তোরে নিজের মাইয়ার মতন বালা জানে রে রাই। দেহি কয়ডা দিসে? তুই এতুডি দিয়া কি করবি? বাইচ্চাগো বেশি লজেন খাইতো হয় না’, এই বলে সে চকলেটগুলো নিজের কাছে রেখে দিলো।

রাই ফ্যালফ্যাল করে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। মা ওর চোখের ভাষা বুঝলো না! কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো।

রাই তার বড়ভাই এর সাথে ঘুমায়। পাশে আলাদা ঘুমায় শান্তা। মাঝে মাঝে আবদার করলে তাদের কাছে এসে শোয়। মায়ের সাথে ঘুমাতেই রাই এর ভালো লাগে। আজও অনেক অনুরোধ করেছে মা কে তার কাছে ঘুমানোর জন্য কিন্তু শান্তা এলো না। কাপড় আর তেরপলের দেয়াল পেরিয়ে ওপাশে চলে গেলো। বেশ অনেকক্ষণ রাই জেগে রইলো রেডিওর মৃদু আওয়াজে বেজে চলা গানের শব্দে। আশেপাশের বেশ কয়েকটা ছাউনি থেকে গানের আওয়াজ আসছে। প্রায় প্রতি রাতেই কোন না কোন ছাউনিতে গান বাজে। চোখ বন্ধ করে রাই গুনগুনিয়ে যাচ্ছে,

‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে’

সকাল সকাল শান্তার কোমড় ব্যাথা। উঠতেই পারছে না ব্যাথায়। গতকাল গভীর রাতে তেরপলের ছাউনিতে খসখসে আওয়াজ। পর্দা একটু ফাঁকা করতেই ফজলু আওয়াজ দিলো। ফজলু প্রায়ই এখানে এসে রাত কাটিয়ে যায়। যে রাতে আসে তারপরের দিন শান্তা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। কোমড়ের নিচ থেকে সর্বাঙ্গে ব্যথা হতে থাকে। রাই কে ডাক দিয়ে শান্তা বলে নাজমা খালাকে বলে আসতে আজকে তার রাঁধতে যেতে একটু দেরী হবে। রাই নাজমাকে বলতে গেলে নাজমা রেজিনার কানে কানে কি যেন বললো, বলে দুজনে মুখ টিপে হাসতে থাকলো। রাই কিছুই বুঝতে পারলো না।

বিকেল হতেই বই খাতা গুছিয়ে রাই ‘আলোর মিছিল’ এ হাজির। আজ ওরা সবাই ইংরেজি বারো মাসের নাম আর ইংরেজিতে দশটি ফলের নাম শিখলো। বাচ্চাদের কারও কারও বলতে প্রথমে একটু কষ্ট হলেও পরে ওরা সবাই টপাটপ মুখস্থ করে ফেললো। সবার আগে পড়া বলতে পারলো আমাদের মিষ্টি রাই। ও বয়সে একটু পরিণত হওয়ায় মস্তিষ্ক একটু বেশি কাজ করে। ক্লাস প্রায় শেষের দিকে এমন সময় রাই প্রশ্ন করলো,

‘আপা, কবিতা কাকে বলে?

সুমি একটু হেসে বললো, ‘কবিতা হলো ছান্দসিক শব্দ প্রয়োগ যা পাঠকের কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করে।’

আপার কথা শুনে রাই হা করে তাকিয়ে রইলো। সুমি বুঝতে পারলো রাই কিছুই বুঝতে পারেনি কবিতার বিষয়ে। তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।

‘বাচ্চারা, চলো আজ আমরা একটা কবিতা শিখবো। কবিতাটি লিখেছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবিতার নাম মা’

যেখানেতে দেখি যাহা

মা-এর মতন আহা

একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,

মায়ের মতন এত

আদর সোহাগ সে তো

আর কোনোখানে কেহ পাইবে না ভাই……


 

কবিতা শুনে রাই এর মনে হলো বাংলার মত মধুর আর কোন ভাষা নেই। মনে যেন হাজারো শব্দ মাটি ফুড়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো।

রান্না শেষে ছাউনিতে ফিরে শান্তা দেখলো রাই উল্টো ঘুরে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। হঠাৎ রাই বালিশে আঘাত করতে লাগলো। এমনভাবে আঘাত করতে লাগলো যেন ভেতরের সব রাগ বের করে দিচ্ছে। শান্তা দৌড়ে গিয়ে রাইকে থামালো। তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করলো। রাই আস্তে আস্তে চুপ হয়ে গেলো। মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে রইলো।

‘কি হইসে মা? এত রাইগা গেলি ক্যান হঠাৎ?’

‘কই মা? আমি আবার কখন রাগলাম?’, রাই এমনভাবে অস্বীকার করতে লাগলো যেন কিছুই হয়নি।

রান্নাবান্না করতে রাই এর বিষয়টা নাজমাকে বললো শান্তা। নাজমা বললো, ‘আমাগো ফজলু ভাই কিন্তু তাবিজ তুমা করতে জানে। জানোস নি? ছোটখাটো ব্যারাম হ্যায় সারায় দিবার পারবো।’

‘বালা বুদ্ধি দিসোস তো৷ হ্যায় আমার মাইয়ারে খুব বালা জানে। বাই রে কইলে একটা ব্যবস্থা ঠিকই করবো’, কথাগুলো বলে শান্তা রান্নায় মনোযোগ দিলো।

নাজমা রেজিনার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে ইশারা করলো, শান্তা সেদিকে খেয়াল করলো না।

আজ খুব সুন্দর জোছনা বাইরে। রাই তেরপলের দরজা ভেদ করে বেশ কিছুক্ষণ চাঁদ দেখলো। কিছুক্ষণ পর ভাই বাটার বান আর কলা নিয়ে আসলো। কিছুদিন ধরেই রাই এর খুব বাটারবান খাওয়ার শখ হয়েছে। খাওয়া শেষে রাই শুয়ে পড়লো। ছোটভাই মাঝে মাঝে কোথায় যেন চলে যায়। আজ সে থাকবে না বলছে। ভাইয়া না থাকলে রাই এর খুব মন খারাপ হয়। এই পৃথিবীতে তার ভাই ই তার বন্ধু। যাই হোক, চোখটা লেগে আসতেই আস্তে আস্তে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। আধেক রাত পেরিয়ে গিয়েছে। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে রাই থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো। চোখ মেলে অনুধাবন করলো প্রকৃতি সন্দেহজনক ভাবে নীরব হয়ে আছে। একমাত্র রেডিওর ফ্রিকোয়েন্সিতে এক সুকণ্ঠীর রাগ। প্রচণ্ড ভারি হয়ে আছে তার শরীরটা। রাই নড়েচড়ে ওঠার চেষ্টা করলো, তখুনি কে যেন তার শরীরটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো!

রাই এর চিনতে এতটুকু ও অসুবিধা হলো না মানুষটিকে। ফজলু! সাধারণত দিনের বেলা চকলেট দিয়ে সে তাকে ব্যথা দিতো। আজ মা পাশের ছাউনিতে থাকা সত্ত্বেও ধরা পরার তোয়াক্কা না করে তাকে কষ্ট দিতে চলে এসেছে। রাই এর দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। তার এই দুর্ঘটনার কথা জানাজানি হলে সে আর তার মা সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না সে বুঝতে পারছে। আলোর মিছিলের ভাইয়া শিখিয়েছে কীভাবে শয়তানের কাছ থেকে আত্মরক্ষা করতে হয়। ফজলুকে ঘায়েল করতে বালিশের নিচে একটা ছুড়ি রেখে দিয়েছিলো সে। কিন্তু এই মুহূর্তে আত্মরক্ষা তো দূরে থাক তার নিজেরই আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না। ছুড়িটা আস্তে আস্তে বালিশের নিচ থেকে বের করে সে তার নিজের পেটে আচড় দিলো!

আদিম পাশবিক উন্মত্ততায় ফজলু খেয়ালই করেনি কখন পুরো কাঁথা ভিজে উঠেছে। খেয়াল হতেই টর্চের আলো ফেললো। দেখলো রক্ত! রক্তের বন্যা চারিদিকে। চিৎকার দিয়ে বেরিয়ে এলো ছাউনি ছেড়ে। চিৎকার শুনে শান্তা ধড়মড় করে উঠলো। পর্দা সরিয়ে দেখলো তার মেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছে!

‘কু** বাচ্চা। তুই আমার রাই এর গায়ে হাত দিছিস। তোর হাত আইজ আমি কাইটা ফালামু।’

আশেপাশে অনেক ছাউনিতেই রেডিও বাজছিলো। এত চিৎকারে সবার বিশেষ মুহূর্ত নষ্ট হওয়ায়, বেরিয়ে এলো সবাই।

নিজের গালির খাতা খুলে ফজলুও তেড়ে এলো। ‘ওই তুই আমারে কি মারবি! কি মারবি তুই! ভুইল্যা যাইস না এই ব্যবসায় কিন্তু তুই নিজেও আসস। বহুত লোকের থেইক্কা ট্যাহা নিসোস। পাড়ার মাইয়াগোর খাবার ঘুমের ওষুধ দিয়া ওগোর ইজ্জত নিয়া নিসোস। তুই মনে করসোস কেউ কিসু জানবো না? নিজের মাইয়ারে খালি মানুষ মনে করস, আর কেউ মানুষ না? আমার থেইক্কা যেই টাকা নিসোস, সেইটা আমি আইজকা উসুল করসি..হা হা হা হা হা হা’

শান্তা চিৎকার করে ফজলুর দিকে তেড়ে এলো। কিন্তু ততক্ষণে পুরো পাড়া জেনে গিয়েছে শান্তা আর ফজলুর কুকীর্তি। এই দুজনকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলো সবাই।

রাত পেরিয়ে প্রায় ভোর। অনেকটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে। রাই মরেনি। রক্ত পড়া অনেকটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তার পেটের ক্ষতকে তোয়াক্কা না করে বেরিয়ে এলো ছাউনি ছেড়ে। মায়ের লাশের পাশে বসে কবিতা আওড়াতে লাগলো রাই,

হেরিলে মায়ের মুখ,

দূরে যায় সব দুখ,

মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,

মায়ের শীতল কোলে

সকল যাতনা ভোলে

কতো না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান

Comments

    Please login to post comment. Login