নাসিও মেঘ থমথমে দুপুরে একলা হাঁটছে। জাপানের কোচি শহর বেশিরভাগ সময়ই মেঘলা থাকে। সারাদিন রুমে বসে থাকতে থাকতে ভীষণ একঘেয়েমিতে পেয়ে বসেছে। একটু সামনে প্লে গ্রাউন্ড টা বেশ প্রাণবন্ত। গেইট পেরিয়ে সারি সারি বসার জায়গা বেছে বসে পড়লো।
~হ্যালো ইয়াং ম্যান।
ছেলেটা এদিক ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
আমাকে বলছো?
~হ্যাঁ।
~কে তুমি?এখানে কি করছো?
~কেনো? আমার কি এখানে আসা নিষেধ নাকি?
~হ্যাঁ, নিষেধই তো, এখানে শুধু বাচ্চারা অথবা টিনেজাররা আসে খেলাধূলো করার জন্য। বড়রা বাইরে অপেক্ষা করে।
~আমি আমার ভাগ্নের সাথে এসেছি। ওই যে দেখতে পাচ্ছো সাদা পোলো টিশার্ট পড়া একটা ছেলে বাস্কেটবল খেলছে? ও আমার ভাগ্নে।
~ওহ, তুমি রিচার্ডের মামা। আমি চিনি ওকে। ও খুব ভালো রাগবি খেলতে পারে। এখানে প্রায়ই দলবল নিয়ে খেলতে আসে। আমি একদিন পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিলাম। ও আমাকে ফার্স্ট এইড করে দিয়েছিলো। ও আমাকে বলেছে রাগবি শিখিয়ে দেবে।
~সেটা তো খুব ভালো। আচ্ছা, তুমি কি সুরিন? সুরিন নামের একজনের কথা রিচার্ড আমাকে প্রায়ই বলে। ও বলে সুরিন ওর খুব ভালো বন্ধু। তাই ই জিজ্ঞেস করলাম।
~ কিন্তু আমি তো সুরিন নই। রিচার্ডের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বোধ হয় অন্য কোন বন্ধুর কথা বলেছে। রিচার্ড আমাদের এখানে বেশ জনপ্রিয়। ওর বন্ধুর অভাব নেই। আর এত বন্ধুর মাঝে স্পেশাল কেউ তো থাকতেই পারে।
~আমার মনে হয় আমি আন্দাজ করতে পারছি, তুমি এখানে কেনো এসেছো? তুমি সুরিন এর ব্যাপারে খোঁজ নিতে এসেছো। কারণ খুব সম্ভবত তুমি জানতে পেরেছো রিচার্ড সুরিনের সাথে শহরের বাইরে আউটিং করার প্ল্যান করছে। নিশ্চয়ই রিচার্ড এর মা তোমাকে পাঠিয়েছে ছেলের বন্ধুর বিষয়ে খোঁজ নিতে। রাইট?
~তুমি তো এক্কেবারে জিনিয়াস। বুঝলে কি করে?
~কারণ আমার মা সেইম কাজ করে। সো ডিসট্রেসিং, ইউ নো!
~ধরা যখন পড়েই গিয়েছি, তবে আর লুকিয়ে লাভ নেই। তুমি কি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারো?
~সুরিন এর ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। তবে কিছু দিন ধরেই দেখছি রিচার্ড এখানে আসার কিছুক্ষণ পরেই একজনের সাথে বেরিয়ে যায়। খুব সম্ভবত ওরা একসাথে পাশের বারে যায়। বারে খোঁজ নিলে ওর ব্যাপারে জানতে পারবে। কারণ এটা রেস্ট্রিক্টেড বার, যারা যায় তাদের পরিচয় ট্র্যাক রাখা হয়। কিন্তু ওরা কোন তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে কিনা, এটা বলতে পারছি না।
নাসিও গ্রাউন্ড থেকে বের হয়ে বারে পৌঁছল। আসলেই নানারকম চেকিং প্রটোকল পেরিয়ে ভেতরে আসতে হয়েছে। কিন্তু এখন ইনফরমেশন জোগাড় করবে কি করে। তার মতো চশমা পড়া, তেলতেলে চুলের মানুষের পক্ষে কাউকে পটানো খুব কঠিন।
একটা নীলচুলো মেয়ে খুব হেসে হেসে ক্লায়েন্ট দের ড্রিংক সার্ভ করছে। মনে হলো তার কাছে গিশে কাজ হবে। নাসিও ভয়ে ভয়ে একটা ড্রিংক চাইলো লিয়ানার কাছে।
~Man, I think you're in the wrong place.
~আমি আসলে খুব সাধারণ মানুষ। সুরিন নামের একটা ছেলে আমার ভাই এর ছেলেকে খারাপ পথে নিয়ে যাচ্ছে। তুমি আমাকে সুরিনের ঠিকানাটা দিতে পারবে?
~I can't do that. This is confidential.
~মনে করো তোমার আপনজনের সাথে এমন হচ্ছে। তুমি কি করতে?
লিয়ানা জানে এই জগতটা কত খারাপ। তার কেমন যেন মায়া হলো। সে বললো,
~এগুলো খুবই গোপনীয়। আর ইদানীং কার ঘটনাগুলো সম্পর্কে তো জানোই, উপর থেকে আমাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর সুরিনের বাবা খুব প্রভাবশালী প্রফেসর। তারপরও আমি তোমাকে ঠিকানা দিচ্ছি কিন্তু এটা শুধু তোমার আমার মধ্যে থাকবে। ডিল?
~তুমি কোন ঘটনার কথা বলছো বুঝতে পারছি না।
~ভাই তুমি কি এলিয়েন? এই শহরে পরপর কতগুলো অঘটন ঘটে গেলো। শোনোনি?
~আসলে আমি খুবই ফ্যামিলি ওরিয়েন্টেড মানুষ। ছোট একটা গার্ডেন আছে। গাছেদের সাথে গল্প করতে করতেই সময় কেটে যায়। আর তাছাড়া এই অসুস্থ সমাজ সম্পর্কে যত কম জানা যায়, ততই ভালো।
~ম্যান, প্লিজ লিভ। আমি আর এক মূহুর্ত সময়ও তোমার সাথে নষ্ট করতে চাচ্ছি না। আমার অননেএএএএক কাজ।
~ওকে, ধন্যবাদ। তুমি অনেক উপকার করলেন।
এই বলে নাসিও চলে যাচ্ছিলো। লিয়ানা কি মনে করে পেছন থেকে থামিয়ে বললো,
~বি কেয়ারফুল আউটসাইড। লাস্ট টাইম যে খুন হয়েছে, সে তোমার মতোই চাশমিশ ছিলো…হা হা হা(এই বলে লিয়ানা হো হো করে হেসে উঠলো)
নাসিও কিছু না বলে মুখটা কাঁচুমাচু করে চলে আসলো। বার থেকে বের হয়ে একটু হেঁটে সামনে একটা চওড়া রাস্তা উত্তর দিকে সোজা চলে গিয়েছে। রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া এখানেই শেষ। এরপর অনেকটা পরিত্যক্ত জায়গা। খবরের কাগজে ক্রাইম প্লটটা দেখেছে সে, সেখানে নিশ্চয়ই এখন অনেক পুলিশ ঘিরে আছে।
একটা পুরোনো স্কুলের আঙিনায় এসে সে দাঁড়ায়। আঙিনায় ফুঁটে থাকা ছোট ছোট ডেইজিগুলো রোদের তাপে নেতিয়ে আছে। মানুষের জীবনটাও এই ডেইজি গুলোর মতো। আশেপাশের পরিবেশ বা পরিবেশের মানুষগুলো যদি বিষ হয়ে ওঠে, সে মানুষও মানসিকভাবে এভাবে নেতিয়ে যায়, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।
ফুল গুলোকে পাশ কাটিয়ে সে ভেতরে দুশো নয় নাম্বার রুমে যায়। পুরোনো পরিত্যক্ত রুমে মাকড়সা জাল বুনলেও স্মৃতিগুলো জ্বলজ্বলে বড্ড। ২০০১ সালে এই রুমে খুব খারাপ কিছু একটা ঘটে গিয়েছিলো তার সাথে। নাসিও বেশ কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবলো সেদিনও আকাশে মেঘ ছিলো।
পরদিন সকালে নাসিও ঘুম থেকে উঠলো। দাঁত মেজে ফ্রেশ হলো। বোনের বাসায় নাস্তা সেরে নিজের গাছে পানি দিতে গার্ডেনে এলো। গাছগুলোর সে খুব যত্ন করে। কিছু গোলাপ দানিতে সাজিয়ে রেখে টিভি অন করলো। সকালের খবরটা দেখা উচিত।
আরেকজন খুন হয়েছে। এইবার একজন প্রফেসর। পুলিশ আর রিপোর্টার্সরা হন্তদন্ত হয়ে তদন্তে নেমেছে। সাংবাদিক ওয়াইফের সাথে কথা বলছেন। তিনি খুব দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন।
~আমার স্বামী খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমি বুঝতে পারছিনা কে বা কারা তাকে এত নৃশংসভাবে শেষ করে দিলো।
~কোন অস্বাভাবিক কিছু কি চোখে পড়েছে?
~পুলিশ আমাকে অনেক জিনিস পত্র যেগুলো ওর পকেটে ছিলো সেগুলো দিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সেগুলোর মাঝে ডলফিন কি টা ছিলো না। এটা ওর খুব প্রিয় ছিলো। আমার মনে হয় এটা খুনি নিয়েছে এবং খুনি ওর পরিচিত কেউ।
নাসিও অদ্ভুত চোখে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে তার হাতে থাকা ডলফিন কি টা সাই সাই করে ঘুরিয়ে!